গল্প ।। বিবেকের দংশন ।। মিঠুন মুখার্জী

 

 বিবেকের দংশন 

মিঠুন মুখার্জী 


ষষ্ঠীর সকালে মণ্ডপে গিয়ে নিধি দেখে, মা দুর্গার জায়গায় দাঁড়িয়ে অন্য কেউ। সবাই দিব্যি প্রণাম করছে। শুধু সে আর সেন জেঠু হাঁ করে তাকিয়ে। জেঠু চুপিচুপি বললেন,'চুপ...!দেখি,কী হয়!' মিনিট খানিক পর সবাই চোখ খুলে সেই ছোট্ট মেয়েটিকে মা বলে সম্বোধন করে। নিধি ও সেন জেঠু সকলের হাফভাব আরও বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখতে লাগলেন। কেউ কেউ উঠে গিয়ে ছোট্ট মেয়েটির পায়ে প্রণাম করছে, কেউ আবার পায়ের কাছে শুয়ে পড়ছে, কেউ তার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, আবার কেউ মিষ্টি হাতে নিয়ে সেই মেয়েটির মুখে পুরে দিচ্ছে। কারো কারো চোখে জল দেখে নিধি ও তার সেন জেঠু ভাবেন -- "এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে মানুষ এখনো এতো বোকা আছে!! ঈশ্বর ভক্তি  আজ যেখানে মানুষের মধ্যে  দেখা যায় না, সেখানে একটা ছোট্ট মেয়েকে মা দুর্গা হিসাবে ধরে নিয়ে ভক্তি রসের ধারা এভাবে বয়ে যাচ্ছে!!" সেন জেঠু হঠাৎ দেখেন সেই মেয়েটি মা দুর্গার মূর্তির সঙ্গে বিলীন হয়ে গেল। মূর্তির মুখের দিকে তাকিয়ে সেন জেঠু হঠাৎ নিধিকে দেখতে পান। তার পাশ থেকে নিধি অদৃশ্য হয়ে যায়। তিনি দেখেন দুর্গা মূর্তির সামনে থেকে ভক্তরা হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যান। মা দুর্গার সামনে তিনি একা দাঁড়িয়ে আছেন।" তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। দুটো চোখ হাত দিয়ে ভালোভাবে ডলে মায়ের মুখের দিকে তাকান। হঠাৎ মহিমাকে দেখতে পান মা দুর্গার জায়গায়। মহিমা‌ তার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে আর বলছে --- "আমাকে ভুলে যাচ্ছ মামা!! তোমার লালসার শিকার বানিয়েছিলে আমাকে। কি দোষ ছিল আমার। নারীদের তোমরা মায়ের জাত বলে থাক। আবার সেই নারীদেরকেই ভোগের পন্য করে তোল। তোমাদের মতো রাজনৈতিক নেতাদের লজ্জা-ঘৃণা-ভয় কিছুই নেই। তোমরা টাকার জন্য নিজের মেয়ে- বোনদেরও ছেড়ে দাও না।" 
         সেন জেঠুর পুরো নাম শংকর সেন। নিউ ব্যারাকপুর স্টেশনের কাছে বাড়ি। গিরগিটির রং বদলাবার কিংবা বারংবার জামা বদলাবার মতো শংকর সেন রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করেন। এককথায় সুযোগ সন্ধানী। জীবনে অনেক মেয়ের সর্বনাশ করেছেন তিনি। রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকায় কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস করেন নি। তবে একটি মেয়ে তার দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার পর মুখ খোলার ভয়তে অকালে ইহলোক ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। মহিমা চৌধুরী। গরীব ঘরের অসহায় মেয়ে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা অন্যের বাড়ি কাজ করে তাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। বি.