ত্রৈমাসিক পত্রিকা: শিল্পে অনন্যা
(জুন সংখ্যা- ২০২৫)
সম্পাদক: ড. দীপক কুমার সেন
পাঠ প্রতিক্রিয়া: গোবিন্দ মোদক
ধানবাদ থেকে প্রকাশিত সাহিত্য-সংস্কৃতি ও গবেষণা বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা শিল্পে অনন্যা যা একাধারে নান্দনিক, মননশীল এবং সময়োপযোগী মূল্যবান লেখায় সমৃদ্ধ সংগ্রহযোগ্য একটি পত্রিকা। বিশ্ব শিশুশ্রম বিরোধী দিবস- ১২ই জুন-কে স্মরণে রেখে সম্পাদক ড. দীপক কুমার সেন মহাশয়ের সুযোগ্য সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকার ৭১তম সংখ্যাটি (এপ্রিল-জুন সংখ্যা- ২০২৫) যেখানে রয়েছে শিশুশ্রম বিষয়ক বেশ কিছু মূল্যবান প্রবন্ধ। প্রবন্ধকার শ্রী উজ্জ্বল কুমার দত্ত উপহার দিয়েছেন "বিশ্ব শিশুশ্রম বিরোধী দিবস এবং এক ভারতবাসীর অবদান" শীর্ষক তথ্যবহুল সুপাঠ্য মূল্যবান একটি প্রবন্ধ। প্রবন্ধটিতে শিশুশ্রম এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্ত কৈলাস সত্যার্থীর কর্মকাণ্ডের নানাবিধ দিক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। প্রবন্ধকার বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়ের "শিশু শ্রমিক সমস্যা: একটি অন্তর্তদন্ত" প্রবন্ধটির পত্রিকার আরেকটি মূল্যবান সম্পদ যেখানে ইঁটভাটার কিশোর, বাবুদের বাড়ির কিশোরী কাজের মেয়ে, মুদিখানা, হোটেল, বার, মিষ্টির দোকান, গোডাউন, গ্যারেজ, ঠিকাদারী সংস্থায় নামমাত্র পেটের ভাত এবং সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে নিয়োজিত / কর্মরত শিশু/কিশোর শ্রমিকদের প্রকৃতি এবং সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাদ যায়নি পরিযায়ী শিশু শ্রমিকের কথাও। বস্তুতপক্ষে এই শিশুশ্রম প্রথা প্রকারান্তরে সমাজের কাছে যে কতোখানি বিভীষিকাস্বরূপ এবং এর কুফল যে কতটা সুদূরপ্রসারী তা পাঠক মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারবেন এই প্রবন্ধটির প্রতিটি পংক্তিতে। তাই শিশুশ্রম বিরোধী আলোচনা চক্রে বা সেমিনারে "এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি – নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার!" যতোই বলা হোক না কেন তা আজীবন শুধু গাল-ভরা কথা হয়েই থেকে যায়। গায়ত্রী আচার্যের "যেদিন আমি শ্রমিক হলাম" নিবন্ধটির অনুভববেদ্যতাও এই একই রকমের।
প্রচ্ছদের বিষয়বস্তু ছাড়াও পত্রিকাটিতে রয়েছে নানা বিষয়ের উপর নানা স্বাদের বেশ কিছু ভিন্নধর্মী মূল্যবান সুপাঠ্য প্রবন্ধ। যতীন মাহাত রচিত "কৃত্তিবাসী রামায়ণে জীবের প্রত্যাশা ও অঘটনের দ্বন্দ্ব: এক বিশ্লেষণ" শীর্ষক প্রবন্ধে আমরা দেখতে পাবো — কিভাবে জীবের প্রত্যাশা ও অঘটনের দ্বন্দ্ব এই মহাকাব্যে ফুটে উঠেছে এবং কিভাবে এই দ্বন্দ্ব মানব জীবনের বাস্তব সত্যকে প্রতিফলিত করেছে। নাতিদীর্ঘ এই প্রবন্ধটি পত্রিকার আরেকটি মূল্যবান সম্পদ। গিলগামেশের মহাকাব্য আধারিত প্রবন্ধকার মানসী কবিরাজ রচিত "মৃত্যুমিথ এবং মহাকাব্য" শীর্ষক প্রবন্ধটি পাঠককে অনিবার্যভাবেই ভাবাবে। "ধূসরতম সময়ের অন্তর্লীন প্রত্যক্ষী- কবি সমর সেন" শীর্ষক প্রবন্ধটির জন্য প্রবন্ধকার শ্যামল শীল সমস্ত সনিষ্ঠ পাঠকের কাছে ধন্যবাদার্হ হবেন। "আমাদের অস্তিত্বগত ত্রুটি এবং তার সংশোধন" — এমন একটি চমৎকার বিষয়ে মূল্যবান লেখনীর ফসল উপহার দিয়েছেন প্রবন্ধকার মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়। চার্লস ডারউইনের বিখ্যাত তত্ত্ব প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং যোগ্যতমের উদবর্তন বিষয়টির নির্যাসকে উপজীব্য করে রচিত প্রবন্ধটির জন্য কোনও ধন্যবাদই প্রবন্ধকারের জন্য যথেষ্ট নয়। রাজ্যবর্ধন ধল মহাপাত্র রচিত "শাস্ত্র: নিঃসঙ্গতার অস্ত্র" শীর্ষক প্রবন্ধটির চমৎকার বঙ্গানুবাদের জন্য দীপিকা সেনাপতি পাঠকের সাধুবাদ পাবেন। প্রবন্ধকার অভিজিৎ দাশগুপ্তের "ওস্তাদের মার শেষ রাতে: আবোল তাবোল- এর সুকুমার" শীর্ষক প্রবন্ধটি যেমন ভিন্নধর্মী, তেমনিই সুপাঠ্য এবং সংরক্ষণযোগ্য। স্বরূপ মুখার্জী তাঁর প্রবন্ধে অত্যন্ত সুচারুভাবে করেছেন নিবিড় আলোকপাত — "বাংলা উপন্যাস: শরৎচন্দ্র: রুশ বিপ্লব"। প্রবন্ধকার সমরেন্দ্র বিশ্বাস তাঁর "হৌসাবাই-এর কাহিনী" প্রবন্ধে বিস্মৃতপ্রায় এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর জীবনীর উপর মরমী আলোকপাত করেছেন। অঞ্জন ভট্টাচার্যের "ভাগলপুরের অপসৃয়মান বঙ্গসমাজ" শীর্ষক নিবন্ধটি পত্রিকার আর একটি মূল্যবান সংযোজন।
বস্তুতপক্ষে একটি পত্রিকার সব থেকে সমৃদ্ধশালী অংশ হলো তার প্রবন্ধ ও নিবন্ধ যা পত্রিকাটির একটি নির্দিষ্ট মান (standard) কে উপস্থাপিত করে। সেই অর্থে একটি পত্রিকায় এতোগুলো ভিন্নধর্মী মূল্যবান প্রবন্ধের একত্র সমাবেশ অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয় যা অত্যন্ত নামীদামি বাণিজ্যিক পত্রিকাতেও সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। আর যে সার্বিক প্রচেষ্টা ও দক্ষতার সঙ্গে মাননীয় সম্পাদক এই অসামান্য সব প্রবন্ধের একত্র সমাবেশ ঘটিয়েছেন তার জন্য তাঁর পক্ষে কোনও ধন্যবাদই যথেষ্ট নয়।
পত্রিকাটিতে এই সুন্দর প্রবন্ধগুলি ছাড়াও রয়েছে সুখপাঠ্য একটি ভ্রমণ গল্প- সুন্দরডুঙ্গা অভিযান। কলমকার শ্রী অরূপ কুমার সিনহার অসামান্য কাব্যিক রচনাশৈলীর সৌজন্যে সনিষ্ঠ পাঠক নির্বিঘ্নেই সেরে নিতে পারবেন তাঁদের মানস ভ্রমণ — তাঁদেরও মনে হবে লেখকের মতো তাঁরাও যেন কুমায়ন হিমালয়ের এই দুর্গম সুন্দরডুঙ্গা অভিযানের এক-একজন শরীক। ভ্রমণ-গল্পের পাশাপাশি পত্রিকায় বিভিন্ন সামাজিক গল্পের হাতছানিও নেহাত কম নয়। ডাঃ তপন কুমার মাজির দু'টি সাদা ফুল গল্পটি পাঠকের মন কাড়বে। আইভি চট্টোপাধ্যায় উপহার দিয়েছেন সময়ানুগ সামাজিক গল্প প্রবঞ্চনা। ভুবন বন্দোপাধ্যায়ের ভিন্নধর্মী গল্প ভোলা বাউল নিজগুণেই ছাপ ফেলবে পাঠক-মনে। নাড়ির টান এবং সম্পূরক নামক স্মার্ট গল্পদু'টি উপহার দিয়েছেন যথাক্রমে সৌমিত্র মজুমদার এবং জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। রুচিস্মিতা ঘোষ রচিত প্রতিবেশী গল্পটির নির্মাণশৈলী বেশ নজরকাড়া। গল্পকার অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্তিম পর্ব গল্পটি বাস্তব জীবনের এক অনবদ্য প্রতিচ্ছবি। তনুশ্রী গড়াই রচিত আয়নার ভেতরে মানুষ নামক গোয়েন্দাধর্মী গল্পটিতে পাঠক পাবেন নতুনত্বের আস্বাদন।
