শেষ চিঠির ওপারে
উৎপল সরকার
অরিন্দম আর মধুরিমার সংসারটা বাইরে থেকে দেখলে ঈর্ষা করার মতো। শহরের অভিজাত আবাসনে নিজেদের ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি, বিদেশে বেড়াতে যাওয়া—জীবনের প্রায় সমস্ত চাহিদাই পূরণ হয়েছিল তাদের। অরিন্দম একটি বহুজাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মধুরিমাও একটি নামী বিজ্ঞাপনী সংস্থার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। ব্যস্ততার মধ্যেও দুজনের জন্য আলাদা সময় রাখার চেষ্টা করত তারা।
তবে সুখের ছবির পেছনে যে অদৃশ্য ফাটল তৈরি হচ্ছিল, তা কেউ বুঝতে পারেনি।
বিয়ের আট বছর পর অরিন্দমের মনে হয়েছিল, মধুরিমা যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। ফোনে অকারণ ব্যস্ততা, মাঝরাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা, সামান্য প্রশ্নেই বিরক্ত হয়ে ওঠা—সবকিছুই তার চোখ এড়ায়নি। প্রথমদিকে সন্দেহকে প্রশ্রয় দিতে চায়নি অরিন্দম। নিজেকে বোঝাত, কাজের চাপেই হয়তো এমন হচ্ছে।
কিন্তু এক শুক্রবার রাতে সেই বিশ্বাসের ভিতটা ভেঙে গেল।
মধুরিমা সেদিন তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা তার ল্যাপটপে একটি মেসেজ ভেসে উঠল। অরিন্দম প্রথমে চোখ সরিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠা একটি বাক্য তাকে থামিয়ে দিল।
“গত রাতটা ভুলতে পারছি না। আবার কবে দেখা হবে?”
প্রেরকের নাম—সৌম্য।
অরিন্দমের পরিচিত মানুষ। মধুরিমার অফিসের সহকর্মী। একাধিকবার তাদের বাড়িতে এসেছে। একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছে। অরিন্দম তাকে বন্ধু বলেই বিশ্বাস করেছিল।
সেদিন রাতে মধুরিমা বাড়ি ফিরলে অরিন্দম কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। স্বাভাবিকভাবে খাবার পরিবেশন করেছে, গল্প করেছে, এমনকি ঘুমানোর আগে মধুরিমার কপালে চুমুও এঁকে দিয়েছে।
কিন্তু সেই রাতেই তার ভেতরে অন্য এক মানুষের জন্ম হয়েছিল।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ অরিন্দম নীরবে সমস্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ করল। সন্দেহ আর অনুমানের জায়গায় জমা হতে লাগল একের পর এক প্রমাণ। অবশেষে সে নিশ্চিত হলো, সৌম্য ও মধুরিমার সম্পর্ক অনেক দিনের।
একদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে মধুরিমা বলল, “আজ ফিরতে দেরি হবে। একটা জরুরি মিটিং আছে।”
অরিন্দম হাসল। বলল, “ঠিক আছে। নিজের খেয়াল রেখো।”
সেদিন রাতে সৌম্য আর বাড়ি ফেরেনি।
পরদিন তার পরিবার থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করল। ফোন বন্ধ। অফিসে অনুপস্থিত। পরিচিতদের কেউ তার খোঁজ জানে না।
অরিন্দম খবরটা সংবাদপত্রে পড়ে চুপচাপ চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।
মধুরিমা তখন অস্থির। কয়েক দিন ধরে সে ঠিকমতো খাচ্ছে না, ঘুমোচ্ছে না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠছে। অরিন্দম তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে।
এক রাতে মধুরিমা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
কাঁদতে কাঁদতে বলল, “অরিন্দম, তোমার কাছে একটা সত্যি কথা বলার আছে।”
অরিন্দম বই বন্ধ করে তার দিকে তাকাল।
“বল।”
“সৌম্যর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। অনেক দিন ধরে। আমি জানি, তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কখনও ভাবিনি।”
কথাগুলো বলতে বলতে মধুরিমা মেঝেতে বসে পড়ল।
“তুমি আমাকে ঘৃণা করো। শাস্তি দাও। কিন্তু প্লিজ, আমাকে একা ছেড়ে যেও না। সৌম্য কোথায়, আমি জানি না। ওর কিছু হয়ে গেল না তো?”