এস সি কমপ্লিট করে স্থানীয় কলেজের গেস্ট লেকচার হওয়ার জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছিল। ইন্টারভিউ দেওয়ার কয়েকদিন পর মহিমাকে লোক দিয়ে শংকর সেন কলেজের পাশে একটা বাড়িতে ডাকেন। বলেন --- "খুব দরকারী কথা আছে, না আসলে কলেজের গেস্ট লেকচারের চাকরিটা তার হাতছাড়া হয়ে যাবে।" চাকরিটা সংসার চালাতে খুবই প্রয়োজন ছিল। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই রাত আটটা নাগাদ শংকর সেনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল মহিমা। ঘরে ঢোকার পর বাইরে থেকে কেউ যেন দরজাটা দিয়ে দিয়েছিল। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল মহিমা। সে দেখে ঘরের একটা চেয়ারে শংকর সেন বসে বসে তার ডকুমেন্ট দেখছে। সে মহিমাকে বলে --- " এসো মহিমা, ভয় পাচ্ছ কেন? আমি কি বাঘ না ভাল্লুক। আমার পাশে এসে বসো।" যৌবনে পরিপূর্ণ মহিমা এবার ভয়তে একটু কাঁপতে থাকে। ভয়ে ভয়ে বলে--- " আমাকে আপনি এতো রাতে এই বাড়িতে ডেকেছেন কেন? তাছাড়া আমি ঘরে ঢোকার পর বাইরে থেকে দরজাটা দিয়ে দেওয়া হল কেন?" মহিমার কথা শুনে একটু শয়তানি হাসি হেসে শংকর সেন বলেন --- " এই কলেজে আমার অনুমতি ছাড়া গেস্ট লেকচার হিসাবে কারোকে নেওয়া হয় না। আমি চাইলে তোমাকে চাকরিটা দিয়ে খুশি করতে পারি, তার বদলে তোমায় আমাকে একটু খুশি করতে হবে। বড় হয়েছ বুঝতেই পারছ আমি কি বলতে চাইছি।" শংকর সেনের কথা শুনে খুবই খারাপ লাগে মহিমার। শংকর সেনের ইঙ্গিত তার বুঝতে আর বাকি থাকে না। তার দুচোখে জল দেখা যায়। সে বলে-- " আমার চাকরি লাগবে না মামা। দরজাটা বাইরে থেকে খুলে দিতে বলুন। আমি বাড়ি যাব। আমরা গরীব হতে পারি কিন্তু সতীত্ব বিক্রি করে চাকরি করতে পারব না।" এরপর দরজার উপর করাঘাত করে মহিমা। এদিকে শংকর সেন যখন দেখে সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না তখন সে গায়ের জোর প্রয়োগ করে। মহিমাকে পেছন থেকে যাবটে ধরে নিয়ে গিয়ে খাটে ছুঁড়ে ফেলে। মহিমা বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করতে লাগে। কিন্তু ঘরের সমস্ত দরজা- জানালা বন্ধ থাকায় বাইরে তার গলার আওয়াজ পৌঁছায় না। অনেকক্ষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়। বয়স হলেও শংকর সেনের গায়ে ছিল পশুর মতো শক্তি। তাছাড়া পেটে একটু জল পড়েছিল। মহিমার হাত ও পা দুটো একপ্রকার বলপ্রয়োগ করে খাটের সঙ্গে বেঁধে ফেলেন। তারপর একে একে জামা প্যান্ট খুলে একেবারে বিবস্ত্র করে দেয়। মহিমার মুখে কাপড় পুরে দেয় যাতে চিৎকার করতে না পারে। তারপর মহিমার গোপন জায়গা গুলো কামড়ে ধরে। পাশবিক অত্যাচার না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। সারারাত বারংবার ধর্ষণ করে মহিমাকে। তার গোপনাঙ্গকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। যন্ত্রনায় ছটফট করে সে। যখন ভোর চারটে বাজে তখন ঘরে প্রবেশ করে আরও পাঁচজন যুবক। একঘন্টা ধরে একের পর এক গনধর্ষণ করে মহিমাকে। দুচোখের কোনে জল গড়িয়ে পড়ে মহিমার। অপরাধের প্রমাণ লোপাট করার জন্য বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাস রোধ করে মেরেছিল মহিমাকে। গাড়ির ডিকিতে করে নিয়ে গিয়ে কবর দিয়েছিল। ক্ষমতার বলে ফাইল চাপা পড়ে গিয়েছিল।
