গল্প।। পুজোর প্রাপ্তি ।। সুচন্দ্রা বসু



পুজোর প্রাপ্তি 

সুচন্দ্রা বসু 


রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। নিজেদের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুই বন্ধু। পুজোর মরশুম শেষ হয়েছে। চারদিকে বিসর্জনের পরের নিস্তব্ধতা। এমন সময় বিমল বলল,
— জানিস শ্যামল একটা ঘটনা  এখনও চোখের সামনে ভাসছে। 
শ্যামল  বলল, — কী ঘটনা? 
— ঢাকির ছোট্ট ছেলেকে দেখেছিলাম পুজোমণ্ডপে। বয়স আট-নয় বছর হবে। ছেলেটা হাঁটতে পারে না। কথা বলতে পারে, কিন্তু খুব জড়িয়ে যায়।  ঢাকি ছেলেটির  সঙ্গে তার মাকেও নিয়ে এসেছিল। মায়ের কোলে বা চেয়ারে বসেই ছেলেটি পুজোর দিনগুলো কাটাত।
শ্যামল বলল, — ছেলেটাকে পুজোমণ্ডপে আমিও দেখেছি। 
— বিমল বলল,প্রথম দিন মন্ডপের ডানদিকে বাঁশের খুঁটির পাশে একটা চেয়ারে বসেছিল। মাথাটা একদিকে হেলে পড়ছে, চোখে ঘুম। জামাকাপড় পরিষ্কার হলেও বেশ মলিন। চারদিকে কত ঝলমলে পোশাক, কত হাসি, কত আনন্দ! তার মধ্যে ছেলেটাকে কেমন যেন আলাদা লাগছিল। আমি পাশে একটা চেয়ার টেনে বসতেই ও গুটিয়ে গেল।
— হয়তো আমাকে দেখে ভয় পেয়েছিল।
কিছুক্ষণ পর আরতির সময় হল। ঢাকিরা ঢাক কাঁধে তুলে নিল। হঠাৎ একটা গলা শুনলাম, “আয় রে গণশা, এদিকে আয়!”
— ছেলেটা যেন মুহূর্তে বদলে গেল। চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। তার মা তাকে কোলে তুলে ঢাকিদের কাছে নিয়ে গেল। তারপর যা দেখলাম, তাতে অবাক হয়ে গেলাম। চেয়ারে বসে ঢাকের তালে তালে ছেলেটা কাঁসর বাজাতে শুরু করল।  কী জোরে বাজাচ্ছে! একটু আগেও যে ছেলেটা ঘুমে ঢুলছিল, সে আরতির শেষ পর্যন্ত একটানা কাঁসর বাজিয়ে গেল।
শ্যামল বলল, — বাহ! ছেলেটার তালজ্ঞান আছে।
— হ্যাঁ রে, আরতি শেষ হলে ওর মা একটা চেয়ার টেনে  ছেলেটার পাশে বসল। আমি কিছু টাকা এগিয়ে দিতেই মহিলা দুহাত জোড় করে প্রণাম করল। তারপর নিজেই বলল, “ছেলেটোর সঙ্গে মুকে লিয়ে আইল ওর বাবা। ঘরে থাকলে তো সারাদিন উকে নিয়ে  থাকি। কষ্ট করে যা রান্ধি তাই খায়। এখানে অন্তত ভোগের খিচুড়ি, ফলমূল, মিষ্টি খেতে পারছি। আর ঢাকের তালে কাঁসর বাজাতেও শিখছে।”
শ্যামল মন দিয়ে শুনছিল।
বিমল আবার বলল, — তারপর ঢাকির সাথে  কথা হল। বলল, “ঘরে থাকলে ছেলেটা সারাক্ষণ কত কথা কয়, কত প্রশ্ন করে। আমরা মাঝে মাঝে বিরক্ত হই। শহরে এসে দেখি, রোজগারপাতি করাই কঠিন। যাদের পয়সা আছে, তাদের আরও পয়সা হচ্ছে। গরিবের অবস্থার বদল হয় না। তাই ভাবি, ঢাকের কাঠিটা শিখে  যদি ওর পেটের ভাত নিজে জোগাতে পারে !”
শ্যামল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। — বাবার কথায় অসহায়তা আছে। ছেলেটার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাও আছে। কিন্তু ওর নিজের ইচ্ছেটা কী, সেটা কি কেউ জানতে চেয়েছে?
— আমিও সেই কথাই ভাবছিলাম। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন পুজোমণ্ডপে গিয়েছি। ছেলেটার চোখ দুটো বড় মায়াবী। অষ্টমীর দিন কিছু চিপস, চকলেট আর শুকনো ফল একটা ব্যাগে ভরে ওকে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম খুব খুশি হবে। কিন্তু ও ব্যাগ খুলে দেখল, তারপর চুপচাপ পাশে রেখে দিল। মুখে কোনও হাসি নেই।
— সব শিশুর আনন্দের প্রকাশ একরকম হয় না। 
— কিন্তু রাতে বাড়ি ফিরে মনটা খারাপ হয়ে রইল। পরদিন বাজারে গিয়ে ওর মাপ অনুযায়ী একটা গেঞ্জি-প্যান্ট কিনলাম। নবমীর দিন আবার গেলাম। ছেলেটা মায়ের পাশে বসেছিল। নতুন জামাটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, “আজ নবমী। এই জামাটা পরে ঠাকুরের সামনে কাঁসর বাজিয়ো কেমন?”
বিমল  তারপর বলল, — ছেলেটা জামাটা নিল ঠিকই, কিন্তু মুখে হাসি ফুটল না। 
— তবে ওই ঢাকির ছেলেটাকে দেখে নিজের ছেলের কথা মনে পড়ছিল। তাই হয়তো ওর মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য এত চেষ্টা করছিলাম। দশমীর দিনও দেখলাম, বাবা-ছেলে পাশাপাশি। ছেলেটা কাঁসর বাজাচ্ছে, আর ওর বাবা ঢাক বাজাতে বাজাতে গাইছে, “ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন!” মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, দেবীরও যেন বিদায় নিতে কষ্ট হচ্ছে।
শ্যামল বলল, — তারপর?
— একাদশীর দিন সকালে বারান্দা থেকে দেখি, মা-ছেলেকে কোলে নিয়ে  আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ছেলেটা কাঁসর বাজছে, তবে ওর বাবা সেদিন ঢাক বাজাচ্ছিল ধীরে ধীরে। আমি ছুটে নিচে নেমে গেট খুললাম। ওদের ভেতরে ডাকলাম। আমার বেশ কিছু পুরোনো জামা আলমারিতে পড়েছিল। সেগুলো একটা ব্যাগে ভরে দিলাম।  মনে পড়ল, বাবানের (অন্বয়ের) নতুন স্কুলব্যাগ আর টিফিন বক্স রয়েছে। দুটো ব্যাগ, নতুন টিফিন বক্স ছেলেটার হাতে দিলাম।
শ্যামল কৌতূহলী হয়ে বলল, — এবারও কি ছেলেটা চুপ করে ছিল?
বিমলের চোখে আবার জল চিকচিক করল। — না রে। এই প্রথম ও নিজে থেকে কথা বলল। জড়ানো গলায় বলল, “আমার মাকে একটা শাড়ি দেবে? মায়ের নতুন শাড়ি নেই।”
শ্যামল নিঃশব্দে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইল।
— বুঝলি শ্যামল, এতদিন ওর জন্য কত কিছু দিতে চেয়েছি। চিপস, চকলেট, নতুন জামা। কিন্তু ওর নিজের জন্য কিছু চাওয়ার কথা একবারও বলেনি। শেষ পর্যন্ত মায়ের জন্য শাড়ি চাইল। আমি ওকে কোলে তুলে ঘরে গিন্নীর কাছে নিয়ে গেলাম। গিন্নী কয়েকটা শাড়ি সামনে রাখতেই ও বেছে নিল একটা লাল পাড় সাদা শাড়ি আর একটা লাল ঢাকাই জামদানি। আরও কয়েকটা পুরোনো চকচকে শাড়িও দিলাম। ওর মুখে তখন যে হাসি দেখলাম, তা কোনও দামি উপহারের আনন্দের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
— তোর চোখে জল এসেছিল নিশ্চয়ই?
— শুধু চোখে নয়, বুকের ভেতরেও। ওর বাবা বলছিল, “একটা শাড়ি পেলেই ওর মা খুশি হবে।” আমি বললাম, “যে মা পুজোর ক'টা দিন স্বামী-সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে, নিজের কষ্ট ভুলে থাকে, তার জন্য কয়েকটা শাড়ি খুব বেশি নয়।” ছেলেটা আমার দেওয়া নাড়ু-মিষ্টিও খুব আনন্দ করে ব্যাগে ভরল। সেদিন বুঝলাম, ওর নিজের চেয়ে মায়ের জন্য কিছু পাওয়াটাই ছিল ওর আনন্দ।


বিমল  হেসে বলল, — কাঁসর বাজানো ওর ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু সেটাই যেন ওর একমাত্র ভবিষ্যৎ বলে কেউ ঠিক করে না দেয়। ওরও তো পড়াশোনা করে নিজের পছন্দের কাজ বেছে নেওয়ার অধিকার আছে।
শ্যামল বলল, — একদম ঠিক। ওর শারীরিক অসুবিধা আছে বলে ওর স্বপ্নের পরিধি ছোট করে দেওয়া যায় না। দরকার হলে পরিবারকে ওর পড়াশোনা ও চিকিৎসা-সহায়তার উপায় খুঁজে দেখতে হবে।
কথা বলতে বলতে রাত আরও গভীর হয়ে এল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। দূরে কোনও বাড়ির জানলায় আলো জ্বলছিল।
বিমল হঠাৎ বলল, — একটা কথা ভাবছি। আমরা পুজোয় মায়ের কাছে কত কিছু চাই। অথচ মায়ের মতো একজন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ওই ছোট্ট ছেলেটা নিজের জন্য কিছুই চাইল না। শুধু বলল, “আমার মাকে একটা শাড়ি দেবে?”
শ্যামল ধীরে বলল, — হয়তো এটাই পুজোর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করা সহজ, কিন্তু মানুষের দুঃখের পাশে দাঁড়ানোই আসল পরীক্ষা।
পূর্ব আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। বিমল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, — আবার রাত শেষ! কখন যে এতক্ষণ কথা বললাম, বুঝতেই পারলাম না।
শ্যামল বলল, — আমাদের তো এটাই অভ্যাস। রাত গভীর হয়, কথার মধ্যে ডুবে থাকি, আর ভোরের আলোয় হুঁশ ফেরে।

আরও একটি রাত নির্ঘুমে কেটে গেল দুই বন্ধুর। ভোরের আলোয় তাদের হুঁশ ফিরল। বিমলের মনে ঢাকির ছেলেটির হাসি আর জড়ানো গলার কথাটি রয়ে গেল—যে নিজের জন্য  না চেয়ে মায়ের জন্য শুধু  শাড়ি চেয়েছিল।
======================= 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad