মাধব ও মালতি
সমীরণ সরকার
(পূর্ব কথা:-চেতক নামের সাদা ঘোড়াটিকে বিধুমুখীর পিত্রালয়ের একটি পরিত্যক্ত চালাতে
রাখা হলো । সে রাতে পূর্ণিমাকে স্বপ্নে দেখে তাকে দেখার প্রবল ইচ্ছা হলো মানবেন্দ্র নারায়নের।।
সেই রাতেই ঘোড়ার পিঠে চেপে মানবেন্দ্র নারায়ণ পৌঁছে গেল কমলাপুর গ্রামে। গভীর রাতে গর্ভবতী পূর্ণিমা দুশ্চিন্তায় ছটফট করতে করতে বাড়ির উঠোনে কামিনী ফুল গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ মানবেন্দ্র নারায়ন কে সেখানে দেখে সে চমকে উঠে চিৎকার করতে যাচ্ছিল। তাকে চুপ করানোর জন্য,মানবেন্দ্র নারায়ণ তার দুই ঠোঁট চেপে ধরল পূর্ণিমার ঠোঁটে। পূর্ণিমা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে অত রাতে সুদূর গড়বেতা থেকে মানবেন্দ্র নারায়ণ কমলাপুরে এসেছে।
মানবেন্দ্র তার প্রেমিকাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল, খুলে বলল, চেতককে বাজিতে জিতে নেওয়ার কথা। পূর্ণিমা খুব খুশি হল।তার 'রাজকুমারের' জন্য তার মন গর্বে ভরে উঠলো।)
, গভীর রাত। চারিদিকে অখন্ড নিস্তব্ধতা। কাজেই পূর্ণিমার মা আশালতা যে তক্তপোষ থেকে নেমে তাঁর ঘরের দরজা খুলছিলেন, সেই শব্দ পূর্ণিমার কানে গেল। ও মুহূর্তের মধ্যে ভেবে নিল যে, এই অবস্থায় কোন কারণেই মায়ের হাতে ধরা পড়া চলবে না। ধরা পড়লে তার তো হেনস্থা হবেই, সেই সঙ্গে তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় রাজকুমার , যে তার গর্ভস্থ সন্তানের পিতা, তাকেও হয়তো অস্বস্তিতে পড়তে হবে। সে তাড়াতাড়ি মানবেন্দ্র নারায়ণের কানে কানে বললো, মা জেগে গেছে। আমি গিয়ে চট করে একটু সামাল দিয়ে আসি। তা না হলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।
মানবেন্দ্র নারায়ণ বললেন, আচ্ছা। শুধু তার দুহাতের বন্ধনে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরা পূর্ণিমাকে ছাড়ার আগে তার কানের লতিতে আস্তে করে কামড়ে দিল। পূর্ণিমা 'উঃ' বলে শব্দ করতে গিয়েও মায়ের কথা মনে পড়ায় চুপ করে গেল।
সে মানবেন্দ্র নারায়ণের গালে একটা চুমু খেয়ে একরকম দৌড়ে চলে গেল।
সে দ্রুত পায়ে পৌঁছে গেল ।
উঠোনের একধারে রাখা একটা মস্ত বড় কালো পাথরের কাছে। ওই পাথরটার পাশে একটা মস্ত বড় মাটির পাত্রে জল রাখা আছে।
আসলে কমলাপুর গ্রামে পূর্ণিমাদের মতো যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই সাধারণ, তাদের ঘরে কোন বাথরুম বা শৌচালয় ছিলো না। এই সমস্ত পরিবারের মহিলারা প্রত্যহ ভোরবেলায় গ্রামের মাঠে, জঙ্গলে , পুকুরের পাঢ়ড়ে বা ঝোপে ঝাড়ে মলত্যাগের মতো অতি প্রয়োজনীয় কাজটি সেরে ,দিঘি অথবা পুকুরের জলে স্নান করে বাড়ি ফিরত। বাড়ি ফিরে তারা ঘরের ভিতর ঢোকার আগে নির্দিষ্ট জায়গায় একটি পাত্রে রাখা জলের সাহায্যে হাত পা ধুয়ে গৃহে প্রবেশ করত।ওই সমস্ত পরিবারের পুরুষেরাও ওই প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন কাজটি খোলা আকাশের নিচে যে কোন জায়গায় করতো।
পুরুষেরা ইচ্ছে মত যেখানে সেখানে মূত্রত্যাগ করলেও, প্রতিটি পরিবারের মহিলাদের জন্য বাসস্থান সংলগ্ন এক বা একাধিক গাছের গুড়ির আড়াল বা ছোট ছোট স্বল্প উচ্চতার গাছের ডালপালার আড়ালে অথবা কোন জংলি গাছ বা ঝোপঝাড়ের ভিতরে প্রাকৃতিক লুক্কায়িত স্থান দেখে ,সেখানে পাথর , ইট ইত্যাদি পেতে একটা ব্যবস্থা করা থাকতো। মহিলারা দিনরাতের মধ্যে যেকোনো সময় সেখানে প্রয়োজনে গেলে, ফিরে এসে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা জলের সাহায্যে হাত পা ধুয়ে গৃহের ভিতরে প্রবেশ করত।
পূর্ণিমার মাথায় হঠাৎ একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করলো। ও প্রায় ছুটে গিয়ে ওদের বাড়ির উঠোনের পাশে রাখা সেই মাটির পাত্র থেকে ঘটির সাহায্যে জল নিয়ে পা ধুতে শুরু করল। শব্দ পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এসে উপস্থিত হলেন আশালতা। তিনি বিস্মিত হয়ে পূর্ণিমাকে বললেন, এখানে কী করছিস তুই,?
----বাইরে গেছিলাম ,তাই হাত পা ধুচ্ছি। কেন, কিছু হয়েছে?
---এত রাতে তুই একা একা বাইরে গেলি কেন? আমাকে তো একবার ডাকলে পারতিস। তাছাড়া লন্ঠন না নিয়ে রাতের বেলায় এভাবে বাইরে যাওয়া ঠিক নয়।
-----চাঁদের আলো ছিল মা। মিছিমিছি ভয় পেয়ো না।তাছাড়া আমার মত হতভাগীকে মা মনসার দাস দাসীরা ছুঁয়েও দেখবে না!
----ছি ছি ছি! তোর মুখে কী কোন কথা আটকায় না?
এরপর আশালতা দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, দোহাই মা মনসা, আমার মেয়েটা ঠিকমতো কথাবার্তা বলতে জানেনা। ওকে তুমি ক্ষমা করে দিও মা। ওর যেন কোন ক্ষতি না হয়।
এবার আশালতা মেয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, ঠিক আছে, আমি শুতে যাচ্ছি। তুই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়।
---ঠিক আছে মা।
(চোদ্দ)
আশালতা বিছানায় শুয়ে একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়লেন। পূর্ণিমা অতি সন্তর্পনে নিজের ঘরে ঢুকে একটা থলেতে নিজের জামা কাপড় এবং টুকিটাকি কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।
মানবেন্দ্র নারায়ণ সুকৌশলে পূর্ণিমাকে চেতকের পিঠে বসিয়ে, নিজে তার পিছনে বসে ঘোড়া ছেড়ে দিলেন।
পূর্নিমা বলল, আমরা এখন কোথায় যাচ্ছিগো কুমার ?
আমরা আপাতত আজ রাতে একটা সরাইখানায় থেকে কাল সকালে আবার যাত্রা শুরু করব।
---আজ রাতে কোথায় থাকবো, বিষ্ণুপুরে?
----না, ওখানে যে সরাইখানাটা আছে, তার মালিক আমার বাবার বিশেষ পরিচিত। সুতরাং ওখানে থাকলে হয়তো ধরা পড়ে যেতে পারি।
----তাহলে?
-----আমরা এখন জয়পুরে যাব।
----আচ্ছা। ওখানে কোন ভয় নেই তো?
না না, রাস্তার ধারে জঙ্গলের মধ্যে ছোট্ট সরাইখানা।। তাছাড়া ওই সরাইখানা টি যে যুবকটি দেখাশোনা করে, সে আমার পরিচিত।
দুজন সওয়ারী কে পিঠে নিয়ে চেতক এগিয়ে চলল অজানা পথে।
**********************************
Regards
Dr. Samiran Sarkar
Khelaghar, Lautore,
P.O : Sainthia, Dist : Birbhum.
W.B - 731234
Mob : 8509258727
Khelaghar, Lautore,
P.O : Sainthia, Dist : Birbhum.
W.B - 731234
Mob : 8509258727

