সজলের বাবা শিবপদ রংপো চিড়িয়াখানার কেয়ারটেকার। সব পশুদের ঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ খাবার দেওয়া তার কাজ। বাঘের কতটা মাংস দরকার, সিংহের কতটা মাংস দরকার, হাতির কতটা কলাগাছের প্রয়োজন সব তার নখদর্পনে।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শিবপদের বিশ্রাম নেই। এ কাজ করতে তার একটুও ক্লান্তি হয় না। তবে আজ সকাল থেকে একটু কেন ক্লান্ত লাগছে বুঝতে পারছেন না শিবপদ।
সবাইকে খাবার দেওয়া হয়ে গেছে। বাকি আছে বাঘ বিক্রম। খাবার নিয়ে বিক্রমের খাঁচার সামনে এসে শিবপদের পা আর চলতে চাইছে না। কেন আজ এমন হচ্ছে, শরীর কেন চলতে চাইছে না বুঝতে পারছেন না শিবপদ।
শিবপদকে খাবার নিয়ে আসতে দেখে বিক্রম আনন্দে এগিয়ে এলো। বিক্রম শিবপদকে বেশ পছন্দই করে। বিক্রমের খুশির গরগর আওয়াজ শোনা গেল। শিবপদ চাবি দিয়ে খাঁচার খাবার দেওয়ার দরজাটা খুলল। খাবার ভেতরে দিয়ে তালাও লাগিয়ে দিল কিন্তু আর পারল না শিবপদ।
চাবি হাত থেকে পড়ে গেল আর শিবপদও মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
বিক্রম অবাক হয়ে গেল। খাবার পড়ে রইল। বিক্রম থাবা দিয়ে শিবপদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে ডাকতে লাগলো।
শিবপদের সাড়া না পেয়ে বিক্রমের গলার আওয়াজ বেড়ে গেল। সে ডেকেই চলছে, থামছে না।
চিড়িয়াখানার ডিরেক্টর মিঃ সিং এর কানে সেই আওয়াজ পৌঁছাতেই তিনি বুঝলেন কোনও সমস্যা হয়েছে। তিনি বিক্রমের স্বর চেনেন। কোনও বিপদ হয়েছে নিশ্চয়ই।
সজলের কানেও সেই ডাক পৌঁছেছে। বাবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সেও বাঘের ডাকের তফাৎ বুঝতে পারে।
বিক্রম ডাকছে, মানে বাবা শিবপদ ঠিক আছে তো? আজ বাবার শরীরটা ঠিক ছিল না। কাল সজলের পরীক্ষা বলে বাবা তাকে পড়তে বলে একা একাই খাবার দিতে গেছে।
সজলের মা নেই। সে বাবার সঙ্গে চিড়িয়াখানার কোয়ার্টারে থাকে। দৌড়ে বাইরে এসে দেখে চিড়িয়াখানার ডিরেক্টর মিঃ সিং ও তাড়াতাড়ি চলছেন। সঙ্গে দুজন গার্ড বন্দুক নিয়ে।
বাঘের খাঁচাটা চিড়িয়াখানার শেষ প্রান্তে। মিঃ সিং সজলকে আসতে দেখে তার হাত ধরে দৌড় দিলেন, পেছন পেছন গার্ডেরা। আরও লোকজন জড়ো হয়েছে। সবাই দৌড়ে চলল বাঘের খাঁচার দিকে।
বিক্রম কিন্তু একনাগাড়ে ডেকেই চলেছে। শিবপদ মাটিতে পড়ে আছে আর বিক্রম তার গায়ে থাবা বুলিয়েই যাচ্ছে।
সবাইকে দূরে দেখতে পেয়ে, বিশেষ করে সজলকে দেখে বিক্রম ডাক থামালো। একটু দূরে সরে গেল।
সজল দৌড়ে বাবা বাবা বলে ডেকে সাড়া পেল না। মিঃ সিং কাছে এসে বললেন, শিবপদকে এক্ষুনি হসপিটালে নিতে হবে। ইতিমধ্যে চিড়িয়াখানার ডক্টর বোসও চলে এসেছেন। তিনি বললেন, ঠিক একদম দেরি করা যাবে না।
সবাই ধরাধরি করে শিবপদকে গাড়িতে তুলে হসপিটালে চললো।
বিক্রম খাবারের দিকে না তাকিয়ে গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। সজল ব্যাপারটা লক্ষ্য করলো।
হসপিটালের ডাক্তার দিদিমনি বললেন, আর একটু দেরি করলে বিপদ হতে পারতো।
ডক্টরের চিকিৎসায় শিবপদ খানিকটা বাদেই চোখ খুলল। চোখ খুলেই তার প্রথম কথা হল, আমি এখানে কেন? বিক্রম এর খাওয়া হয়েছে তো?
মিঃ সিং বললেন, এ কথা বলছো কেন?
ক্লান্ত স্বরে শিবপদ বলল, আমি খাবারটা নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু বিক্রম খেল কিনা দেখা হয়নি। সজল কই?
সজল বাবার হাতটা জড়িয়ে ধরে বলল, বাবা বিক্রম খাবার সামনে নিয়ে বসে আছে। মনে হয় তুমি ভালো আছো জেনে গেলে খাবে।
মিঃ সিং বললেন, আজ তুমি রেষ্ট নাও শিবপদ, কাল ঘরে ফিরে বিক্রমের কাছে যেও। বিক্রমের চেঁচামেচি আজ তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছে।
সজল বলল, ঠিক তাই বাবা। ধীরে ধীরে সজল সব ঘটনা শিবপদকে বলল।
শিবপদর চোখ জলে ভরে গেল।
দুদিন বাদে শিবপদর হসপিটাল থেকে ছুটি হল।চিড়িয়াখানায় পা দিয়েই সে আগে বিক্রমের খাঁচার কাছে। বিক্রম চুপচাপ বসে আছে। শিবপদ বিক্রম বলে ডাকতেই তাড়াতাড়ি উঠে খাঁচার ধারে এলো। শিবপদ বসে হাত বাড়িয়ে দিতে বিক্রম থাবা দিয়ে শিবপদর হাত স্পর্শ করে মুখ দিয়ে খুশির হুম হুম আওয়াজ করলো।
মিঃ সিং মোবাইলে সেই ছবি তুলে রাখলেন। তারপর বললেন, শিবপদ এবার ঘরে গিয়ে রেষ্ট নাও। কাল আবার বিক্রমের কাছে এসো।
বিক্রম যেন বুঝতে পারল। শিবপদর হাত ছেড়ে দিল। সজল বলল, বাবা বিক্রমও বলছে তোমার রেষ্ট দরকার।
শিবপদ ঘরের দিকে ফিরল। পেছন ফিরে যতবার তাকাল ততবারই বিক্রম বসে আছে আর খুশিতে লেজ নাড়ছে।
সজল বলল, বাবা এই দুদিন বিক্রম ভালো করে খায়নি। আজ ও তোমাকে দেখে খুব খুশি হয়েছে। ও তোমাকে বড্ড ভালবাসে বাবা।
শিবপদ সজলের মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে হেসে বলল, ওদের কেউ যত্ন নিলেই তাকে ওরা চিনে রাখে, ভালও বাসে।
সজল বলল, মানুষের মতো ওদেরও মন আছে তাই না বাবা?
শিবপদ কিছু উত্তর দেবার আগেই পেছন থেকে মিঃ সিং বললেন, বিক্রম এককথায় শিবপদর প্রাণ বাঁচিয়ে দিয়েছে। বাঘ জানোয়ার হলেও ওদেরও মন আছে এটা আমাদের বিক্রম প্রমাণ করে দিল। নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।
শিবপদ খানিকটা সময় বসে থেকে ঘরে ফিরে চলল। বিক্রমকে দেখে, তাকে ছুঁয়ে তারও মন খুশিতে ভরে গেছে।
=======================
অঞ্জনা মজুমদার
এলোমেলো বাড়ি
চাঁদপুর পল্লি বাগান
পোঃ রাজবাড়ি কলোনী
কলকাতা ৭০০০৮১

