ধারাবাহিক উপন্যাস ।। মাধব ও মালতি ।। সমীরণ সরকার

 

 
 

(পূর্ব কথা:--- জয়পুরের পান্থশালায় মানবেন্দ্র ও পূর্ণিমা তিন দিন থাকলেও জগন্নাথ পাত্র তাদের কাছ থেকে কোনরকম অর্থ নেননি। কারণ তিনি মনে মনে ভেবে নিয়েছিলেন যে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা কনক নারায়ণ চৌধুরীর ছেলে মানবেন্দ্র নারায়ন ও তার পুত্রবধূকে তার পান্থশালায় তিন দিন সযত্নে রেখেছেন এবং তাদের কাছ থেকে কোনরূপ অর্থ নেননি এই খবরটা কোনরকমে কনক নারায়ন চৌধুরীর কানে পৌঁছে দিতে পারলে তিনি হয়তো ভবিষ্যতে কোনরকম সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু স্বামীর এই উদ্দেশ্যে বাধা দিলেন তার স্ত্রী মল্লিকা। কারণ পূর্ণিমার আন্তরিক ব্যবহারে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। এছাড়া মানবেন্দ্র নারায়ণ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে ডাকাতদের কাছ থেকে তার গয়না উদ্ধার করেছিলেন, এতে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। তাই পূর্ণিমা পান্থশালা থেকে চলে যাওয়ার সময় তিনি তাকে তার গয়নার অর্ধেকটা উপহার স্বরূপ দিয়েছিলেন।
 সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর 'পুনিকে' দেখতে না পেয়ে আশালতা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। ওদিকে মানবেন্দ্র নারায়ণের ঠাকুরমা বিধুমুখী দেবী  তাঁর বাপের বাড়িতে মানবেন্দ্র ও তার ঘোড়াটাকে দেখতে না পেয়ে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন এবং তাড়াতাড়ি বাঁকুড়াতে ফেরার জন্য ভাইকে পালকির ব্যবস্থা করতে বললেন।)

।। কুড়ি।। 


সকালবেলায় চৌধুরী ভিলার' মানুষজনের ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে খবর পৌঁছে গেল যে, আশালতার মেয়ে  'পুনি' তার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছে। খবরটা হৈমন্তীর কানে প্রথম পৌঁছে দিল তার খাস দাসী বকুল। হৈমন্তী তখন চৌধুরী ভিলার রান্নাঘরে তার শ্বশুর মশাই অর্থাৎ 'চৌধুরী ভিলার' বর্তমান কর্তা কনক নারায়ণ চৌধুরীর জন্য বাদামের শরবত তৈরিতে ব্যস্ত ছিল।  কনক নারায়ণ চৌধুরী রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধোওয়ার পর কিছুক্ষণ উন্মুক্ত ছাদে , খোলা আকাশের নিচে শরীর চর্চা করেন। তারপর সেখানেই বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। এরপর নিচে নেমে ‌খুব ভালো করে সারা শরীরে তেল মালিশ করে স্নানঘরে ঢোকেন।স্নান সেরে পোশাক বদলে সোজা চলে যান তিন তলার ছাদে ,তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি ঠাকুরঘরে। সেখানে কনক নারায়ণ নিয়মিত গীতা, চন্ডী পাঠ করেন , গুরু মন্ত্র জপ করেন । এরপর দোতলায় তার শয়ন কক্ষের সামনের ব্যালকনিতে মস্ত বড় কাঠের ডেক চেয়ারে বসে  স্থানীয় সংবাদপত্রের পাতা এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত কিছু পত্রপত্রিকা পড়তে পড়তে বড় পাথরের গ্লাসের এক গ্লাস বাদামের শরবত খান। না, ওটাকে শুধু বাদামের শরবত বলা ঠিক হবে না। কারণ ,‌ ওটায় দেশী বাদামের সঙ্গে ভেজানো ছোলা, কল বের ‌ হওয়া গোটা মুগ, কিসমিস, আখরোট, অল্প কাজুবাদাম,এক টুকরো কাঁচা হলুদ, ইত্যাদিও থাকে। সমস্ত উপকরণগুলো প্রথমে‌  হামনদিস্তায়‌‌  খুব ভালোভাবে থেঁতো করা হয়।তারপর থেঁতো হওয়া জিনিসগুলোকে আবার শিলনোড়ার সাহায্যে‌  মোলায়েমভাবে বাটা হয়। এরপর পুরো জিনিসটা পানীয় জলে গুলে  একটা পরিষ্কার কাপড়ের সাহায্যে  একটা বড় পাথরের গ্লাসে ছাঁকা হয়। এরপর হৈমন্তী ঐ গ্লাসের তরলের মধ্যে অল্প পরিমাণ আখের গুড়  ভালো করে মিশিয়ে দেয়। এভাবে শরবত তৈরি হয়ে যায়। হৈমন্তী প্রতিদিন সকালে নিজের হাতে ওই শরবত পরিবেশন করে তার শ্বশুরমশাই কে। সকালবেলায় কিছুক্ষণ  শরীর চর্চা করার পরে শরবত খাওয়া কনক নারায়ণের যুবক বয়স থেকে অভ্যাস। কনক নারায়ণের যুবক বয়সে তাঁর মা বিধুমুখী পুত্রের জন্য নিজের হাতে এই শরবত তৈরি করতেন। পুত্রবধূ রত্নমালা 'চৌধুরী ভিলায়' পা রাখার পরেও এই অভ্যাসের পরিবর্তন হয়নি। আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বেড়াতে গেলে বা অন্য কোন কারণে বিধুমুখী দেবী 'চৌধুরী ভিলায়' অনুপস্থিত থাকলে  সেই কটা দিন রত্নমালা নিজের হাতে শরবত তৈরি করে‌ স্বামীকে পরিবেশন করেন।  
  মানবেন্দ্র নারায়ণের  বিয়ের কয়েক মাস পরে কনক নারায়ণ লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর পুত্রবধূ 
হৈমন্তী সারাদিন মুখ শুকনো করে 'চৌধুরী ভিলার' এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় । মেয়েটি অল্প বয়সী , শরীর একটু পাতলা হলেও রুগ্ন নয়, নাক মুখের গড়ন  ভালো, বেশ বড়বড় ডাগর দুটি চোখ, কুচকুচে কালো এক মাথা চুল, সব মিলিয়ে মেয়েটি বেশ সুশ্রী। কিন্তু মেয়েটি এরকম মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়ায় কেন? তবে কি মানবেন্দ্রের সঙ্গে ওর এখনো ভাব হয়নি? কনক নারায়ণ কৌতুহলী হলেন। মা যেহেতু তার সইয়ের নাতনির সঙ্গে মানবেন্দ্রের বিয়ে দিয়েছেন, তাই প্রথমে  মাকে ডেকে কারণ অনুসন্ধান করলেন। বিধুমুখী বললেন, ওসব নিয়ে তোকে অত ভাবতে হবে না কনক, কিছুদিন পরে দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না, পরপর বেশ কয়েকদিন লক্ষ্য করেও কনক নারায়ণ কোন পরিবর্তন দেখতে পেলেন না। তখন তিনি তাঁর স্ত্রী রত্নমালাকে ডেকে সঠিক কারণ জানতে চাইলেন। রত্নমালা জানতেন , তার ছেলের পছন্দ হয়নি হৈমন্তীকে। উল্টে আশালতার বিধবা মেয়ে পূর্ণিমার সঙ্গে ভাব জমাবার চেষ্টায় তার ছেলে ব্যস্ত। কিন্তু সে কথা তিনি তার স্বামীকে বলেন কী করে? তাই তিনি প্রথমটায় নানারকম কথা বলে স্বামীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কনক নারায়ণ যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি নানারকম ভাবে স্ত্রীকে জেরা করতে শুরু করলেন । কিছুক্ষণের মধ্যেই 
রত্নমালা সত্যিটা বলে দিতে বাধ্য হলেন। কনক নারায়ণ চিন্তিত হলেন। শেষে পুত্রবধূকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখার জন্য তাঁর নিজের খাওয়া দাওয়া তদারকির বেশিরভাগ দায়িত্ব তার কাঁধে তুলে দিলেন। আর সেই থেকেই সকালবেলায় শ্বশুর মশাইয়ের প্রিয় বাদামের শরবত তৈরি করার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিল হৈমন্তী। 
আজ সকালেও সেই কাজে ব্যস্ত ছিল সে। হঠাৎ
বকুল এসে তার কানে কানে বলল, একটা ভালো খবর আছে গো বৌমণি।
---কী খবর ?
---এখানে বলা যাবে না গো, একটুখানি বাইরে চলো না। খুব গোপন খবর। খবরটা শুনলে তোমার ভালো লাগবে গো বৌমণি।
হৈমন্তী কৌতুহলী হলো। শ্বশুরবাড়িতে আসার পর থেকে সে এখনো স্বামীর মন পায়নি। কানাঘুষোয় শুনেছি যে তার স্বামী মানবেন্দ্র নারায়ণ রাঁধুনী মাসি আশা লতার বালবিধবা 
মেয়ে পূর্ণিমার প্রতি অনুরক্ত। এ বিষয়ে শাশুড়ি বা স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করার মত সাহস তার হয়নি। সমস্ত ব্যাপারটা মেনে নিয়ে চুপচাপ চৌধুরী ভিলায় ঘুরে বেড়াত সে। হঠাৎ শশুর মশাই তার খাওয়া দাওয়া দেখভালের দায়িত্ব তার কাঁধে দেওয়ায় খুব খুশি হয়েছিল সে। আজ সকাল বেলায় হঠাৎ বকুলের মুখে গোপন খবর কথাটা শুনে একটু কৌতূহল হলো তার। বকুলের সঙ্গে রান্নাঘরের বাইরে গেল সে। 


(চলবে)

**********************"""""***""""""""""""""
সমীরণ সরকার, সাঁইথিয়া, বীরভূম 
৮৫০৯২৫৮৭২৭



















Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad