রামমোহন রায় ও বাল্যশিক্ষা
শৌনক ঠাকুর
কালী মন্দিরের চাতালে একটা বালক বসে পূজা দেখছিল। ফর্সা। নাদুস নুদুস। ফুটফুটে শরীর। চোখে কৌতূহল। মনে আবেগ। পূজা সেরে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বেরিয়ে এলেন। পরনে লাল বসন। গলায় লাল উত্তরীয়। কপালে লাল টীকা। বোঝাই যাচ্ছে তিনি শাক্ত। বালকটিকে দেখে তিনি একটু হাসলেন। পূজার উপকরণস্বরূপ একটা বেলপাতা তার হাতে দিলেন। বালক বেলপাতাটিকে মনোযোগের সঙ্গে দেখল। কি বুঝলো কে জানে পাতাটিকে চিবাতে শুরু করল। দূর থেকে বালকটির মা ছেলের কাণ্ড দেখে ভীষণ রেগে গেলেন। ছুটে এসেন। ছেলের মুখ থেকে ফেলে দিলেন বেলপাতাটি। এই দৃশ্য বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের কাছে মোটেই সুখকর ছিল না। তিনি প্রচণ্ড রুষ্ট হন। অভিশাপ বর্ষণ করতে করতে বালকটির মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন, "এই পুত্র বিধর্মী হইবে।"
এই অভিসম্পাত যে কতটা সত্যি হয়েছিল বা আদৌ সত্যি হয়নি সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। তবে তিনি বিধর্মী হন নি। বরং ধর্মসংস্কারে ব্রতী হয়েছিলেন। প্রচলিত ধর্মের গোঁড়ামি, কুসংস্কার, ভন্ডামির বিরুদ্ধে এক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলেন। পৌতোলিকতার বিপরীতে একেশ্বরবাদের সমর্থক হয়েছিলেন। পাঠক হয়ত বুঝে গেছেন ওই বালকটির আসল পরিচয়। হ্যাঁ, বালকটির নাম রাজা রামমোহন রায়। বালকটির মা ফুল ঠাকুরানি (তারিনী দেবী)। আর সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের নাম শ্যাম ভট্টাচার্য। ফুল ঠাকুরানির বাবা। রামমোহন রায়ের দাদু। শ্যাম ভট্টাচার্য ছিলেন শাক্ত মতাবলম্বী এবং ধার্মিক। সেই সঙ্গে মহান পণ্ডিত। সেকালে তাঁর উচ্চারিত বাক্য বেদবাক্য নামে খ্যাত ছিল।
যাই হোক শ্যাম ভট্টাচার্যের এই অভিশাপ শুনে মা ফুল ঠাকুরানি স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি তাঁর পায়ে পড়লেন। অভিশাপ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য কাকুতি মিনতি শুরু করলেন। নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের ক্রোধ প্রশমিত হল। তিনি শান্ত হলেন। নরম সুরে বললেন যে তার মুখনিঃসৃত বাণী ফেরানো সম্ভব নয়। তিনি একটু চিন্তা করলেন। তারপর বালকটির দিকে এগিয়ে গেলেন। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "তোমার পুত্র রাজপুজ্য ও অসাধারণ লোক হইবে।"
পরবর্তীতে রামমোহন রায় যে রাজপুজ্য ও অসাধারণ লোক হয়েছিলেন একথা বলার অপেক্ষার রাখে না। যে মানুষটি সারা জীবন পৌত্তলিকতা, পূজা অর্চনার বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন, প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন একেশ্বরবাদের সেই মানুষটি বাল্যকালে ছিল ভক্ত প্রহ্লাদের মতই কৃষ্ণপ্রাণা। সত্যিই ভাবতে অবাক লাগে!
বালক রামমোহন নিয়মিত পূজা অর্চনা করতেন। ভাগ ভাগবত পাঠ না করে জল স্পর্শ করতেন না। রাধাগোবিন্দের বিগ্রহের সামনে বসে থাকতেন। শ্রীকৃষ্ণের রাতুল চরণ ছিল তার হৃদয়। বাড়িতে তিনি মানভঞ্জন পালা অনুষ্ঠিত হতে দিতেন না। এই বিরহের পালা তার মনকে ব্যথিত করত। ভাবতে অবাক লাগে এই মানুষটি হয় উঠলেন বিগ্রহের সম্পূর্ণ বিরোধী। নিরাকার ব্রহ্ম-এর প্রচারক।
খুব দুরন্ত হলেও বালক রামমোহনের লেখাপড়ার কোনরূপ অনাগ্রহ ছিল না। এ ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন। মেধাবী রামমোহনের অক্ষর পরিচয়ের দু'তিন দিনের মাথায় ফলা-বানান এবং যুক্তাক্ষরও শিখে ফেলেন। তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে লেখাপড়া করতেন। নিত্য নতুন জিনিস জানার জন্য তার কৌতূহলী মন সব সময় উদগ্রীব হয়ে থাকত। তাঁর পড়াশোনার আগ্রহ কতটা প্রবল ছিল একটা ঘটনা থেকে জানা যায়। একটা বলছি কেন অনেকগুলো ঘটনায় রয়েছে এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। একদিন সকালে নিজের ঘরে সপ্তকান্ড রামায়ণ নিয়ে বসলেন তিনি। সকাল গড়িয়ে দুপুর, গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ভুলে গেলেন নাওয়া খাওয়া। সপ্তকাণ্ড রামায়ণটি একাসনে বসে শেষ করলেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁর মা দাসীর মারফৎ তাঁকে যতবারই খাবার জন্য ডাকতে পাঠিয়েছিলেন ততবারই তার উত্তর ছিল এই হয়ে গেছে। যাচ্ছি। সেদিন পুত্র রামমোহনের সঙ্গেও তাঁর মা অভুক্ত ছিলেন। সন্তানকে না খাইয়ে কোন্ মা খেতে পারে? এমন মহান মাতার কোলেই তো এ ধরনের সুসন্তানের জন্ম হয়।
তৎকালীন সময়ে আরবি ও ফারসি শেখার একটা রেওয়াজ ছিল। বেশিরভাগ সরকারী কাজকর্ম আরবি ও ফারসিতে চলত। ফলে অনেকেই এই দুটি ভাষা শিখতেন। ব্যতিক্রম হয়নি রামকান্তের কনিষ্ঠ পুত্রের ক্ষেত্রেও। বালক রামমোহন অল্পদিনের মধ্যে আরবি ফারসি ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। এরপর তাকে সংস্কৃত শেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। অতি কঠিন ভাষা, জটিল ব্যাকরণ কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি রপ্ত করে ফেললেন।
পরবর্তীতে তিনি সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, ল্যাটিন, ইংরেজি ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেন। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে তার মনের পরিবর্তন হয়। তিনি উপলব্ধি করেন হিন্দু ধর্মের নিরাকার ব্রহ্ম, ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের একেশ্বরবাদের গূঢ় রহস্য। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠলেন একেশ্বরবাদের সমর্থক। এবং প্রচারক।
তিনি যুক্তি দিয়ে মানুষকে বোঝাতেন। এই একেশ্বরবাদ শুধুমাত্র তাঁর শব্দে নয়, কাজেও এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। পূজা অর্চনার সংক্রান্ত কোন নিমন্ত্রণ এলে তিনি পত্র পাঠ তা প্রত্যাখ্যান করতেন। বহু রাজা মহারাজার আমন্ত্রণ তিনি ফিরিয়েছেন। এই একেশ্বরবাদে সমর্থনে তিনি ষোলো বছর বয়স একটি গ্রন্থ ('হিন্দুদিগের পৌত্তলিক ধর্মপ্রণালী') লিখেছিলেন। পিতার বিরাগভাজন হয়েছিলেন। পিতা পুত্রের মনোমালিন্য এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছিল যে তার পিতা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কখনই তার লক্ষ্য বা তার বিশ্বাস থেকে এক বিন্দু সরে যাননি। তাঁর স্পষ্ট ব্যাখ্যা ঈশ্বরের অধিষ্ঠান মনের অন্তঃকরণে। তাহলে কেন তাকে মূর্তিতে পূজা করা হবে? মনোমন্দিরের ষড়রিপমুক্ত বেদিতে, নির্মল স্বচ্ছ আবহে আরাধনাটাই হল আসল সাধনা, মোক্ষ। তাঁর কথায়—-- 'একমেদ্বিতীয়ম'।
_____________
গ্রন্থঋণ
১.রামমোহন রায় : শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
২.'ভারত পথিক রামমোহন': সনৎ মিত্র
৩.'মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়ের জীবন চরিত : নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়
৪. Wikipedia
_____________
শৌনক ঠাকুর
গ্রাম পোঃ - দক্ষিণখন্ড
থানা - সালার
জেলা - মুর্শিদাবাদ

