জ্ঞানের গুটি পোকা থেকে আলোর প্রজাপতি: কলকাতা ন্যাশনাল লাইব্রেরি
উৎপল সরকার
"A good book is the precious lifeblood of a master spirit, embalmed and treasured up on purpose to a life beyond life."
"একটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ হলো এক মহান মননের অমূল্য জীবনরস—
যা যত্নসহকারে সংরক্ষিত থাকে,
জীবনের সীমা অতিক্রম করে আরেক জীবনের উদ্দেশ্যে।"
— Areopagitica (John Milton)
কলকাতার আলিপুরের ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি ১৯৫৩ সালে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত হয়ে সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার ঘটনাটি ভারতের সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানভিত্তিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত। এই পরিবর্তন কেবল একটি নামান্তর ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণ এবং জ্ঞানকে জনসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এক মহান অঙ্গীকারের প্রতীক। প্রায় দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জ্ঞান বিতরণের এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রাপথ ছিল সুদীর্ঘ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ, যেখানে ১৯৫৩ সালের ঘটনাটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
১. ভূমিকা: জ্ঞানের মিনার ও জাতীয় আকাঙ্ক্ষা
মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অপরিসীম। জ্ঞান সংরক্ষণ, বিতরণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে অতীতের অভিজ্ঞতা হস্তান্তরের মাধ্যমে গ্রন্থাগারগুলো সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। ভারতের মতো একটি বহুত্ববাদী, একটি বহুভাষিক, বহুসংস্কৃতির দেশে একটি জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা আরও গভীর। এটি কেবল বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, বরং একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্যের প্রতিচ্ছবি। কলকাতার আলিপুরে অবস্থিত ন্যাশনাল লাইব্রেরি এমনই একটি প্রতিষ্ঠান, যা ভারতের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর দীর্ঘ এবং বর্ণময় ইতিহাস ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন ভারতের আত্মপ্রকাশের গল্প বলে যায়। ১৯৫৩ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে, যখন ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির নাম পরিবর্তন করে ন্যাশনাল লাইব্রেরি রাখা হয় এবং এর দ্বার সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, তখন তা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং ছিল স্বাধীন ভারতের জ্ঞানচর্চাকে গণতান্ত্রিক করার এক সুদূরপ্রসারী ঘোষণা। এই পরিবর্তন ভারতের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ও শিক্ষাগত দৃষ্টিভঙ্গির এক ঝলক তুলে ধরে, যেখানে জ্ঞানকে আর কতিপয় অভিজাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এই প্রবন্ধটি ১৯৫৩ সালের এই যুগান্তকারী পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ন্যাশনাল লাইব্রেরির ইতিহাস, গুরুত্ব এবং ভারতের জ্ঞানচর্চায় এর অসামান্য অবদান নিয়ে আলোচনা করবে।
২. পূর্বসূরি: ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে গ্রন্থাগার প্রথা
ন্যাশনাল লাইব্রেরির মূল ভিত্তি প্রোথিত আছে ব্রিটিশ ভারতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগারের মধ্যে – কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি (Calcutta Public Library) এবং ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি (Imperial Library)। এই প্রতিষ্ঠান দুটির ইতিহাস ভারতের জ্ঞানচর্চার প্রারম্ভিক পর্যায়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ক) কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি (১৮৩৬):
১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি ছিল ভারতের প্রথম সারির একটি গ্রন্থাগার, যা জনসাধারণের জন্য গঠিত হয়েছিল। এটি ছিল মূলত ভারতীয় ও ইউরোপীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবী এবং বিত্তবান ব্যক্তিদের যৌথ প্রচেষ্টার ফল।প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, স্যার এলিজা ইম্পে সহ বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি এই গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কলকাতার বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল একটি "শেয়ারহোল্ডার লাইব্রেরি," অর্থাৎ যারা গ্রন্থাগারের শেয়ার ক্রয় করতেন, তারাই এর সদস্য হতে পারতেন। তবে, নির্দিষ্ট শর্তে সাধারণের জন্যও এর কিছু অংশ উন্মুক্ত ছিল। এটি কলকাতার মেটকাফ হলে (Metcalfe Hall) স্থাপিত হয় এবং ধীরে ধীরে এটি ভারত ও বিদেশের বহু মূল্যবান বই এবং জার্নালের এক সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায় পরিণত হয়। এটি ঔপনিবেশিক ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যকলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল, যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞান একত্রিত হয়েছিল।
খ) ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি (১৯০৩):
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, লর্ড কার্জন ভারতের ভাইসরয় থাকাকালীন একটি কেন্দ্রীয়, বৃহৎ এবং সমন্বিত গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাঁর ধারণা ছিল, ভারতের বিভিন্ন সরকারি বিভাগ ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা ছোট ছোট গ্রন্থাগারগুলোকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা উচিত, যাতে একটি সমন্বিত বৃহৎ গ্রন্থাগার ভারতের জ্ঞানচর্চায় এক শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। এর ফলস্বরূপ ১৯০৩ সালে ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। লর্ড কার্জন এটিকে "ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক সাম্রাজ্যের হৃৎপিণ্ড" (Heart of the intellectual empire of India) হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। এই গ্রন্থাগারটি কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি, বিভিন্ন সরকারি সেক্রেটারিয়েট লাইব্রেরি এবং অন্যান্য ছোট ছোট সংগ্রহশালাগুলির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র অভিজাত গবেষক এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং সাধারণ পাঠক ও গবেষকদের জন্যও একটি বৃহৎ রেফারেন্স লাইব্রেরি গড়ে তোলা। ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি প্রথমে মেটকাফ হলে এবং পরে কলকাতার এসপ্ল্যানেড রোডের একটি ভবনে স্থানান্তরিত হয়। এটি ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যার সংগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এটি দেশের অন্যতম প্রধান গবেষণা কেন্দ্র হয়ে ওঠে।তবে, ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি তার নাম এবং কাঠামোগত দিক থেকে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতীক ছিল। এটি মূলত ব্রিটিশ রাজ এবং অভিজাত শ্রেণীর জন্য অধিকতর সহজলভ্য ছিল, যেখানে সাধারণ ভারতীয়দের প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল। স্বাধীনতার পর, এই কাঠামোর পরিবর্তন ছিল অপরিহার্য, যা ১৯৫৩ সালের ঘটনা দ্বারা বাস্তবায়িত হয়।
৩. যুগান্তকারী পরিবর্তন: ১৯৫৩ সাল ও জাতীয় লাইব্রেরির জন্ম
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর, ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয়করণ এবং জনগণের কল্যাণে সেগুলোকে ব্যবহার করার একটি নতুন নীতি গ্রহণ করা হয়। ব্রিটিশ শাসন সাম্রাজ্যের "ইম্পেরিয়াল" ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের "জাতীয়" পরিচয় তুলে ধরা ছিল অত্যন্ত জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে, ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়।
ক) জাতীয় পরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা:
স্বাধীনতা লাভের পর নবগঠিত ভারত সরকার বুঝতে পারে যে একটি দেশের জাতীয় আত্মমর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় গ্রন্থাগার অপরিহার্য। ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি, তার সমৃদ্ধ সংগ্রহ থাকা সত্ত্বেও, ঔপনিবেশিক প্রতীক ছিল। তাই, এটিকে দেশের জাতীয় আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করার প্রয়োজন অনুভূত হয়। একটি 'ন্যাশনাল লাইব্রেরি' কেবল বইয়ের সংগ্রহশালাই হবে না, বরং এটি হবে ভারতের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক।
খ) স্থানান্তরণ ও নতুন ঠিকানা: আলিপুরের বেলভেডেয়ার এস্টেট:
ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির জন্য একটি বৃহৎ এবং উপযুক্ত স্থানের অভাব অনুভূত হচ্ছিল। এই সময়ে কলকাতার আলিপুরের বেলভেডেয়ার এস্টেটে অবস্থিত তৎকালীন ভাইসরয়ের গ্রীষ্মকালীন বাসভবনটি একটি আদর্শ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বিশাল এলাকা এবং ঐতিহাসিক ভবনটি গ্রন্থাগারের ব্যাপক সংগ্রহ এবং ভবিষ্যতের সম্প্রসারণের জন্য উপযুক্ত ছিল। ১৯৪৮ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি, ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি আনুষ্ঠানিকভাবে বেলভেডেয়ার এস্টেটে স্থানান্তরিত হয়। এই স্থানান্তরণ কেবল ভৌগোলিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল একটি রূপান্তরের প্রথম ধাপ। একটি ঔপনিবেশিক শক্তির উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির বাসস্থানকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করা ছিল স্বাধীন ভারতের এক প্রতীকী বিজয়।
গ) নামকরণের পরিবর্তন এবং আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন:
অবশেষে, ১৯৫৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ছিল আপামর বাঙালি তথা ভারতবাসীর কাছে এক ঐতিহাসিক দিন, ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ইন্ডিয়া। এই নামকরণ ভারতের শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। তৎকালীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ স্বয়ং এই নবনামকৃত গ্রন্থাগারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তাঁর উপস্থিতি এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং গুরুত্বকে তুলে ধরে। মৌলানা আজাদ তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে এই গ্রন্থাগারকে "জাতির মঙ্গলের জন্য জ্ঞান বিতরণকারী একটি প্রতিষ্ঠান" হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
ঘ) সাধারণের জন্য উন্মোচন:
নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি, ১৯৫৩ সালের এই ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল গ্রন্থাগারটিকে সাধারণ জনগণের জন্য খুলে দেওয়া। আগে যেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল, এখন তা সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। এটি ছিল জ্ঞানকে গণতান্ত্রিক করার এক বিশাল পদক্ষেপ। সাধারণ মানুষ, গবেষক, শিক্ষার্থী, এবং শিক্ষানুরাগীরা এখন সহজে দেশের বৃহত্তম জ্ঞান ভান্ডারে প্রবেশাধিকার লাভ করে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে, ন্যাশনাল লাইব্রেরি কেবল অভিজাতদের গবেষণা কেন্দ্র না থেকে, "জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়" (People's University) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এটি প্রমাণ করে যে স্বাধীন ভারত জ্ঞানকে সার্বজনীন ভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। এটি শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং অসংখ্য ভারতীয়কে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানে সহায়তা করে।
৪. ন্যাশনাল লাইব্রেরির ভূমিকা ও তাৎপর্য: ১৯৫৩ পরবর্তী অধ্যায়
১৯৫৩ সালের পর থেকে ন্যাশনাল লাইব্রেরি ভারতের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে চলেছে। এর উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা বহুলাংশে বিস্তৃত হয়েছে।
ক) ভারতের ডেপোজিটরি লাইব্রেরি হিসেবে:
১৯৫৪ সালে ভারতের সংসদ দ্বারা গৃহীত "ডেলেভারি অফ বুকস অ্যান্ড নিউজপেপারস (পাবলিক লাইব্রেরিজ) অ্যাক্ট" (Delivery of Books and Newspapers (Public Libraries) Act) অনুযায়ী, ন্যাশনাল লাইব্রেরি একটি ডেপোজিটরি লাইব্রেরি (Deposit Library) হিসেবে চিহ্নিত হয়। এর অর্থ হলো, ভারতে প্রকাশিত প্রতিটি বই, সংবাদপত্র এবং সাময়িকীর একটি অনুলিপি বাধ্যতামূলকভাবে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে জমা দিতে হবে। এই আইনটি নিশ্চিত করে যে দেশের প্রকাশিত সকল সাহিত্যকর্মের একটি স্থায়ী সংরক্ষণাগার তৈরি হবে, যা ভারতের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অসামান্য ভান্ডার হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে গ্রন্থাগারের সংগ্রহ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এটি দেশের প্রকাশিত সকল গ্রন্থের একক সর্ববৃহৎ সংগ্রহশালায় পরিণত হয়।
খ) জ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্র:
ন্যাশনাল লাইব্রেরি কেবল বই জমা রাখার জায়গা নয়, এটি গবেষক, স্কলার, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্র। এখানে ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রের লক্ষ লক্ষ বই, জার্নাল, পান্ডুলিপি, মানচিত্র, সরকারি নথি এবং দুর্লভ প্রকাশনা সংরক্ষিত আছে। বিশেষ সংগ্রহশালা যেমন রাজা রামমোহন রায় কালেকশন, অরবিন্দ ঘোষ কালেকশন, ইলা মিত্র কালেকশন সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত সংগ্রহ এখানে স্থান পেয়েছে। এই বিপুল সংগ্রহ শিক্ষার্থীদের পিএইচডি গবেষণা থেকে শুরু করে ঐতিহাসিকদের নতুন তথ্য অনুসন্ধানে সহায়তা করে। এর বহুমুখী সংগ্রহ ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
গ) সাংস্কৃতিক সংরক্ষণাগার:
গ্রন্থাগারটি ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি দেশের অতীত এবং বর্তমানের জ্ঞানকে সুরক্ষিত রাখে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য। প্রাচীন পাণ্ডুলিপি থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্য – সবকিছুই এখানে যত্নে সংরক্ষিত। ডিজিটাল প্রযুক্তির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে, ন্যাশনাল লাইব্রেরি তার সংগ্রহকে ডিজিটালাইজ করার প্রচেষ্টাও শুরু করেছে, যাতে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে গবেষকরা সহজেই এই জ্ঞান ভান্ডারে প্রবেশ করতে পারেন। এটি কেবল ভারতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে সাহায্য করে না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিকেও তুলে ধরে।
ঘ) জনসাধারণের প্রতি দায়বদ্ধতা:
১৯৫৩ সালের পর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকে, ন্যাশনাল লাইব্রেরি জনগণের চাহিদা পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এখানে প্রশস্ত পাঠকক্ষ, রেফারেন্স পরিষেবা, এবং বিভিন্ন ধরনের পাঠক পরিষেবা উপলব্ধ রয়েছে। গ্রন্থাগারটি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সেমিনার, প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, যা জ্ঞানচর্চা এবং জনসাধারণের মধ্যে পঠন-পাঠনের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে। এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জন্য একটি মিলনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, যেখানে সবাই জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়।
৫. চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
এত গৌরবময় ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও ন্যাশনাল লাইব্রেরিকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। লক্ষ লক্ষ বইয়ের সঠিক সংরক্ষণ, ক্ষয়প্রাপ্ত বই ও পাণ্ডুলিপির পুনরুদ্ধার, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রন্থাগার পরিষেবা উন্নত করা এবং ডিজিটাল যুগেও এর প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখা অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।গ্রন্থাগারটিকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন অপরিহার্য। ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত এবং ব্যাপক করতে হবে, যাতে সংগ্রহগুলো অনলাইনে আরও সহজে উপলব্ধ হয়। আধুনিক ও আরো বেশী বেশী করে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে মাধ্যম কে সংরক্ষনের জন্য প্রয়োগ করে বই ও পান্ডুলিপিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয় থেকে রক্ষা করা জরুরি। এছাড়া, গ্রন্থাগারকে কেবল একটি সংরক্ষণাগার না রেখে একটি জীবন্ত জ্ঞান কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক গ্রন্থাগারগুলির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে এটি তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়াতে পারে।
৬. উপসংহার:
১৯৫৩ সালে কলকাতার আলিপুরের ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি থেকে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে রূপান্তর এবং এটিকে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘটনাটি ভারতের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এটি কেবল একটি গ্রন্থাগারের নাম পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল স্বাধীন ভারতের জ্ঞানচর্চাকে ঔপনিবেশিকতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে জাতীয় আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত করার এক মহৎ উদ্যোগ। এই পরিবর্তন জ্ঞানের উপর অভিজাতদের একচেটিয়া অধিকারের অবসান ঘটিয়ে সকলের জন্য জ্ঞানার্জনের পথ প্রশস্ত করে।
আজ, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ইন্ডিয়া শুধুমাত্র বইয়ের একটি বিশাল সংগ্রহশালা নয়, বরং এটি ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত প্রতীক। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞান সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি বহন করে এবং নতুন আবিষ্কার ও গবেষণার জন্য অনুপ্রেরণা যোগায়। ১৯৫৩ সালের সেই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের ফলেই এটি দেশের বৃহত্তম গ্রন্থাগারে পরিণত হয়েছে, যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে জ্ঞানার্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান ভারতের জ্ঞানচর্চায় এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে, যা ভবিষ্যতেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জ্ঞানের আলো বিতরণ করে যাবে। এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং অবিচল কর্মতৎপরতা ভারতের শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক জীবনে এক অনবদ্য অধ্যায় রচনা করেছে এবং আগামী দিনেও করবে।এই ধারণার একটি গভীর সাহিত্যিক ও দার্শনিক রূপায়ণ পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বিচিত্রপ্রবন্ধ' গ্রন্থের অন্তর্গত 'লাইব্রেরি' প্রবন্ধে। তিনি লাইব্রেরিকে এমন এক মিলনস্থল হিসেবে কল্পনা করেছেন, যেখানে মানবসভ্যতার বহুকালব্যাপী কণ্ঠস্বর একত্রিত হয়—।
"কত নদী সমুদ্র পর্বত উল্লঙ্ঘন করিয়া মানবের কণ্ঠ এখানে আসিয়া পৌঁছিয়াছে কত শত বৎসরের প্রান্ত হইতে এই স্বর আসিতেছে। এসো এখানে এসো, এখানে আলোকের জন্ম সংগীত গান হইতেছে"।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "বিচিত্রপ্রবন্ধ" গ্রন্থের অন্তর্গত 'লাইব্রেরি' (Library) প্রবন্ধের অংশ।
=======================
তথ্য সূত্র:-
গ্রন্থ/ডকুমেন্ট: ন্যাশনাল লাইব্রেরি, কলকাতা: ইতিহাস ও ভূমিকা:-
প্রকাশক:তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
সুকুমার সেন, বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস
অমর্ত্য সেন (বাংলা অনুবাদ), যুক্তি ও স্বাধীনতা।
দেবেশ রায়, সংস্কৃতি ও সমাজ।
-------------------------------------
লেখক ও প্রেরক :-উৎপল সরকার, নিউটাউন, আলিপুরদুয়ার, জেলা :-আলিপুরদুয়ার। পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ

