কল্পবিজ্ঞান।। মিজোরাম এ রোবুর কান্ড ।। অঞ্জনা মজুমদার


ছবিঋণ - ইন্টারনেট 

 

মিজোরামে রোবুর কান্ড 

অঞ্জনা মজুমদার  

 

সমু আর বিবি সাত আর নয় বছরের দুই ভাইবোন মেজমামার সাথে মিজোরাম বেড়াতে এসেছে। ইন্ডিগোর বিমান যখন লেংপুই বিমানবন্দরে ল্যান্ড করলো মেজমামা বললেন, আহা ফুলে ঘেরা এই বিমানবন্দর যেন পাহাড়ের কোলে একটা সুন্দর বাড়ি।
সত্যিই লেংপুই বিমানবন্দর ভারি সুন্দর। সেখানে সাড়ে তিনশো টাকা দিয়ে ইনার লাইন পারমিট এর জন্য ফর্ম পুরণ করে ছোট্ট বিমানবন্দরের বাইরে সব যাত্রীরা বেরিয়ে এলেই বিমানবন্দরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বিবি বলল, আচ্ছা মেজমামু আমাদের দমদম এয়ারপোর্ট দিনে রাতে কখনও এমন বন্ধ হয়? 
মেজমামু কিছু বলার আগেই একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। ছোটখাটো চেহারার ফর্সা এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে মেজমামুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বললেন,  স্যর আই অ্যাম বিয়াকা। আজ থেকে আগামী পাঁচ দিন আমি সবসময় আপনাদের সাথেই আছি। এখন হোটেলে চলুন। 
সুন্দর একটা সাদা ইনোভায় চেপে প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে আইজলের গ্রান্ড হোটেলে এসে পৌঁছল। 
সুন্দর হোটেল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে বলে মেজমামাকে কফি আর সমুকে বিবিকে চকোলেট ড্রিঙ্ক দিয়ে ওয়েলকাম জানানো হল।
গোটা পথ একটা মোটরসাইকেল ওদের গাড়ির পিছনে পিছনে আসছিল। তার দুজন আরোহীও ওই একই হোটেলে ঢুকল। বিবি চেষ্টা করেও ওদের মুখ দেখতে পেল না। মাস্ক পরা, কিন্তু একজনের লাল চুল আর অন্যজনের কোঁকড়া। 
হোটেলের লিফটটা অদ্ভুত রকমের। মাত্র দুজন লোক পরপর ওই লিফটে উঠতে পারে। 
বিবি লিফটে উঠতে যেতেই লালচুলো লোকটা বিবিকে ঠেলে লিফটে উঠে পড়ল। পিছন পিছনে কোঁকড়াচুলোও ওদের ঠেলে লিফটে উঠে পড়ল। ওরা অবাক হয়ে দেখল লিফট ফিফথ ফ্লোরে থামল। সমু বোতাম টিপতেই আবার লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোরে চলে এল। ওরা উঠতেই মেজমামা রিশেপশনের ফর্মালিটি মিটিয়ে সামনে চলে এসেছেন। বললেন, তোরা আগে ফিফথ ফ্লোরে চলে যা আমি পরে যাচ্ছি। রুম নং  ৫০৪ এ হোটেলের বয় আমাদের সুটকেশ নিয়ে অপেক্ষা করছে। 
ওরা লিফটে উঠে পড়ল। কিন্তু লোকদুটোর আচরণ ওদের দুঃখ দিয়েছে। যাই হোক ৫০৪ নং রুমের সামনে বেয়ারা দাঁড়িয়ে। ওদের দেখে হাসিমুখে দরজা খুলে দিল। মেজমামাও চলে এসেছেন। ওরা 
ঘরে ঢুকে পড়ল তার আগেই বিবি দেখে নিয়েছে উল্টোদিকে ৫০২ নং ঘরের দরজা সামান্য ফাঁক করে সেই লালচুলো ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অদ্ভুত! লোকটার চোখ নীল। দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। 
দরজা বন্ধ করেই বিবি উত্তেজিত হয়ে মেজমামু বলে ডাকতেই মেজমামা বললেন, জানি রে ওরা ৫০২ নং ঘরে আছে। আমার কাছে মিজোরাম মিউজিয়াম এর জন্য যে স্পেশাল ছবি আর ম্যাপটা আছে সেটা ছিনিয়ে নিতে চাইছে। 
সমু বলল, তাহলে কি হবে মামু? 
মেজমামা হাসলেন,  আমিও তৈরি। কিচ্ছু ভয় নেই। 
বিবি মেজমামাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি জানি আমাদের মেজমামু বড় বিজ্ঞানী। কেউ মেজমামুর সাথে বুদ্ধিতে, শক্তিতে পারবে না।
সমু বলল, কিন্তু মামু এখন তো রোবু আমাদের সঙ্গে নেই। আমরা দুষ্ট লোকেদের সাথে লড়াই করে পারবো? 
মেজমামু হেসে ফেললেন। নিজের ছোট্ট সুটকেশটা বের করে বিবিকে বললেন, আয় তোরা হেল্প কর। দেখি রোবুকে আনতে পেরেছি কিনা। 
সমু আর বিবির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দুজনে মেজমামার সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে দশ মিনিটে ছোট্ট রোবুকে দাঁড় করিয়ে ফেলল। সুইচ অন করতেই রোবু বলল, হাই মামু, হাই বিবি সমু। দেখ আমি তোমাদের সাথে সবসময়ই আছি।
সমু বিবি হাততালি দিয়ে উঠলো। আমাদের আর কেউ হারাতে পারবে না। মিউজিয়াম এর জন্য আনা জিনিসও কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। 
মেজমামু বললেন,  চল আমরা ডিনার সেরে আসি। রোবু ঘর পাহারা দিক। রোবু বলল, ইয়েস মামু। তোমরা নিশ্চিন্তে ডিনার সেরে এসো।
তিনজনে ঘরে তালা দিয়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরে ডাইনিং হলে ডিনার করতে এলো। সমু বিবি চিকেন ফ্রায়েড রাইস আর মেজমামা রুটি আর চিকেন খেলেন। মেজমামা বার বার ঘড়ি দেখছিলন। ঘড়িতে লাল আলো ব্লিঙ্ক করছিল। বললেন, তাড়াতাড়ি ঘরে যেতে হবে। 
ডিনার সেরে বেয়ারাকে ঘরে চার বোতল মিনারেল ওয়াটার দিতে বলে আগেই লিফটে উঠে গেলেন। সমু বিবি পিছনে পিছনে দৌড়ে গেল। ঘরের সামনে এসে ওরা অবাক। পেছনে বেয়ারাটিও এসে পৌঁছেছে। 
ঘরের দরজা হাট করে খোলা। মেঝেতে সেই লালচুলো আর কোঁকড়াচুলো পড়ে কাতরাচ্ছে। ছটফট করছে। তবে চুলগুলো মাথা থেকে আলাদা। ওগুলো পরচুলা ছিল?
রোবুকে দেখা যাচ্ছে না। বিবি দেখল, জানালার পর্দার আড়ালে রোবুর পা দুটো উঁকি দিচ্ছে।
বেয়ারাকে কিছু বলতে হল না, সে দ্রুত ফোন করে ডাকতে ম্যানেজার দৌড়ে এলেন, সঙ্গে একজন পুলিশ অফিসার। অফিসার মেজমামার হাত ধরে বললন, আমরা রেডিই ছিলাম। কিন্তু আপনার ঘরে এই অ্যাটাকটা আটকাতে পারলাম না। কিন্তু আপনি আর এই দুটো বাচ্চা এদের কপোকাত করলেন কি করে?  
বিবি কিছু বলার আগেই বেয়ারা উত্তেজিত হয়ে বলল, না না স্যর কিছু করেন নি, আমরা আসার আগেই এরা এভাবেই পড়ে ছিল। অফিসার কনস্টেবলদের বললেন, ওদের নিয়ে যাও। 
ওরা নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়েছে। কেঁদে কেঁদে বলছে এ ঘরে জিন ছিল। এখন ছুপিয়ে গেছে। 
অফিসার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মেজমামার দিকে তাকিয়ে বললেন, কি ব্যাপার মিঃ সেন?  
মেজমামা মৃদু হেসে বললেন, আপনাদের আর অন্ধকারে রাখবো না। রোবু বেরিয়ে আয়। 
রোবু গুটি গুটি পায়ে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। শার্ট প্যান্ট পরা রোবুকে বাচ্চা ছেলের মতো দেখতে। ম্যানেজার অবাক হয়ে বললেন, একে তো আগে দেখিনি? 
মেজমামা বললেন, কিছু মনে করবেন না অফিসার রোবু আমার তৈরি করা রোবট। ও আমার আর সমু বিবির সুরক্ষা কবচ। প্লেনে রোবট আনা ঝামেলার। তাই ওর পার্টস খুলে এনে এই ঘরে জোড়া লাগিয়েছি। ওকে আমি মিউজিয়াম এর জন্য আনা জিনিসগুলো পাহারা দিতে রেখে গিয়েছিলাম। ও ওর কাজ ঠিক মতোই করেছে। তাই না অফিসার? রোবুর কাজকর্ম ওই ফুলদানিতে রাখা ক্যামেরায় ধরা পড়েছে আর থানায় রেকর্ড ও হয়েছে। অফিসার তা দেখেই এখানে এসেছিলেন।
অফিসার রোবুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, হ্যালো রোবু। ইউ ডিড এ গ্রেট জব।
রোবু হাত ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ স্যর। মেজমামা আমাকে তৈরি করেছেন, আমার কাজই মেজমামাকে সুরক্ষা দেওয়া। 
সমু আর বিবি রোবুর দুপাশে দুহাত ধরে গর্বের সুরে বলল, রোবু আমাদের বন্ধু। ও ক্যারাটে, জুডো সব জানে। 
অফিসার বললেন, ঠিক তাই, রোবুই আজ রাতে তোমাদের পাহারায় থাকবে। কাল পুলিশ প্রোটেকশনে মিউজিয়াম এ যাবো আমরা সবাই। 
 সমু আর বিবি একসাথে বলে উঠল, থ্রি চিয়ার্স ফর রোবু। 
পুলিশ অফিসার বললেন, হ্যাটস্ অফ রোবু। তুমিও কাল মিউজিয়াম এর অনুষ্ঠানে যাবে। 
পরদিন মিজোরাম মিউজিয়াম এর অনুষ্ঠানে মেজমামার সাথে মিজোরাম এর মুখ্যমন্ত্রীর আলাপ হল। উনি আগ্রহ নিয়ে রোবু, সমু বিবির সঙ্গে আলাপ করলেন। মঞ্চে মেজমামার সাথে সমু বিবি ছাড়াও রোবুও উপস্থিত ছিল। 
----------------------------------- 

অঞ্জনা মজুমদার 
এলোমেলো বাড়ি 
চাঁদপুর পল্লী বাগান 
পোঃ  রাজবাড়ি কলোনী 
কলকাতা  । 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.