ছোটগল্প ।। সন্তান ।। কাবেরী মিত্র

Uploaded Image 

  সন্তান

 কাবেরী মিত্র


চন্দনার আজকাল প্রায়ই মনে হয়, মা হয়ে সে যা করেছে, তা তো তার কর্তব্য ছিল। কিন্তু তাই বলে সন্তানের কি মায়ের প্রতি কোনও কর্তব্য থাকে না? সন্তান বড় হলে, অনেক শিক্ষিত হলে, মাকে কি ভুলে যেতে হয়? মায়ের অবদান কি একবারও মনে পড়ে না ছেলের? কী জানি, হয়তো সে নিজেই অতি সাধারণ মানুষ, অতশত বোঝে না। তবে এইটুকু চন্দনা ঠিকই বুঝেছে, ছেলের জীবনে মায়ের আর কোনও প্রয়োজন নেই।
চন্দনার স্বামী মারা যাওয়ার পর সে ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে মায়ের কাছে চলে এসেছিল। তখন তার বয়স খুবই কম। একা থাকলে হয়তো কিছু অসৎ মানুষের লালসার শিকার হতে হতো তাকে। তাই মায়ের কাছেই আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু তার মায়ের সংসারের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। সংসারের খরচ চালাতে চন্দনা তাদের পাড়ার কমলা দিদির কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বলে একটা কাজ জোগাড় করে দিতে অনুরোধ করেছিল।
কমলা দিদি দু-এক দিনের মধ্যেই চন্দনাকে দুটি বাড়িতে রান্নার কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে চন্দনা আরও কয়েকটি বাড়িতে কাজ নেয়। কারণ, তার একটাই স্বপ্ন—ছেলেকে অনেক শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করে তুলবে।
সেই স্বপ্ন নিয়েই ছেলের পাঁচ বছর বয়সে তাকে একটি স্কুলে ভর্তি করে দেয় চন্দনা। ছেলেও ছিল ভীষণ মেধাবী। প্রতি বছর পরীক্ষায় ভালো ফল করত। মাস্টারমশাইদের মুখে ছেলের প্রশংসা শুনে চন্দনার বুক গর্বে ভরে উঠত।
ছেলে যখন যা চাইত, চন্দনা যেভাবেই হোক তা এনে দেওয়ার চেষ্টা করত। যে বাড়িগুলোতে সে কাজ করত, সেই বাড়ির ছেলেমেয়েরা যেভাবে বড় হচ্ছে, তারও ইচ্ছে হতো নিজের ছেলেকে ঠিক সেভাবেই মানুষ করতে। তাই সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করত সে।
কমলা দিদি কতবার বলেছে, —এইভাবে ছেলেকে সব সময় মাথায় তুলিস না। ওকে তোর কষ্টটা বুঝতে দে। নইলে কোনও দিন তোর অভাব, তোর পরিশ্রম, কিছুই বুঝবে না।
কথাগুলো শুনে চন্দনার মনে মনে রাগ হতো। ভাবত, নিজের ছেলেটা তো পড়াশোনা করে না, সারাদিন খেলাধুলো করে বেড়ায়। তাই বুঝি আমার ছেলেকে নিয়ে এত হিংসে!
এরপর চন্দনার ছেলে খুব ভালো ফল করে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে কলেজে ভর্তি হলো। সেখানেও সে কলেজের সেরা ছাত্র। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখানকার পড়াশোনা শেষ করে একটি নামী কোম্পানিতে চাকরি পেল। চাকরি নিয়ে চলে গেল পুনেতে।
ছেলের এই বড় হয়ে ওঠার পিছনে চন্দনার যে কত অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল, তা সবাই দেখেছে। এমনকী যে বাড়িগুলোতে চন্দনা কাজ করত, সেই বাড়ির বউদিরাও জানতেন। শুধু যার জন্য এত কিছু, সেই ছেলে কোনও দিন মায়ের কষ্টের কথা ভেবে তাকে দুটো সান্ত্বনার কথাও বলেনি। বরং যখন যা প্রয়োজন হয়েছে, মাকে শুধু নির্দেশ দিয়েছে। মা কোথা থেকে কীভাবে সব জোগাড় করবে, তা একবারও ভাবেনি।
পুনেতে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম ছেলে প্রতিদিন একবার করে ফোন করত। পরে সেই ফোনের ব্যবধান বেড়ে সাত দিনে একবারে এসে দাঁড়াল।
এর প্রায় এক বছর পর একদিন ছেলে ফোন করে মাকে জানাল, —মা, আমি বিয়ে করছি। আমার সঙ্গে একই কোম্পানিতে কাজ করে মেয়েটি। ওর মা-বাবা আসবেন। আমরা রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করছি। পরে তোমাকে নিয়ে যাব।
সেদিন চন্দনা চুপচাপ ঘরে বসে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। কিন্তু মা তো! চোখের জল মুছে আবারও ছেলের আগামী দিনের সুখ ও মঙ্গল কামনা করেছিল।
বিয়ের প্রায় দুমাস পর ছেলে একাই এসে মাকে পুনেতে নিয়ে গেল।
ছেলের ফ্ল্যাটে ঢুকে চন্দনার চোখ যেন ছানাবড়া! সুন্দর সুন্দর আসবাবপত্র, সাজানো-গোছানো ঘর। দেখে তার খুব আনন্দ হচ্ছিল। মনে মনে ভাবছিল, বাবুদের বাড়িতে তো এমন সব জিনিস কত দেখেছি। কোনও দিন কি ভেবেছিলাম, একদিন আমার ছেলেও এমন সুন্দর করে নিজের ঘর সাজাবে!
ইচ্ছে হচ্ছিল কমলা দিদিকে, কাজের বাড়ির বউদিদের ডেকে এনে সব দেখায়।
ছেলের বাড়িতে কয়েকদিন বেশ আনন্দেই কাটছিল চন্দনার। কিন্তু একদিন দেখল, বাড়ির কাজের লোক আর আসছে না। ছেলে এসে মাকে বলল, —মা, এখানে কাজের লোক নিয়ে খুব ঝামেলা। যতদিন না নতুন লোক পাচ্ছি, তুমি একটু সামলে নাও না!
চন্দনা হাসিমুখেই রাজি হয়ে গেল। ছেলের সংসার, সেখানে কাজ করতে আবার কিসের অসুবিধা! নিজের হাতে বাড়ির সব কাজ করতে লাগল সে।
মাসখানেক পর একদিন ছেলের বাড়িতে পার্টির আয়োজন করা হলো। কিছু খাবার রেস্তোরাঁ থেকে এলেও মূল খাবারগুলো ছেলেই মাকে বলল, —মা, আজ তোমার হাতের সেই সুন্দর সুন্দর রান্নাগুলো কোরো। বন্ধুরা সবাই খেয়ে খুব খুশি হবে।
ছেলের কথা শুনে চন্দনাও মন দিয়ে রান্না করল। নিজের জানা সেরা পদগুলোই তৈরি করল সেদিন।
রাতে পার্টি শুরু হলে ছেলে ও বউমা এসে মাকে বলল, —মা, তুমি এই ঘর থেকে বেরিয়ো না। সবাই চলে গেলে তারপর বেরোবে।
চন্দনা অবাক হলেও কিছু বলল না। ঘরের ভিতরেই চুপচাপ বসে রইল।
পার্টি অনেক রাত পর্যন্ত চলল। অতিথিরা একে একে রান্নার প্রশংসা করতে লাগলেন।
একজন তো বলেই ফেললেন, —বাঃ! রান্নাগুলো তো অসাধারণ হয়েছে! আজ আমার খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে। আমার মা ঠিক এমনই সুন্দর রান্না করতেন।
চন্দনার ছেলে ও বউমা দুজনেই একটু হাসল। কিন্তু কেউ একবারও বলল না যে এই রান্না তার নিজের মা করেছেন।
বন্ধুটি আবার বললেন, —তোমাদের রান্নার লোকটিকে একদিনের জন্য আমার বাড়িতে ধার দিতে হবে। যেদিন আমার বাড়িতে পার্টি হবে, সেদিন ওঁকে আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেবে। যা পারিশ্রমিক লাগে, আমি দিয়ে দেব।
চন্দনার ছেলে-বউমা চুপ করে আছে দেখে বন্ধুটি আবার বললেন, —কী হলো? তোমাদের বুঝি মত নেই?
ছেলে ও বউমা দুজনেই বলে উঠল, —আরে না, না! তা কেন? তুমি যেদিন বলবে, পাঠিয়ে দেব।
চন্দনা দরজার আড়াল থেকে সব শুনছিল। সে ভেবেছিল, সবাই চলে গিয়েছে। তাই একটু জল খেতে ঘর থেকে বেরোচ্ছিল। কিন্তু এই কথাগুলো শুনে দরজার আড়ালেই থমকে দাঁড়াল।
অবাক হয়ে ভাবল, তার ছেলে একবারও বলল না, এই রান্না তার মা করেছে! কত সহজেই তাকে বাড়ির রান্নার লোক বানিয়ে দিল!
চন্দনার খুব অভিমান হলো। মনে মনে ভাবল, যদি রান্নার লোক হয়েই থাকতে হয়, তবে যাকে এত কষ্ট করে মানুষ করেছি, তার সংসারে কেন? বরং যাদের বাড়িতে এতদিন কাজ করেছি, সেই বাড়ির দাদা-বউদিদের কাছেই ফিরে যাব। অন্তত সেখানে কাজের বিনিময়ে সম্মানটুকু তো পাব।
কী পেলাম আর কী হারালাম! এই অসম্মানের মধ্যে পড়ে থাকার চেয়ে সম্মানের সঙ্গে পরিশ্রম করে খেয়ে বাঁচা অনেক ভালো।
হঠাৎ কমলা দিদির কথাগুলো মনে পড়ে গেল। কতবার নিষেধ করেছিল, ছেলেকে বাবুদের ছেলেদের মতো বড় করিস না। তোর কষ্টটা ওকে বুঝতে দে। কিন্তু সে শোনেনি। বরং কমলা দিদির ছেলেকে কত খারাপ ভেবেছে, শুধু পড়াশোনা করে না বলে।
অথচ সেই ছেলেটাই মায়ের বয়স হয়েছে বলে তাকে আর কাজ করতে দেয় না। মা, বউ, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে হাসিখুশিতে সংসার করে।
আর তার নিজের ছেলে? এত কষ্ট করে মানুষ করার পরও মায়ের পরিচয়টুকু দিতে লজ্জা পায়!
এরপর চন্দনা আর কিছুতেই পুনেতে ছেলের কাছে থাকতে চাইল না। অনেকটা জোর করেই ফিরে এল নিজের পুরোনো ঠিকানায়। আবারও কাজে যোগ দিল সেই পরিচিত বাড়িগুলোতে।
ছেলে দূরে থাকলেও তার অমঙ্গল কখনও কামনা করেনি চন্দনা। আজও মাঝে মাঝে দূর থেকে হাতজোড় করে ছেলের মঙ্গল কামনা করে।
হাজার হোক, মা তো!
সন্তান যেমনই হোক, মায়ের ভালোবাসা কি কখনও ফুরিয়ে যায়?
সেই তো প্রচলিত কথা—
"কুসন্তান যদিও হয়, কুমাতা কখনো নয়।"
--------------------------------
 
কাবেরী মিত্র 
কলকাতা.....১৩৬

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad