বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

ধারাবাহিক উপন্যাস ।। চক্রব্যুহ ( পরিচ্ছেদ- ১) ।। প্রবীর মুখার্জী


 

"চক্রব্যূহ" 

[রোমহর্ষক অলৌকিক উপন্যাস] 

 

 প্রবীর মুখার্জী 

 

১  

 

হঠাৎ মনে হলো ঝোপের মধ্যে কিছু একটা নড়ছে। সাপ নয়তো, হতেও পারে। খুব ভয়ে ভয়ে সামনে ঝুঁকে দেখলাম। না সাপ টাপ কিছু নয়। খুব ছোট একটা পাখির বাচ্ছা প্রাণপনে মাথা তোলার চেষ্টা করছে। 

       গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে আশ্রমের পাশে ভগ্নপ্রায় জমিদার বাড়ির সামনের বাগানে প্রচুর আম গাছ রয়েছে। আমি জানি কাল রাতে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টির কারণে আজ গাছ তলায় প্রচুর কাঁচা আম পরে থাকবে। ভেবেছিলাম খুব ভোরে উঠে প্রচুর আম কুড়িয়ে এনে মা'কে বলবো আচার বানিয়ে দিতে। কিন্তু সারা রাত ঝড় জল আর আমের কথা ভাবতে ভাবতে ভোরের দিকে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

     ঘুম ভাঙাতেই ছুটে গিয়েছিলাম আম কুড়োতে। তখন ভোর পেরিয়ে সকালের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু এ গাছ তলা ও গাছ তলা ঘুরে একটা আমও না পেয়ে শেষকালে মন মরা হয়ে জমিদার বাড়ির ভাঙা প্রাচীরে বসে ভাবছি ভোরে উঠতে না পারার কারণে কেউ বা কারা সব আম কুড়িয়ে কেটে পড়েছে।

তখনি দেখলাম একটা পাখির  ছানা মাথা তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। সকালের শান্ত স্নিগ্ধ মিষ্টি রোদের ছটা এসে পড়েছে তার গায়ে। আরো একটু কাছে গিয়ে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম বেশ কয়েকটি লাল পিঁপড়ে তাকে ছেঁকে ধরেছে। তাদের জ্বালা থেকে বাঁচতে ছটফট করছে। এ অবস্থায় আর কিছুক্ষন থাকলে পাখির ছানাটা মারা যাবে।

      সঙ্গে সঙ্গে গা থেকে গেঞ্জি টা খুলে বাঁ হাতের তালুতে রেখে সস্নেহে ডান হাত দিয়ে অতি সাবধানে বাচ্চাটিকে তুলে গেঞ্জির উপরে রাখলাম। এমন সময় একটা পাখি ঝাপটা দিয়ে আমার মাথার চুল ছুঁয়ে আবার গাছের ডালে গিয়ে বসলো। প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তার পর উপরে তাকিয়ে দেখলাম। একটা টিয়া পাখি গাছের ডালে বসে ছটফট করছে। সম্ভবত এই বাচ্চাটির মা। পাখিটির পাশে গাছের কোটরে আরো কয়েকটি বাচ্ছা মুখ বাড়িয়ে চিক চিক করছে। 

     বুঝতে পারলাম কাল রাতে প্রচন্ড ঝড় জলের সময় কোনো কারণে এই বাচ্চাটি ঐ কোটোর থেকে নিচে পড়ে গেছে। এখন তার মা দেখতে পেয়ে ফিরে পাবার জন্য ছটফট করছে। 

খুব সাবধানে বাচ্চাটির গা থেকে লাল পিঁপড়ে গুলো সরিয়ে ভাবলাম গাছের কোটরে রেখে আসবে। কিন্তু এক হাতে বাচ্ছা নিয়ে গাছে ওঠা সম্ভব নয়। 

       এদিক ওদিক তাকিয়ে কারো সাহায্য নেবো ভাবছি এমন সময় ত্রিশূল হাতে রক্ত বসন পরিহিত জটাধারী একজন সন্ন্যাসী ভাঙা জমিদার বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,

।। "বাচ্চাটা নিয়ে এখন কি করবি সেটাই ভাবছিস তো?"  

      এত সকালে ভাঙা জমিদার বাড়ির ভিতরে থেকে সন্ন্যাসীকে বেরিয়ে আসতে দেখে একটু অবাক হলাম। কিন্তু ভয় পেলাম না। কারণ পাশেই "তারাশঙ্কর ধাম" আশ্রম। সেখানে দিনরাত কত সন্ন্যাসী আসছে যাচ্ছে তাদেরই কেউ একজন হবে ভেবে মাথাটা হালকা উপর নিচে করে অস্ফুট স্বরে বললাম,

।। "হ্যাঁ।"

জটাধারী সন্ন্যাসী বললেন,

।। "চিন্তা করিস না। ওটাকে নিয়ে বাড়ি যা।"

আমি বললাম,

।। "মা বকবে।"

মৃদু হেসে সন্ন্যাসী বললেন,

।। "বকলে বকবে। জানবি ওটাই তোর আশীর্বাদ।"

 হাতে ধরে থাকা পাখির বাচ্চাটা নড়ে উঠলো। 

।। "দাঁড়া।"

      বলে সাধুবাবা কাছে এসে পাখিটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বিড়বিড় করে কি সব বললেন। তার পর আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন,

।। "মঙ্গল হোক। যা বেটা এবার ওকে নিয়ে বাড়ি যা।"

         বাড়ির পথে কয়েক পা বাড়িয়ে একটু দাঁড়ালাম। এক বার বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আবার যখন সাধুবাবার দিকে তাকালাম দেখলাম সাধুবাবা নেই। 

'এরই মধ্যে সাধুবাবা কোথায় চলে গেলেন!'  

এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেলাম না। 

অগত্যা আমের পরিবর্তে টিয়া পাখির বাচ্ছা নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবছি, সাধুবাবা যতই বলুক আজ আমাকে মা'য়ের কাছে বকা খেতেই হবে। 

এমন সময় নিমাই দাদু আমার সামনা সামনি হয়ে বলল,

"নাতি আমার অর্ক আমার

ওরে দুষ্টু ছেলে,

সাত সকালে খালি গায়ে

কোথায় গিয়েছিলে?"

কথায় কথায় ছড়া কাটতে ওস্তাদ এই দাদু আমার খুব প্রিয়। মাঝে মাঝে আমাদের মধ্যে ছড়ার প্রতিযোগিতা চলে। তাই দাদুর ছড়ার উত্তর ছড়াতেই দিলাম। বললাম,

"আম কুড়ুতে গিয়েছিলাম দাদু

কেউ করেনি মানা,

আম পাইনি পেয়েছি তবে

এই পাখির ছানা।"

পেটে হাত বোলাতে বোলাতে নিমাই দাদু আবার বললো,

"দেখবো পরে এখন আমার

পেট মোচড় মারে,

ওরে বাবা আর নয়কো

কথা হবে পরে।"

বলে নিমাই দাদু প্রকৃতির টানে মাঠের দিকে ছুটতে শুরু করলো। দাদুর কান্ড দেখে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরলাম।

 মা তখন দরজায় জল, মারুলি দিচ্ছিলো আমাকে খালি গায়ে দেখে বললো,

।। "কি রে কাউকে কিছু না বলে সাত সকালে খালি গায়ে কোথায় গিয়েছিলিস?"

ভয়ে ভয়ে আমি বললাম,

।। "আম কুড়ুতে।"

।। "আম কই?"

।। "পাইনি।"

।। "হাতে ওটা কি?"

দূরে থেকে সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে পাখির বাচ্ছাটা দেখিয়ে বললাম,

।। "টিয়া পাখির বাচ্ছা।"

বাচ্ছাটা দেখে রেগে গিয়ে মা বললো,

।। "ও তাহলে আম কুড়ুতে নয়। সাত সকালে গাছে চেপে টিয়া পাখির বাচ্ছা পাড়তে গিয়েছিলি?"

।। "না মা বিশ্বাস করো আমি গাছে চাপি নি। এই বাচ্চা টা ওই লেদা আম গাছের নিচে পড়ে ….।"

  পাখি বাড়িতে আনার কারন বলতে যাবো এমন সময় মা এক ধমকে থামিয়ে দিয়ে বললো,

।। "চুপ কর।"

আমি চুপসে গেলাম। মা আবার বলতে শুরু করলো,

।। "দিন দিন যত বড়ো হচ্ছিস ততই অবাধ্য, মিথ্যাবাদী আর বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছিস।"

।। "আ হা, কি হলো কি? সাত সকালে ছেলেটাকে বকছিস কেন।" 

লাঠি ধরে ধীর পদক্ষেপে আস্তে আস্তে আমার দিদা অন্নদা দেবী কথা গুলো বলতে বলতে কাছে এলেন। গা থেকে জল নামলো। দিদা এসেছে মানে আমাকে আর বকা খেতে হবে না।  

     আমি যখন খুব ছোট, কোলের ছেলে, তখন বাবা চাকুরী সূত্রে আমাদের কে নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার কিছুদিন পর আকস্মিক দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যু হয়। তারপর থেকে মা অসহায় হয়ে পরে। আমাকে কোলে নিয়ে আবার গ্রামে ফিরতে বাধ্য হন। ভেবেছিলেন ফিরে এসে শ্বশুরের ভিটেতে শ্বশুরের ছত্রছায়ায় থাকবেন। কিন্তু ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর পরিহাস।  

     কিছুদিন যেতে না যেতেই আমার দাদু স্বপন ব্যানার্জী দেহ রাখলেন। আমাকে নিয়ে আবার অনাথ হয়ে পড়লেন মা রমলা দেবী। ছোট ছেলেকে নিয়ে এত বড় বাড়িতে থাকবেন কি করে! কে তাদের আগলে রাখবে! কি করবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না। তখনই মনে পড়লো দিদা অন্নদা দেবীর কথা। কাছে নিয়ে এসে রাখলেন তার মা'কে। তার পর থেকেই মা, দিদার আদরে আমি বড়ো হতে থাকি।

     দিদা অন্নদা দেবী আমাকে চোখে হারায়। নাতি অন্ত প্রাণ। গায়ে আঁচড় লাগতে দেন না। অনেক বিপদে দিদা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে মা'য়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। আজও তাই হলো। দিদাকে দেখে মা রাগে গর গর করতে করতে,

।। "এই, এই তোমার জন্যই ছেলেটা একদিন গোল্লায় যাবে। লাই দিয়ে দিয়ে ওকে মাথায় তুলছো। তোমার প্রশ্রয়ে ওর লেখাপড়া কিস্সু হবে না। গোডাং মূর্খ হয়ে থাকবে। মুনিষ খেটে খেতে হবে। গরু চড়াতে হবে। এই আমি বলে দিলাম কিন্তু।"

               বলে ভিতরে যেতে যেতে আবার বলল,

।। "ঘর ঢোক তারপর তোর একদিক কি আমার একদিক।"

ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে পাখির ছানা হাতে সদর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবছি ভিতরে গেলে মা'য়ের রোষানলে পরে আমার অবস্থা কি হবে। এমন সময়….. 

দিদা আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল,

।। "কি হলো দাদু ভাই। মা হঠাৎ এত রেগে গেল কেন?"

আমি আবদারের সুরে নিজের সাফাই গাইতে বললাম,

।। "দেখো না দিদা, আম কুড়োতে গিয়ে দেখলাম এই বাচ্চাটা লেদা আম গাছের নিচে পড়ে আছে। আমি কুড়িয়ে না আনলে তো এতক্ষনে পিঁপড়েতে ওকে খেয়ে ফেলতো। তাই নিয়ে এলাম। এতে আমার কি দোষ। তুমিই বলো দিদা।"

ভিতর থেকে মা বললেন,

।। "দিদাকে সাক্ষী মেনে পার পাবি ভাবছিস। হাতের কাজটা শেষ করি তার পর তোর ব্যবস্থা হচ্ছে।"

 দিদাকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে ভয়ে বললাম,

।। "দিদা।"

দিদা তার আদরের নাতিকে জড়িয়ে ধরে গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,

।। "যাও দাদু ভাই হাত মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে পড়তে বসো। তার পর আমি দেখছি কি করা যায়।" 

   হাতে ধরে থাকা পাখির বাচ্চাটা দিদাকে দেখিয়ে আস্তে আস্তে বললাম,

।। "এটার কি হবে দিদা?"

দিদা একটু চিন্তা করে বললেন,

।। "হু, এক কাজ করো দাদুভাই। ওটাকে আপাতত সিঁড়ির নিচে একটা ঝুড়ি চাপা দিয়ে রেখে দাও। তার পর যা হোক একটা কিছু ব্যবস্থা হবে।"

      অতি সাবধানে পা টিপে টিপে গিয়ে তাই করলাম। তারপর হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসলাম। মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে খুব জোরে জোরে পড়তে শুরু করলাম,

"সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,

সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। 

আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে,

আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।


ভাইবোন সকলেরে যেন ভালোবাসি,

এক সাথে থাকি যেন সবে মিলেমিশি।

ভালো ছেলেদের সাথে মিশে করি খেলা,

পাঠের সময় যেন নাহি করি হেলা।"

   কান্ড দেখে মা মুখ টিপে হাসতে শুরু করল।  দুলতে দুলতে আরো জোরে জোরে পড়তে শুরু করলাম,

"মাগো আমায় দাও না বলে 

কি করবো এখন

তুমিই মা গো বাঁচাও আমায় 

বিপদে পড়ি যখন।"

পড়ার ফাঁকে আড় চোখে দেখলাম মা টিয়া পাখির ছানাটাকে ঝুড়ি তুলে দেখছে আর বলছে,

।। "আহারে এইটুকু বাচ্চা এখনো চোখ ফোটে নি। এ তো না খেতে পেয়ে মারা যাবে।"

     মেয়েকে একটু নরম হতে দেখে দিদা  বলল,

।। "তুই একটু চেষ্টা করে দেখ না। যদি কিছু খাওয়াতে পারিস।"

।। "কি করে খাওয়াবো মা? ও তো এখনো মাথা তুলতেই পারছে না।" 

।। "চেষ্টা করে দেখ না। যদি কাপড়ের সলতে পাকিয়ে কিছুটা দুধ খাওয়াতে পারিস।"

।। "তাই দেখি চেষ্টা করে। কিছুটা দুধ যদি পেটে যায়। তারপর পাঁচু আসুক। পাঁচু এলে বলবো বাচ্চাটাকে গাছের কোটরে ওর মায়ের কাছে দিয়ে আসতে।"

কথাগুলো বলতে বলতে মা ঘরের ভিতরে চলে গেল।

  পড়ার বই থেকে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি, দিদা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়ল। দিদা হাত তুলে অভয় জানালো।

    তারপর আরো দু - তিন দিন কেটে গেছে। এ ক'দিন এক নাগাড়ে বৃষ্টি হওয়ার কারণে পাঁচু গাছে উঠতে রাজি না হওয়ায় বাচ্চাটি বাড়িতেই রয়ে গেছে।

   মা' এর লালন পালনে বাচ্চাটি এ ক'দিনে কিছুটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। মাথা তুলে পিট পিট করে তাকাচ্ছে। ঘুরতে ফিরতে  ঝুড়ি তুলে বাচ্চাটিকে বার বার লক্ষ্য করছি দেখে দিদা বলল,

।। "কি দেখছো দাদুভাই।"

।। "দেখো দেখো দিদা। বাচ্চাটা কেমন পিট পিট করে আমার দিকে তাকাচ্ছে।"

।। "কই দেখি দেখি।"

বাচ্চাটা দেখে দিদা আবার বললেন,

।। "হ্যাঁ, তা তো বটে, তা তো বটে। বুজলে দাদুভাই, বাচ্চাটা আরেকটু বড় হলে, আমি ওকে কথা বলতে শেখাবো।"

।। "দিদা, পাখিরা কথা বলতে পারে?"

 পাশেই সিঁড়ির ধাপে বসতে বসতে দিদা আবার বলল,

।। "পারে বৈকি দাদু ভাই, কিছু কিছু পাখি আছে যারা মানুষের মতো কথা বলতে পারে।"

।। "যেমন?"

পাশে বসে আগ্রহ ভরে দিদার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, দিদা বললেন,

।। "এই যেমন ধরো টিয়া, ময়না, কাকাতুয়া, শালিক এদেরকে ঠিক ভাবে শেখাতে পারলে এরা কথা বলতে পারে।"

।। "তাহলে তুমিই ওকে শেখাও না দিদা।"

।। "দাড়াও দাদুভাই, ও আরেকটু বড় হোক, তবে তো শিখতে পারবে।"

।। "বেশ তাহলে এখন ওর একটা ভালো নাম দাও তো দিদা। আমি সেই নাম ধরে ওকে ডাকবো।"

 দিদা বললেন,

।। "এটা তুমি ঠিক বলেছ দাদু ভাই। ওর একটা নাম খুব দরকার। আচ্ছা কি নাম দিলে ভালো হয় বলো তো?"

।। "তুমিই বলো।"

।। "কেষ্ট, কেষ্ট দিলে কেমন হয়।"

।। "ধুর, আমিই তো তোমার কেষ্ট। আবার কেষ্ট?"

      হো হো করে হাসতে হাসতে দিদা আমাকে জড়িয়ে ধরে  বলল,

।। "হ্যাঁ, তা তো বটে, তা তো বটে। আমি রাধা আর তুমি কেষ্ট। আমরা রাধা - কেষ্ট। আমার আবার কেষ্ট কি দরকার।"

।। "আঃ দিদা, ওসব ছাড়ো তো। এখন ওর একটা ভালো নাম বলো।"

।। "হ্যাঁ রাধা কেষ্ট সব বাদ। তাহলে আজ থেকে ওর নাম হবে মিঠু।"

।। "হ্যাঁ এটা তুমি ঠিক বলেছ দিদা, মিঠু। আজ থেকে ওকে আমি মিঠু বলেই ডাকবো।"

আমাদের কান্ড দেখে রান্নার খুন্তি নাড়তে নাড়তে মা হেসে ওঠে।

রান্নাঘর থেকে মা সবকিছু শুনেও কিছু বলছে না দেখে মনে সাহস বাড়ল। দিদাকে  বললাম,

।। "বুজলে দিদা, মিঠুর জন্য একটা খাঁচা বানাতে হবে, নইলে কুকুর বেড়ালে ওকে খেয়ে ফেলবে।" 

     তার পরের দিন বাজার থেকে লোহার তার কিনে নিয়ে এসে সুন্দর একটা খাঁচা বানিয়ে ফেললাম। তা দেখে মা মনে মনে খুব খুশি হয়েছে বুজলাম। কিন্তু আমাকে সেটা বুঝতে দিলো না। বলল,

।। "দিন রাত ও সব নিয়ে পরে থাকলে লেখা পড়া করবি কখন? স্কুলে যাবার সময় হয়েছে সে দিকে খেয়াল আছে।"

বারান্দার দেওয়ালে ঝুলতে থাকা দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। তাইতো অনেক বেলা হয়ে গেছে। আর দেরি করলে স্কুলে যেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি একটা গামছা টেনে নিয়ে ছুটলাম পুকুরে স্নান করতে। রাস্তায় খুশির সাথে দেখা। স্কুল যাবে বলে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে চলে এসেছে। 

    একই স্কুলে খুশি আমার থেকে দু ক্লাস নীচে পড়ে। আমরা এক সাথে স্কুলে যাই, আবার এক সাথে ফিরি। আজ দেরি দেখে খুশি বললো,

।। "কি গো অর্কদা এখনো স্নান করো নি। স্কুলে যাবে না।"

।। "যাবো তো। তুই আমাদের ঘরে গিয়ে একটু বস। আমি এক্ষুনি স্নান করে আসছি।"

    বলে ছুটে গিয়ে মিত্র পুকুরের জলে ঝাঁপ মারলাম। অন্য দিন পুকুরে স্নান করতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষণ সাঁতার কাটি। কিন্তু আজ আর তা হলো না। তাড়াতাড়ি ফিরে এসে দেখি খুশি ঝুড়ি খুলে মিঠুর গায়ে হাত বোলাচ্ছে। একটা ধমক দিয়ে বললাম,

।। "এই ঝুড়ি খুলছিস কেন? ঢাকা দে বলছি। নইলে এখুনি কুকুর, বেড়ালে ওকে খেয়ে ফেলবে।"

    বলে ঝুঁড়ি তুলে ঢাকা দিয়ে দিলাম। খুশির একটু রাগ হলো বুঝতে পারলাম। ওভাবে না বললেই ভালো হতো। মা রান্না ঘর থেকে বলল,

।। "ভাত বেড়ে দিয়েছি।"

।। "যাই মা।"

বলে তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে চলে গেলাম। খাওয়া হয়ে গেলে জামা-প্যান্ট পরে, বইয়ের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে খুশিকে বললাম,

।। "চল।"

বলে হাঁটতে শুরু করলাম। খুশি বারান্দার ধারিতে চুপচাপ বসেছিল। কোন কথা না বলে আমার পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলো। 

আমার আচরণে খুশি মনে আঘাত লেগেছে। খুব রাগ হয়েছে বুঝতে পারলাম। তবে তার এই রাগ বেশিক্ষন থাকবেনা সেটা আমি ভালো করেই জানি।

স্কুল যাওয়া সময় বা স্কুল চলা কালীন আমার সাথে একটা কথাও বলল না।

স্কুল থেকে ফেরার পথে রাগ ভাঙ্গাতে আমি বললাম,

।। "কিরে কথা বলবি না নাকি। খুব রাগ করেছিস মনেহচ্ছে।"

 তখনই হঠাৎ আমাকে টপকে ছুটতে ছুটতে বাড়ি চলে গেল। বুঝলাম এবারের রাগ ভাঙাতে আমাকে একটু বেগ পেতে হবে। 

  অগত্যা আমিও বড়ি ফিরে তাড়াতাড়ি ব্যাগ রেখে সবার আগে ছুটে গেলাম মিঠুর দিকে, ঝুড়ি খুলে দেখি মিঠু চিক চিক করছে।  মনে হল অনেক্ষন পর আমাকে দেখে আনন্দ পেয়েছে। 

এমন সময় পিছন থেকে একজন বলে উঠলো,

।। "কি অর্ক বাবু স্কুলে গিয়েছিলে বুঝি।"

 ঘুরে দেখি পরেশ দা। বললাম,

।। "আরে পরেশ দা, তুমি কখন এলে। ভালো আছো তো?"

পরেশদা আমার ছোট মাসির ছেলে। কিছুদিন হলো মিলিটারিতে চাকরি পেয়েছে। প্রথম ছুটিতে বাড়ি এসে আমাদের বাড়ি এসেছে। মাসি ও দিদাকে প্রণাম করতে।

      বয়সে পরেশদা আমার থেকে অনেক বড় হলেও আমাদের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব, পরেশদা আমাদের বাড়ি এলেই আমার খুব মজা হয়।

পরেশদা আমাকে নিয়ে এখানে সেখানে ঘুরতে যায়। এটা সেটা কিনে খাওয়াই, সিনেমা দেখতে নিয়ে যায়। মা তখন পড়ার জন্য চাপ দেয় না। পরেশদা যে ক'দিন এখানে থাকে সে ক'দিন খুব আনন্দে কাটে। পরেশদাকে আবার বললাম,

।। "কতদিন পরে এলে, এবার কিন্তু অনেকদিন থাকতে হবে দাদা।"

।। "না রে ভাই এ বারে বেশি দিন থাকা হবে না। ছুটি খুব কম। কালই চলে যেতে হবে। সবার সঙ্গে একবার করে দেখা করতে হবে তো।"

পরেশদার কথাগুলো শুনে মনটা একটু খারাপ হল। ভেবেছিলাম পরেশদা এসেছে মানে এবার তার সাথে ঘুরতে যাবো। খাওয়া-দাওয়া করবো, সিনেমা দেখবো। কিন্তু সেগুলো সব মাঠে মারা গেল। হয়তো আমার মনের কথা বুঝতে পেরে পরেশদা আবার বলল,

।। "চল, এখন আমরা একটু ঘুরতে বের হব।"

কিছুটা খুশি হয়ে বললাম,

।। "কোথায় যাবে?"

।। "আসার সময় দেখলাম আমোদপুর ব্লক মাঠে একটা মেলা বসেছে। চল মেলা থেকে ঘুরে আসি।"

              রান্নাঘর থেকে মা বললো,

।। "দাঁড়া, তোরা আগে কিছু একটা খেয়ে নে তার পর বের হবি।"

পরেশদা বলল,

।। "না মাসি আমরা এখন আর কিছু খাব না। মেলাতে কিছু একটা খেয়ে নেব।"

 বুঝলাম মেলা ঘোরার সাথে সাথে খাবারটাও বেশ জমবে।

আজ আর কোয়ে পুকুরের মাঠে ফুটবল খেলতে যাওয়া হলো না। পরেশদার সাইকেলের পিছনে চেপে মেলা দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।

   দাদার হাত ধরে মেলাতে ঘুরে ঘুরে নন্দন কানন, আনন্দ কানন, চিড়িয়াখানা, পুতুলনাচ দেখার পাশাপাশি টুকটাক অনেক কিছু খেলাম। দাদার সাথে নাগরদোলায় চেপে বন বন করে ঘুরতে বেশ ভালোই লাগলো। 

পরেশদা দিদার জন্য পিতলের গোপাল ঠাকুর। মাসির জন্য কিছু সাংসারিক জিনিস কিনে আমাকে বলল,

।। "বল, তুই কি নিবি?"

।। "আমাকে একটা পিস্তল কিনে দাও দাদা।"

   আমার এহেন আবদারে পরেশদা একটু অবাক হয়ে বললো,

।। "কেন মেলায় এত কিছু থাকতে পিস্তল নিবি কেন? পিস্তল দিয়ে কি করবি?"

।। "আমার বন্ধু মিঠুকে যে মারতে আসবে কুকুর, বেড়াল যেই হোক তাকে আমি এই পিস্তল দিয়ে মারবো।"

।। "আরে এ তো খেলনা পিস্তল। এতে কাউকে মারা যাবে না।"

।। "কিন্তু ভয় তো দেখানো যাবে।"

।। "হ্যাঁ, তা হয়তো যাবে।"

আমার পছন্দ মতো পরেশদা একটা খেলনা পিস্তল কিনে দিলো। খেলনা পিস্তল হলে কি হবে দেখতে একদম আসল পিস্তলের মতো। আমি খুব খুশি।

মোগলাই পরোটা খেয়ে আমরা যখন পাঁপড় চেবাতে চেবাতে মেলা থেকে বের হলাম। তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আমি দাদাকে বললাম,

।। "অনেক দেরি হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি চলো নইলে মা বকবে।"

পরেশদা বললো,

।। "কোন দিকে যাবি?"

।। "কেন যে দিকে এসেছি।"

আসলে গ্রাম থেকে শহরে যাওয়া আসার দুটি রাস্তা আছে। একটা নদী, নালা, বন, জঙ্গল পেরিয়ে আধ ঘন্টার রাস্তা। অন্যটি টেকড্ডা ঘাট কাসেম সেতু পেরিয়ে এক ঘন্টা লেগে যায়। পরেশদা বললো,

।। "রাতের বেলায় ও পথে যেতে তোর ভয় করবে না তো।"

আমি মোটেই ভীতু নয়, যথেষ্ট সাহসী।বললাম,

।। "কেন?"

।। "শুনেছি বনের ভিতর, নদীর ধারে শ্মশানে ভুত আছে। যদি ধরে।"

পরেশদা একটু মজা করে হাসতে হাসতে কথাগুলো বললো। আমি বললাম,

।। "ধুর যত সব বাজে কথা। আমি ও সব বিশ্বাস করি না।"

।। "সাবাস। এই তো চাই। তবে চল।"

      বলে শহর ছেড়ে মাঠের রাস্তা ধরলাম। হালকা চাঁদের আলোয় আমরা যখন নদী পেরিয়ে বনের ভিতর ঢুকলাম তখন দেখলাম শ্মশানের ধারে বনের ভিতর একটা আলো জ্বলছে। পরেশদা বলল, 

।। "ওই দেখ অর্ক ওটা কিসের আলো বল তো?"

আমি বললাম,

।। "মনে হয় শ্মশানে মড়া পুড়ছে। ওটা তারই আলো।"

পরেশদা বলল,

।। "নারে ওটা চিতার আগুন নয়। দেখছিস না ওখানে কয়েকজন লোক জটলা করছে। কোন একটা রহস্য আছে মনে হচ্ছে।"

 একটু মুচকি হেসে আমি বললাম,

।। "দাদা তোমার কি ভয় করছে।"

পরেশদা একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

।। "ধুর পাগল। আমরা হলাম মিলিটারি ও সব ভয় টয় করলে আমাদের চলে না। তুই আছিস তাই নইলে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে আসতাম আসলে ব্যাপারটা কি।"

।। "আমি এখানে আছি। তুমি যাওনা, দেখে এসো ব্যাপারটা কি।"

।। "তোর ভয় করবেনা?"

পরেশ দার প্রশ্নের উত্তরে আমি বললাম,

।। "না, ভয় করবে কেন! আমার কাছে পিস্তল আছে তো।"

পরেশ হাসতে হাসতে বলল,

।। "হ্যাঁ তা তো বটে। তাহলে তুই এখানে একটু অপেক্ষা কর আমি একটু এগিয়ে দেখে আসি ওরা করা, কি করছে?" 

পরেশদা এগুতে যাবে, এমন সময় বনের ভিতর থেকে একজন বলে উঠলো,

।। "বাড়ি যাচ্ছেন যান, ওদিকে যাবেন না।"

   হটাৎ কথাটা শুনে আমরা দুজন চমকে উঠলাম। পরে নিজেকে সামলে নিয়ে পরেশদা বলল,

।। "এই, তুমি কে রে?"

ওই অপরিচিত লোকটি গাছের আড়াল থেকে বলল,

।। "আমি যেই হই, তোমার দেখার দরকার নাই। বারণ করছি তুমি যাবে না।"

দাদা বলল,

।। "কেন গেলে কি হবে?"

জঙ্গলের ভিতর থেকে ওই লোকটি আবার বললো,

।। "বিপদে পড়বে।"

।। "এই তুই কে রে? বাইরে বেরিয়ে আয় তো একবার দেখি।"

এমন সময় গাছপালার আড়াল থেকে মুখে গামছা বাঁধা একজন অপরিচিত লোক বেরিয়ে এলো। পরেশদা বলল,

।। "এই তোরা এখানে কি করছিস রে?"

 সেই লোকটি বলল,

।। "আমরা যাই করি সেটা তোমার দেখার দরকার নাই। তোমরা ভালোই ভালোই বাড়ি চলে যাও। নইলে বিপদে পড়বে।"

।। "না আমি যাব না। দেখব কি হচ্ছে ওখানে।"

    বলে পরেশদা এগিয়ে যেতে চাইলে ওই লোকটি বাধা দেয়। শুরু হয় দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি, পরেশদার কয়েকটা মোক্ষম ঘুষি খেয়ে লোকটা বেসামাল হয়ে বনের ভিতরে ছুটে পালাতে পালাতে মুখে একটা অদ্ভুত আওয়াজ করলো।

 দেখা গেল দূরে আলোর মধ্যে যে লোকগুলো জটলা করছিল তারা কে কোন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিকে ওদিকে ছুটতে লাগলো। আমি বললাম,

।। "দাদা ওরা যদি এদিকে আসে!"

 দাদা বলল,

।। "তোর পিস্তলটা বের করে আমাকে দে।"

বলে প্যাকিং করা পিস্তলটা বের করে কোমরে গুঁজে নিয়ে আমাকে বলল,

।। "ওরা এলে এটা আমি তোকে দেবো তুই ওদের দিকে তাক করে ধরবি। তার পর বাকি কাজটা আমি করে দেবো।" 

বলতে বলতে কয়েকজন আমাদেরকে ঘিরে ফেলল। একজন আক্রমণ করলে পরেশদার লাথি খেয়ে রণে ভঙ্গ দিলো। সমবেত আক্রমণ প্রতিহত করতে কোমর থেকে নকল পিস্তলটা বের করে তাদের দিকে তাক করে পরেশদা আমাকে বললো

।। "ভাই আমার পিছনে দাঁড়া।ওদের সবকটাকে আমি গুলি করে মারবো।"

বলে ওদের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে...


চলবে...


Address.

Prabir Mukherjee

Village. Ahamadpur. Kagash road.

Postoffice. Ahamadpur.

District. Birbhum. Pi. 731201

Mobile. 7001862434




Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.