গল্প ।। আইস চকোলেট ।। নীলেশ লায়েক

 

আইস চকোলেট

নীলেশ লায়েক 



খেলার নিয়ম কানুন অনেক। বোলিং করতে হবে কাঁধের নিচে থেকে। ওয়ান ড্রপ ওয়ান হ্যান্ড ক্যাচ। সিক্স মারলে আউট। আর সবথেকে বড়ো নিয়ম, বল যে বাইরে পাঠাবে, নিয়ে আসতে হবে তাকেই।
একটা লোপ্পা বল, একটা ফাঁদ, একমুহূর্তের ভুল। বল চলে গেলো দেওয়াল ডিঙিয়ে স্কুলের ভেতর। গার্লস স্কুল। তারই লাগোয়া মাঠে আমাদের খেলা। এখন বিকেল, ছুটি। ব্যাট নামিয়ে দেওয়ালে চড়তে হয় আমাকেই। যাঃ!
"কি রে? নাম?"
"কত মেয়ে রে!"
"কোথায়? এখন তো ছুটি!"
"ওই তো। মাঠে। ক্যারাটে হচ্ছে।"
"সে হোক। তুই নাম। টুক করে বলটা নিয়ে আয়।"
ঝুপ। ক্যারাটে প্রাকটিস একটু দূরে। এদিকে কটা আম জামের গাছ, নিচে ঝোপঝাড়। মশা। ঝোপের ভেতর বল খুঁজতে লাগি। 
"পেলি?"
"দেখছি। দাঁড়া।"
"তাড়াতাড়ি।"
"অ্যাই! তুমি ওখানে কি করছো?"
এইরে! কার গলা? ধরা পড়ে গেলাম নাকি? সামনে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে। এখানে কেন? ওদের দলবল তো ওদিকে। হুই, হাই, হাইইযাহঃ! কে রে তুই? সাদা ড্রেস, কালো বেল্ট। ব্ল্যাকবেল্ট! সেরেছে।
"আমি, মানে, আমরা, ইয়ে..."
"অদিতি, কাম কুইক। ওখানে কী? ওটা আবার কে?" ক্যারাটে মাস্টারের গলা। "হ্যাং হিম। তাড়াতাড়ি এসো। বরফ গলে যাচ্ছে।"
মেয়েটা পেছন ফিরে দৌড় দিলো। অদিতি! মুখটা তাই চেনা চেনা। এ তো আমাদের পাড়াতেই থাকে, নতুন এসেছে। যখন স্কুল যায়, চোখে চশমা, জোড়া বিনুনি, স্কুলড্রেস। চশমা ছাড়া চিনতেই পারিনি। এখন পনিটেল বাঁধা, কপালে হেডব্যান্ড। 'বরফ গলে যাচ্ছে' মানে? 
কখন পায়ে পায়ে আমিও এগিয়ে গেছি দলটার কাছে। সবাই গোল করে ঘিরে দাঁড়িয়ে, মাঝখানে দু থাক ইটের ওপর একটা পেল্লায় বরফের ব্লক রাখা। স্যার একটা খুরপি নিয়ে ব্লকের মাঝে আড়াআড়ি দাগ কাটছেন। এক ইঞ্চি মত গর্ত করে লাইন টানা হলে একটা তোয়ালে পাট করে ওপরে পেতে দেওয়া হলো। পাশে অদিতি হাত পা ছোড়াছুড়ি করছে অদ্ভুত সব ভঙ্গিমায়। চারিদিকে গুনগুন, "পারবে? পারবে না। কি হবে? ধুর ধুর, হয় নাকি! মাথা ফেটে যাবে দেখবি।"
"সাইলেন্স।" স্যারের হুঙ্কার। "অদিতি, কাম ফরওয়ার্ড।"
সবাই চুপ। মেয়েটা বরফের চাঙড়ের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে। চোখ বন্ধ, জোড় হাত, যেন ধ্যান করছে। কন্সেন্ট্রেট। দশ সেকেন্ড, কুড়ি সেকেন্ড, তারপর চোখ খুললো। সামনে ঝুঁকে একবার স্যারকে, একবার চারপাশের সবাইকে, শেষে হয়তো বরফটাকেও প্রণাম করলো। তারপর, আমিই কি দেখলাম, নাকি সবাই দেখেছে, ওর মুখ চোখ কেমন পাল্টে গেলো নিমেষে। কয়েক সেকেন্ড কিছু অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি, একটা দুর্বোধ্য চিৎকার, আলোর বেগে মাথাটার নেমে আসা। কড়াৎ!

যখন বল নিয়ে বেরিয়ে এলাম ততক্ষনে খেলা চটকে গেছে। মাথা ঘেঁটে গেছে একদম। কি হলো? ঐটুকু মেয়ে, এতো জোর? স্যার বললেন, জোরটা বড়ো কথা নয়, টেকনিকটাই আসল। ট্রেনিং, অধ্যবসায়। বরফের ওপর দাগটা কেন? ওটাই তো উইক পয়েন্ট। পুরো আঘাতটা ওখানেই গিয়ে পড়বে, আর মচাৎ। চকোলেটে যেমন দাগ থাকে। ছাব্বিশে জানুয়ারীর প্যারেডে তো ক্যারাটে শো হবে। স্টেডিয়ামে। লাস্ট ইভেন্ট অদিতির আইস ব্রেকিং। ফাটাফাটি ব্যাপার হবে।  আর এক সপ্তাহ বাকি। 

সাতটা দিন, একটাই এজেন্ডা। খেলার মাঠে, স্কুলে। অদিতি। কে অদিতি? ওই মেয়েটা, ওই যে, নতুন এসেছে। আমার পাশের বাড়ি, ব্ল্যাকবেল্ট, জানিস, মাথা দিয়ে ঠুকে এই এতো বড়ো বরফ...
"ধুর, তাই হয় নাকি?"
"সত্যি। আমি দেখেছি।"
মাঠের পাশে ইঁটের পাঁজা। কারো বাড়ি হচ্ছে। সেই ইঁট দিয়েই আমাদের ক্রিকেটের উইকেট হয়। রোজ খেলার পর সেখান থেকে ইঁট নিয়ে ডেমো দেখাচ্ছি। এভাবে, বুঝলি, দুদিকে ইঁট, ওপরে এতো বড়ো বরফ, এক ফুট মোটা। বরফের অভাবে ইঁট দিয়েই ডেমো। মাথা ঠুকতে সাহস হয় না। কায়দা করে একদিন হাত চালাতেই হাত ফুলে ঢোল। দুমাদ্দুম লাথি। এক লাথিতেই ইঁট দু ভাগ। বুক ফুলে ডবল। আমিও কিছু কম নাকি? 

পাবলিসিটি কিছু কম করিনি কদিনে। প্রজাতন্ত্র দিবসে ভরা গ্যালারি। প্যারেড হচ্ছে। মাঠের পাশে ছেলেমেয়েদের দল, আলাদা আলাদা গ্রুপে অপেক্ষায়। রঙিন পোশাক, পতাকা, ওড়না, টুপি। গ্যালারিতে বন্ধুদের মাঝে বসে চোখ ঘুরতে থাকে মাঠের এ কোনা থেকে ও কোনা। 
ওই তো অদিতি। সাদা ক্যারাটের পোশাকে। দলের সাথে। 
একের পর এক গ্রুপের অনুষ্ঠান। ছোটদের নাচ, জিমন্যাসটিক্স। যোগা। ভারত সেবাশ্রম সংঘের ছাত্র আর সাধুদের লাঠিখেলা। তরোয়ালের খেলা।   হাততালির ঝড়। 
"ওই দ্যাখ, এবার।"
ক্যারাটের দল দৌড়োতে দৌড়োতে আর হাত নাড়তে নাড়তে গ্যালারির সামনে পজিশান নিয়েছে। মাঝে অদিতি। একটা ছোট ঠেলাগাড়িতে করে বরফের ব্লক নিয়ে আসা হলো মাঠে। ধরাধরি করে সাজানো হলো সামনে। তারপর হুইসিল। শো শুরু হলো।
"দেখলি? কত ভারী! ওটাকেই..."
স্টেপ বাই স্টেপ ড্রিলের পর কম্ব্যাট শো। একজনের সাথে চারজন। কিক। চপ। চারজন চারদিকে উড়ে যাওয়া আর নিপুন ভল্ট দিয়ে উঠে দাঁড়ানো। ক্লে টাইল কিক করে ভাঙা। সিঙ্গল টালি, জোড়া টালি। শেষে অদিতির ক্লাইম্যাক্স।
"এইবার..."
তোয়ালে ঢাকা বরফের চাঙড়ের সামনে ধ্যানমগ্ন অদিতি। গ্যালারিতে আমিও জোড় হাতে বসে। প্রার্থনা। সব যেন ঠিক হয় ভগবান। সেদিনের মতো।
একটা চিৎকার, আলোর বেগে নেমে আসা মাথা বরফ পাথরের ওপর। পাথর নির্বিকার। কি হলো? অদিতি কেমন অবাক মুখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। বাকিরাও বুঝতে পারছেনা কিছু। আমি ভোঁ মেরে গেছি। গ্যালারিও চুপ।
আবার চেষ্টা। নিষ্ফল। আবার। হচ্ছে না। কী অসহায় দেখাচ্ছে ওকে। গ্যালারির সহানুভূতি খুব দ্রুত সরে যাচ্ছে। হাততালি, চিৎকার, সিটি। হাসি,  বিদ্রুপ।
মাথা ছেড়ে কনুই দিয়ে চেষ্টা, হাতের ঘা। কোনো লাভ নেই। পাথর যে কে সেই। গ্যালারি ভরা উপহাস আর বিদ্রুপের ঢেউ। এদের আমি কীকরে বোঝাবো? ও তো পেরেছিলো। আমি দেখেছি। কে বিশ্বাস করবে? শুনবেই কে? 
চুপচাপ ক্যারাটের দল ফিরে যাচ্ছে। মাথা নিচু করে। শেষ হাততালি ছাড়াই। আমিও তো গ্যালারিতে, একা। আমিও কী হেরে যাচ্ছি না? এই সব হাসি আর টিটকিরি তো আমার জন্যও।
"কী রে? তোর অদিতি কী করলো? মাথায় বরফ লাগাতে বল।"

অনুষ্ঠান শেষ। গ্যালারি খালি হচ্ছে। মাঠে এদিক ওদিক এক দুজন বসে। হাতে টিফিনের প্যাকেট। এক কোনে মেয়েটা চুপচাপ বসে। এখনো চোখেমুখে কেমন অবিশ্বাস। কেন হলো এরকম? টিফিন প্যাকেট পাশে পড়ে আছে। আমি মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে ভাবছি। ঢুকবো? যাবো ওর কাছে? কী বলবো? কী বলতে হয় এখন? 
বরফটাও পড়ে আছে একপাশে। তোয়ালেটা নেই। বরফ গলেছে একটু একটু। আইস ইজ মেলটিং। কিন্তু ভাঙছে না তো। পারবো মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে? আমি জানি তুমি পারতে। আমি দেখেছি। যা বলার মনে মনেই বলি।
বরফের ব্লকের মাঝামাঝি চকোলেটের দাগ। উইক পয়েন্ট। বরফ ভাঙতো ওই লাইন বরাবর। কিন্তু...
দাগটা তো আড়াআড়ি নেই! কি জানি কার ভুলে লম্বালম্বি ভাবে আঁকা। ও বরফ কোনোদিনও ভাঙতো কী?

===================== 
Nilesh Kr Layek 
9234613360
38C professional flat
Kadma farm area
Jamshedpur 
831005

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad