গল্প ।। প্রভু ভক্ত কানু কাকা ।। সমীর কুমার দত্ত

 Uploaded Image

প্রভু ভক্ত কানু কাকা 

 সমীর কুমার দত্ত 

 

কানাই  গিরি আমার প্রিয় কানু কাকা সেই ছোট বেলায় কৈশোরে এসেছিলো আমাদের জমিদার বাড়িতে। কৈশোর, যৌবন পার করে বার্ধক্যে এসেও ছুটি নিতে চায় না বরং তার জ্যেষ্ঠ সন্তান বলাইকে তার কাছে নিয়ে গিয়ে রাখতে চায়। বাপ ছেলের মধ্যে তফাৎ শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতায় আর পরিশ্রম করার ক্ষমতায়। কানু কাকা তখনকার সময় পাঠশালার গন্ডী পার করে আমাদের বাড়ি এসেছিলো আর বলাই স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। ওর কানু কাকার মতো পরিশ্রম করার মতো ক্ষমতা নেই। কানু কাকার ইচ্ছে ছিলো বলু ওরফে বলাইকে জমিদার বাড়িতে নিয়ে এসে হালকা কাজে  যেমন ফায় ফরমায়েশ খাটার কাজে লাগিয়ে দেওয়া যাতে জমিদার বাড়ির ছত্রছায়ায় থেকে কাজের সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়াটা চালিয়ে যেতে  পারে। তারপর একটা চাকরি পেলে , ওদের সংসার ওই দেখতে পারবে।কর্তাবাবুকে ছেড়ে ওর আর বাড়ি ফেরা হয়তো হবে না। ওর বয়স হচ্ছে। বাকি জীবনটা জমিদার বাড়িতে কাটিয়ে দেবে। জমিদার বাড়ি ওর কাছে নিজের বাড়ির মতো। কিন্তু  বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি।কারণ বড়ো ছেলে আর ও দুজনেই জমিদার বাড়িতে পড়ে থাকলে ওর স্ত্রীর অসুবিধে হবে। জমিদার বাড়িতে কাজ করে বিঘে খানেক জমি কিনেছে আমার ঠাকুরদা শরৎচন্দ্র দত্তের বদান্যতায়। স্ত্রী একা সামলে উঠতে পারবে না।

কানু কাকার কথা বলে শেষ করা যাবে না। কানু কাকার মতো লোক দুষ্প্রাপ্য। বর্তমানে আর্থ সামাজিক কাঠামোয় মানুষ এখন আত্মকেন্দ্রিক। কেউ কারো কথা ভাবে না। কানু কাকা নিজের সংসার ফেলে রেখে এসে দিনের পর দিন জমিদার বাড়ির সকলের সেবা করে গেছে। মাসেও একবার বাড়ি যায় নি পাছে কারো অসুবিধা হয়। ছেলে এসে মাসোহারা নিয়ে গেছে। আমাদের সংসারের মঙ্গল চেয়ে কখন‌ও এ সংসার ছেড়ে যাবার কথা ভাবে নি। সংসারের একজন মাতব্বর গোছের হয়ে উঠেছিলো শুধু মাত্র ওর দায়িত্বজ্ঞান, বিশ্বস্ততা আর  মনিবকে নিজের পিতৃতূল্য মনে করার গুণে। আমার ঠাকুরদা, ঠাকুমা, মা-বাবা, কাকা-কাকিমা আমরা সকলে কানু কাকার ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। কার কি দরকার সবটি ওর নখদর্পণে।বাড়ির সকলের জামাকাপড় কাচা থেকে শুরু করে শুকতে দিয়ে সেগুলো তোলা, গোটা বাড়ির ঝাঁটপোঁছ, ধান কাটা থেকে শুরু করে মরাইজাত করা পর্যন্ত সমস্ত কাজ দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করা, ঠাকুরদার তামাক সাজা থেকে ঠাকুমা , মা - কাকীদের পান দোক্তার জোগান দেওয়া সবেতেই নজর ছিলো কানু কাকার। সর্বশেষে ঠাকুরদা, ঠাকুমা শোবার আগে তাঁদের পায়ে গরম তেল মালিশ করা, কি নয়?


লোকটার রাগ বা ব্যাজার বলে কিছু ছিলো না। সংসারের কেউ কোন দুশ্চিন্তায় পড়লে কানু কাকা বলতো," ও কিছু চিন্তা করবেন না। ও আমি সামলে নেবো। সকলে কানু কাকার ওপরে নির্ভর করে নিশ্চিন্ত থাকতে পারতো। আমরা স্কুল যাবার সময় যদি জামাকাপড় নোংরা দেখতো তো বলতো," দাঁড়াও,জামায় নোংরা লেগে আছে। ওটা ছেড়ে অন্য একটা পরো। ওটা আমায় দাও,  আমি কেচে শুকতে দি। তবে কাল পোরে যেতে পারবে। জুতো চকচকে না থাকলে দৌড়ে গিয়ে ব্রাশ নিয়ে এসে ঘষে দিতো।

গ্রামে পড়ে থাকলে ছেলেপুলে সেরকম ভাবে মানুষ হবে না ভেবে  একদিন বাবা কাকারা চাকরি নিয়ে যে যার সংসার সহ ভিন রাজ্যে, কেউ কেউ প্রবাসে পাড়ি দিলেন। কেউই ঠাকুরদা ঠাকুমার কথা না ভেবে শুধু মাত্র কানু কাকার ওপর নির্ভর করে নিজেদের মতো করে গুছিয়ে নিয়ে এক এক করে সরে পড়লেন। বৃদ্ধ বৃদ্ধা অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে র‌ইলেন, মুখে কিছু বলতে পারলেন না। কিন্তু কানু কাকা তখন বাবা কাকাদের বলেছিলো, " দাদাবাবুরা আপনারা সকলে কর্তাবাবা ,কর্তা মাকে ফেলে রেখে চলে যাবেন। এটা কি ভালো হবে? এই বুড়ো বয়সে স্বজনদের দূরে রেখে এনারা কি ভালো থাকবেন?" অমনি ম্যানেজার বাবু গর্জে উঠলো। কর্তাবাবার ছেলেরা চলে গেলে ওনার সুবিধে হবে টাকা পয়সা, জায়গা - জমি এদিক ওদিক করতে। তাই কানু কাকার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, " এই তুই থাম। চাকর, চাকরের মতো থাক। বড়দের কথার মধ্যে নাক গলাচ্ছিস যে।"   তখন আর ঠাকুরদা চুপ করে থাকেন নি। প্রতিবাদ করে বললেন," চুপ করো তুমি। ‌ওকে চাকর বলার অধিকার তোমায় কে দিয়েছে? সে অর্থে তুমিও তো চাকর। আমি তোমাকে চাকর বলে ভাবি?" কানে হাত দিয়ে ম্যানেজার বাবু ক্ষমা চেয়ে বললো,"ভুল হয়েগেছে কর্তাবাবু। আর এমনটি হবে না।" ম্যানেজার লোকটা সুবিধের নয়। কানু কাকাকে একদম সহ্য করতে পারে না। 

ছেলে,বৌ , নাতি,নাতনিরা  চলে যাওয়ার ঠিক পরেই ঠাকুমা শশীমুখী দেবী শয‌্যা নিলেন। আর উঠলেন না। পরপারের ডাক এসে গেলো। চলে গেলেন জীবনসঙ্গীকে কানু কাকার হাতে ছেড়ে দিয়ে। কানু কাকা  মুখাগ্নি , হবিষ্যি ,অশৌচ পালন ক্ষৌরকর্ম ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠানাদির  মাধ্যমে ছেলের কাজ করে। ঠাকুরদা শোকে দুঃখে শয্যাশায়ী হলেন। কানু কাকাকে সদা সর্বদা তাঁর পাশে থাকতে হয়। কোনকিছু দেখার সময় পায় না। ঠাকুরদা বিকারগ্রস্ত হয়ে বলতে লাগলেন,"কানু তুই গতজন্মে আমাদের ছেলে ছিলি নিশ্চয়‌ই। সারাটা জীবন তোর সংসার ফেলে আমাদের জন্য করে গেলি। পরজন্মে যেন তোর মতো ছেলে পাই। ম্যানেজার বাবুকে বল উকিল বাবুকে খবর দিতে। এ বিষয় সম্পত্তি তোর নামে করে দিয়ে যাবো।" প্রতিবাদ করে কানু কাকা বলে, "কর্তা বাবা, আপনার পায়ে পড়ি, ও কাজটি আপনি করে আমাকে আর দোষের ভাগি করবেন না। আমি গরীব মানুষ, এসবের মর্ম বুঝিনা। এসব বিষয় নয় বিষ।" 
 একদিন ঠাকুরদা কানু কাকাকে বললেন,"জমিগুলো বিক্রির ব্যবস্থা কর। কেউ যখন থাকল‌ই না,এসব রেখে কি করবো। কে দেখবে? তোর তো আমাকে নিয়েই কেটে যায়। তোর দেখার সময় ক‌ই।" ঠাকুরদার কথা শুনে কানু কাকা বললো,"তাই তো দেখছি কর্তা বাবা, আমার অবর্তমানে সকলে কাজে ফাঁকি দিচ্ছে। ধান কেটে মাঠে ফেলে রেখেছে। যেটা না দেখবো সেটাই অব্যবস্থায় পড়ে থাকবে। এদিকে আপনাকে ছেড়ে যেতেই পারছি না। কর্তা বাবা, একদিকে আপনি ঠিকই বলেছেন—জমিজমা আর কার জন্যে। যাদের জিনিস তারাই যদি না ভাবলো তাহলে রেখে লাভ কি।"
— আমি মরে গেলে বিষয় সম্পত্তি বিক্রির টাকা সব  গ্রামের লোকেদের দান করে যাবো।
অর্থ ও হৃদয় থাকতেও যিনি ছিটে ফোঁটাও গ্রামবাসীদের দান করার কথা ভাবেন নি , তিনি নাকি ছেলেপুলে থাকা সত্ত্বেও বিষয় সম্পত্তি বিক্রির টাকা গ্রামবাসীদের দান করে যাবেন।
এটা ভাবলেও কষ্ট হয়।

মাঠে কর্মরত চাষিদের দিকে হাঁক পেড়ে কানুকাকা বললো, 
" হ্যাঁরে ধান সব কাটা হয়ে গেছে?"
—হয়ে এসেছে। আজ বোধহয় সব তোলা যাবে না। 
—যেটা না দেখবো। না দাঁড়ালে কাজ এগোয় না। আমি দেখছিস তো কর্তা বাবাকে ছেড়ে আসতে পারছি না। তোদের ওপর কিছুই ভরসা করা যায় না। যেটা না দেখবো, সেটা হবে না। কি যে করি। আমার হয়েছে জ্বালা!
ঠাকুরদা ভিতরে ভিতরে খুব ভেঙে পড়েছিলেন। দেখতে দেখতে ঠাকুরদা দেহ রাখলেন। চিঠি লিখে ছেলেদের খবর দেওয়া হলো। তাদের আসতে দেরি হবে। এদিকে বাসি মড়া ঘরে ফেলে রাখা যাবে না। ঠাকুরদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করলো কানু কাকা। ছেলের কাজ ‌ওই করলো। কাঁছা নেওয়া, হবিষ্যি করা সব‌ই কানু কাকা ছেলে হয়ে পালন করলো।  এর পরের দিনই আমরা যখন এসে পৌঁছুলাম তখন কানু কাকার ধূম জ্বর। জ্বরের ঘোরে বিকারগ্রস্ত কানু কাকা ভুল বকছিলো," আমাকে সবাই ছেড়ে চলে গেলো। এখন এই যক্ষের ধন আগলাতে পড়ে আছি। যতক্ষণ না এ বিষয় সম্পত্তির মালিকরা আসে, আমার মুক্তি নেই।" কথাগুলো বলতে বলতে সবকিছু থেমে গেলো চিরদিনের জন্য। বাড়ি তার ফেরা হলো না। সেই না ফেরার দেশে পৌঁছে গেলো আমার প্রিয় কানু কাকা। 

কানু কাকার মৃত্যুতে ভীষণ দুঃখ  পেয়েছিলাম। কারণ কানু কাকাকে আমাদের পরিবারের একজন বলে মনে করতাম। কানু কাকা আমাদের পরিবারের সঙ্গে এতোটাই একাত্ম হয়ে উঠেছিলো। ঠাকুরদা -ঠাকুমার একনিষ্ঠ অনুগামী হয়ে উঠেছিলো, আর তাই বুঝি ঠাকুরদা -ঠাকুমা চলে যাওয়ার পর পর‌ই কানু কাকা এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো নিজের পরিবারকে উপেক্ষা করে। চোখের সামনে একটা বৃহৎ সংসারকে ভেঙে যেতে দেখে ঠাকুরদা -ঠাকুমা যেমন সহ্য করতে পারেন নি, তেমনি কানু কাকাও সহ্য করতে পারে নি। তাই তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা সৎকার ঠাকুরদা -ঠাকুমার চিতার মধ্যস্থলে হোক এটা আমাদের পরিবারের সিদ্ধান্ত। সেই অনুযায়ী আমাদের গ্রামের দু-তিনটি গ্রামের পরে কানু কাকার ছেলে বলাই ও তার মাকে লোক দিয়ে ডেকে পাঠানো হলো।

বলাই ও তার মা যথা সময়ে এসে পৌঁছলে কানু কাকার সৎকার শুরু হয়ে গেলো। সৎকার হলো আমাদের গ্রামের শ্মশানে ঠাকুরদা -ঠাকুমার চিতার মধ্যস্থলে। সৎকার স্থলে ঠাকুরদা -ঠাকুমার মতো ছোট্ট একটা স্মৃতিবেদী তৈরি করে তাতে লিখে দেওয়া হলো—
"কর্তা বাবা ও কর্তা মায়ের একান্ত অনুগত পাত্র শ্রী কানাই গিরির পুন্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে :-"
এইভাবে আমাদের পরিবারের তরফ থেকে কানু কাকাকে সম্মান জানানো হয়। শ্রাদ্ধের ক্রিয়াকর্ম মিটে যাবার পর আমাদের পরিবারের তরফ থেকে কানু কাকার স্ত্রীকে পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। যার বর্তমান বাজার দর পাঁচ গুণ বেড়ে পঁচিশ হাজার টাকা। সমস্ত ক্রিয়াকর্ম মিটে গেলে বিশাল অট্টালিকা সম বাস্তুটুকু বাদে জমিজমা সব বিক্রয় করে দেওয়া হলো। অট্টালিকা সম বাস্তুটুকু রাখার উদ্দেশ্য মাঝে মধ্যে ছুটি কাটানোর জন্য আসা অর্থাৎ শিকড় ছিন্ন না করা। সুদিনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে এই সুবিশাল অট্টালিকা। তখন তালপুকুর নামেই, ঘটি ডুববে না আর।
=======================
 
Samir Kumar Dutta
Pune, Maharashtra

Uploaded Image

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad