ছবিঋণ-ইন্টারনেট
অবেলার জলছবি
অভিজিৎ হালদার
শহরের এই ক্যাফেটা একটু অদ্ভুত। চারপাশটা কাঁচ দিয়ে ঘেরা হলেও এর ভেতরে এক ধরণের ধোঁয়াটে অন্ধকার সবসময় লেপ্টে থাকে। পরিনীলা জানালার ধারের টেবিলটাতে বসে বাইরের বৃষ্টির পতন দেখছিল। আজ আকাশটা যেন ভেঙে পড়ছে। ধূসর মেঘের আড়ালে সূর্যটা কখন মুখ লুকিয়েছে তার হদিস নেই। পরিনীলার হাতে থাকা কফির কাপটা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই। তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে ক্যাফের দরজার দিকে। আজ ঠিক পাঁচ বছর পর নীলধ্রুবর সাথে তার দেখা হওয়ার কথা।
পাঁচ বছর! সময়টা কি খুব বেশি? হয়তো নয়, আবার হয়তো অনেকটা। পরিনীলার মনে হলো, এই পাঁচ বছরে সে শুধু বেঁচে থাকার অভিনয়টাই করে গেছে। তার পরনের নীল শাড়িটা বৃষ্টির আবহে আরও গাঢ় দেখাচ্ছে। সে জানত নীলধ্রুব নীল রঙ পছন্দ করত, যদিও আজ সেই পছন্দ-অপছন্দের কোনো মূল্য নেই। ঠিক তখনই ক্যাফের ঘণ্টাটা বেজে উঠল। দরজার কাছে এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘদেহী যুবক। পরিনীলার হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সেই একই অবিন্যস্ত চুল, একই রকমের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, শুধু চিবুকের কাছে দাড়িগুলো আগের চেয়ে ঘন হয়েছে। নীলধ্রুব ভেতরে ঢুকেই চারপাশটা একবার দেখে নিল, তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এল পরিনীলার দিকে।
"অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছ?" নীলধ্রুবর কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর, যেন গভীর কোনো খাদের প্রতিধ্বনি।
পরিনীলা মৃদু হাসল, যদিও সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না। "অপেক্ষা করা তো আমার পুরনো অভ্যাস নীল। বসো।"
নীলধ্রুব বসল। মাঝখানের টেবিলটা যেন একটা বিশাল ব্যবধান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের মধ্যে। নীলধ্রুব তার জ্যাকেটটা খুলে চেয়ারের পেছনে রাখল। তার হাতদুটো কাঁপছে কি না তা পরিনীলা বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু নীলধ্রুবর হাতদুটো টেবিলের নিচে লুকানো। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও বাড়ল। ক্যাফেতে হালকা মিউজিক বাজছে, যা পরিবেশটাকে আরও বেশি ভারী করে তুলছে।
"কেন ডেকেছ আজ?" নীলধ্রুবর সরাসরি প্রশ্নে পরিনীলা কিছুটা থতমত খেল। সে ভেবেছিল কিছুক্ষণ হয়তো নীরবতা থাকবে, পুরনো দিনের কোনো তুচ্ছ স্মৃতি নিয়ে কথা হবে। কিন্তু নীলধ্রুব বদলে গেছে। সে এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী।
পরিনীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, "হয়তো শেষবারের মতো একবার দেখার ইচ্ছে ছিল। মানুষ তো মরে যাওয়ার আগেও একবার নিজের প্রিয় মুখগুলো দেখতে চায়।"
নীলধ্রুব একটু ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসল। "প্রিয় মুখ? পরি, আমরা কি একে অপরের কাছে আজও প্রিয়? যে বিচ্ছেদটা তুমি নিজে লিখেছিলে, তার পাঁচ বছর পর এই প্রিয় শব্দের ব্যবহারটা কি একটু বেমানান নয়?"
পরিনীলার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। সে জানত নীলধ্রুব তাকে দোষ দেবে। বিচ্ছেদের সেই শেষ রাতটাতে পরিনীলাই বলেছিল, "আমাদের আর দেখা না হওয়াই ভালো।" কিন্তু কেন বলেছিল, তার পেছনের সেই অসহ্য যন্ত্রণাটা কি নীলধ্রুব কখনো উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছে?
নীলধ্রুব তখন নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে পরিনীলার একাকীত্ব তাকে স্পর্শ করত না।
"আমি জানি তুমি আমাকে ক্ষমা করোনি নীল," পরিনীলা ধরা গলায় বলল। "কিন্তু সেদিন আমার কাছে আর কোনো পথ ছিল না। তোমার সাফল্যের পথে আমি বাধা হতে চাইনি।"
নীলধ্রুব ক্যাশ কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে ওয়েটারকে এক কাপ ব্ল্যাক কফির ইশারা করল। তারপর পরিনীলার দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, "সাফল্য? যে সাফল্যের পাশে প্রিয় মানুষটা নেই, তাকে কি আদৌ সাফল্য বলা যায়? আমি তো আজও সেই মধ্যবিত্ত ছেলেই রয়ে গেলাম যে ট্রেনের জানালার ধারে বসে তোমার কথা ভাবত। আমার সাফল্য তোমাকে সুখ দিতে পারেনি পরি, বরং আমাদের মাঝখানে একটা দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে দিয়েছে।"
পরিনীলা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই ওয়েটার কফি নিয়ে এল। কফির সেই তিতকুটে গন্ধে যেন বর্তমানের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। নীলধ্রুব এক চুমুক কফি খেয়ে বলল, "আমি পরশু এই শহর ছেড়ে চিরকালের মতো চলে যাচ্ছি পরি। আমার যাওয়ার আগে কিছু সত্য তোমার জানা দরকার, যা আমি পাঁচ বছর আগে গোপন করেছিলাম।"
পরিনীলার বুকটা ধক করে উঠল। সত্য? কীসের সত্য? নীলধ্রুবর চোখের সেই গভীর ছায়ার আড়ালে এমন কী লুকিয়ে আছে যা আজ পাঁচ বছর পর প্রকাশ্যে আসবে? ক্যাফের আলোটা হঠাৎ একবার কেঁপে উঠল। বাইরে এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকাল, আর সেই আলোয় পরিনীলা দেখল নীলধ্রুবর ডান হাতের কবজিতে একটা গভীর কাটা দাগ। সেটা কি আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা ছিল? নাকি অন্য কিছু?
••••••
ক্যাফেটার ভেতরে এসির একটানা গুঞ্জন ছাপিয়ে নীলধ্রুবর কণ্ঠস্বর পরিনীলার কানে তীরের মতো বিঁধল। নীলধ্রুবর ডান হাতের কবজিতে সেই গভীর কাটা দাগটা তখনও স্পষ্ট। পরিনীলা নিজের চোখ সরাতে পারছিল না। ওই দাগটা যেন কেবল চামড়ার ওপর কোনো ক্ষত নয়, বরং একটা মানচিত্র—যাতে লেখা আছে গত পাঁচ বছরের না বলা যন্ত্রণার ইতিহাস। বাইরে বৃষ্টির বেগ এখন উন্মত্ত। জানালার কাঁচের ওপর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে, ঠিক যেমন পরিনীলার মনের ভেতরে স্মৃতির ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে।
পরিনীলা কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "এই দাগটা কিসের নীল? তুমি কি... তুমি কি নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিলে?"
নীলধ্রুব একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে তার কফির কাপটা দুহাতে জড়িয়ে ধরল, যেন ওই উত্তাপটুকু তাকে বর্তমানে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। সে বলল, "ক্ষতি করার সাহস সবার থাকে না পরি। আমি হয়তো সেদিন খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম, অথবা হয়তো খুব বেশি সবল। যেদিন তুমি স্টেশনে দাঁড়িয়ে বলেছিলে যে তোমার বাবা তোমার জন্য অন্য পাত্র ঠিক করেছেন এবং তুমি আর আমার সাথে কোনো ভবিষ্যৎ দেখছ না—সেদিন আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। আমি ভাবতাম আমরা একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু তুমি খুব সহজে 'সাফল্য' আর 'নিশ্চয়তা' শব্দদুটো ব্যবহার করে আমাকে বাতিল করে দিলে।"
পরিনীলা মাথা নিচু করে রইল। টেবিলের তলায় সে নিজের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে মুচড়াচ্ছে। সে জানে সে সেদিন মিথ্যে বলেছিল। সে জানে নীলধ্রুবর প্রতি তার ভালোবাসা সেদিনও ছিল হিমালয়ের মতো অটল। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে তাকে নিষ্ঠুর হতে হয়েছিল। পরিনীলার বাবা তখন ক্যান্সারের শেষ ধাপে, আর নীলধ্রুব তখন স্রেফ একজন বেকার যুবক যে কেবল স্বপ্নের পিছে ছুটছে। নীলধ্রুবকে সেই কঠিন সত্যটা জানালে সে হয়তো নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে পরিনীলার পাশে এসে দাঁড়াত, কিন্তু তাতে নীলধ্রুবর ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যেত। পরিনীলা চেয়েছিল নীলধ্রুব ডানা মেলুক, আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকুক, তাকে যেন কোনো পিছুটান না পোড়ায়।
"তুমি কি জানো পরি," নীলধ্রুব আবার বলতে শুরু করল, "সেদিন স্টেশন থেকে ফিরে আমি ঠিক তিন মাস একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এই দাগটা কোনো আত্মহত্যার চেষ্টার চিহ্ন নয়। এটা একটা দুর্ঘটনার স্মারক। যে রাতে আমাদের বিচ্ছেদ হলো, সে রাতে আমি মাঝরাস্তায় বাইক নিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলাম। ডাক্তাররা বলেছিল আমার ডান হাতটা হয়তো আর কোনোদিন ঠিকমতো কাজ করবে না। আমি যখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছিলাম, তখন আমার শুধু একটা কথা মনে হতো—পরিনীলা কি জানে আমি মরে যাচ্ছি? নাকি সে তার নতুন জীবনের স্বপ্নে খুব বিভোর?"
পরিনীলার চোখের জল এবার বাঁধ মানল না। টপটপ করে দু ফোঁটা জল তার কফির কাপে গিয়ে পড়ল। সে জানত না। সে কিছুই জানত না। নীলধ্রুবর দুর্ঘটনার খবরটা তার কাছে পৌঁছায়নি, কারণ সে তখন বাবার চিকিৎসার জন্য অন্য শহরে চলে গিয়েছিল।
নীলধ্রুব তার পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করতে গিয়েও থেমে গেল। ক্যাফেতে ধূমপান নিষেধ। সে ক্যাফেটার ছাদটার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি যখন সুস্থ হলাম, তখন আমি আর সেই পুরনো নীলধ্রুব ছিলাম না। আমার ভেতরের আবেগগুলো যেন ওই হাসপাতালের করিডোরেই কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। আমি জেদ ধরেছিলাম আমি বড় হব, অনেক বড়। আজ আমার হাতে টাকা আছে, ক্ষমতা আছে, গাড়ি আছে। কিন্তু জানো তো পরি, আজ যখন ক্যাফেতে ঢোকার সময় তোমার ওই নীল শাড়িটা দেখলাম, আমার মনে হলো আমি আজও সেই পাঁচ বছর আগের স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। যেখানে তুমি আমার হাতটা ছেড়ে দিয়েছিলে।"
পরিনীলা নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সে অনুশোচনার স্বরে বলল, "নীল, আমি যদি তোমাকে বলি সেদিন আমার চলে যাওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল? আমি যদি বলি আমি আজও কাউকে নিজের জীবনে জায়গা দিতে পারিনি?"
নীলধ্রুবর চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এসে পরিনীলার খুব কাছে মুখ নিয়ে গেল। "মিথ্যে বোলো না পরি। মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো ইমারত বেশিদিন টেকে না। আমাদের বিচ্ছেদটা ছিল বাস্তব। আজ তুমি যদি সহমর্মিতার খাতিরে কিছু বলো, তবে সেটা হবে আমার পুরনো ক্ষততে নুন ছেটানো। আমি আজ তোমাকে এখানে ডাকার কারণ অন্য। আমি তোমাকে একটা জিনিস ফিরিয়ে দিতে চাই।"
নীলধ্রুব তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট মখমলের বাক্স বের করল। বাক্সটা খুলতেই ভেতরে একটা ঝকঝকে হীরের আংটি দেখা গেল। পরিনীলা অবাক হয়ে চাইল। নীলধ্রুব বলল, "এটা আমি পাঁচ বছর আগে তোমার জন্য কিনেছিলাম। টিউশনি করিয়ে জমানো প্রতিটি পয়সা দিয়ে। সেদিন স্টেশনে এটা তোমাকে দেব ভেবেছিলাম, কিন্তু তুমি তার আগেই আমাকে বিদায় করে দিলে। এটা এতদিন আমার কাছে একটা বোঝার মতো ছিল। আজ আমি এটা তোমার হাতে তুলে দিয়ে আমার জীবনের এই অধ্যায়টা চিরতরে বন্ধ করতে চাই।"
পরিনীলা আংটিটার দিকে তাকিয়ে দেখল তার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। নীলধ্রুব তাকে মুক্তি দিতে চাইছে, নাকি নিজেকে? আংটিটা কেবল একটা গয়না নয়, ওটা নীলধ্রুবর হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসের প্রতীক।
বাইরে মেঘ ডাকার শব্দ হলো। ক্যাফের ওয়েটার এসে বিলটা টেবিলের ওপর রাখল। নীলধ্রুব মানিব্যাগ বের করল। পরিনীলা বুঝতে পারল, এই সন্ধ্যাটা শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা। সে কি নীলধ্রুবকে আজ সব সত্যি বলে দেবে? নাকি এই আংটিটা গ্রহণ করে নীলধ্রুবকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবে?
"আমি আংটিটা নেব না নীল," পরিনীলা শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
নীলধ্রুব ভুরু কুঁচকাল। "কেন?"
"কারণ এই আংটিটা নেওয়ার অধিকার আমার সেদিনও ছিল না, আজও নেই। কিন্তু তোমার ওই কবজির ক্ষতটার দায়ভার আমার। আমি চাই তুমি আমাকে একটা শেষ সুযোগ দাও। সবটা ব্যাখ্যা করার জন্য।"
নীলধ্রুব ঘড়ির দিকে তাকাল। "আমার কাছে সময় খুব কম পরি। আমি পরশু এই দেশ ছাড়ছি। তবে হ্যাঁ, কাল সন্ধ্যায় যদি তুমি শহরের ওই পুরনো লাইটহাউসের নিচে আসতে পারো, তবে হয়তো আমি তোমার কথা শুনব। ওটাই হবে আমাদের শেষ দেখা।"
নীলধ্রুব উঠে দাঁড়াল। সে আর একবারও পরিনীলার দিকে তাকাল না। ক্যাফের দরজা ঠেলে সে বৃষ্টির মধ্যে মিলিয়ে গেল। পরিনীলা সেখানে একা বসে রইল। তার সামনে পড়ে আছে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফি আর একরাশ হাহাকার।
••••••
শহরের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুরনো লাইটহাউসটা এখন আর জাহাজদের পথ দেখায় না। তার মরচে ধরা সিঁড়ি আর নোনা ধরা দেওয়ালে কেবল সময়ের দীর্ঘশ্বাস জমে আছে। পরিনীলা যখন সেখানে পৌঁছাল, তখন সূর্য ডুবু ডুবু। আকাশের বুক চিরে শেষ বিকেলের রক্তিম আভা সমুদ্রের নীল জলের ওপর আছড়ে পড়ছে। পরিনীলার হাতে একটা পুরনো প্লাস্টিকের ফোল্ডার। পাঁচ বছর ধরে সে এই কাগজের স্তূপটা আগলে রেখেছে, ঠিক যেমন একজন মা তার মৃত সন্তানের স্মৃতি আগলে রাখে।
নীলধ্রুব অনেক আগেই এসে পৌঁছেছিল। সে লাইটহাউসের একদম ওপরের ব্যালকনিতে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে একটা সাদা শার্ট, যার হাতা কবজি পর্যন্ত গোটানো। দূর থেকে তাকে একাকী এক নাবিকের মতো দেখাচ্ছিল, যে দিকভ্রষ্ট হয়ে মাঝসমুদ্রে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। পরিনীলা ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। প্রতিটি ধাপে তার মনে হচ্ছিল সে যেন অতীতে ফিরে যাচ্ছে। সেই কলেজ ক্যাম্পাস, সেই ক্যান্টিনের আড্ডা, আর নীলধ্রুবর সেই পাগল করা গিটারে তোলা সুর—সবই যেন এই নোনা বাতাসে ভাসছে।
"তুমি আসবে কি না আমি নিশ্চিত ছিলাম না," নীলধ্রুব পিছন না ফিরেই বলল। তার গলায় এক অদ্ভুত শূন্যতা।
পরিনীলা নীলধ্রুবর পাশে এসে দাঁড়াল। বাতাসের ঝাপটায় তার চুলগুলো অবিন্যস্ত হয়ে চোখেমুখে পড়ছে। সে ফোল্ডারটা শক্ত করে ধরে বলল, "সত্যিটা জানানোর দায়বদ্ধতা থেকে এসেছি নীল। কাল ক্যাফেতে তুমি আমাকে তোমার কবজির ক্ষত দেখিয়েছিলে। আজ আমি তোমাকে আমার হৃদয়ের ক্ষতগুলো দেখাতে চাই।"
নীলধ্রুব এবার মুখ ফেরাল। তার চোখে এক ধরণের উপহাস মেশানো কৌতূহল। পরিনীলা ফোল্ডার থেকে কয়েকটা হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ বের করে নীলধ্রুবর দিকে বাড়িয়ে দিল। নীলধ্রুব ভ্রু কুঁচকে কাগজগুলো নিল। সেগুলো ছিল পাঁচ বছর আগের কিছু মেডিকেল রিপোর্ট আর হাসপাতালের বিল।
"এগুলো কী?" নীলধ্রুবর গলায় বিস্ময়।
"এগুলো আমার বাবার শেষ দিনগুলোর ইতিহাস নীল," পরিনীলার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। "যে রাতে আমি তোমাকে স্টেশনে বিদায় জানিয়েছিলাম, তার ঠিক চার ঘণ্টা আগে আমি জানতে পেরেছিলাম বাবার ক্যান্সার লাস্ট স্টেজে। ডাক্তার বলেছিলেন আমাদের হাতে আর মাত্র কয়েক মাস সময় আছে। আমার মা তখন শয্যাশায়ী, ছোট বোনটা স্কুলে পড়ে। আমার পরিবার তখন এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।"
নীলধ্রুব স্তব্ধ হয়ে কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। পরিনীলা থামল না, সে বলতে থাকল, "আমি জানতাম তুমি বেকার। আমি জানতাম তোমার স্বপ্নগুলো তখন কেবল ডানা মেলতে শুরু করেছে। আমি যদি সেদিন তোমাকে সত্যিটা বলতাম, তবে তুমি তোমার বিদেশের স্কলারশিপ ছেড়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াতে। নীলধ্রুবর ক্যারিয়ার ধ্বংস করে পরিনীলা হয়তো তার বাবাকে বাঁচাতে পারত না, কিন্তু নীলধ্রুবর সারা জীবনের আক্ষেপটা আমি মুছে দিতে পারতাম না। আমি চেয়েছিলাম তুমি উড়ো। আমি চেয়েছিলাম তোমার সাফল্যের পথে কোনো বিষণ্ণতা যেন ছায়া না ফেলে। তাই আমি অভিনয় করেছিলাম। আমি বলেছিলাম আমি তোমাকে আর ভালোবাসি না, আমি স্বচ্ছল জীবন চাই। নীল, আমি তোমার ওপর অন্যায্য নিষ্ঠুরতা করেছি শুধু তোমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।"
সমুদ্রের ঢেউগুলো লাইটহাউসের পাদদেশে আছড়ে পড়ে এক বিশাল শব্দ তুলল। নীলধ্রুবর হাতের কাগজগুলো বাতাসের ঝাপটায় উড়তে চাইছে। সে যেন পাথর হয়ে গেছে। তার চোখের সেই কাঠিন্য নিমেষেই জলছবি হয়ে ফুটে উঠল। যে মানুষটাকে সে পাঁচ বছর ধরে ঘৃণা করে নিজের সাফল্যের জ্বালানি বানিয়েছিল, আজ জানল সেই ঘৃণার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক সুগভীর আত্মত্যাগ।
"কেন বললে না পরি? একবার তো সুযোগ দিতে পারতে," নীলধ্রুবর গলা ধরে এল। সে রেলিংটা এমনভাবে জাপটে ধরল যেন সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে।
"সুযোগ দিলে তুমি থাকতে নীল। কিন্তু সেই নীলধ্রুব হয়তো আজকের এই সফল মানুষটা হতে পারত না। সে দিনরাত হাসপাতালের বারান্দায় বসে নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দিত। আমি তোমার ভেতরে সেই হাহাকার দেখতে চাইনি।"
নীলধ্রুব হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে হাহাকার ছিল। "সাফল্য! তুমি কি মনে করো আমি এখন সফল? এই পাঁচ বছরে আমি পৃথিবীর সেরা সুযোগগুলো পেয়েছি, কিন্তু প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে তোমার ওই 'নিষ্ঠুর' মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত। আমি আজ ঘৃণা দিয়ে ঘেরা এক বিশাল প্রাসাদের মালিক, যার ভেতরে কোনো আলো নেই। তুমি আমাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলে, কিন্তু আসলে তুমি আমাকে এক অদৃশ্য শেকলে বেঁধে দিয়েছিলে যার নাম 'অপ্রাপ্তি'।"
পরিনীলা আকাশের দিকে তাকাল। অন্ধকার নেমে আসছে। লাইটহাউসের পুরনো বাতিটা হঠাৎ এক সেকেন্ডের জন্য জ্বলে উঠেই আবার নিভে গেল। পরিনীলা মৃদুস্বরে বলল, "এখন তো সব জানলে নীল। এখন কি তবে আমাদের এই অসমাপ্ত গল্পটা অন্য কোথাও নতুন করে শুরু হতে পারে?"
নীলধ্রুব সমুদ্রের দিগন্তের দিকে আঙুল নির্দেশ করল। যেখানে এক ফালি আলো দূরে কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে। সে ধীর স্বরে বলল, "দেরি হয়ে গেছে পরি। অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমি তোমাকে একটা কথা বলিনি। পরশু আমি যে দেশ ছাড়ছি, সেটা কেবল কর্মস্থলের জন্য নয়। আমি একটা কন্ট্রাক্ট সাইন করেছি যেখানে আগামী দশ বছর আমার এই দেশে ফেরার কোনো উপায় নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা..."
নীলধ্রুব থামল। তার গলার স্বর এবার একদম নিচে নেমে গেল। "আমি গত এক বছর ধরে এক ধরণের নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারে ভুগছি। আমি জানি না আর কতদিন আমার স্মৃতিরা আমার সাথে থাকবে। হয়তো কয়েক বছর পর আমি তোমার নামটাও ভুলে যাব। আমি তোমাকে এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আবার টানতে চাই না।"
পরিনীলার পৃথিবীটা যেন দুলতে শুরু করল। এ কেমন নিয়তি! যখন সত্য উন্মোচিত হলো, তখন সময় নামক ঘাতক তাদের মাঝখানে আবার একটা দেয়াল তুলে দিল। নীলধ্রুবর স্মৃতি হারিয়ে যাবে? সে কি পরিনীলার এই নীল শাড়ি, এই লাইটহাউস, এই সমুদ্র—সব ভুলে যাবে?
নীলধ্রুবর এই অসুস্থতা কি সত্যিই তাদের চিরতরে আলাদা করে দেবে? নাকি পরিনীলা এবার জেদ ধরবে তার স্মৃতি হয়ে পাশে থাকার?
••••••
লাইটহাউসের বাতিটা আবার দপ করে জ্বলে উঠল, এক মুহূর্তের জন্য পরিনীলার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। সেই এক পলকের আলোয় নীলধ্রুব দেখল পরিনীলার চোখ দুটো কান্নায় উপচে পড়ছে, কিন্তু তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত স্থিরতা। নীলধ্রুবর অসুস্থতার কথা শুনে তার ভেঙে পড়ার কথা ছিল, কিন্তু পরিনীলা যেন পাথর হয়ে গেছে। সে জানত, নিয়তি তাদের সাথে এক নিষ্ঠুর খেলা খেলছে। পাঁচ বছর আগে সে নীলধ্রুবকে মুক্তি দিয়েছিল তার ভবিষ্যতের জন্য, আর আজ নীলধ্রুব তাকে মুক্তি দিতে চাইছে নিজের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে।
"তুমি কি ভেবেছ নীল, স্মৃতি হারিয়ে গেলেই আমাদের অস্তিত্ব মুছে যাবে?" পরিনীলা খুব ধীর পায়ে নীলধ্রুবর কাছে এগিয়ে এল। সে নীলধ্রুবর ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল। সেই কবজির ক্ষতটা এখন অন্ধকারের মাঝেও পরিনীলা অনুভব করতে পারছে। "স্মৃতি তো মস্তিষ্কের কোষে থাকে, কিন্তু অনুভূতি? সেটা তো মিশে থাকে রক্তে, নিশ্বাসে। তুমি হয়তো আমার নাম ভুলে যাবে, আমার গলার স্বর চিনতে পারবে না, কিন্তু এই যে আমার হাতটা তুমি ধরে আছো—এই স্পর্শটা কি তোমার রক্ত চেনে না?"
নীলধ্রুব মুখ ফিরিয়ে নিল। সমুদ্রের নোনা বাতাস তার চোখের জল শুকিয়ে দিচ্ছে। সে রূঢ় গলায় বলল, "আবেগ দিয়ে বাস্তবতা ঢাকা যায় না পরি। নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার কোনো রূপকথা নয়। ডাক্তাররা বলেছে, ধীরে ধীরে আমি আমার চারপাশের চেনা জগতটাকে হারাবো। আমার ভাষা হারিয়ে যাবে, আমি কথা বলতে পারব না, এমনকি নিজের প্রতিবিম্ব দেখেও চিনতে পারব না। আমি চাই না তুমি সেই একজন অচেনা মানুষের সেবা করে নিজের জীবনটা নষ্ট করো। আমি চাই তুমি আমাকে সেই তেজি, উদ্ধত নীলধ্রুব হিসেবেই মনে রাখো, যে তোমাকে ভালোবাসতে জানত না।"
পরিনীলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমুদ্রের দিকে তাকাল। "তুমি খুব স্বার্থপর নীল। সবসময় নিজের সিদ্ধান্ত আমার ওপর চাপিয়ে দাও। পাঁচ বছর আগে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তোমাকে ছাড়া থাকার, কারণ আমি তোমার ভালো চেয়েছিলাম। আজ তুমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছ আমাকে ছাড়া থাকার, কারণ তুমি আমার ভালো চাও। কিন্তু আমাদের এই তথাকথিত 'ভালো'র চক্করে আমাদের ভালোবাসাটা কোথায় হারিয়ে গেল? কেউ কি একবারও জিজ্ঞেস করেছে আমাদের মন কী চায়?"
নীলধ্রুব কোনো উত্তর দিল না। সে জানে পরিনীলা ঠিক বলছে। কিন্তু সে নিরুপায়। সে এই দশ বছরের চুক্তিতে সই করেছে শুধু এই জন্য যে তার চিকিৎসার যাবতীয় খরচ সেই কোম্পানি বহন করবে। সে চায় না তার এই ক্ষয়িষ্ণু শরীরের বোঝা পরিনীলার ওপর পড়ুক। সে এই শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবে, যেখানে তার একাকীত্ব হবে তার একমাত্র সঙ্গী।
রাত আরও গভীর হলো। লাইটহাউস থেকে ফেরার পথে কেউ কোনো কথা বলল না। পরিনীলা গাড়ি চালাচ্ছিল, আর নীলধ্রুব জানালার বাইরে দ্রুত চলে যাওয়া শহরটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই শহর, এই রাস্তা, এই ল্যাম্পপোস্ট—সবই খুব দ্রুত তার জীবন থেকে মুছে যাবে। সে একবার আড়চোখে পরিনীলার দিকে তাকাল। স্টিয়ারিং ধরা পরিনীলার আঙুলগুলো সাদা হয়ে আছে। সে হয়তো নিজের কান্নার বেগকে সংবরণ করার চেষ্টা করছে।
পরিনীলা গাড়িটা নীলধ্রুবর হোটেলের সামনে থামাল। নীলধ্রুব নামার আগে পরিনীলা তাকে একটা ছোট কাঁচের শিশি দিল। শিশির ভেতরে একটা নীল রঙের অপরাজিতা ফুল শুকনো অবস্থায় পড়ে আছে।
"এটা কী?" নীলধ্রুব জিজ্ঞেস করল।
"এটা সেই প্রথম ফুলটা নীল, যেটা তুমি আমাকে কলেজের প্রথম বর্ষে দিয়েছিলে," পরিনীলা ম্লান হেসে বলল। "পাঁচ বছর আমি এটাকে যতন করে রেখেছি। তুমি যখন বিদেশে থাকবে, যখন তোমার চারপাশটা ঝাপসা হতে শুরু করবে, তখন এই শুকনো ফুলটার দিকে তাকিয়ে দেখো। যদি ফুলটা দেখে তোমার মনে পড়ে কোনো এক বৃষ্টির দিনে এক মেয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করত, তবে বুঝে নিও তোমার স্মৃতি এখনো হারায়নি। আর যদি কিচ্ছু মনে না পড়ে, তবে এটাকে ছুঁড়ে দিও সমুদ্রের জলে। আমি বুঝে নেব নীলধ্রুব চিরকালের মতো হারিয়ে গেছে।"
নীলধ্রুবর হাতটা কাঁপছিল। সে শিশিটা নিজের পকেটে রাখল। "কাল সকালে আমার ফ্লাইট পরি। সেখানে আসার দরকার নেই। আমি চাই না আমাদের শেষ বিদায়টা কান্নায় ভেজা হোক।"
পরিনীলা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু গাড়িটা স্টার্ট দিল। নীলধ্রুব হোটেলের গেটের ভেতরে অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত সে তাকিয়ে রইল। পরিনীলার মনে এক নতুন সংকল্প জন্ম নিল। নীলধ্রুব তাকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়, কিন্তু পরিনীলা কি তা হতে দেবে? সে কি পারবে নীলধ্রুবর ওই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির পাহারাদার হতে?
পরিনীলা বাড়ি ফিরে তার আলমারি থেকে একটা পুরনো চামড়ার ব্যাগ বের করল। সেখানে তার পাসপোর্টের সাথে রাখা আছে একটা খাম। খামটার ভেতরে নীলধ্রুবর সেই কোম্পানিরই একটা নিয়োগপত্র—যেখানে সে মাসখানেক আগে নার্সিং স্টাফ হিসেবে আবেদন করেছিল এবং নির্বাচিত হয়েছিল। পরিনীলা জানত না এই কোম্পানিটাই নীলধ্রুবর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে। এটা কি কাকতালীয় নাকি ভাগ্যের কোনো অমোঘ সংকেত?
পরিনীলা নীলধ্রুবকে বলেনি যে সেও একই ফ্লাইটে যাচ্ছে। তবে সে যাত্রী হিসেবে নয়, সে যাচ্ছে একজন সেবিকা হিসেবে, যার নাম হয়তো নীলধ্রুব কোনোদিন জানবে না। সে হবে নীলধ্রুবর সেই ছায়া, যে তাকে অন্ধকারেও পথ দেখাবে।
••••••
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালে মানুষের ভিড়, অথচ নীলধ্রুবর কাছে মনে হচ্ছে সে এক জনমানবহীন দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ধরা সেই ছোট্ট কাঁচের শিশিটা, যার ভেতর রাখা শুকনো অপরাজিতা ফুলটা এখন তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা। সে জানে, এই নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হওয়ার পর তার আর কোনো পরিচয় থাকবে না। সে হয়ে যাবে এক দামী কোম্পানির 'পেশেন্ট নাম্বার ৪০২'। তার স্মৃতিরা একে একে ঝরে পড়বে শরতের পাতার মতো। নীলধ্রুব দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইমিগ্রেশনের দিকে এগিয়ে গেল। সে একবারও পিছনে ফিরে তাকাল না। সে জানত না, কয়েক কদম দূরেই নার্সিং ইউনিফর্ম আর মাস্কের আড়ালে দাঁড়িয়ে এক জোড়া ভেজা চোখ তাকেই দেখছে। পরিনীলা সেখানে দাঁড়িয়েছিল এক অটল পাহাড়ের মতো, যার ভেতরে লাভার মতো যন্ত্রণা বইছে, কিন্তু বাইরে সে শান্ত।
বিমানে ওঠার পর নীলধ্রুব যখন জানালার ধারের সিটে বসল, তার মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা মনে হতে লাগল। কিছুক্ষণ আগেই দেখা সেই ক্যাফে, লাইটহাউস আর পরিনীলার মুখ—সবই যেন আবছা হয়ে আসছে। এটা কি ঘুমের ওষুধের প্রতিক্রিয়া নাকি তার রোগের প্রথম ধাপ? সে পকেট থেকে শিশিটা বের করে হাতের তালুতে রাখল। হঠাৎ এক পরিচ্ছন্নতা কর্মী বা অ্যাটেনডেন্ট তার পাশের সিটে এসে দাঁড়াল। হাতে জলের বোতল আর কিছু ওষুধ। নীলধ্রুবর ঝাপসা দৃষ্টিতে সেই মেয়েটির চোখ দুটো খুব চেনা মনে হলো। কিন্তু মাস্কের কারণে সে মুখটা দেখতে পেল না।
"আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে স্যার?" মেয়েটির কণ্ঠস্বর খুব নিচু, যেন এক দূর সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ।
নীলধ্রুব অস্ফুটে বলল, "আমার মনে হচ্ছে আমি কিছু একটা ভুলে যাচ্ছি। বড় জরুরি কিছু।"
মেয়েটি তার কপালে হাত রাখল। সেই স্পর্শে এক অদ্ভুত শীতলতা ছিল যা নীলধ্রুবর স্নায়ুগুলোকে শান্ত করে দিল। মেয়েটি বলল, "সবকিছু মনে রাখার দায়িত্ব আপনার নয়। কিছু স্মৃতি বাতাসের জন্য ছেড়ে দিতে হয়।" নীলধ্রুব জানল না, ওই মাস্কের আড়ালে পরিনীলার ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছিল। সে নীলধ্রুবর খুব কাছে, অথচ কয়েক আলোকবর্ষ দূরে।
মাস তিনেক পরের কথা। বিদেশের এক অত্যাধুনিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের বারান্দায় বসে থাকে নীলধ্রুব। এখানকার আকাশটা অনেক বেশি নীল, কিন্তু তাতে পরিনীলার শাড়ির সেই মায়া নেই। নীলধ্রুবর রোগটা খুব দ্রুত বাড়ছে। সে এখন নিজের নাম লিখতে গেলে মাঝপথে থেমে যায়। সে তাকিয়ে থাকে দূরের তুষারাবৃত পাহাড়ের দিকে। প্রতিদিন সকালে একজন সেবিকা এসে তার ঘর গুছিয়ে দেয়, তাকে খাইয়ে দেয়, আর সন্ধ্যায় তাকে গল্প পড়ে শোনায়। নীলধ্রুব মেয়েটিকে 'নিলা' বলে ডাকে। কেন জানি না, এই নামটা ডাকলে তার অবশ হয়ে যাওয়া হৃদয়ে একটু স্পন্দন জাগে।
একদিন সন্ধ্যায় আকাশ থেকে বরফ পড়ছে। নীলধ্রুব তার বিছানায় শুয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল। 'নিলা' তার পাশে এসে বসল। নীলধ্রুবর দৃষ্টি আজ কেমন জানি স্বচ্ছ। সে নিলার হাতটা ধরল। নিলার হাতটা আজ কাঁপছে না।
"নিলা, আমি কাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি," নীলধ্রুব খুব কষ্টে কথাগুলো সাজিয়ে বলল। "একটা লাইটহাউস, অনেকগুলো পুরনো কাগজ, আর একটা হীরের আংটি। একটা মেয়ে কাঁদছিল। আমি কি কাউকে খুব কষ্ট দিয়ে এসেছি?"
পরিনীলা—যে এখন নিলা ছদ্মনামে তার পাশে আছে—চুপ করে রইল। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে যাচ্ছে। সে নীলধ্রুবর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, "না, আপনি কাউকে কষ্ট দেননি। আপনি তাকে ভালোবেসে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন।"
নীলধ্রুব হঠাৎ হেসে উঠল। এক নিষ্পাপ শিশুর মতো হাসি। সে বলল, "আমি কি তোমাকে চিনি? তোমার চোখগুলো কেন জানি সেই কান্নায় ভেজা মেয়েটার মতো। তুমি কি সেই মেয়েটি?"
পরিনীলার চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। সে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে নীলধ্রুবর চোখের সেই উজ্জ্বলতা আবার হারিয়ে গেল। সে আবার শূন্য দৃষ্টিতে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল— "অপরাজিতা... নীল ফুল... স্টেশনে অনেক ভিড়..."
সেদিন রাতে নীলধ্রুবর টেবিলে রাখা সেই কাঁচের শিশিটা রহস্যময়ভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার বদলে সেখানে পাওয়া গেল একটা নতুন খাম। খামটার ওপর লেখা নেই কারও নাম, শুধু ভেতরে একটা চিরকুট আছে যেখানে লেখা— "যদি কোনোদিন সব মুছে যায়, যদি পৃথিবীটা তোমার কাছে অচেনা মনে হয়, শুধু ফিরে তাকাও। তোমার ছায়া হয়ে যে দাঁড়িয়ে আছে, সেই তোমার ঘর।"
পরদিন সকালে ডাক্তাররা যখন নীলধ্রুবর ঘরে ঢুকলেন, তারা দেখলেন ঘরটা খালি। নীলধ্রুবর কোনো চিহ্ন নেই। এমনকি সেই 'নিলা' নামের সেবিকাটিরও কোনো হদিস নেই। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল, ভোরের আলো ফোটার আগে দুইজন মানুষ কুয়াশার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের ঢালু রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। একজনের হাঁটার ভঙ্গি কিছুটা অসংলগ্ন, আর অন্যজন তাকে শক্ত করে ধরে পথ দেখাচ্ছে।
তারা কি কোনো অজানার উদ্দেশ্যে হারিয়ে গেল? নাকি পরিনীলা তাকে নিয়ে ফিরে এল সেই পুরনো শহরে, যেখানে স্মৃতিরা আজও লাইটহাউসের নিচে জমা হয়ে আছে? নীলধ্রুবর কি শেষ পর্যন্ত সব মনে পড়বে? নাকি এক নিস্তব্ধ অন্ধকার তাদের এই অসমাপ্ত গল্পটাকে চিরকালের জন্য ঢেকে দেবে?
সমুদ্রের পাড়ে আজও সেই লাইটহাউসটা দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে জেলেরা বলে, ঝড়ের রাতে নাকি ওপরের ব্যালকনিতে একটা ছায়া দেখা যায়। কেউ বলে ওটা প্রেতাত্মা, কেউ বলে ওটা এক চিরন্তন প্রতীক্ষা। কিন্তু উত্তরটা হয়তো কেবল সেই পুরনো ফোল্ডারের হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজগুলোই জানে।
লেখক পরিচিতি:- লেখক অভিজিৎ হালদার এর জন্ম নদীয়া জেলার অন্তর্গত মোবারকপুর গ্রামে ২০০১ সালের ১লা সেপ্টেম্বর।
পিতা কার্ত্তিক হালদার ও মাতা আরতি হালদার।
প্রাথমিক শিক্ষা মোবারকপুর প্রাইমারী বিদ্যালয় , মাধ্যমিক শিক্ষা ভাজনঘাট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় , সুধীরঞ্জন লাহিড়ী মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং বর্তমানে আই টি আই এর ছাত্র।
লেখালেখির সূএপাত: স্কুল জীবন থেকে। লেখালেখি:- বিভিন্ন – পএ পত্রিকা, ম্যাগাজিন , ওয়েবজিন, ফেসবুক পেজ/ ফেসবুক গ্রুপ , ব্লগসাইট , ওয়েবসাইট , অনলাইন প্লাটফর্ম , এছাড়া বিভিন্ন ফোরামে।
প্রথম বই: "প্রথম আলো "
পেশা ও পরিচয়: তরুণ কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক, গীতিকার, লেখক ও অন্যান্য।
সাহিত্যিক ধারা: আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক কবিতা, প্রেম ও বিরহ, অস্তিত্ববাদী ভাবনা, গ্রামীণ ও শহুরে জীবনচিত্র , বাস্তববাদী, দার্শনিক চিন্তাধারা, কল্পনাবিলাসী , রূপকথা , বাস্তব পেক্ষাপট ও সমসাময়িক।
বিশেষ উক্তি:
"এই শহরকে ভালো না বেসে যদি আমি চাঁদের মাটিকে ভালো বাসতাম
তবে আমি নীল ডায়েরি না হয়ে নীল আর্মস্ট্রং হতাম।"
=======

