বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

ভৌতিক রচনা ।। অভিশপ্ত প্রতিবিম্ব ।। জয় মণ্ডল


 

অভিশপ্ত প্রতিবিম্ব

 জয় মণ্ডল



গল্পটি শুরু হয় অর্ণবের শহর কলকাতার এক ছোট স্টুডিওতে। অর্ণব, ২৮ বছর বয়সী প্রাণবন্ত যুবক, পেশায় চিত্রশিল্পী। সে আধুনিকমনস্ক, ভূত-প্রেত বিশ্বাস করে না। সে সম্প্রতি আর্থিক সংকটে ভুগছে, তাই তার একমাত্র আশা হলো তার এক পুরোনো পৈতৃক বাড়ি, যেটি উত্তর কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত ও জীর্ণ পুরোনো বাড়ি, 'রায়চৌধুরী ভিলা' সেটিকে বিক্রি করা।

রায়চৌধুরী ভিলা বহু বছর ধরেই পরিত্যক্ত। বাড়িটি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে তৈরি। এর নকশা কিছুটা গোথিক ধাঁচের, কিন্তু তাতে দেশীয় উপাদান মেশানো। দোতলার বারান্দায় রেলিংগুলো ভাঙা, কিন্তু নিচে প্রবেশদ্বারে দুটো বিশাল পাথরের সিংহমূর্তি—যেন বাড়ি পাহারা দিচ্ছে।
বাড়িটির ডিজাইন এমন যে দিনের বেলায়ও অনেক ঘরে সরাসরি সূর্যের আলো পৌঁছায় না। বিশেষ করে লাইব্রেরি এবং বৈঠকখানা সবসময় আবছা অন্ধকারে ঢাকা থাকে। 
বাড়ির পেছনে একটি ছোট, শুকিয়ে যাওয়া পুকুর আছে এবং তার পাশেই পুরোনো জমিদার বাড়ির ব্যক্তিগত শ্মশান ছিল। গ্রামের লোকেরা বিশ্বাস করে, সেই শ্মশানের ছায়া পুকুরের মাধ্যমে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।
গ্রামের লোকেরা ও তার এক দূর সম্পর্কের কাকিমা বলেন, বাড়িটিতে নাকি অশুভ আত্মা আছে। অর্ণব এগুলোকে 'পুরোনো দিনের গল্প' বলে উড়িয়ে দেয়।
অর্ণব গ্রামে আসে, বাড়িটা পরিষ্কার করে বিক্রির জন্য। গ্রামের লোকেদের চোখে সে অবিশ্বাসী, তাদের কাছে এই বাড়িটা অভিশপ্ত।

তারপর......

বসন্তের এক সন্ধ্যা। সূর্যের শেষ আলোয় রায়চৌধুরী ভিলাকে দেখতে লাগছিল এক বিশালাকার, ঘুমন্ত দানবের মতো। ভাঙা পাঁচিল, সদর দরজার পাল্লাগুলো অর্ধ-উন্মুক্ত, ভেতরে ঘন ঝোপঝাড়। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, আর পুরোনো কাঠের পচা গন্ধ মিশে এক গা ছমছমে আবহ তৈরি হয়েছে। অর্ণবের মনে হলো, যেন এই বাড়িটা তাকে ডাকছে, এক অদৃশ্য হাতের ইশারায়।

বাড়ির ভেতরে ঢুকেই অর্ণব অনুভব করে এক অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। জালের স্তর, ধুলোর আস্তরণ, আর মাকড়সার বাসা।
বিশেষ করে, দোতলার বিশাল বৈঠকখানায় একটি বিশাল, পুরোনো আয়না রয়েছে। আয়নাটি কাপড় দিয়ে ঢাকা। কাকিমা বারবার বারণ করেছেন আয়নাটি খুলতে। এই কাকিমাই , অর্ণবের সেই দূর সম্পর্কের কাকিমা। প্রবীণা, ধার্মিক এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। বাড়ির অলৌকিক কাহিনিগুলো তিনি খুব ভালো জানেন।

আর বিশাল সেই অয়নাটির নাম "দৃষ্টিদর্পণ", এটি কলকাতার কোনো বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ অ্যান্টিক দোকান থেকে কেনা হয়নি, বরং ঠাকুরদার এক তান্ত্রিক বন্ধু এটি উপহার দিয়েছিলেন, যিনি মায়ানমারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এটি খুঁজে পান। এর ফ্রেমটি কালো চন্দন কাঠের, যা দিয়ে সাধারণত পূজা-আর্চার বিশেষ সামগ্রী তৈরি হয়।

কাকিমার মতে, আয়নাটিকে একসময় প্রতি মাসে কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে বিশেষ পূজা করা হতো। সেই নিয়ম ভাঙার কারণেই বিপদ শুরু হয়।



অর্ণব আসার পর থেকেই কাকিমা বারবার আয়নাটি খুলতে বারণ করেন।
কাকিমা : "এই আয়নাটা অভিশপ্ত, বাবা! তোর ঠাকুরমা বলত, এই আয়নাটা নাকি মানুষের ভেতরের খারাপ দিকটা বার করে আনে। যারা এর সামনে দাঁড়ায়, তাদের জীবন নাকি ওলটপালট হয়ে যায়। তোর ঠাকুরদার মৃত্যুর কারণও নাকি এই আয়না!" আসলে কাকিমা কেবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন নন, তিনি হলেন রায়চৌধুরী ভিলার ইতিহাসের "জীবন্ত গ্রন্থাগার"। তিনি জানেন, তাঁর ঠাকুরদার আত্মহত্যার দিন ঠিক কী হয়েছিল—ঠাকুরদা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গলা কেটেছিলেন, আর আয়নাটি তখন রক্তে ভিজে গিয়েছিল।

অর্ণব হাসে। "কাকিমা, তুমি এখনো সেই পুরোনো দিনের গল্প নিয়ে আছো? বিজ্ঞানের যুগে ভূত-প্রেত?"


তারপর, পুরোনো মালি গোপাল আসে। ষাটোর্ধ্ব, রহস্যময় এবং অল্পভাষী। সে বাড়ির সব গোপন কথা জানে। সে বাড়ির সমস্ত কাজ করে দেয়, কিন্তু তার চোখে সবসময় একটা অদ্ভুত ভয় আর রহস্য লুকিয়ে থাকে।
গোপাল খুব কম কথা বলে তাই অর্ণব যখন আয়নার কথা জিজ্ঞেস করে, গোপাল শুধু বলে, "আয়নাটা খুলবেন না বাবু, খুললে বিপদ।"


অর্ণব কাকিমা ও গোপালের কথা অগ্রাহ্য করে। আসলে তার চিত্রশিল্পীর মন কৌতূহলী হয়ে ওঠে। সে আয়নাটি খুলে দেখতে চায়।
এক রাতে, যখন সবাই ঘুমিয়ে, অর্ণব দোতলায় যায়। আয়নাটি ধুলোয় ঢাকা, সে কাপড়টি সরায়।
আয়নাটি বিশাল, কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো। আয়নার কাঁচটা পুরোনো, কিন্তু অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অর্ণব নিজেকে দেখে, প্রথম দিকে সব স্বাভাবিক মনে হয়।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই অর্ণব লক্ষ্য করে, আয়নার প্রতিবিম্বটা সামান্য পরিবর্তিত। তার প্রতিবিম্বের চোখে মুখে কেমন একটা হিংস্রতা ফুটে উঠছে, যা তার নিজের মধ্যে নেই।
সে চোখ কুঁচকে তাকায়। প্রতিবিম্ব হাসছে, কিন্তু সেই হাসিটা অর্ণবের নয়। একটা শীতল, অশুভ হাসি।


আয়না খোলার পর থেকে অর্ণবের আচরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
সে ক্রমশ মেজাজ হারাতে থাকে, ছোটখাটো বিষয়ে বিরক্ত হয়। সে রাতে আয়নার সামনে বসে থাকে। প্রতিবিম্বের চোখগুলো যেন তাকে সম্মোহিত করে।
তার মনে হতে থাকে, প্রতিবিম্বটা তাকে কিছু করতে বলছে, কিছু খারাপ কাজ। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আঁকা ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলে, নিজের সৃষ্টির প্রতি এক অদ্ভুত বিতৃষ্ণা জন্মায়।
অর্ণব অনুভব করে তার সৃজনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে, তার জায়গায় আসছে এক হিংস্র, ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি।

তারপর...... 

একদিন রাতে, অর্ণব তার ঠাকুরমার পুরোনো ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি ভাঙা ট্রাঙ্ক খুঁজে পায়। ট্রাঙ্কের ভেতরে ঠাকুরমার একটি ডায়েরি।
ডায়েরিতে ঠাকুরমার হাতের লেখায় বাড়ির ইতিহাস লেখা। এই আয়নাটি নাকি তার ঠাকুরদার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় উপহার দিয়েছিলেন। সেই আত্মীয় নাকি কালো জাদুতে বিশ্বাসী ছিল।
ডায়েরিতে লেখা আছে, আয়নাটি নাকি মানুষের ভেতরের সুপ্ত অশুভ সত্তাকে জাগিয়ে তোলে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। তার ঠাকুরদারও নাকি এই আয়নার প্রভাবে মানসিক পরিবর্তন হয়েছিল এবং শেষে তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আত্মহত্যা করেন।
তাছাড়া ডায়েরিতে আরও একটি অদ্ভুত পঙক্তি লেখা ছিলো : "আয়নাটি আত্মাকে শুষে নেয়। যখন তুমি তোমার নিজের প্রতিবিম্ব চিনতে পারবে না, তখনই সব শেষ।"



অর্ণব ডায়েরি পড়ার পর বুঝতে পারে তার সঙ্গে কী হচ্ছে। সে আতঙ্কিত হয়ে আয়নাটি ভাঙতে চায়, কিন্তু পারে না। আয়নাটি যেন এক অদৃশ্য শক্তি দিয়ে সুরক্ষিত।
এক গভীর রাতে, অর্ণব আয়নার সামনে দাঁড়ায়। তার প্রতিবিম্ব এখন পুরোপুরি পরিবর্তিত। প্রতিবিম্বটি অর্ণবের মতোই দেখতে, কিন্তু তার চোখে মুখে এখন এক বীভৎস হাসি। প্রতিবিম্বটি আয়নার ভেতর থেকে অর্ণবের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, তাকে ভেতরে টেনে নিতে চায়। অর্ণব প্রাণপণে নিজেকে ছাড়াতে চায়, কিন্তু পারে না। তার মনে পড়ে ঠাকুরমার শেষ পঙক্তি।



গোপাল মালি লাঠি হাতে আসে। সে দেখে অর্ণব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। গোপাল এক অদ্ভুত মন্ত্র আওড়াতে শুরু করে এবং একটি পুরোনো চামড়ার পুটুলি ছুঁড়ে দেয় আয়নার দিকে।
পুটুলিটি আয়নার ওপর আছড়ে পড়তেই আয়নার কাঁচটা চিড় ধরে।
চিড় ধরা আয়নার কাঁচের মধ্যে দিয়ে একটি কালো ধোঁয়ার মতো জিনিস বেরিয়ে আসে এবং মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে যায়। তারপর, অর্ণব জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। যখন তার জ্ঞান ফেরে, সে দেখে কাকিমা আর গোপাল তার পাশে। আয়নাটি এখন সম্পূর্ণ ভাঙা। গোপাল যখন পুটুলি ছুঁড়ে আয়নাটি ভাঙে, তখন অর্ণব জ্ঞান হারায়। যখন জ্ঞান ফেরে, তখন সে দেখে আয়নাটি বহু টুকরো হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে।
 



তারপর, অর্ণব আর বাড়িটি বিক্রি করে না। সে আবার শহরে ফিরে যায়, কিন্তু সেই আয়না আর তার প্রতিবিম্বের স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফেরে। বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় গোপালকে জিজ্ঞেস করে, "আয়নার সব টুকরোগুলো কি ফেলা হয়েছে?" গোপাল শান্তভাবে উত্তর দেয়, "সবটুকু নয় বাবু। এক টুকরো আমার কাছে রেখে দিয়েছি...... সাবধানে থাকতে হয়।" এই কথাটি ইঙ্গিত দেয় যে অশুভ শক্তি পুরোপুরি মুক্তি পায়নি, বরং গোপাল নিজেই হয়তো এখন সেটির রক্ষক বা শিকার।
অর্ণব নিজেকে দেখে, সে এখন স্বাভাবিক, কিন্তু তার ভেতরের ভয়টা রয়েই গেছে। অর্ণব বুঝতে পারে, সে হয়তো মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু সেই অশুভ প্রতিবিম্বের ছায়া তার মনের গভীরে রয়ে গেছে। সে জানে, কিছু পুরোনো বাড়ির রহস্য শুধু ভাঙা কাঁচ দিয়ে শেষ হয় না। কিছু অশুভ সত্তা চিরকাল মানুষের মনের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে, সঠিক সুযোগের অপেক্ষায়।






Contact Details : 
Name : Joy Mondal, 
Kalimandir purbapara, kalikapur, near PHC, Post - kalikapur, P. S - Sonarpur, south 24 parganas, W. B. - 743330

Call and WhatsApp : 8016013005

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.