ছবিঋণ-ইন্টারনেট
শরৎ সাহিত্যে নারী প্রেম
আবদুস সালাম
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের দেড়শত বৎসর পর ও শরৎ সাহিত্যের যে আবেদন তা যথেষ্ট তাৎপর্যবহ। তাঁর সাহিত্যের আবেদন চিরদিনের চিরকালের। কষ্টার্জিত জীবন অতিবাহিত করার সকল প্রকার অভিজ্ঞতার ফসল তাঁর এই সাহিত্যসম্ভার ।
বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে শরৎ সাহিত্যের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। কখনো কখনো তিনি অনিলা দেবী ছদ্মনামে ও লিখেছেন। শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রগুলো অনেক চরিত্রের ভিড়ে নিজস্ব প্রবণতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কারণে স্বতন্ত্র।
বাংলা ছোটগল্পের সূচনা উনিশ শতকে ইউরোপীয় রেনেসাঁস ও বাস্তবতার প্রভাবে। যেখানে কবি গুরুকে ছোট গল্পের জনক বলা হয়; তাঁর 'ঘাটের কথা' ও 'দেনা-পাওনা' প্রথম সার্থক ছোটগল্পের উদাহরণ - যা 'ভারতী' পত্রিকার মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে । এই সকল গল্পগুলি প্রাচীন রূপকথা ও নীতিকথামূলক গল্পের ধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন । তিনি কালজয়ী যে সকল ছোটগল্প আমাদের উপহার দিয়েছেন তা বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পরবর্তীতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী গল্পকার হলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । পল্লীসাহিত্যিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে কয়েকজন লেখকের আবির্ভাব হয়েছিল তাদের মধ্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অন্যতম । তৎকালীন পল্লী সমাজকে তিনি যেভাবে লেখনিতে চিত্রায়িত করেছিলেন তা এককথায় অনবদ্য।
তাঁর সাহিত্যে নারী প্রেম এক অসামান্য ও শাশ্বত রূপ ধারণ করেছে। তাঁর গল্পে আমরা নারীর প্রেম, ত্যাগ, সেবা ও সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার দুঃসাহসী পদক্ষেপ লক্ষ্য করি ।তিনি অবহেলিত পতিতা, বিধবা ও সাধারণ নারীদের গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রেম, একনিষ্ঠতা ও মানবিক মূল্যবোধ ফুটিয়ে তুলেছেন । তাঁর গল্প পড়তে পড়তে একফোঁটা লোনা জল টুপ করে ঝরে পড়ে। নারী জীবনের মর্ম কথা কলমের আঁচড়ে তাকে চিত্রায়িত করেছেন। তাঁর গল্প মানেই মর্মন্তুদ মর্মবেদনার কাহিনী । শুধু তাই নয় বঞ্চিত নারীদের প্রতিবাদের ভাষা বসিয়েছেন তাদের মুখে।
'চন্দ্রমুখী', 'রাজলক্ষ্মী', 'সাবিত্রী', 'কমলতা' বা 'অভয়া'র মতো চরিত্রগুলো প্রেমের উর্ধ্বে উঠে তাদের ভালোবাসার গভীরতা প্রশ্নাতীত ।এ যেন সমাজের চিরন্তন জিজ্ঞাসা । সমাজ নারীদের উপর যে জুলুম অত্যাচার করে চলেছে তার প্রতিবাদ স্বরূপ গল্পের কথা সাজিয়েছেন। এই মহান কারিগর নারীদের দেবতা বললেও কম বলা হয়। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের কথা কেউ শোনেনা,কেউ ভাবে না। শরৎ বাবু নিজে ব্রাহ্মণ হয়ে ও তথাকথিত ব্রাহ্মণ সমাজের জঘন্য রূপ চিত্রায়িত করেছেন। এজন্য তিনি অবহেলিত নিপীড়িত মহিলাদের ভগবান।
শরৎচন্দ্র পঁচিশ বছর (১৯১৩-১৯৩৮) একটানা মেয়েদের কথা লিখে অবিস্মরণীয় যেসব নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, তা আজও জনপ্রিয়। সেসব নারীর কেউ কেউ সাধারণ মেয়ে, কেউ বা মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, আবার কেউ বা নিম্নবর্গ কিংবা সমাজের দৃষ্টিতে ভ্রষ্টা। অবিরত লিখে গেছেন প্রেমাকুল মেয়েদের গল্প। শুধু নারীই নয়, সকল মানুষের অন্তরের নিগূঢ় রহস্যে ডুব দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র।
পতিতা, বিধবা, বৈষ্ণবী, সতী, অরক্ষণীয়া অথবা বিয়ে-বহির্ভূত প্রেম- তা সে যেমনটাই হোক না কেন, শরৎচন্দ্র অভিভূত হয়ে থাকতেন তাদের প্রেমে। নারী চরিত্র রূপায়ণে তার আখ্যানগুলো সহজ-সরল ভাষায় এবং আটপৌরে রোমান্টিক ভাবাদর্শে বিবৃত হয়েছে।
শরৎচন্দ্রের মনে হয়েছিল নারীসুলভ বলে তার যথার্থ মূল্য নির্ধারণ আদৌ সম্ভব নয়। তার মতে, যেদিন নারী হয়ে যাবে দুর্লভ, সেদিনই সমাজ অনুধাবন করতে পারবে নারীর যথার্থ মূল্য। সমাজ নারীর মূল্য নির্ধারণ করে তার সেবাপরায়ণায়, স্নেশীলতায়, সতীত্বে এবং সহনশীলতায়।
তার দৃঢ় সিদ্ধান্ত- 'যে ধর্ম বনিয়াদ গড়িয়াছে আদিম জননী ইভের পাপের উপর, যে ধর্ম সংসারের সমস্ত অধঃপতনের মূলে নারীকে বসাইয়া দিয়াছে, সে ধর্ম সত্য বলিয়া যে-কেহ অন্তরের মধ্যে বিশ্বাস করিয়াছে, তাহার সাধ্য নয় নারীজাতিকে শ্রদ্ধার চোখে দ্যাখে।'
শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো আবেগ ও উচ্ছ্বাসে অসাধারণ ঔজ্জ্বল্যে উপস্থাপিত হয়েছে। 'বড়দিদি' (১৯১৪) উপন্যাসের মাধবী এবং মৃত্যুর পর প্রকাশিত'শেষের পরিচয়' (১৯৩৯)-এর সবিতা আজো বাঙালির মনে উঁকি দেয়। প্রায় ২৩টি প্রধান উপন্যাসের একাধিক নারী চরিত্র যেন গেঁথে আছে শরৎপ্রেমীদের অন্তরে।
'গৃহদাহ'র একদিকে অচলা অন্যদিকে মৃণাল, চরিত্রহীনের একদিকে সাবিত্রী অন্যদিকে কিরণময়ী, তবে 'শেষ প্রশ্ন'র কমল একেবারে আলাদা। 'পথের দাবী'র ভারতী, তারও আগে'বিন্দুর ছেলে'র বিন্দুবাসিনী, 'মেজদিদি'র হেমাঙ্গিনী এবং'নিষ্কৃতি'র শৈলজা সরল ও স্নেহপ্রবণ নারীদের অন্যতম দৃষ্টান্ত। এসব নারীর পাশে 'দেবদাস'-এর চন্দ্রমুখী, 'শুভদা'র কাত্যায়নী এবং 'আঁধারে আলো'র বিজলীর মতো বারবনিতার আখ্যানও পাঠকদের হৃদয়কে দারুণভাবে স্পর্শ করেছে।
শরৎ সাহিত্যে নারী প্রেমের প্রধান যে দিকগুলো আমাদের চোখে পড়ে তা নিম্ন রূপ:-
ক) বিদ্রোহী ও মুক্ত প্রেম: শরৎচন্দ্রের নারীরা সামাজিক কুসংস্কার ও প্রচলিত নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে স্বেচ্ছায় তারা ভালোবাসতে এগিয়ে আসে । শ্রীকান্ত" উপন্যাসের 'অভয়া' চরিত্রটি প্রেমের খাতিরে সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙেছে এবং নিজের জন্য সঠিক সঙ্গী বেছে নেওয়ার সাহসিকতা ও দেখিয়েছে । ঐসময় একথা ভাবতে কেউ সাহস করতো না। নারী জীবনের মথিত কথা উচ্চারণ করে পক্ষান্তরে তিনি নারী প্রেম কে সাহস জুগিয়েছেন।
খ) পতিতা ও অবহেলিত নারীর প্রেম: সমাজ কর্তৃক অবহেলিত নারীদের তিনি প্রেমের পরম আধার হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন । 'দেবদাস' উপন্যাসের চন্দ্রমুখী, 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের রাজলক্ষ্মী বাঈজি হওয়া সত্ত্বেও ভালোবাসার ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থ ও একনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন।তাদের প্রেম ছিল পবিত্র ও গভীর, যা বাহ্যিক সামাজিক পরিচয়ের উর্ধ্বে।
গ) আত্মত্যাগ ও সেবা: নারীর ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরিচয় শরৎচন্দ্রের মতে তাদের আত্মত্যাগ। প্রেমিকের জন্য জীবন উৎসর্গ করার মানসিকতা বা সেবাপরায়ণতা তার চরিত্রগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য । শ্রীকান্ত উপন্যাসে অভয়া, রাজলক্ষ্মী সতীর চরিত্রে এই সকল রূপের বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও (বিলাসীর চরিত্র)অন্নদা দিদি, (বিনোদনের পালা) বিনোদিনী, (কঙ্কাবতীর চরিত্রে) কঙ্কাবতী ইত্যাদি চরিত্র।
ঘ) মানবিক প্রেম: প্রচলিত ধর্মের চেয়ে তিনি মানবিক ধর্মকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, শ্রীকান্ত উপন্যাসের মূল চরিত্র'কমলতা'র মত চরিত্রের মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিক ও মানবিক ভালোবাসার রূপ তুলে ধরেছেন, যা গতানুগতিক প্রেমের চেয়ে ভিন্ন।
ঙ) হৃদয়ের আকুতি: শরৎচন্দ্র নারীদের মনের অব্যক্ত বেদনা, তীব্র আবেগ এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । এজন্য শরৎচন্দ্র সবথেকে আলাদা। সামগ্রিকভাবে, শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে নারী প্রেম কেবল রোমান্টিকতা নয়, বরং তা সমাজের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও শাশ্বত মানবতার এক বলিষ্ঠ রূপ।
চ) নারীর চরিত্রায়ণ ও মনস্তত্ত্ব: শরৎসাহিত্য নারীর সতীত্বের চেয়ে তাদের মানবিক সত্তাকে বড় করে দেখিয়েছেন। চরিত্রহীন, গৃহদাহ, বা দেবদাস-এর মতো উপন্যাসে নারী চরিত্রের সাহসিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার চিত্র ফুটিয়েছেন, যা তৎকালীন সময়ে ছিল বৈপ্লবিক। নারীর বুকে সাহসিকতার একটা প্লাবন বইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
ছ) সাধারণের আবেগ: 'দেবদাস' বা 'শ্রীকান্ত'-এর মতো রচনায় মানুষের প্রেম, বিরহ, ও হতাশার গভীর অনুভূতিগুলো এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে পাঠকরা নিজেদের জীবনের সাথে তা মিলিয়ে নিয়েছেন। পাঠকের মনের উপলব্ধি গুলো অনায়াসেই নিপুণ ভাবে চিত্রায়িত করেছেন।
তাঁর ছোটগল্পে নারীর প্রেম মানেই প্রথাভাঙ্গা ,আত্মত্যাগ ,সামাজিক বাধা পেরিয়ে আসা গভীর সংবেদনশীলতার উপাখ্যান। যেখানে পতিতা ,বিধবা ,বৈষ্ণবী সকল শ্রেণীর নারী তাদের নিজস্ব ভাষায় প্রেমকে খুঁজে পেয়েছে। কখনো তা হয়েছে অবহেলিত স্বামীর প্রতি গভীর ভালোবাসা । যেমন সতী আঁধারে আলোতে আবার কখনো তা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে সমাজের চাপানো নিয়মের বিরুদ্ধে। যেমন শ্রীকান্তর প্রেম যা প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে এক নতুন মানব সম্পর্কের টানাপোড়েনের দিকে এগিয়ে গেছে। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে এক নতুন মানবিক সম্পর্কের দিক উন্মোচন করতে বদ্ধপরিকর। শরৎচন্দ্রের ছোটগল্পে নারীর বৈশিষ্ট্য প্রথাগত সম্পর্কের উর্ধ্বে। তিনি প্রচলিত সমাজের প্রচলিত প্রেম, অবিবাহের ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন । তার নারী চরিত্র শুধুমাত্র গৃহকোণে আবদ্ধ না থেকে প্রেমকে জীবনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখেছে । আত্মত্যাগ ও সহনশীলতাকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর সকল নারী চরিত্রই অপরিসীম আত্মত্যাগ ও সহনশীলতার প্রতীক । যেমন সত্যি গল্পের সতী, অভাগীর স্বর্গে অভাগীর জীবন যেন নারীর চিরন্তন ত্যাগ ও ভালবাসার প্রতিচ্ছবি । বিদ্রোহী প্রেম শ্রীকান্ত উপন্যাসের রাজলক্ষ্মী বা অভয়ার মতো চরিত্ররা প্রচলিত সামাজিক নিয়ম ভাঙতে দ্বিধা করেনি। তারা নিজেদের ভালবাসার টানে সমাজের চোখে পতিতা বা অসতী হয়েও নিজেদের অস্তিত্ব ও ভালবাসাকে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছে। ব্যর্থ ও বঞ্চিত প্রেম স্বামীর মত গল্পে আমরা দেখতে পাই। কিভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে নারীর প্রেম ব্যর্থ হয় !এই প্রেমগুলো গভীর বেদনা ও করুণার জন্ম দেয় । নৈতিকতার নতুন সংজ্ঞা দেখে চরিত্রহীনের সাবিত্রী বা দত্তার বিজয়ের মত চরিত্ররা প্রেমের জটিলতা ও নৈতিকতার নতুন সংজ্ঞা তুলে ধরেছে। যা প্রচলিত ধারণার বিপরীত। তাঁর গল্পে প্রেম কোন ফ্যান্টাসি নয়, বরং বাস্তব জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে নারী প্রেম কিভাবে টিকে থাকে বা ভেঙে পড়ে তার বাস্তবসম্মত চিত্র । শ্রীকান্ত উপন্যাসে শ্রীকান্ত সামাজিক বাধা ও বৈষম্যকে অতিক্রম করে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। সামাজিক নিয়মের কারণে কিভাবে নিয়ম কে বিসর্জন দিতে হয় তা দেখানো হয়েছে। সতী গল্পে প্রতিব্রতা ধর্ম ও ভালোবাসার এক গভীর আন্তঃবিষয়ক ভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে। অভাগীর প্রেম ও জীবন যেন এক করুণ পক্ষের প্রতিচ্ছবি। সমাজের প্রান্তিক নারীর অবস্থার কথা বলে। মোটকথা শরৎচন্দ্রের ছোটগল্পে নারী প্রেম শুধু রোমান্টিকতা নয় বরং সামাজিক বন্ধন, মানবিকতা ত্যাগ, বঞ্চনা এবং বিদ্রোহের জটিল মিশ্রণ । যা বাংলা সাহিত্যের নতুন মাত্রা যোগ করেছে ।
###
তথ্যসূত্র : প্রবন্ধ
ক) শরৎচন্দ্র ছোটগল্পের প্রান্তিক ও বঞ্চিত নারী চরিত্র:-সুমনা দাস
খ) শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে নারী চরিত্র:-ফারুক হোসেন সিহাব
গ) শরৎ সাহিত্য ও নারী চেতনা:-ডঃপলৌমী চক্রবর্তী
শরৎ সাহিত্যে নারী:-শ্রী প্রমথ পাল
আবদুস সালাম

