গল্প।। শেষ ট্রেনের যাত্রী ।। কুহেলী রায়

 

শেষ ট্রেনের যাত্রী 

কুহেলী রায়   


শীতের রাত,কুয়াশায় ঢেকে গেছে ছোট্ট পাহাড়ি স্টেশনটি। রাত ঠিক সাড়ে বারোটা।এই সময় শুধু একটি ট্রেন থামে —শেষ ট্রেন।স্টেশনে লোক বলতে মাত্র দু একজন রেল কর্মী আর একজন যাত্রী অরিন্দম।
অরিন্দম শহর থেকে ফিরছিল।চাকরির কাজে দেরি হয়ে যাওয়ায় শেষ ট্রেন ছাড়া উপায় ছিল না।চারিদিকে এতটাই নিস্তব্ধ যে নিজের শ্বাসের আওয়াজ ও কানে আসছিল না।হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল বাজতেই সে চমকে উঠল।
ট্রেন এসে থামল। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই —কোন যাত্রী নামল না উঠলেও না, একা অরিন্দম ছাড়া। সে একটি ফাঁকা কামড়ায় উঠে জানালার পাশে বসে পড়ল। ট্রেন ছাড়তেই কুয়াশার ভেতর স্টেশন যেন মিলিয়ে গেল।
কিছুদূর যাওয়ার পর অরিন্দম লক্ষ্য করল,তার কামরায় আর কেউ নেই ।ঠিক তখনই ধীরে ধীরে দরজাটা খুললো —এক মহিলা উঠলেন। পরনে সাদা শাড়ি, মুখ ফ্যাকাশে,চোখ দুটি অদ্ভুত ভাবে স্থির।
এই কামরায় কেউ বসে?তিনি খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।
অরিন্দম একটু অস্বস্তি বোধ করলেও বললেন— না,বসুন।
মহিলাটি তার সামনের সিটে বসে জানলার দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে রইলেন। ট্রেনের ঝাঁকুনি শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দই কানে আসছিল না।
কিছুক্ষণ পর মহিলা হঠাৎ বললেন—-আপনি কি জানেন, এই লাইনে রাতের শেষ ট্রেনে একজন যাত্রী সব সময় থাকে। সে বাড়ি ফিরতে পারে না।
অরিন্দম হাসার চেষ্টা করল— ভূতের গল্প নাকি?
মহিলা ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন— তার চোখে যেন গভীর শূন্যতা!
“গল্প নয় সত্যি”।
ঠিক তখনই কামরার আলো ঝিলমিল করে নিভে গেল। অরিন্দমের বুক ধরফর করতে লাগলো। আলো জ্বলে উঠতেই সে দেখল —মহিলাটির মুখটি অস্বাভাবিক ভাবে বদলে গেছে। চোখ দুটি বড় বড় হয়ে গেছে। গলার কাছে কাটা দাগ,
ভয়ে ভয়ে সে কাঁপা গলায় বলে উঠলো—”আপনি আপনি কে?”
মহিলাটি ফিসফিস করে বলল–
আমি এই ট্রেনের যাত্রী।দশ বছর আগে এই লাইনে দুর্ঘটনা হয়েছিল। ট্রেনটি খাদে পড়ে যায়,সবাই মরে ছিল– সঙ্গে আমিও!
অরিন্দম চিৎকার করতে গিয়েও পারল না, তার গলা শুকিয়ে কাঠ।
মহিলাটি বলল,এই শেষ ট্রেনে যে আমার সাথে ফেরে সে আর বাড়ি ফিরতে পারে না।
হঠাৎ ট্রেনের গতি কমলো। দূরে একটি স্টেশন দেখা গেল। অরিন্দম জানালার দিকে তাকিয়ে বুঝল এটাই তার গন্তব্য।
সে দৌড়ে দরজার দিকে গেল। ট্রেন থামতেই সে লাফ দিয়ে নামলো। পিছনে তাকিয়ে দেখে কামরাটি সম্পূর্ণ ফাঁকা। কোন মহিলা নেই।
পরদিন সকালে খবরের কাগজে একটি ছোট্ট খবর চোখে পড়লো।
শেষ ট্রেনে এক যুবক অজ্ঞান অবস্থায় স্টেশনে উদ্ধার।
বলছে ট্রেনে এক মৃত মহিলা তার সাথে কথা বলছিল।
অরিন্দম আজও জানেনা –স্বপ্ন দেখছিল ?নাকি সত্যিই সে শেষ ট্রেনের যাত্রী ছিল।
কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত যে, রাতে শেষ ট্রেনে সে আর কখনো উঠবে না।
অরিন্দম সারা রাত ঘুমোতে পারল না। চোখ বন্ধ করলেই সেই সাদা শাড়ির মহিলা, ফ্যাকাসে মুখ, শূন্য দৃষ্টি সব ভেসে উঠছিল। ভোরের আলো ফুটলেও তার ভয় কাটেনি। মনে হচ্ছিল ট্রেনটা এখনো চলছে। আর সে কামরায় বসে আছে।
পরদিন কাজে গেলেও মন বসছিলো না। সহকর্মীরা বলল -তুই কেমন যেন বদলে গেছিস। অরিন্দম কিছুই বলছিল না, কিন্তু সে বুঝতে পারছিল যেন কিছু একটা ঠিক নেই।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ স্টেশনের নোটিশ বোর্ডে চোখ পড়লো তার –হলুদ হয়ে যাওয়া একটা পুরনো কাগজে লেখা।