পত্রিকার কবিতা বিভাগটিও অত্যন্ত বলিষ্ঠ যেখানে স্থান পেয়েছে বাইশটি নানা স্বাদের কবিতা। জীবনের পথে পথে ভ্রাম্যমান মানুষের ভ্রমণের ইচ্ছা অনবদ্য মুন্সিয়ানায় পরিস্ফূট হয়েছে কবি দুর্গাদাস মিদ্যার ভ্রমণ কবিতায়। ফিরে পড়বার মতো অনবদ্য একটি নস্টালজিক কবিতা উপহার দিয়েছেন কবি স্মৃতি শেখর মিত্র (সরকারী অনুদান)। কবি অতনু মিশ্রের কবিতায় বিশুদ্ধ বিবেকের প্রতিস্থাপন। "লোভের লালন অথবা একটি ডেথ সার্টিফিকেট" শীর্ষক একটি উত্তর আধুনিক কবিতা উপহার দিয়েছেন কবি হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়। একই কথা প্রযোজ্য মোস্তফা মঈনের লালপদ্ম কবিতা এবং প্রদীপ কুমার ঘোষের মন্ত্রপূত কবিতার ক্ষেত্রেও। কবি উৎপলেন্দু পালের নিভন্ত সম্পর্কের আগুন পাঠকের মননকে স্পর্শ করবে। কবি রীনা ভৌমিকের শক্ত খোসায় ঢাকা ধানে কবিতায় "মাঝরাতে একটা কালো ঘোড়া ঘা দিয়ে যায় সব্বার স্বপ্নের দরজায়। চুম্বকের মতো তার অমোঘ আকর্ষণ"! কবি চিত্তরঞ্জন পাত্র তাঁর কবিতায় নববর্ষকে আহ্বান জানিয়েছেন, নরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের রামধনু কবিতা জুড়ে শস্য শ্যামলা জন্মভূমির মানচিত্র। চমৎকার একটি অনুভবী কবিতা উপহার দিয়েছেন কবি বদ্রীনাথ পাল (সাজে কি আর)। "এভাবেই সবাই হারিয়ে যায়" — এমনই এক চমৎকার ভাবনায় ভাবিত হয়ে কবি অষ্টপদ মালিক উপহার দিয়েছেন একটি অনবদ্য কবিতা। কবি সুনীতি গাঁতাইত তাঁর এই সময় কবিতায় সমাজের দিকে তীব্র অঙ্গুলি-সংকেত করেছেন। পিন্টু দেওয়াশী, আভা চট্টরাজ, প্রদীপ চক্রবর্তী, শ্রীময় ঘোষ, যাদব দত্ত প্রমুখ কবি তাঁদের কবিতায় স্বনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
সুমন গুপ্তের অসাধারণ প্রচ্ছদ পত্রিকাটিতে ভিন্নমাত্রা দান করেছে। সব মিলিয়ে শিল্পে অনন্যা-র বর্তমান সংখ্যাটি হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম বিরোধী আন্দোলনকে উৎসাহিত করে তোলবার এক মহান হাতিয়ার — যার জন্য ড. দীপক কুমার সেন অবশ্যই সবার ধন্যবাদার্হ হবেন। পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যার দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে থাকাই যায়।
ত্রৈমাসিক পত্রিকা: শিল্পে অনন্যা (জুন সংখ্যা- ২০২৫)
সম্পাদক: ড. দীপক কুমার সেন
প্রকাশ স্থান: ধানবাদ, ঝাড়খণ্ড
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: শ্রী সুমন গুপ্ত
মূল্য: ১০০ টাকা
___________________________
প্রেরক: গোবিন্দ মোদক।
সম্পাদক: কথা কোলাজ সাহিত্য পত্রিকা।
রাধানগর, ডাক- ঘূর্ণি, কৃষ্ণনগর, নদিয়া।
পশ্চিমবঙ্গ, ডাকসূচক - 741103