অরিন্দম কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে বসে পড়ল।
“মানুষ ভুল করে, মধুরিমা। সব ভুলের জন্য সংসার ভেঙে দিতে হয় না।”
মধুরিমা বিস্মিত চোখে তাকাল।
“তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”
“হয়তো পারব। তবে একটা কথা মনে রেখো, বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে আগের মতো হতে সময় লাগে।”
মধুরিমা তার হাত দুটো শক্ত করে ধরে কেঁদে ফেলল।
সেই রাতের পর অরিন্দমের আচরণে কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। বরং সে আরও যত্নশীল হয়ে উঠল। মধুরিমার পছন্দের খাবার আনত, অফিস থেকে ফেরার সময় ফুল নিয়ে আসত। মাঝেমধ্যে দুজনে পুরোনো দিনের মতো বেড়াতেও যেত।
মধুরিমা ভাবতে শুরু করল, হয়তো সত্যিই অরিন্দম তাকে ক্ষমা করেছে।
কিন্তু তার অজান্তে বাড়ির একটি ঘর তখন অদ্ভুত নীরবতার সাক্ষী হয়ে ছিল। অরিন্দম সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাত। পুরোনো কাগজপত্র, কয়েকটি ছবি এবং একটি ছোট ডায়েরি নিয়ে সে কী যেন লিখত।
একদিন ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে মধুরিমা ডায়েরিটি খুঁজে পেল।
প্রথম পাতায় লেখা—
‘মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ কাউকে আঘাত করা নয়। তাকে তার নিজের অপরাধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া।’
পরের পাতাগুলোয় ছিল কিছু তারিখ, কয়েকটি ফোন নম্বর এবং সৌম্যর নাম।
মধুরিমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে ডায়েরি বন্ধ করে যথাস্থানে রেখে দিল। কিন্তু সেদিন থেকে অরিন্দমের প্রতিটি হাসি, প্রতিটি স্নেহের স্পর্শ তার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠল।
কয়েক দিন পর অরিন্দম জানাল, তাকে তিন দিনের জন্য কলকাতার বাইরে যেতে হবে।
মধুরিমা মাথা নাড়ল।
অরিন্দম বেরিয়ে যাওয়ার পর সে আবার সেই ঘরে ঢুকল। আলমারির নিচের তাকে একটি খাম পেল। খামের ভেতরে ছিল সৌম্যর লেখা একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
‘মধু, তোমাকে একটা কথা জানানো দরকার। অরিন্দম সব জানে। শুধু আমাদের সম্পর্ক নয়, তোমার নামে যে আর্থিক লেনদেনগুলো হয়েছে, সেগুলোর কথাও। আমি ভুল করেছি। কিন্তু তোমাকে একটা বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যেতে চাইনি। যদি কখনও এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছয়, বুঝবে, সত্যিটা আর বেশিদিন চাপা থাকবে না।’
চিঠির নিচে কোনও তারিখ ছিল না।
মধুরিমা বুঝতে পারছিল না, অরিন্দম আসলে কী জানে। আর সৌম্য কোথায়?
সেদিন সন্ধ্যায় অরিন্দমকে ফোন করল সে।
“তুমি কোথায়?”
“হোটেলে। কেন?”
“তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।”
“ফিরে এসে বলব।”
“না, আজই বলতে হবে। তুমি সৌম্যর ব্যাপারে কী জানো?”
ফোনের ওপারে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর অরিন্দম বলল, “সত্যিটা জানতে চাও?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় বাড়িতে থেকো। একজন আসবেন। তাঁর কাছেই সব উত্তর পাবে।”
পরদিন বিকেল পাঁচটায় দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
মধুরিমা দরজা খুলে দেখল, সামনে একজন পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সঙ্গে অরিন্দমও।
অফিসার ঘরে ঢুকে একটি ফাইল টেবিলের ওপর রাখলেন।
“মিসেস মধুরিমা, সৌম্যর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। তাঁর সঙ্গে আপনার আর্থিক লেনদেন এবং কয়েকটি নথিতে আপনার স্বাক্ষর রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের প্রয়োজন।”
মধুরিমার মাথা ঘুরে গেল।
অরিন্দম শান্ত গলায় বলল, “তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি। সৌম্য নিখোঁজ হওয়ার আগে আমার কাছে এসেছিল। সে তোমার নামে কিছু আর্থিক জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছিল। আমাকে সব জানিয়েছিল। তারপর থেকেই সে নিখোঁজ।”
মধুরিমা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি জানো ও কোথায়?”
অরিন্দম জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “না। তবে আমি চাই, সত্যিটা সামনে আসুক।”
পুলিশ অফিসার ফাইল খুলে কয়েকটি কাগজ বের করলেন। সেগুলোতে মধুরিমার স্বাক্ষর ছিল। তার নামে নেওয়া ঋণের নথি, জাল অনুমতিপত্র এবং কিছু গোপন লেনদেনের হিসাব।
মধুরিমা এবার বুঝতে পারল, তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতার পাশাপাশি আরও বড় একটি সত্য প্রকাশ্যে আসতে চলেছে।
পুলিশ চলে যাওয়ার পর সে অরিন্দমের সামনে দাঁড়াল।
“তুমি এতদিন সব জেনেও আমার সঙ্গে এমন স্বাভাবিক আচরণ করলে কেন?”
অরিন্দম মৃদু হাসল।
“কারণ আমি চাইনি তুমি ভয়ে পালিয়ে যাও। আমি চেয়েছিলাম, একদিন তুমি নিজেই নিজের সত্যিটা স্বীকার করো।”
“তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না আর?”
অরিন্দম কোনও উত্তর দিল না। শুধু টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি সাদা খাম বের করে তার হাতে দিল।
“এটা তোমার জন্য।”
খামের ভেতরে ছিল বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ এবং একটি ছোট চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
‘মধুরিমা, তোমাকে হারানোর ভয়েই একসময় তোমার সব ভুল ক্ষমা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝেছি, ক্ষমা আর আত্মসমর্পণ এক জিনিস নয়। ভালোবাসা মানে নিজের আত্মসম্মানকে প্রতিদিন হত্যা করা নয়। তুমি তোমার পথ বেছে নিয়েছ, আমিও আমার পথ বেছে নিলাম। তোমার প্রতি কোনও ঘৃণা নেই। শুধু আর কোনও প্রত্যাশা নেই।’
চিঠিটি পড়ে মধুরিমা নির্বাক হয়ে গেল।
জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। শহরের আলো একে একে জ্বলে উঠছে। অথচ তাদের সাজানো সংসারের সমস্ত আলো যেন নিভে গেছে।
অরিন্দম দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকাল।
মধুরিমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে এতদিনের ক্ষমা?”
অরিন্দম থেমে গেল।
“ক্ষমা করেছিলাম বলেই আজ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু ক্ষমা করেছি বলে আবার আগের জীবনে ফিরতে হবে, এমন কোনও কথা নেই।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
সেই রাতে মধুরিমা প্রথমবার বুঝল, কিছু সম্পর্কের মৃত্যু হয় বিচ্ছেদের দিনে নয়, বিশ্বাস ভাঙার প্রথম মুহূর্তেই।
আর অরিন্দম বুঝেছিল, প্রতিশোধের চেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের ভেতরের ভাঙা মানুষটাকে আবার নতুন করে গড়ে তোলা।
কিন্তু সৌম্যর নিখোঁজ হওয়ার রহস্য তখনও অমীমাংসিত।
ডায়েরির শেষ পাতায় অরিন্দমের লেখা একটি বাক্য রয়ে গিয়েছিল—
‘সবাই ভাবে, আমি তাকে ক্ষমা করেছি। অথচ কেউ জানে না, সেই রাতেই আমি আমাদের সম্পর্কের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছি।’
==================
লেখায়--- উৎপল সরকার
নিউটাউন, জেলা আলিপুরদুয়ার
স্বাস্থ্য দপ্তরে কর্মসূত্রে শিলিগুড়ির বাসিন্দা
যোগাযোগ:-৭০০১২৯৭৪৫৯