সতর্কীকরণ:: “রাত বারোটার পর শেষ ট্রেনে একা যাত্রা নিষেধ।”
তার বুক কেঁপে উঠলো। এটা কি কাকতালীয়?
কৌতুহল সামলাতে না পেরে স্টেশনের বুড়ো কালেক্টর কে জিজ্ঞাসা করল—
কাকু, এই নোটিশ টা কেন দেওয়া?
বুড়ো লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল— তুমি কি শেষ ট্রেনে উঠেছিলে?
অরিন্দম মাথা নাড়তে এই বুড়ো ফিসফিস করে বলল- তাহলে তুমি কি তাকে দেখেছো?
কি!!
 অরিন্দমের গলা শুকিয়ে এলো।
সাদা শাড়ির মহিলা? বুড়ো ধীরে ধীরে বলল,
দুর্ঘটনার রাতে সে তার বাচ্চাকে খুঁজছিল।তখন সে লাইনে পড়ে যায়। তারপর থেকে শেষ ট্রেনে সে ফেরে। 
অরিন্দমের মনে পড়ল– মহিলাটি একবার ও হাসেনি।শুধু জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল।
সেই রাতেই অদ্ভুত সব ঘটনা শুরু হলো।
রাত বারোটার সময় অরিন্দমের ঘরের লাইট নিভে গেল ।জানালার কাছে টুকটাক শব্দ। বাইরে তাকিয়ে দেখে –কুয়াশার ভেতরে ট্রেনের আলো।
অসম্ভব তার বাড়ির কাছে তো কোন রেললাইন নেই!
হঠাৎ কানে ভেসে এলো তার পরিচিত কন্ঠ -আপনি কি জানেন ?আমি এখনো বাড়ি ফিরতে পারিনি।
অরিন্দমের সারা শরীর জমে হিম হয়ে গেল।ধীরে ধীরে ঘরের দরজাটা খুলে গেল।
সাদা শাড়ির আঁচল মেঝেতে ছুঁয়ে আছে। মহিলাটি দাঁড়িয়ে আছে ।এবার তার চোখে জল। আমার বাচ্চাটা তুমি দেখেছ? কন্ঠে অসহায়তা।
অরিন্দম ভয়ে কাঁপলেও মাথা নাড়ল– না,
আমি দেখিনি।
মহিলাটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। যেদিন আমার বাচ্চাকে 
কেউ শেষ ট্রেনে নিয়ে যাবে সেদিন আমি মুক্তি পাব।
এই কথা বলেই সে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।ঘরে আলো জ্বলে উঠলো ।সব স্বাভাবিক।
পরদিন সকালে খবর এলো রাতের শেষ ট্রেনে এক শিশু অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে।
অরিন্দম বুঝলো অভিশাপ ভাঙতে শুরু করেছে।
কিন্তু আজও যখন রাত বারোটা বাজে তখন দূরে কোন ট্রেনের হুইসেল শুনলে ভয়ে তার বুক কেঁপে ওঠে।
কারণ সে জানে শেষ ট্রেনের যাত্রী এখনো বিদায় নেয় নি।
শেষ ঘটনার পর কয়েকদিন অরিন্দম স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।খবরের কাগজে শিশুটির বেঁচে যাওয়ার খবর পড়ে তার মনে একটু স্বস্তি এসেছিল। সে ভাবলেও হয়তো সেই আত্মা সত্যিই মুক্তি পেয়েছে। এবার হয়তো সব শেষ।
কিন্তু ভয় আসলে তখনই শুরু হয়- যখন মানুষ মনে করে ভয় কেটে গেছে।
এক সপ্তাহ পর এক রাতেই অরিন্দমের হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে দেখে ঘরের দেওয়ালে বড় একটা ছায়া নড়ছে। দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িতে ঠিক সাড়ে বারোটা।ঘর নিস্তব্ধ -অথচ কানে ভেসে আসছে সেই আওয়াজ; ট্রেন ছুটে চলার আওয়াজ।
উঠে বসতেই অনুভব করলো সে, ঘরটা ধীরে ধীরে দুলছে ;ঠিক ট্রেনের কামরার মত ।না, না! এটা হতে পারে না। 
হঠাৎ জানালার কাছে ভেসে উঠলো সেই নাম -শেষ স্টেশন।  পিছন থেকে একটি শান্ত কন্ঠ-
তুমি কে? অরিন্দম কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল?
ছেলেটি হেসে বলল, তুমি আমায় খুঁজছিলে না ?অরিন্দমের মাথার ভেতরে ঝাকুনি লাগলো। হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই দিন রাতে শেষ ট্রেনের কামরা থেকে নামার সময় কেউ তো ছিল না ।তাহলে সে কাকে ধাক্কা দিয়েছিল?
ছেলেটি ফিসফিস করে বলল– মা এখন অপেক্ষা করছে।
হঠাৎ কামরার দরজা খুলে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে সেই মহিলা। এবার তার মুখে শান্ত হাসি।
ধন্যবাদ,তিনি বললেন তুমি আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিয়েছো। অরিন্দম হাঁপাতে হাঁপাতে বলল– তাহলে কি আমার মুক্তি?

মহিলাটি কিছুক্ষণ চুপ করে বলল –মুক্তি সবার জন্য নয়!
পরের দিন সকালে রেল লাইনের ধারে প্রচন্ড ভিড়। কাগজে শিরোনাম ::রাতে শেষ ট্রেন থেকে পড়ে এক যুবকের মৃত্যু ।পরিচয় ::অরিন্দম।
লোকেরা বলাবলি করছিল রাতে সেই ট্রেনে সে নাকি একা ছিল,কার সাথে কথা বলছিল!
বুড়ো টিকিট কালেক্টার একা দূরে দাঁড়িয়ে বলল- শেষ ট্রেন যাত্রী ছাড়া যায় না।
আর সেই রাতেই শেষ ট্রেন ছাড়লো:
একটি ফাঁকা কামড়ায় জানালার পাশে বসে আছে অরিন্দম!
মুখ ফ্যাকাশে,চোখ শূন্য।
আর তখনই কামড়ায় এক নতুন যাত্রী উঠলো।
অরিন্দম মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করল, এই কামরায় কি কেউ বসে….?

শব্দ সংখ্যা:1010
========================
 
লেখক পরিচিতি
কুহেলী রায় 
সহকারী শিক্ষিকা 
আরামবাগ বিবেকানন্দ একাডেমি, আরামবাগ, হুগলি
----------------- 
ঠিকানা 
গ্রাম: রাধানগর 
পোস্ট :নাঙ্গুলপাড়া 
থানা:খানাকুল 
জেলা:হুগলী
 পিন:712406

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.