কি দোষ ছিল গরীব মহিমার? একটা সামান্য চাকরিই তো চেয়েছিল যোগ্যতার বিচারে। তার পরিনতি এমন হওয়াটা কি ঠিক!! এই মহিমার মতো হাজার হাজার মেয়েরা শংকর সেনদের মতো মানুষদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিমুহূর্তে। নিধি শংকর সেনের ভাইজি ছিল। তারও জীবনের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। নরপিশাচরা সম্পর্ক দেখে না, খোঁজে কচি মেয়ের যৌবনভরা দেহ। নিধির বাবা গৌতম সেন শংকর সেনকে পছন্দ করেন না। তার স্বভাব সম্পর্কে সে পুরোপুরি অবগত। মেয়েকে জেঠুর ধারেকাছে ঘেঁষতে বারণ করেছে। কিন্তু ছোট্ট নিধির জেঠুকেই খুব পছন্দ। তাই সঙ্গে সঙ্গেই থাকে সবসময়। ষষ্ঠীর দিন যখনি মা দুর্গার মুখ দেখেছেন শংকর সেন তখনি মহিমা ও নিধির মুখ ভেসে উঠেছে। নিজের মেয়ের তুল্য মহিমার সঙ্গে তিনি যা করেছেন তা ঘোর অপরাধ। তিনি ভাবেন, "নিধির সঙ্গে কেউ যদি এমন করে তাহলে তাদের পরিবারের প্রতিটি মানুষের মনের অবস্থা কেমন হবে!! গরীব বলে মহিমার মতো মেয়েদের সম্মানের কি কোনো মূল্য নেই!!" শংকর সেনের বিবেক তাকে দংশন করতে থাকে। তিনি হঠাৎ মা দুর্গার সামনে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন --- " মা তুই আমায় ক্ষমা কর মা। ক্ষমতার দম্ভে বহু নারীর সর্বনাশ করেছি আমি। কত মানুষের প্রিয়জনকে কেড়ে নিয়েছি। আমায় তুই শাস্তি দে মা। আমাকে মুক্তি দে। এই পাপের বোঝা নিয়ে আমি আর বাঁচতে চাই না।" তার কান্না শুনে অনতিদূরে থাকা নিধি ছুটে এসে শংকর সেনকে বলেন--- " কি হয়েছে তোমার জেঠু? তুমি কাঁদছ কেন?" নিধিকে দেখে তিনি বুঝতে পারেন পরের ক্ষতি করলে একদিন নিজেরও ক্ষতি হয়। নিধির সঙ্গে যদি তার মতো অত্যাচার কেউ করে।
পরদিন সকালে বাড়ির কারোকে কিছু না বলে শংকর সেন পুলিশ স্টেশনে যান। তাকে দেখে পুলিশ স্টেশনের সকলে উঠে দাঁড়ান। এযাবত তার কৃতকর্মের জন্য তিনি লজ্জিত বলে জানান। তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। মহিমা ও মহিমার মতো মেয়েদের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচার ও খুনের অপরাধে বিচারক শংকর সেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। আত্মসমর্পণ করার জন্য মৃত্যুদণ্ড দেন না বিচারক। জেলের মধ্যে থেকে প্রতি রাত্রে নিজের বিগত পাশবিক আচরণের জন্য চিৎকার করে কান্না করতেন শংকর সেন। একদিন নিজের মানসিক দ্বন্দ্ব সহ্য করতে না পেরে জেলের মধ্যে আত্মহত্যা করেন তিনি। বিবেকের দংশন এমনি হয়। আত্মহত্যা করার মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিধি, মহিমা ও মহিমাদের মতো মেয়েদের মুখশ্রী। প্রতিটি নারীর মধ্যে দেবী দুর্গাকে দেখতে পান তিনি।

================== 

মিঠুন মুখার্জী
C/O-- গোবিন্দ মুখার্জী
গ্ৰাম : নবজীবন পল্লী
পোস্ট+থানা -- গোবরডাঙা
জেলা -- উত্তর ২৪ পরগণা
পিন-- 743252

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad