বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

প্রবন্ধ : মধু-পত্নীর করুণ পরিণতি ।। শৌনক ঠাকুর


   

    
      

 মধু-পত্নীর করুণ পরিণতি 

                     

 শৌনক ঠাকুর 




"আজ এই শেষ দিনে চিকিৎসালয়ের ভৃত্য ও শুশ্রূষাকারিণী ভিন্ন তাঁহার মুখে জলগণ্ডুষ দিবার জন্য একজনও নিকটে ছিলেন না। রাজপথের ভিক্ষুক ও অনাথগণের সহিত একত্রে বঙ্গের বর্তমান সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি এইরূপে পরলোকগমন করিলেন।"১ ঋণ, অবহেলা, অপমান কবির জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় অন্তিমতম আঘাতটি বলিষ্ঠ, আত্মবিশ্বাসী কবিকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছিল —- তার প্রেয়সী , তার প্রমিলা হেনরিয়েটার এরকম করুণ পরিণতি। ভাবতে অবাক লাগে যার প্রথম জীবন এতটা মধুময় সেই তারই এমন পরিণতি।



কবির বাল্যবন্ধু ছিলেন গৌরদাস বাবু। তিনি বদলি হয়ে এলেন হাওড়াতে। বাল্যবন্ধু মধুসূদন উত্তরপাড়ায় আছেন এই সংবাদ পেয়ে তিনি দেখা করতে যান। প্রথম দিনের পর তিনি প্রায়শই বন্ধুর কাছে আসতেন। বিভিন্ন বিষয়ে আলাপচারিতা ও কথাবার্তা হত দুই বন্ধুর মধ্যে। ব্যস্ততার কারণে এই আসা-যাওয়ার মাঝে সাময়িক ছেদ পড়েছিল। কিছুদিন পর তিনি কবির সাথে দেখা করতে গিয়ে রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। 


তিনি দেখলেন কবির ঘরের অবস্থা বীভৎস। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু খাবার পড়ে আছে। এখানে ওখানে ভনভন করছে মাছি। দুর্গন্ধ আসছে। নোংরা অপরিষ্কার বিছানায় মধুকবি শুয়ে আছেন। আর মাঝে মাঝে রক্ত বমি করছেন। সেই রক্তের ছিঁটে ফোঁটা লেগেছিল তার পোশাকেও আর ঠোঁটের কোণে। অন্যদিকে মেঝেতে মধুকবির প্রিয়তমা হেনরিয়েটা রোগ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। কুঁকড়ে গিয়েছে তার শরীর। এ দৃশ্যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান গৌরদাসবাবু। শুধু গৌরদাসবাবু কেন এ দৃশ্য আমাদের মনকে ব্যথিত করে। আমরা কেউই চায় না কারোর জীবনে এমন নির্মম পরিণতি নেমে আসুক।


 যাইহোক তিনি কবি-পত্নীকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। কিন্তু তীব্র যন্ত্রণার মুহূর্তেও কবি-পত্নী করজোড়ে গৌরদাসবাবুর উদ্দেশ্যে বললেন "আমার জন্য চিন্তা নাই; আমি মরিতে ভয় করি না; যদি পারেন আমার স্বামীর প্রাণ রক্ষা করুন।" এদিকে কবি মধুসূদন হাত নাড়তে নাড়তে বললেন – "আমাকে দেখতে হবে না, ওকে দেখুন, ওর পরিচর্যা করুন। মৃত্যুকে আমি পরোয়া করি নে।"


একেই বলে বোধ হয় প্রকৃত প্রেম। উভয় উভয়ের জন্য উদ্বিগ্ন। পরস্পর পরস্পরের প্রতি যত্নশীল। আর হবে নাই বা কেন এই হেনরিয়েটা একদিন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, স্বদেশ সবকিছু ছেড়ে মধুকবির জীবন তরীতে বেঁধেছিলেন আপন প্রাণ মন। 'হাতে হাত রেখে' সুখ-দুঃখময় জীবনকে উপভোগ করেছিলেন। এই 'সাহেবকবি' স্বয়ং স্বীকার করেছেন ,"পারস্পরিক ভালবাসা, পারস্পরিক আবেগ ও অনুভূতির বিনিময়, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে।"


দু'জনের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। উত্তরপাড়াতে কবি আর কবি-পত্নীকে রাখা সমীচীন হবে না। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। কলকাতায় যাওয়া আবশ্যক। কিন্তু তাদের তখন আর্থিক দৈন্যতা এতটাই ছিল যে সপরিবারে কলকাতায় বাস করা মোটেই সম্ভবপর নয়। তাছাড়া কবি মাইকেলের শারীরিক অবস্থা ততটা স্থিতিশীল নয় যে, তাকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা যাবে। আবার না গেলেও নয়। তার বন্ধুরা বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। যানবাহনে ধকল কবি সহ্য করতে পারবেন না। তাই স্থির হল বজরায় তাকে কলকাতা নিয়ে যাওয়া হবে। মধুকবি প্রথম কলকাতায় এসেছিলেন বেলেঘাটার খাল পথে। শেষবারের মতো কলকাতায় প্রবেশ করলেন সেই জলপথেই —- গঙ্গার নির্মল প্রবাহে। বজরা ভিড়ল বাবুঘাটে। কবিকে আলিপুর দাতব্য চিকিৎসালয়ে ভর্তি করা হল। সাল ১৮৭৩ মাস জুন। আর স্ত্রী হেনরিকে রাখা হল ১১ নাম্বার লিন্ডস স্ট্রিটে। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পাড়ায়। দুহিতা শর্মিষ্ঠা ও জামাতা উইলিয়াম ওয়াল্টার এভান্স ফ্লয়েডের বাড়িতে। 


ছেদ চিহ্ন টেনে দিলেন বিধাতা। আর কোনদিনই কবি আর কবি-পত্নীর মধ্যে দেখা হবে না। মৃত্যুকালে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধব তো দূরের কথা কবি-পত্নী শেষবারের জন্য মৃত্যুশয্যায় শায়িত হতভাগ্য স্বামীকে দেখতে পেলেন না। তার মাথায় যে একটু হাত বুলিয়ে দেবেন তার সুযোগটুকুও পেলেন না। পেলেন না স্বামীর জন্য এক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন করতে। অন্যদিকে নিঠুর বিধাতা সেই সুযোগও মৃত্যু প্রতীক্ষারত স্বামীকেও দেননি। "হায়! বঙ্গের নব্যকবি শিরোমণির ভাগ্যে এই শোচনীয় পরিণাম ছিল!"


 কবি পত্নীর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাকে আলিপুর জেনারেল হসপিটালে ভর্তি করা হয়। যকৃত প্লীহা, গলার অসুখসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে তার দেহ ক্ষয় হতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের অনাহার, দারিদ্রতায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বিধাতা বাম। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরেই ধরা পড়ল উদরী রোগ। হার্টের অবস্থাও ভালো নয়। চিকিৎসাতেও তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকে নাড়ীর স্পন্দন। 


এদিকে মধুকবির অবস্থাও তথৈবচ। শরীর আরও খারাপ হতে থাকে। জ্বর। গলায় ঘা। জিভের কোন স্বাদ নেই। ছন্দহীন হৃদযন্ত্র। যকৃতের অবস্থাও শোচনীয়। বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা কবি না কবি-পত্নীর কে আগে পরলোকে গমন করবেন। 


কিন্তু পতিব্রতা স্ত্রীর মতই যিনি একদিন 'অম্লান বদনে সংসারের সকল জ্বালা' সহ্য করেছিলেন, স্বামীর জন্য যাবতীয় অলংকার স্বেচ্ছায় স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, নিজে একটি দিনের জন্যও সুখের প্রয়াসী ছিলেন সেই নারী চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হলেন। সমাপ্ত হল সাত-আট দিনের লড়াই। তখন তার বয়স মাত্র ৩৭ বছর ৩ মাস ১৭ দিন।  ২৬ শে জুন ১৮৭৩।


যে কবির ফেভারিট ইন্দ্রজিৎ তার প্রিয়তমা প্রমিলার উদ্দেশ্যে বলেছিল "বেঁধেছে যে দৃঢ় বাঁধে, কে পারে খুলিতে সে বাঁধে?" সেই কবির সঙ্গে তার প্রমিলা তার হেনরিকে 'দৃঢ় বাঁধে' বেঁধে রাখতে পারলেন না। এমনকি দেখতেও পেলেন না শেষ দেখাটা। সত্যিই কী ট্র্যাজিক পরিণতি। 


কবি-পত্নীর নিথর দেহ জে. লিউইস্ এণ্ড কোম্পানীর (J. Lewis and Co. Undertakers ) শববাহী শকটে লোয়ার সার্কুলার রোড দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার শেষ যাত্রায় সামিল হয়েছিলেন কন্যা, জামাতা, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু মনমোহন ঘোষ প্রমুখরা। সেন্ট ডন গির্জার প্রধান ধর্মাচার্য রেভারেন্ড ডব্লিউ. সি. ব্রমহেড় (Rev. W. t. Bromehead, Senior Chaplain, St. John's Church) জেক্রিয়েটার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন।


এক পূর্বতন ভৃত্যের কাছে পত্নীর মৃত্যু সংবাদ পেয়েছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী প্রেমিক মধুসূদন দত্ত। 'শুষ্ককণ্ঠে, রুদ্ধস্বরে' তিনি বলেছিলেন, — "জগদীশ! আমাদিগের দুইজনকেই একত্র সমাধিস্থ করিলে না কেন ? কিন্তু আমার আর অধিক বিলম্ব নাই, আমি সত্ত্বরই, হেনরিয়েটার অনুবর্ত্তী হইব।" এদিকে মনমোহন ঘোষ হাসপাতালের দোতলার বারান্দায় কবির ঘরের দিকে যেতে যেতে তার এক সঙ্গীকে বললেন "একজনকে ত সমাধিস্থ করিয়া আসিলাম; কে জানে, আবার কখন আর একজনকে সমাধিভূমে লইয়া যাইতে হয়! কি ভয়ঙ্কর রাত্রি!" ঘরে ঢুকে তিনি দেখলেন 'মুমূর্ষু মধুসূদন মুদিত নেত্রে শয্যায় শায়িত' আছেন। তাদের পদশব্দ শুনে কবি চোখ মেললেন। পত্নীর অন্তেষ্টিক্রিয়ার বিষয়ে খোঁজ নিলেন। বললেন, "সকলত ভদ্রচিত সম্পন্ন হইয়াছে?" 


 পত্নীর মৃত্যু-মুখ দর্শন করা তো দূরে থাক পত্নীর সমাধির ওপর যে তিনি নিশ্চিন্তে, নিরালায় অশ্রু বিসর্জন করবেন বিধাতা সেই সুখটুকও তাকে দেন নি। অথচ হেনরিয়েটা ছিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয়। তার 'মনের মানুষ'। সুখে-দুখে, বিপদে-আপদে সর্বতোভাবে তাঁর পাশে তিনি থেকেছেন। বাহ্যিক সুখ না থাকলেও কবি আর কবি-পত্নীর মধ্যে যে একটা টান ছিল, একটা সুখ ছিল, একটা বিশেষ অনুভূতি ছিল সে কথা বলা বাহুল্য হবে না। দাম্পত্যের সুখ প্রসঙ্গে মধুসূদন তাঁর প্রবন্ধে একদা লিখেছিলেন,"The happiness of a man who has an enlightened partner is quite complete."



                       ______


ঋণ স্বীকার : 

১. মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত : যোগীন্দ্রনাথ বসু

২. মধুস্মৃতি :  নগেন্দ্রনাথ সোম

৩. মধুসুদন দত্ত-ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। সাহিত্য সাধক চরিতমালা, পৃঃ ৮৭।

৪. মধুসূদনের সমাজচেতনা : শঙ্কর শীল

৫. ক্ষেত্র গুপ্ত (সম্পাদিত), মধুসূদন রচনাবলী,

৬. Wikipedia 


______________&&&_________


শৌনক ঠাকুর 

গ্রাম পোঃ : দক্ষিণখন্ড 

থানা : সালার 

জেলা : মুর্শিদাবাদ




Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.