রুস্তম -এ - হিন্দ
সুকান্ত ঘোষ
সেই যেবার টিভিতে রামায়ণ সিরিয়াল দেখাতে শুরু করল সেই থেকেই টুলু কাকুর জীবনটা গেল বদলে। টুলু কাকু মানে অতীশ নারায়ণ মিত্র ।আমাদের প্রতিবেশী অশোক নারায়ন মিত্র কাকুর ভাই। অশোক কাকুকে চাকরি উপলক্ষে মাসের কুড়ি পঁচিশ দিন বাইরে বাইরেই থাকতে হয়। বাড়িতে থাকার মধ্যে টুলু কাকু ,অশোক কাকিমা আর অশোক কাকিমার মেয়ে ঝিন্টি । ঝিন্টি সবেমাত্র ক্লাস সেভেনে পড়ে । টুলুকাকু তখন ইউনিভার্সিটিতে ।এমনিতে খেলা ধুলোয় ভালো ছিল টুলু কাকু ।ফুটবল খেলতো ।হাইট ছিল বেশ ভালো। পেশী বহুল চেহারা ।কিন্তু রামানন্দ সাগরের রামায়ণ দেখে টুলু কাকুর মত গেল বদলে। তার শখ হল রামায়ণের হনুমান চরিত্র অভিনেতা দারা সিংহের মতো কুস্তিগীর হবেন।
যা ভাবা তাই কাজ ।অশোক কাকিমা একমাত্র দেবরটিকে নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করতেন। খেলাধুলো করে বলে তার জন্য আলাদা বাদাম আলাদা ডিম বরাদ্দই ছিল ।এখন টুলু কাকু বায়না ধরল যে কুস্তি শিখবে । তাতে অশোক কাকিমাই সবথেকে বেশি উৎসাহ দেখালেন। অশোক কাকু একটু আপত্তি করেছিলেন এই ভেবে যে তাতে লেখাপড়ার ক্ষতি হবে ।আর যাই হোক একটা চাকরি বাকরি তো করতে হবে !কুস্তি শিখে আর কে কবে চাকরি পেয়েছে ?কিন্তু অশোক কাকিমা বেঁকে বসলেন। দেবর যখন বলেছে কুস্তি শিখবে তখন শিখবে । তিনি নাকি শাশুড়ি মার কাছে কথা দিয়েছিলেন আজীবন মা-বাবা হারানো দেবরটির কোন সাধ অপূর্ণ রাখবেন না ।অতএব শুরু হয়ে গেল টুলু কাকুর কুস্তি শিখন ।সেই ভোরবেলা উঠে কোথায় যেন কুস্তি শিখতে যেত টুলু কাকু ।তার পুষ্টির জন্য বাদাম ,ছোলা, পেস্তা,আখের গুড় কোন কিছু অভাব রাখতেন না অশোক কাকিমা ।শুনেছি জলখাবারে নাকি গোটা দশেক ডিম সিদ্ধ তার বরাদ্দ ছিল । দুপুরে মাছ মাংস তো ছিলই ।রাতেও নাকি একটা গোটা মুরগি তন্দুরি করে দিতে হতো তাকে। কুস্তির গুণেই হোক কিংবা খাদ্য গুণে কিছু দিনের মধ্যেই টুলু কাকুর শরীর টা হয়ে উঠলো দেখার মতো।
মাসছয়েকের মধ্যে কুস্তি বীর ও হয়ে উঠল কাকু ।মানে সেই রকমই তো দাবি করল ।বাড়ির পাশে ফাঁকা মাঠে একটা কুস্তির আখড়া গড়ে তুলল। আর আমাদের মত ছেলেপেলেদের ডেকে বলল ,"তোদের এবার থেকে কুস্তি শেখাবো আমি।শরীর হলো মন্দির । Humanbody is the temple of the living God - বুঝলি ?শরীরটাকে যদি ভালো করে তৈরি করতে পারিস তাহলে দেখবি যত ভয়ংকর বিপদ ই হোক না কেন তোদের দেখেই ভয়ে পালাবে। তোরাই তো দেশের সম্পদ।"
কাকু এও প্রতিশ্রুতি দিলো যে সকালের জলখাবার এর ব্যবস্থা সেই করবে । তাতে ছোলা, বাদাম গুড় যেমন থাকবে তেমন ডিম সেদ্ধ কলা কমলা লেবু থাকবে।
শরীরকে মন্দির বানানোর যত না ইচ্ছা আমাদের ছিল তার থেকে বেশ লোভ ছিল ডিম সিদ্ধ, কলা, কমলা লেবুর।
অতএব স্যাঙ্গাত এর অভাব হলো না ।অশোক কাকিমা দেওরের এই পদোন্নতিতে এত খুশি হলেন যে স্বেচ্ছায় সব খরচ নিজের ঘাড়ে তুলে নিলেন। আসলে কাকুরা বংশ পরম্পরায় বড়লোক ।আর অশোক কাকু ও রোজগার করেন বেশ ভালো রকম। তবু সবাই তো আর খরচ করতে চায়না! কিন্তু অশোক কাকিমার মনটা ছিল বেশ ভালো। আর দেওর কে ভালো ও বাসতেন খুব।
অতএব,রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা হাজির হতাম। খালি গায়ে লেঙ্গট পরে কাদামাটির উপরে গড়াগড়ি খেতাম।কত রকম প্যাঁচের কথা যে বলতেন টুলু কাকু !সেসব আমরা বুঝতাম ও না ছাই কিছু !তবে কাদামাটি মেখে গড়াগড়ি খেতে ভালো লাগতো ,।আর ভালো লাগতো নিত্যনতুন জল খাবার। শুধু একটাই সমস্যা ছিল ।যখন আমরা একে অপরকে ল্যাং মেরে দমাস করে ফেলছি ,আবার নিজেও পরে যাচ্ছি,মাঝে মাঝে ঝিনটি হেসে গড়িয়ে পরতো।তখন নিজেদের একটু লজ্জা লজ্জা লাগতো ।কিন্তু তারপরেই জল খাবার পর্বের কথা ভেবে সেসব অপমান আমরা তুচ্ছ জ্ঞান করতাম। খাবার সময় কাকু, কতসব নতুন নতুন কথা বলতেন ।পৃথিবীতে কত সব সাহসী মানুষ জন্মেছেন ।সাহস না থাকলে মানুষ হওয়া যায় না ।কুস্তি শুধু শরীর গড়েনা ।তা মনে সাহসও বাড়িয়ে তোলে ।এইসব কথা শুনে আমরা অবাক হতাম আর খুব গর্ব হতো যে, টুলু কাকুর মত একজন সাহসী মানুষ আমাদের পাড়ায় বাস করেন আমাদের বাড়িতে মা কাকিমারা বলতেন যাই হোক বাবা পাড়ায় চোর ছেচরের উপদ্রব কমবে, এত বড় সাহসী একজন কুস্তিগীর আমাদের পাড়ায় আছেন এ কথা নিশ্চয়ই চোর ডাকাতেও খবর রাখে আমাদের বাড়িতেও আমাদের উৎসাহ দেওয়া হতো টুলু কাকুর মত সাহসী হয়ে উঠতে।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে টুলু কাকুর ডাক পরতে লাগলো।সংবর্ধনার বান বয়ে গেল।অশোক কাকিমা তো খুব খুশী।তাঁর পুত্র সম দেওর একজন সত্যিকারের বীর হয়ে উঠেছে।
এইরকম কোনো এক সংবর্ধনা সভায় কোনো এক সঞ্চালক টুলু কাকুর প্রশংসা করতে গিয়ে " রুস্তম ই হিন্দ" বাক্যবন্ধটি ব্যবহার করলেন।আমরা এর অর্থ জানতাম না।কিন্তু বিশেষণ টি খুব পছন্দ হল।আমরা আর টুলু কাকু না বলে " রুস্তম ই হিন্দ" বলে ডাকতে লাগলাম। টুলু কাকু খুশী।অশোক কাকিমা আরো খুশী।আমাদের জলখাবারের মেনু দীর্ঘ হল।কখনো ছানা,কখনো সন্দেশ অথবা দরবেশ যুক্ত হতে থাকলো।
যে হারে আখড়ায় কুস্তির অনুশীলন চলছিল আমাদের এতদিনে আমরা সবাই এক একটা " রুস্তম ই হিন্দ" হয়ে উঠতাম যদি না সেই ঘটনাটি ঘটতো।তখন আমাদের আখড়ার সবেমাত্র একমাস পূর্ন হয়েছে।আমরা সব বুক ফুলিয়ে হাত দুটো কে শরীর থেকে দূরে রেখে নিজের নিজের শরীর সম্পদ দেখাতে শুরু করেছি।এমন সময় ঘটে গেল সেই ঘটনা টি।
এমনিতে আমাদের আখড়া আর কুস্তির খবর অনেক দুর পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কিন্তু ,চোর সমাজে সেই খবর প্রচার করার মত লোকের অভাব ছিল বোধ হয়। কেননা এত সব সত্ত্বেও একদিন পাড়ায় ডাকাত পরলো।আর পরলো কি না সেই " রুস্তম ই হিন্দ".এর বাড়িতেই।
সবেমাত্র রাত বারোটা।অশোক কাকু বাড়ি নেই।টুলু কাকু স্বামী গৌরবানন্দের লেখা " সাহস শরীরে নয়,মনে অবস্থান করে" শীর্ষক বইটি সবে সম্পন্ন করে নিদ্রা গিয়েছেন। ঝিনটি ও গভীর ঘুমে।অশোক কাকিমা তখনও রান্না ঘরে কিছু করছেন।
হঠাৎ তিন জনের ডাকাত দল ঢুকে পরে চেপে ধরলো অশোক কাকিমা কে।কাকিমা " চোর,চোর,ডাকাত,ডাকাত" বলে চিৎকার করতে লাগলেন।আমরা যারা আশেপাশে থাকতাম সকলে এসে জড়ো হলাম।কারণ,টুলু কাকু বলেছেন " প্রকৃত কুস্তিগীর রা সদাসর্বদা অন্যকে সাহায্য করে।" সাহায্য তো করবো।কিন্তু, তিন তিনটে মুশকো লোক একসঙ্গে ঢুকে পড়েছে রান্না ঘরে।আর ছুরি ছোরা বের করে চেপে ধরেছে অশোক কাকিমা কে।
আমরা ভাবছি এরা তো জানে না কার বাড়িতে ডাকাতি করতে এসেছে! এক্ষুনি আমাদের রুস্তম ই হিন্দ আসবে আর এক একটা ডাকাত কে উলট প্যাঁচ দিয়ে ধোবার মত আছড়ে ফেলবে।অশোক কাকিমা ও নিশ্চয়ই তাই ভেবেছিলেন।
কিন্তু,কোথায় কি ? মিনিট দশেক কেটে যাবার পরেও আমাদের টুলু কাকুর দেখা নেই।বোধ হয় " সাহস শরীরে নয়,মনে অবস্থান করে" তাকে গভীর ভাবে নিদ্রিত করে ফেলেছিল। আমরা ছোটরা আমাদের বাড়ির বড় দের সঙ্গে এসে অশোক কাকুর বাড়ির বাইরে এসে উপস্থিত হয়েছিলাম।আমাদের মধ্যে ছোট্টু একটু ডাকাবুকো।সে একাই একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।কিন্তু,তার বাবা তাকে ভয়ে এমন করে আঁকড়ে লাগলেন যে সে আর এগোতে পারলো না।
কিছু সময় এইরকম ভাবে কেটে গেল।অশোক কাকিমা উপলব্ধি করলেন যে কোনো রুস্তম ই হিন্দ এইসব ছোট খাটো ব্যাপারে নাক গলাতে এগিয়ে আসবে না।যা করার তাঁকে নিজেকেই করতে হবে।কিন্তু ,তাঁর গলায় যে ছুরি ঠেকানো।আর ওরা যে তিনজন।এখন আলমারির চাবি দিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় কি?
কিন্তু,তিনি অত সহজে হারবার পাত্রী নন।তিনি তো রান্না ঘরের কাজ করছিলেন?
তাঁর ডান হাতে তখনো ধরা ছিল একটা মাঝারি সাইজের লোহার কড়াই।এতে করেই যে রুস্তম ই হিন্দ এর খাবার রান্না করতে হয় তাঁকে।আচমকাই,সেই লোহার কড়াই টির ডান্ডা ধরে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলেন তিনি।বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে সেই কড়াই অর্ধ চক্রাকারে গিয়ে আঘাত করলো তাঁর বাম দিকে দাঁড়িয়ে থাকা ডাকাত সর্দারের মাথায়।সে ব্যাটা " ওঃ !"শব্দ করে চিৎ পটাং। অশোক কাকিমা সেই ভারী কড়াই মাথার উপর বন বন করে ঘোরাতে শুরু করতে অন্য দুজন ও পালানোর চেষ্টা করলে। কিন্তু,আমাদের ছোট্টু এক ছুটে গিয়ে সদর দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলে।তখন, অনেক লোক জমে গেছে।ডাকাত গুলিকে রামধোলাই শুরু হল।তখনই দেখি একতলার জুতো র বাক্সের পিছন থেকে বের হয়ে এলো আমাদের কুস্তি বীর টুলু কাকু।
কোমরে হাত দিয়ে তিনি যখন ভাবছেন কোন প্যাঁচ এ ডাকাত গুলিকে কাবু করবেন তখন ই পুলিশ এসে গেল।ডাকাত গুলোর তখন আধমরা অবস্থা।
ভিতরে ভিতরে কি হয়েছিল কে জানে ?দুদিন পরে আমরা সবাই যখন কুস্তির আখড়ায় গেলাম দেখলাম ভিতর থেকে গেটে তালা দেওয়া। আর বাইরে থেকে দেখলাম আখড়া যেখানে ছিল সেখানে ইটের দেয়াল উঠছে। সেখানে নাকি সিকিউরিটি রুম তৈরি হবে।
দুঃখের কথা এই যে আমাদের আর ' রুস্তম ই হিন্দ ' হওয়া হলো না। জনান্তিকে শোনা গেল টুলু কাকুর খাদ্য তালিকায় নাকি ব্যাপক কাট ছাঁট হয়েছে।আর অশোক কাকু ঘোষণা করেছেন এম এস সি তে ফার্স্ট ক্লাস না পেলে টুলু কাকুকে তিনি বাড়ি ছাড়া করবেন।
===========================
SUKANTA GHOSH
CHANDIPUR
PIRPUR
HOWRAH
MOB 9874463796

