বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

ধারাবাহিক উপন্যাস ।। চাবি (শেষ)।। সপ্তদ্বীপা অধিকারী

 

প্রেম

 চাবি  

সপ্তদ্বীপা অধিকারী

 

পঞ্চম পরিচ্ছেদ 

 

ত্রিপর্ণা  নিজের বাড়িতে গেট-টুগেদার পার্টির আয়োজন করেছে যাদের যাদের সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছে। 

 কাউকেই বাদ দেয়নি সব্বাইকেই বলেছে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও একদম ঝা চকচকে বিয়ে বাড়ির মতোই এলাহি কাণ্ড-কারখানা করে তুলেছে এর মূল কারণই হলো শুধুমাত্র নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখানো একইসঙ্গে পলিকে কতোটা হীন, নিচ, স্বার্থপর, অশিক্ষিত তা প্রতীয়মান করা অনুষ্ঠানের দুই দিন আগে থেকেই সে প্রায় প্রতিদিন একটা না একটা সোনার বা হিরের বা ডায়মণ্ডের গয়না নিয়ে নিয়ে পলির ফ্ল্যাটে গেছে কোনোদিন বাড়িতে ডেকে এনেছে নিজের আলমারি খুলে জানতে চেয়েছে কোন্ শাড়ির সাথে কোন্ গয়নায় বেশি ভাল্লাগবে কোন্ কোন্ শাড়ির পাড়ের কল্কার সাথে ম্যাচিং করা গয়না এবং ব্লাউজ বানিয়েছে, সেইসব দেখিয়েছে আসলে সে তার বৈভব দেখিয়েছে কিন্তু মুখখানা এমন করে রেখেছে যেন, সে সত্যিই খুব চিন্তান্বিত এতসব লোকজন আসছে কী পরবে, কী খেতে দেবে সেই চিন্তায় অস্থির

অনুষ্ঠানের দিন ত্রিপর্ণা সেজেছিলও চমৎকার পলির কিন্তু সেই একই চুল বাঁধা সেই সুতির শাড়ি কপালে সিঁদূরের টিপ হাতে শাঁখা-পলার সাথে বেশ মোটা মোটা দুটো বালা পরেছে ত্রিপর্ণার গয়নার শেষ নেই কিন্তু সে চেয়ে চেয়ে পলির ওই সবেধন নীলমনি বালা দুটো দেখছে অনেকক্ষণ থেকে টেরিয়ে  দেখছে আর ভাবছে এই বুঝি পলি বালা দুটো ওকে দেখাবে যেমন দেখিয়েছে দেখিয়ে বলবে--" দিয়েছে জানিস...! ইত্যাদি প্রভৃতি" যেমন এই কয়দিন ধরে দেখাচ্ছে ভেবেই রাগে পকপক করছে ত্রিপর্ণার ভিতর চায় না পলির কিচ্ছু থাকুক পলির আগাপাস্তালা

শুধু শূন্য হোক শূন্য পলির কষ্ট দেখতে চায় সে শুধু এতোটাই কষ্ট দেখতে চায় যে, পলির মৃত্যুও সে কামনা করে না মরে গেলে সেতো ওকে জ্বালাতে পারবে না কিন্তু বাস্তবে সে তো পলিকে বিন্দু পরিমাণও জ্বালাতে পারছে না এইটাই তার মাথায় যেন খুন চড়িয়ে দিচ্ছে পলি তো কই একবারো ওর ওই মোটা মোটা বালা জোড়া দেখালো না!

আর থাকতে না পেরে অমলেশকে বলেই ফেলল

বলল--"ওতো একবারও ওই বালা দেখালো না! ওর এতো অহঙ্কার আমার অসহ্য লাগছে অমল!"

অমলেশ ফুৎকারে উড়িয়ে দেয় বলে--"তুমিও যেমন! কোথায় পাবে ওইরকম মোটা মোটা বালা সব গিলটি করা গয়না!"

ত্রিপর্ণার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর নামল এতোটাই স্বস্তি লাগছে ভাবল যে, পলির এই দৈন্যতা সবার সামনে ফাঁস করবে

তখন খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে ছাদের উপর অমলেশ একখানা বিরাট কমন রুম করে রেখেছে অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে সকলে বসে আড্ডা দেবার জন্য সারাদিন ত্রিপর্ণার শাড়ি আর গয়না আর সেই সাথে পার্লারের ঝা চকচকে রূপে চমকে সবার চোখ ধাঁধিয়ে ঘুরেছে এখন এই কমনরুমে বসে আড্ডা চলছে দিদিমনিদের প্রায় প্রত্যেককে ডেকে ডেকে পলির সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছে বলেছে--"আমরা তো আসলে একই স্কুলে পড়েছি ওর  বাড়ি কুসুমতলি আর আমার ধরমপুর যদিও দূরত্ব অনেকটাই কিন্তু স্কুল একই সেই নয়ানজুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এমন কি আমাদের ধরমপুরের "ধরমপুর ফ্রি প্রায়মারি বিদ্যালয়ে" আমরা একসাথে পড়েছি ওকে কি ফেলতে পারি? ওকে আর ওর বর আর মেয়েকে আমিই থাকতে দিয়েছি"

পলি একবারো প্রতিবাদ করেনি একবারও বলেনি যে, প্রতি মাসে কুড়ি হাজার টাকা ভাড়া দেয় আর ওর বর ওদের বাগান পরিচর্যা করে পলি ইচ্ছে করলে বলতেই পারত যে, ত্রিপর্ণাই তাকে জোর করে রেখেছে ত্রিপর্ণার মেয়ের পুরো দায়িত্ব পলিই সামলায় তার জন্য একটি পয়সাও পারিশ্রমিক নেয় না নাহ এসব কথা পলি বলেনি ত্রিপর্ণা প্রথম প্রথম ভয়ে ভয়েই ছিল ভেবেছিল পলি যদি ফাঁস করে দেয় আসল সত্য! কিন্তু সারাদিনে এতোবার ত্রিপর্ণা পলিকে অপমান করল, এত্তোবার করে বলল --"পলি, পুটুশ কোথায়? ওকে কোথায় রেখেছিস?"

পলি একবারও তেমন কথা বলেনি

ত্রিপর্ণা জানে যে পলি ওর মেয়েকে ওর থেকেও ভালোভাবে যত্ন করে তবুও এভাবে বলার অর্থ সকলের কাছে বোঝানো যে, পলিকে আসলে সে তার বাচ্চার গভর্নেস হিসেবে রেখেছে পলি একবারো প্রতিবাদ করেনি কী সুন্দর করে হেসে প্রতিবার ত্রিপর্ণার কথার জবাব দিয়েছে মিষ্টি করে ত্রিপর্ণার তাতে রাগ আরও বেড়েছে যেন কিছুতেই তার হাজার বার করে করা অপমানে তার

কিচ্ছুই হয়না ত্রিপর্ণা আরও রেগে যায় কী করবে ভেবে পায়না কীভাবে কী করলে এই নিচু জাতের, ভিখিরিটাকে অপমান করা যাবে তা সে যেন ভেবেই পায় না

অনেকেই তখন চলে যাচ্ছে ত্রিপর্ণার শরীর জ্বলছে পলিকে তো কিছুই করা গেল না! স্কুলের যে কয়েকজন দিদিমনি এসেছিলেন, তাঁরা সব্বাই আজও পলিকেই ভালোবাসেন! কেন? কেন? কেন? ত্রিপর্ণার সাথে পলির কোনোই তুলনা হয়না না রূপে, না শিক্ষায়, না রুচিতে, না সামাজিক অবস্থানে! তবু! তবুও ঝর্না দিদিমনিকে যখন পলি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল, ঝর্নাদি ওকে কীভাবে জড়িয়ে ধরলেন! বাপরে! যেন একদম নায়িকাসবার সাথে সবাই ছোটোবেলার সেইসব গল্প করছে ত্রিপর্ণাও করছে কিন্তু তার মাথা বনবন করে ঘুরছে! এত্তো টাকা খরচ করা হলো যার জন্য তাতো করা হলো না! কিছুই তো অপমান করা গেল না! ওর ওই মিষ্টি হাসিটা যেন একটা নিরেট হাতিয়ার সমস্ত অপমানকে ছিটকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে

সস্তা একটা তাঁতের শাড়ি পরেছে আর কপালে টিপ! তাতেই এত্তো সুন্দর কেন লাগছে? কেন লাগবে ওকে এত্তো সুন্দর? কেন সব্বাই এখনো ওকে অতোটাই ভালোবাসবে? বান্ধবীরা, বন্ধুরা, বন্ধুর বউরা, বান্ধবীর বরেরা সব্বাই ওকে এবং পলিকে সমান দৃষ্টিতেই দেখছে! কেন? কেন? ত্রিপর্ণার ইচ্ছে করছে সব্বাইকে জিজ্ঞাসা করতে যে, কী এমন আছে পলির মধ্যে? ওকে মাথায় তুলে নাচার মতো কোনো গুণই ওর নেইএকদম হঠাৎ ত্রিপর্ণার খেয়াল হলো যে, পলির হাতের ওই গিলটি করা বালা জোড়ার কথা! ওইটা নিয়ে বললে সব্বাই ওর বর্তমান অবস্থা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে ত্রিপর্ণা এটা ভেবেই গলায় মধু ঢেলে বলল--"পলি, আয় এখানে"

পলি এগিয়ে এলেই বলল--"আমি তো খেয়ালই করিনি যে, তোর হাতে এত্ত সুন্দর সুন্দর দুটো বালা পরেছিস! দারুণ লাগছে কিন্তু!"

বলতে বলতে ওর খেয়াল হলো যে, পলির বালার সাথে ম্যাচিং করে একই ডিজাইনের কানের দুল এবং গলায়ও হারও  রয়েছে ত্রিপর্ণা বলল--"আরে দেখি দেখি বাহ! দারুণ তো!"

ত্রিপর্ণার ধারণা এবার পলি বলবে যে, এগুলো সব গিলটি করা গয়না

কিন্তু পলি তো কিছুই বলে না একিরে! কিছু বলে না কেন?

ত্রিপর্ণা বলে--"এই পলি খোল না রে! একটু দেখা!"

পলি এবার বলবে ভাবলো ত্রিপর্ণা! কিন্তু কোথায় কী? পলি যে সবগুলোই সত্যি সত্যি খুলে সবার সামনে রাখল উল্টে-পাল্টে দেখে বোঝাই গেল যে, সেগুলো গিলটি করা নয় সব আসল সোনা ত্রিপর্ণার যতটুক যন্ত্রণা হলো, তার থেকে বেশি হলো অবাক! কেমন করে সম্ভব? পলি এতো টাকা

পায় কোথায়? ওর বর যে কিছুই করে না! সেই গ্রামে টিমটিমে মিষ্টির দোকান থেকেই এতো আয় করা কি সম্ভব?

সে বলল--"তোর বর কী কোনো চাকরি পেয়েছে রে?"

পলি বলল--"নারে! ওর সেই মিষ্টির দোকানই সব আর তো কিছু নয়"

ত্রিপর্ণার অবাক চোখের দিকে চেয়ে পলি যথারীতি সেই একই রকম হাসলো সেই হাসি সবকিছু নস্যাৎ করা হাসি ত্রিপর্ণা আর কিছুই বলার ভাষা খুঁজে পেলো না!

ঠিক এই সময় পুটুশ কাঁদতে কাঁদতে ঘরে এল এখন সামান্য সামান্য কথা বলে যদিও তা অস্পষ্ট  কিন্তু বোঝাতে পারে দুই চোখ বন্ধ করে সে পলির দিকে হাত দুটো তুলে দিল মানে পরিষ্কার--"কোলে নাও!"

পলি কোলে নিলে মেয়ে বলে--"শীত কয়ে শীত কয়ে" অর্থাৎ ওর শীত লাগছে ত্রিপর্ণা বলে--"এই গরমে শীত পাচ্ছে কোথায় বলতো পলি?"

পলি কপালে, গলায় হাত দিয়ে তাপ অনুভব করে বলল--"নাতো শরীর তো স্বাভাবিকই"

ত্রিপর্ণা হাত পাতল--"আয় মা!"

মেয়ে এক ঝটকায় মায়ের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল--"মাসি, মাসি ওকেনে চলো" মানে হলো অন্য ঘরে চলো যেখানে মা থাকবে না! বা অন্য কেউ থাকবে না! একফোঁটা মেয়ে হলে কী হবে? একদম পাকা অন্য ঘরেই চলে গেল পলি! অন্য ঘর আর কোথায়? গেছে একদম পাশের ঘরেই এখান থেকেই মেয়ের আর মেয়ের মাসির হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে বান্ধবীরা বলল--"তুই  অনেক কপাল করে পলিকে পেয়েছিস! বাচ্চা রেখে অফিস করার মতো যন্ত্রণা আর কিছুতে নেই! একমাত্র মায়েরাই জানে ছোটো শিশুকে রেখে অফিস করা কতোখানি যন্ত্রণার বুক ফেটে যায় বাচ্চারও ঠিক মতো যত্ন হয়না তবুও  যেতে হয় প্রাণ কাঁদে খেতে পারিনা তবুও যেতেই হয়"

সব্বারই একই মন্তব্য ত্রিপর্ণা কী ভেবে এই যে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করল, তার কী হলো! সব তো মাঠেই মারা গেল! এখন ওই ছোটোলোকটাকে আবার অন্য কেউ না চেয়ে বসে! সবারই তো ছোটো ছোটো বাচ্চা এইরকম বিশ্বস্ত আর ভালোবাসার মানুষ পেলে কেউ কি ছাড়বে?

একটু পরেই আবার পুটুশ এই ঘরে এলো নিজে নিজেই হেঁটে, হেঁটে কী হয়েছে বা কী ভেবেছে তা - জানে মেয়েটা পরির মতো সুন্দর একটা গোলাপী ঘাগরা পরিয়েছে পলি সেই সাথে সারা শরীরে ম্যাচিং গয়না! খুব মিষ্টি লাগছে কয়েক মিনিট আগেই বলল যে, ওর নাকি শীত করছে আর এইটুক সময়েই তার মুড পুরো চনমনে ত্রিপর্ণা হাত বাড়ালো

"পুটুশ সোনা, এসো এসো আমার কাছে এসো"

কী মিষ্টি করেই না মেয়ে হাসলো! কিন্তু কাছে এলো না ত্রিপর্ণা আবার হাত বাড়ালো "এসো মা!"

মেয়ে হঠাৎ এক চিৎকার করে হাসতে হাসতে দৌড় দৌড়ে গিয়ে দরজার পিছনে লুকিয়ে বলে--"টুটি!"

সব্বাই হেসে উঠল

ত্রিপর্ণা বলল--"কোথায় লুকালে পুটুশ মা? দেখতে পাচ্ছি না তো!"

মেয়ে বলে--"টুটি!"

আর খিলখিল করে হাসে লুকোচুরি খেলে তার মানে মেয়ের সাথে পলি অনুষ্ঠান বাড়িতে পলির মেয়েও আছে বেশিরভাগ সময় পলির মেয়ে থাকে সুবলের কাছে পলি বলে--"বড্ড বাপ-ন্যাওটা মেয়ে হয়েছে আমার খিদে লাগলে আমার কাছে আসে অন্য কোনো সময়েই সে আসে না সে চেনেই না যেন আমাকে!"

পুটুশের খুব লুকোচুরি খেলার শখ হয়েছে এখন সে বারবার লুকাচ্ছে আর বলছে--"টুটি!"

খেলতে খেলতে কেউ যদি বলে--"ধরতো, ধরতো পুটুশ সোনাকে ধরতো!"

দুটো হাত উঁচু করে, চিৎকার করে, ছুটতে থাকে আর খিলখিল খিলখিল করে হাসে

ঠিক এইরকমই ছুটতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল পুটুশ! আর যায় কোথায় কান্না যে আরম্ভ হলো আর থামে না পলি মনেহয় অন্য কোথাও গেছে ত্রিপর্ণা এত্তো কোলে নিতে চাইছে মেয়ে কিছুতেই এলো না! ত্রিপর্ণা জোর করতে গেলে মেয়ে আরও জোরে চিৎকার করে কাঁদে ঠিক এই সময় পলির আগমন তাকে দেখেই মেয়ের ব্যথা যেন দশগুণ বেড়ে গেল পলিও কোলে তুলে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল তারপর দেখল যে, মেয়ের হাঁটু ছড়ে গেছে পলি মেয়েকে কোলে নিয়েই নীচে গেল পায়ে স্যাভলন লাগিয়ে ঠাণ্ডা করেযখন আবার যখন উপরে সবার কাছে এসেছে, তখন মেয়ে ঠাণ্ডা! একদম শান্ত! কিন্তু চোখে জল আর তখনো ফোঁপাচ্ছে অল্প অল্প আর  চুপচাপ পলির কোলে বসে রয়েছে

পলি ঘরে এসে বলল--"বাচ্চাদের কিছু সমস্যা থাকে সব বাচ্চাদের এই সময় ওরা কিছু বোঝেনা কিন্তু "ধর", "ধর" বললেই ঊর্ধশ্বাসে ছোটে এটা ওদের অভ্যাস কিন্তু আমাদের এই সময় খেয়াল রাখতে হবে, আমরা যখন ওদের এভাবে ছোটাবো, তখন আশপাশটায় একটু নজর রাখবো যেখানে পড়েছে ওখানে একটা বটি পড়ে রয়েছে ওর আরও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারত তাই না?"

সব্বাই মুখ নিচু করে নিল কারণ সক্কলেই এই খেলায় অংশগ্রহণ করেছে

পলি বলল--"আর এই ব্যাপারটা কিন্তু মায়েরই  সবার আগে দেখা কর্তব্য"

বলে সে মেয়েকে কোলে নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল!

ত্রিপর্ণার এই বিষয়ে রাগ হয়না বরং খুব খুশি হয় পুরো দিন, পুরো সপ্তাহ, পুরো মাস এবং পুরো বছর বাইরেই থাকে কতোটুক সময় থাকে সে বাড়িতে? রাতে যখন ফেরে তখন পুটুশ জেগে থাকলে দেখা হয় মা-মেয়ের, যখন রওনা হয়, ম্যাক্সিমাম দিনই মেয়ে ঘুমায়, তাই আকণ্ঠ পিপাসা নিয়েই ত্রিপর্ণাকে দিন কাটাতে হয় ত্রিপর্ণার বুকের ভিতরে হাহাকার করে মেয়েটার জন্য নইলে ঘুমন্ত মেয়ের মুখটা একবার দেখেই তৃষ্ণা মেটাতে হয় সেই হাহাকার তো মিটবে না কিন্তু মেয়েটা তার অভাব পুষিয়ে নিচ্ছে এই ভালোলাগায় সে আপ্লুত তাই পলির উপরেও সে কৃতজ্ঞ

তাই সে হাসল মিষ্টি হাসি আর তখনই ত্রিপর্ণার আশা পূরণ হলো এতোটা সময় হাজার চেষ্টা করেও যাদের মুখ দিয়ে পলির বিরুদ্ধে একটাও বাজে কথা বলাতে পারেনি সে, এক মুহূর্তের চিলতে হাসি সেই চাহিদারই পূরণ ঘটালো কে যেন বলল--"এটা কি ঠিক ত্রিপর্ণা?"

অন্য কেউ বলল--"মায়ের চেয়ে মাসির দরদ যেখানে বেশি হয়, সেখানেই গণ্ডগোল"

আর কেউ নন, তাদের একজন দিদিমনি বলেছেন এই কথা! ত্রিপর্ণার বুকে শান্তি হচ্ছে আহ! হাহাকার দূরে গেল সরে এইটাই তো সে চায়! তবুও সে কোনো কথা বলতে পারল না কেন কে জানে!

এইসময় কোনো এক বান্ধবী বলল--"আরে বয়স তো হয়েছে মনেহয় ছেলেমেয়ে আর হবে না

 সেইজন্যই তো পরের সন্তান নিয়ে আদিখ্যেতা দেখাচ্ছে!"

অন্য একজন বলল--"ত্রিপর্ণা খুব সাবধান কিন্তু ভালো মনের মানুষ হতেই পারেনা"

কেউ বলল--"নারে তুই বরং তাড়িয়ে দে"

কেউ বলল--" আরে লোকের অভাব নেই আমিই বলে দিচ্ছি একজনকে!"

কিন্তু ত্রিপর্ণা জানে পলির মতো সৎ মানুষ শুধু দুষ্প্রাপ্যই নয়, পাওয়া যাবেই না!

বিশেষ করে তার পুটুশ পলিকে পেয়ে খুশি মায়ের অভাব পুরণ করছে যে নারী, তাকে অসম্মান করতে মন চাইছে না ত্রিপর্ণার তবুও সে পলি নি:সন্তান বলার কোনো প্রতিবাদও করে না মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ ভেবে সব্বাই যখন পলির গুষ্টির শ্রাদ্ধ করতে উদ্যত, ঠিক সেই সময় এই ঘরে সুবল

নিজের মেয়েকে কোলে নিয়ে হাজির সে তখন বলছে--"পলি কোথায়? পলি, পলি?" ডাকতে ডাকতে সুবল আসে সেই ঘরে

কে যেন বলে--"পলিকে দিয়ে কী হবে গো? পলি তো ত্রিপর্ণার মেয়েকে নিয়েই ব্যস্ত"

সুবল এক গাল হাসে বলে--"ত্রিপর্ণার মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে সেতো সব্বাই জানে আসলে আমাদের মেয়ের দুধ খাবার সময় হয়েছে তো তাই মাকে খুঁজছে!" বলতে বলতে চলে গেল সুবল কে যেন জিজ্ঞেস করল--"এখনো বুঝি বুকের দুধ খায়?"

সুবল শুনতে পায়নি শুনেছে ত্রিপর্ণা

সে বলে--"হ্যাঁ এই বুড়ো বয়স পর্যন্ত পলি মেয়েকে বুকের দুধ খাওয়ায়

 

সোনা আর শিপ্রা এখন কুসুমতলিতে মিষ্টির দোকান দিয়েছে আগে একমাত্র সুবলের দোকানেই মিষ্টি পাওয়া যেত আর নিজেদের গ্রামের মানুষই শুধু না, আশেপাশের মানুষজনও সুবলের দোকানের উপর নির্ভর করত তাতে একটা সুবিধা ছিল সুবল আর সুবলের বাবা যা মিষ্টি বানাতো, তার এক কপর্দকও পড়ে থাকতো না অনেক সময় খারাপ হয়ে যাওয়া মিষ্টিও সুবল বাধ্য হয়েছে চালিয়ে দিতে

একবার নয়, এমন যে কতোবার হয়েছে যে, তিনটে গ্রামের পরের গ্রাম থেকে মাঠ ঠেঙিয়ে কেউ মিষ্টি নিতে এসেছে সুবল মনেপ্রাণে সৎ সে ঠকাতে পারে না বিশেষ করে তখন সবে সব কাজ-টাজ করে সে শুয়েছে সেই কোন্ ভোরে উঠে উনুন জ্বেলে মিষ্টির দুধ জ্বাল দিতে শুরু করেছে অত্যন্ত মেহনতি করেই সে এই মিষ্টি বানায় সাহায্যকারী প্রায় নেই বললেই চলে  সে জানে কয়েকজন সাহায্যকারী পেলে কাজটা আরও সুচারুভাবে সে সম্পন্ন করতে পারে কিন্তু তবুও কাউকেই নেয় না নতুন করে মাইনা এবং খাবার দেবার একটা চাপ তো থাকেই

তো সে যাই হোক খরিদ্দার ডাকে

ঘুম চোখে যতোবারই সে বলে--"মিষ্টি আর নেই"

ততই খরিদ্দার বলে--"এট্টু দেকো না ভাই কিচ্চু নেইকো দানাদার, রসগুল্লা, নিমকি ঝা হোক কিচু দিলিই হবে দিদিরি দেকতি এইয়েচ খবর না দিয়ি এলি হয় বলোদিন? এট্টু মিষ্টি পাতে না ছোঁয়ালি ঝে মান থাকে না মা কোদ্দেচে ডিমির অমলেট, চা, মুড়ির মোয়া ছেল ঘরে তা এট্টু মিষ্টি না দিলি কেরাম্ভায় কী হয় বলো"

সুবল তার কাচা ঘুম ভেঙে  উঠে আসে বলে--" নেইকো বললি কতা বিশ্বেস যাও না! কী বলি বলোদিনি"

বলে সে উঠে পড়ে দোকানের ঝাঁপ খোলে সামনে গেট থাকলে কী হবে পিছনে দরমার ভাঙা বেড়া ঠেলে ঢুকে পড়ে ঘেয়ো কুকুর-বিড়াল তারা তখন কলের গোঁড়ায়, মেঝেতে পড়ে থাকা ছানা-কাটা জল চকচক করে খাচ্ছিল সুবল একটা ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারলে কেঁউ কেঁউ করে পালায় কুকুরের দল ম্যাও ম্যাও করতে করতে বিড়ালেরাও আড়ালে সরে যায় সুবল দেখায় তার ছোট্ট কাচের শেল্ফ সব খালি কয়েকটা মাছি ভনভন করছে খালি মাছিগুলো আসলে গন্ধ খাচ্ছে খিদে পেলে গন্ধেতেও পেট ভরে যায় কিংবা কে জানে, ওই কাচের ঘরের গায়ে কোথাও হয়ত মিষ্টির রস লেগে আছে খরিদ্দার চেয়ে চেয়ে দেখে বলে--"মা বলে দেচে কিচু না কিচু নে যাতিই হবে"

বলে সে চারিদিক দেখে কাচের শেল্ফে কিচ্ছু নেই তা ঠিক কিন্তু মেঝেতে অনেক পাত্র পড়ে কোনোটাতে জল, কোথাও মাখা খানিকটা আটা কোথাও কয়েকটা পাতি লেবুর খোসা হঠাৎ খরিদ্দার দেখতে পায়, একটা খোলা বাটিতে কতোগুলো রসগোল্লা রসও আছে রসটুকু কেমন ঘোলা ঘোলা অধীর আগ্রহে খরিদ্দার সেদিকে সুবলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে--"সুবলদা, ওইদিকি দেকো রসগুল্লা রইয়েচ"

সুবল বলে--"আরে ওগুলো নষ্ট হই গেচ"

খরিদ্দার নাছোড়বান্দা

অবশেষে সেই খরিদ্দার একটা রসগুল্লা খেয়ে বলল--"কিচুই খারাপ হয়নিকো সুবলদা খালি এট্টু টকসা -টকসা কিচু হবে নাকো দিলি ওরা ঠিক খেয়ি নেব্যানি"

বলে সেগুলো নিয়ে নেয় শুধু তাইই নয় সুবলকে দামও দিতে আসে সুবল জিভ বার করে পিছিয়ে যায় বলে--"তুম নে যাচ্চো তোমার নিজির ইচ্ছেতে মুই নিষেধ করিচি এই মিষ্টির ঝন্যি দাম নোবো?"

সেই সুবলের বিয়ের পরে অনেক পরিবর্তন সে এখন মিষ্টি তৈরিতে নিজের সমস্ত পরিশ্রম, মেধা এবং ভালোবাসা দান করে দোকানে আর কুকুর বিড়াল ঢুকতে পারে না পলি নিজের হাতে পরিষ্কার করেছে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কঞ্চির উপর এঁটেল মাটি ছেনে লাগিয়ে দেওয়া করিয়েছে গ্রামের বউঝিদের দিয়ে এখন সুবলের দোকান ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর সোনা আর শিপ্রাও সুবলের শ্বশুর বাড়িতে মিষ্টির দোকান খুলেছে আসল কারিগর সুবল নিজে হলেও সকলেই মনপ্রাণ দিয়েই হাত লাগায়

কথায় কথায় পলি বলে--"এটা আর আমাদের বাড়ি নেই এটা এখন সুবলের শ্বশুরবাড়ি"

আসলে পলির জন্য এলাকায় খুব সুনাম কুড়িয়েছিল সোনা আর শিপ্রাও বরাবরই যদিও পলিদের বাড়ি ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তার দাদু খুব ভালোমানুষ ছিলেন তাঁকেই ভালোবেসে গৃহত্যাগ করেছিলেন সরমাদেবী বিখ্যাত আইনজীবীর সাথে সরমাদেবীর বাবা বিয়ে দিয়েছিলেন সরমাদেবী তাঁর স্বামীকেই অনন্যোপায় হয়ে সব বলে দিয়েছিলেন কী অসমসাহসিক মনোবল ছিল তাঁর! আজও এখনো গ্রামের মন্দিরে মনোমোহন-সরমাদেবীকে হর-পার্বতী রূপে পুজো করা হয় এতোটা খ্যাত হবার পরও সুবলের মিষ্টির দোকান পলিদের বাড়ির সামনে হতেই  গ্রামের সবাই বলতে আরম্ভ করলে "সুবলের শ্বশুরবাড়ির মিষ্টির দোকান"!

মজা করে তাই পলিও বলে--"সুবলের শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি"

পলিকে মাঝে মাঝে আসতেও হয় কারণ সোনা আর শিপ্রা বড্ড ছেলেমানুষ ঠিকঠাক করে সব দিক সামলাতে পারছে কীনা দেখতে আসে নিজেই পলির ইচ্ছানুসারেই দুই জনকেই প্রাইভেটে পড়তেও হচ্ছে তারা পড়াশুনাও করে, সংসারও করে আবার মিষ্টির দোকানও করে

মিষ্টি বানানো এতোটাও সহজ নয় খুব যত্নে তৈরি করতে হয় নইলে কোনো মিষ্টিই সঠিক হয়না এমন কি দুধের গুণাগুণের উপরও মিষ্টি তৈরির সফলতা নির্ভর করে অনেক খানি গ্রামে খুব বেশি বাড়িতে গরু-ছাগল নেই বাইরের গ্রাম থেকে দুধ আনাতে হয় অনেকের মোবাইল নেই কোথাও গরুর বাছুর হলে খবর চলে আসে মুখে মুখে তখন সেই বাড়িতে গিয়ে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে হয় দুধ নেওয়ার জন্য এখন কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চা হবার পর গাই গরুকে ইঞ্জেকশান দেওয়া হয় বেশি দুধ পাবার জন্য পলি শুরুতেই বলে দেয়--"গরুকে ইঞ্জেকশান দেবেন না যেটুক দুধ হবে তা গরুর বাছুর খাবে আপনারা রাখবেন বাকিটা দেবেন" এইসঙ্গে পলি এটাও বলে দেয়--"দাম বেশি দিচ্ছি কিন্তু মিথ্যা বললে জীবনেও দুধ নেবো না"

পলি আরও বলে--"গরুকে বিচালির সাথে ঘাস দেবেন খোল-ভুষি-খুদ-কুঁড়ো দেবেন ভাতের ফ্যান দেবেন  ফেলে দেওয়া সব্জি দেবেন ছোটো ছোটো করে কেটে"

পলি এইভাবেই মিষ্টি তৈরি করছে গ্রামের ছেলেদেরই বিভিন্ন কাজে সহায়ক হিসেবে নিচ্ছে কিছু কিছু মিষ্টান্ন যা পলি তৈরি করে তা অসামান্য সত্যিই তা এক্কেবারে অমৃতই লাগে দুধের সর দিয়ে খাঁটি ঘিও বানায় তারা

এবারও পলি এসেছে এমনই একটি কাজে কিন্তু বেশিদিন সে তো থাকতে পারবে না ত্রিপর্ণা কিছুতেই ছাড়তে চাইছিল না বারবার বলছিল--"তুই কেন যাবি পলি? আমার মেয়েটা যদি অসুস্থ হয়?"

পলি বলেছিল--"দরকার হলে তুই ছুটি নিয়ে সামলাবি ত্রিপর্ণা আমার মা-বাবা নেই কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ি আছেন অল্পবয়সি ভাইটা আছে তার কলেজে পড়া বউ রয়েছে আমাকে তাদের দায়িত্ব পালন করতেই হয় ত্রিপর্ণা আমাকে যেতেই হবে"

এই শেষের বাক্যটা পলি এমন করে উচ্চারণ করে যেন মনেহয়, ওটা শব্দ দিয়ে তৈরি কোনো বাক্য নয় যেন করাত ঘচাং করে কেটে ফেলতে পারে পলির এই পার্সোনালিটিটাই সে একদম সহ্য করতে পারে না অথচ প্রতি মুহূর্তে সে এইটাই সহ্য করে যাচ্ছে পলি যখন যাবে বলেছে, তখন সে যাবেই ত্রিপর্ণা জানে আবার এও জানে যে, পলি তার পুটুশকে ভালোও বাসে যার উপর পৃথিবী সমান রাগ, তাকেই সে জিজ্ঞাসা করে অসহায়ের মতো--"তাহলে কী হবে পলি?"

ত্রিপর্ণা জানে তার পুটুশের এই সমস্যা পলি নিজেই সমাধান করবে সে নিশ্চিত জেনেই অমোন অসহায়ের মতো চেয়ে থাকে পলির দিকে

পলি একটু থেমে থাকে কী যেন ভাবে অথচ সে সেই সময় বাস ধরবে, তারপর ট্রেন ধরবে তারপর ভ্যানে করে অনেকটা পথ যাবার পর সেই কুসুমতলি আসবে তার মাথাতেও অনেক চিন্তা আবার কীসব ব্যবসা-ট্যাবসাও করে ত্রিপর্ণা জানে পলি নিজেকে যথেষ্ট সম্মান করে সেই জন্যই ওই ফালতু দুধের না কীসের যেন ব্যবসা করে অর্থাৎ ওর জীবনে অনেক সমস্যা অনেক মানে অনেক ঠিক সেইসব কাজেই সে যাচ্ছে গ্রামে তবুও পুটুশের জন্যও পলি কিছু একটা করবে জানে ত্রিপর্ণা

পলি রেডি হয়ে গেছে সে বেরচ্ছে পুটশও যথেষ্ট পাকা হয়ে উঠেছে কেমন হা করে দেখছে সে তার মাসিমনিকে ত্রিপর্ণাও  বেরবে অফিসে অমলেশও পলি এইসময় বলল--"আমরা পালা করে সন্তান দেখি আমার মেয়ে লিলি ওর বাবার কাছেই থাকবে তুই যদি মনে করিস আমাদের ঘরে রাখতে পারিস মনে হয়না কোনো সমস্যা হবে বলে আর আমি তো প্রতি মুহূর্তে ভিডিও কল করব আর লিলির সাথে পুটুশের কিন্তু দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে"

ত্রিপর্ণা চুপ করে আছে দেখে পলি বলল--"অবশ্য আমাদের ঘরে যেতে মানে খেতে দিতে তোর যদি কোনো আপত্তি থাকে তাহলে অন্য কথা আফটার অল আমরা তো ক্যাওড়া!"

এই প্রথম পলির মুখ থেকে কোনো অভিমানের কথা বেরল ত্রিপর্ণাও অবাক হয়ে ভাবল ভাবল এমনই যে, সত্যি সত্যি তাদের গ্রামে গিয়ে সে পলিদের বাড়িতে তার মেয়েকে একটা দিন রাখলে বা পলি তাদের বাড়িতে এসে এইভাবে সমস্ত জায়গায় ঢুকে পড়বে জাস্ট অসম্ভব কিছুতেই সম্ভব নয় অথচ এখানে এই শহরে সে তো পলিকে এক বিন্দুও ভালো না বেসেও ঘরে থাকতে দিয়েছে তার একবারো মনেও হয়নি যে, পলি ক্যাওড়া বরং তার ভিতরে যে রাগ, যে দ্বেষ ঢুকিয়ে

দিয়েছে তারই কচিকালের পরিচিত মহল, সে এখনো সেটা থেকে সরতে পারছে না মনেহয় এই জীবনে সে কোনোদিনই পলিকে বন্ধু ভাবতে পারবেও না

পলি বেরিয়ে যাবার সময় বলেছিল--"আমি আজ অনেক রাতে ফিরবো অথবা কাল ফিরবো পুটুশ আর লিলি একসাথে থাকলে সব থেকে ভালো থাকবে দুজনেই আমার মনে হয়েছে এবার সিদ্ধান্ত তোর"

বলে সবে জুতো  জোড়া পায়ে গলিয়েছে অমনি পুটুশ বুঝে গেছে যে মাসিমনি "বেরু বেরু" যাচ্ছে ব্যাস! ওমনি বেচারার কান্না শুরু পলি দ্রুত ফোন করল সুবলকে সুবল লিলিকে কোলে নিয়েই এসেছে লিলিকে দেখেই পুটুশের কান্না উধাও সুবল দুজনকে নিয়ে উপরে যাবার পর পলি বেরিয়েছে

তারপর বাড়ি গিয়ে ব্যবসার হাল-হকিকত তদারকি করে পাড়ারই এক ভাইএর মুখে

 সে শুনতে পায় যে, মীরপুরে কোনো একজন কৃষক গাই গরু কিনেছেন তিনিই খবর পাঠিয়েছেন লোক মারফৎ পলির কুসুমতলি পৌঁছাতেই দুপুর হয়ে গেল এক সেকেণ্ডও সে বসার সময় পেলো না শিপ্রা বলে--"কচুর শাক করেছিলাম দি দুটো ভাত মুখে দিয়ে যাও"

পলি বলে--"বসে খাবার সময় নেই রে বাটিতে করে দে"

শিপ্রা বাটিতে করেই পলিকে খেতে দিল খেয়েই সাইকেল নিয়ে পলি ছুটল সব যায়গায় পাকা রাস্তা নেই মাটির পথও আছে সেখানেও সাইকেল খারাপ চলে না মোটামুটি চলে,কিন্তু কোনো রাস্তায় বর্ষাকালে জলে ডুবে যায় বলে ভাঙা ভাঙা ইটের টুকরো ফেলে রাখে অনেকে ইটের টুকরো থাকলে টোটো-অটো চলে মানে চলতে পারে কাদার তুলনায় ভালো কিন্তু সমস্যা হয় সাইকেল নিয়ে মনেহয় শরীরটাকে নিয়ে কেউ যেন জাগলিং খেলছে এত্তো ঝাঁকুনি দেয় পলির থামবার উপায় নেই সে ওইভাবে নাচতে নাচতেই গেছে বেশিক্ষণ সময় নেয়নি সংক্ষেপে কথা সেরে সে তখন ফিরছিল সন্ধে হবো হবো ভাব সেই ইটের রাস্তা ধরেই সে ফিরছে আশেপাশে লোকজন নেই পুরো ফাঁকা  হঠাৎ সে দেখতে পায় কে যেন হাঁটছে অনেকটা কুঁজো হয়ে বৃদ্ধ হাতে লাঠি তবে কি হর-পার্বতী? এই নির্জনে এইরকম ছন্নছাড়া পোষাকে কে যায়? পলি দাঁড়িয়ে পড়ে ভাবছিল তখন, গ্রামের সব্বাই দেখেছে একমাত্র সে- দেখেনি তাহলে কি আজ তাকেই দেখা দিতে এসেছেন? পলির চোখে জল চলে এলো সে সত্য মিথ্যা জানেনা সে বিজ্ঞানমনস্ক কিন্তু তবুও সে যেন বিশ্বাস করতে পারলেই বর্তে যায়! আহা! কতোকাল সে তার দাদু-ঠামিকে দেখেনি আর তো দেখতেও পাবে না এই জীবনে! বৃদ্ধ টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে এদিকেই এগিয়ে আসছেন হঠাৎ পলির মনে হলো যে, সে কীসব পাগলের মতো ভাবছে! হর-পার্বতী তো একজন

নন তাঁরা তো দুইজন দাদু আর ঠামা তাঁরা তো একজন মরলেই দুইজন মরেন তাঁরা তো এইভাবে একা একা আসতেই পারেন না এলে দুই জনেই আসতেন!

পলি সাইকেল থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে নিজেই ওই বৃদ্ধর দিকে এগিয়ে গেল বয়সের ভারে নয়, ইনি রোগে-ভুগে এমন চেহারার  হয়ে গেছেন পলি জিজ্ঞাসা করল--"কে গো তুমি? কোথায় যাচ্ছো?"

উনি বললেন--"আমি ধরমপুর গ্রামে যাব এট্টু পথ বলে দেবা?"

পলি কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারে ইনি বৃদ্ধ নন, বৃদ্ধা

পলি বলে--" ধরমপুরে  কার বাড়িতে যাবে গো?"

বৃদ্ধা বলেন--"ত্রিপর্ণা বলে একজন আচে ওকেনে মানে ছেল মুই তার বা তার মা-বাবা-ভাই-বুন যারে  পাবো তার কাচে যাব! আমারে এট্টু পত বলে দেবা?"

পলি বলে--"ঠাকুমা  তুমি তাদের কে হও? তাদের খুঁজতিছো ক্যান?"

বৃদ্ধা হাউহাউ কান্নায় ভেঙে পড়ে--"ওগো মুই বাপির মা! মুই বাপির মা!

 

বাপির মাকে নিয়ে আসতে পলির অনেক দেরি হল দেরি দেখে শিপ্রা বারবার ফোন করছিল পলি বলল যে, সে হেঁটে হেঁটে আসছে টোটো পায়নি সে আর বাপির মা সাইকেলে বসতে পারছেন না শিপ্রা মেয়েটা খুব বুদ্ধিমতী একবারও সে  বাপির মায়ের পরিচয় জানতে চাইল না বরং সে সোনাকে খবরটা দিয়ে রাখল সোনারও সেই ব্যক্তিটির পরিচয় জানবার কথা মনে হলো না দিদি যখন বলেছে যে সে কাউকে নিয়ে আসছে তখন তিনি একজন বিশেষ কেউ কিছুদূর হেঁটে আসতে আসতে পলি সমস্ত ঘটনাই শুনল ত্রিপর্ণার স্বামী অমলেশ সে জানত সে জানত যে, ত্রিপর্ণার বাড়ি ধরমপুর কিন্তু শ্বশুবাড়ি যে পরানপুর তা জানত না তবে এই ত্রিপর্ণাই যে সেই ত্রিপর্ণা তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু মানুষ কতোখানি নির্দয় হলে একজন অসুস্থ, প্রায় অন্ধ বৃদ্ধাকে যিনি হাঁটতে পারেন না, তাঁকে একটা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে চলে আসে কোনো টাকা পয়সাও দেয়নি অমলেশের বাড়ি যখন দখল করতে আসে প্রোমোটার, তখন বাপির মায়ের সন্দেহ হয়েছে তিনি পায়ে হেঁটে সেই বৃদ্ধাশ্রমে গেছেন তাঁর সন্দেহ হয়েছিল, যে, হয়ত অমলেশের বউ তাঁর শাশুড়িকে বৃদ্ধাশ্রমেই রেখেছে তাঁদের পরানপুর গ্রাম থেকে সেই বৃদ্ধাশ্রম অনেক দূরে কিন্তু গ্রাম বলেই  আশেপাশের অনেক গ্রামের মানুষজনই এই বৃদ্ধাশ্রমের কথা জানে সেখানে গিয়ে তিনি শোনেন যে, প্রভাদেবী মারা গেছেন মারা গেছেন ওখানে রেখে আসার সাত দিনের মধ্যেই সেই খবরটা পাবার পর থেকেই তিনি ত্রিপর্ণা আর অমলেশকে খুঁজছেন! একবার জানতে চাইবেন কেন মারলেন এভাবে একজন বৃদ্ধাকে! শুনতে শুনতে আঁৎকে উঠছিল পলি! মানুষের মতো হিংস্র প্রাণী

দুটো নেই এই পৃথিবীতে! কিছুদূর আসার পর একটা টোটো পাওয়া গেল পলি দাঁড়াতে বলল টোটোর চালক বলে--"যাবো নাকো ভাড়া আচ"

পলি অনুরোধ করে--"ভাই তোমার টোটো তো খালি চলো না ভাই আমার মাসির শরীরটা ঠিক নেই উনি হাঁটতে পারছেন না"

টোটোর চালক পাত্তা না দিয়ে চলেই যাচ্ছিল তাদের সামনে দিয়ে তাদের ক্রস করেই টোটোওয়ালা দাঁড়িয়ে পড়ল তারপর টোটো পিছনে নিয়ে এসে দাঁড় করাল আর নেমে এসে পলির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়াল

বলল--"দিদি, চিনতি পারিনিকো মুই ক্যাবলা সোনা আর মুই এক কেলাসে পড়িচ"

বলে বাপির মাকে ধরে পরম যত্নে টোটোতে তুলে নেয়

বলে--"মুই দে আসবুনি দি তোঙ্গা

বাড়ি"

পলি সাইকেলে উঠল

ক্যাবলা বলে--"দি, এবার এট্টা মোটর ছাইকেল নিলি ভাল্ দেকায়"

পলি বলে--"হ্যাঁ, সময়ও বাঁচে কিন্তু রাস্তা-ঘাটের যা অবস্থা!"

ক্যাবলা বলে--"দিদি, বলচিলুম কি, মোর ছোটো ভাইটার ঝন্যি তোমার মিষ্টির দোকানে এট্টা কাজ দেকে দোবা?"

পলি বলে--"মোবাইল নাম্বারটা দিও অবশ্যই দেখবো"

এক গাল হাসি ফুটে ওঠে ক্যাবলার মুখে দিদি বলেছে মানে সে কাজ হয়েই গেছে মনে করে সবাই

বাড়িতে পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিয়ে বাপির মায়ের কথা তুলল পলি

শুনেই সোনা বলে--" আরে দি, ওরে তো আমরা চিনি ওই ত্রিপর্ণা তোর ক্লাস-মেট তো দেখেছি নিশ্চয়ই মনে নেই কিন্তু ওর এক ভাই ছিল নাম অর্পণ আর বোনের নাম সুপর্ণা তাদেরকে তো পুরো সর্বস্বান্ত করেছে"

পলি বলে--"মানে? নিজের মাকেও?"

সোনা বলে--"তুই জানিস না? অনেকেই তো জানে! সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে মা-ভাই-বোনকে পথে বসিয়ে পালিয়েছে! একটা নরকের কীট!"

বাপির মা হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে

পলি বলে--"শোনো মাসি, কান্নাকাটি বন্ধ করো আমাদের আগে জানতে হবে পুরো ব্যাপারটা তারপর কান্নাকাটি"

সোনা এতোক্ষণ মোবাইল ঘাঁটছিল

এখন নিজের মনেই বলল--"মনেহয় পেয়েছি...! হ্যালো...! আচ্ছা আপনি কি অপু মানে অর্পণ? নয়ানজুলি স্কুলে পড়তেন?"

বলতে না বলতেই সোনা লাফিয়ে উঠে বলল--" অপু, আমি সোনা বলছি চিনতে পারছিস? কুসুমতলির সোনা!"

পলি বলল--"আমাকে দে ফোনটা!"

সোনা বলল--"অপু, আমার দিদির সাথে একটু কথা বল!"

অপু বলল--"নিশ্চয়ই তোর দিদির মতো মানুষ হয়না! আমি তো ওনাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি!"

পলি বলল--"অর্পণ তোমার ছোড়দি কোথায়? মানে সুপর্ণা?"

অর্পণ বলল--"এইতো পলি দি, এইখানেই কথা বলবে?"

পলি বলল--"কথা তো বলবই কিন্তু আমাদের বাড়ি কবে আসতে পারবে তাই বলো"

অর্পণ বলল--"এমন কিছু রাত হয়নি বললে এখুনি যেতে পারি"

পলি বলল--"তাহলে এখুনিই চলে এসো দুই ভাই বোনই"

সেদিন সারারাত ছয়জন মানুষ এক বিন্দুও ঘুমায়নি সারারাত সুপর্ণা আর অর্পণ কেঁদেছে অর্পণ তার মায়ের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুটা মানতে পারেনি আজও সুপর্ণাও যখন মায়ের কথা বলে কাঁদতে কাঁদতে ফোঁপায়

বলে--"পলিদি,আমার দিদি অন্যায় করেছে মানলাম সব চুরি করে নিয়ে নিয়েছে তাতে ততটা দু: নেই, যতোটা দু: আছে নিজে মায়ের জন্য কিছু না করতে পারার জন্য"

সুপর্ণার কান্না সত্যি সহ্য করা যায় না

অর্পণও কাঁদে

পলি বলে--"দেখো, আমরা সবাই মিলে মিষ্টির দোকান করলে খুব ভালো চলবে আমরা পর্যন্ত গোটা চোদ্দটা দোকান খুলেছি কলকাতায় তোমরা শিক্ষিত সৎ তোমাদের আমার লাগবে"

সুপর্ণা এবং অর্পণ এক পায়ে খাঁড়া

পলি দায়িত্ব দিল শিপ্রাকে

বলল--"আগামীবার এসে ওদের দুইজনকে নিয়ে যাব এই কদিনে সোনা আর শিপ্রার উপর দায়িত্ব দেওয়া থাকল অর্পণ আর সুপর্ণাকে খুব ভালো করে মিষ্টি তৈরি করতে শিখিয়ে দেবার"

অর্পণ আর সুপর্ণাও খুশি তারাও কাজেই লাগতে চায় বিশেষ করে পলির সঙ্গে যুক্ত হতে সকলেই চায়

কথা বলতে বলতে ওরা খেয়ালই করেনি যে,অনেকক্ষণ থেকেই দরজায় ঠকঠক করে শব্দ হচ্ছে

সোনা বলল--"কে?"

কোনো সাড়া শব্দ আর নেই এখন অবশ্য সেই আগের ভয় আর নেই এখন গ্রামে আর তাড়ি তৈরিই হয়না সোনা গিয়ে দরজা খুলেই একদম চুপ করে গেল পলি বলে--"কে এসেছে রে? সোনা, চুপ কেন?"

শিপ্রা এগিয়ে এল

তারপর সেও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল তারও মুখে কোনো কথা নেই পলি এবার বলল--"একিরে? যে- যায় লঙ্কায়, সে- হয় রাবণ?"

বলে সে এসে দেখল সামনে আর কেউ নন তিনি ব্রজবন্ধু মণ্ডল শিপ্রার বাবা

পলি বলল--"আসুন, আসুন তালইমশায় ভিতরে আসুন" ব্রজবন্ধু বাবু হাত জোড় করেন--"ক্ষমা করে দাও পলি মা আমাকে!"

পলি তাড়াতাড়ি গিয়ে ব্রজবন্ধু বাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল

বলল--"ছি, ছি আমি আপনার মেয়ের মতো আমাকে অপরাধী করবেন না!"

পলি মেনে নিয়েছে মানে বাকিরাও মেনে নেবে স্বাভাবিক অর্পণ আর সুপর্ণাও প্রণাম করল ওরা বিশেষ কিছু জানে না কিন্তু আবছা কিছু ওরাও শুনেছিল এবার  সোনা আর শিপ্রাও ব্রজবন্ধুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ব্রজবন্ধু বাবু মেয়েদের মতো কেঁদে উঠলেন শিপ্রার কান্না দেখে পলির চোখও ভেসে যাচ্ছিল আহা! মেয়েটা বুকের মধ্যে পাথর চাপা দিয়ে হাসি মুখে

সংসার করছিল জন্মদাতা বাবার সাথে সম্পর্ক শেষ হলে কোনো মেয়েরই ভালোলাগে না কিন্তু প্রতিটা মেয়েই চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকার করে সুখী করে তোলে পুরো সংসারকে! পলি আজ শিপ্রাকে আরও অনেক বেশি ভালোবাসবে বলে নিজের কাছে নিজেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো

সোনাও অবাক বিস্ময়ে চেয়ে চেয়ে শিপ্রার কান্না দেখছিল কী ভীষণ ভালোবাসে মেয়েটা তার বাবাকে সেই বাবার বিরুদ্ধে পুলিশে কমপ্লেইন করেছে এই মেয়ে! কতোখানি কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা! কেউ একবারও তার এই নৈবেদ্যকে মর্যাদা দেয়নি উচিত ছিল  আলাদা করে মর্যাদা দেবার

শিপ্রা নিজে কাঁদছে আর বাবার চোখ মুছে দিচ্ছে

বলছে--"বাবা, আমাকে ক্ষমা করো বাবা, তোমার প্রেশারটা কি আরও বেড়েছে,বাবা? বাবা, বলো না আমি চলে আসার পর প্রেশার ঠিক আছে বাবা? ওষুধ খাও নিয়মিত, বাবা?"

বাবা বলেন--"আমি ঠিক আছি মা তুই সুখে আছিস তো মা? এরা তো খুব ভালো মানুষ! কিন্তু আমি মানিয়ে নেইনি বলে তোর উপর অত্যাচার করেনিতো, মা আমার?"

মেয়ে বলে--"না বাবা! একদম না! এঁরা খুব ভালো বাবা! আমি খুব সুখী বাবা! বাবা, শুধু তোমার জন্য আর মায়ের জন্য আমি রাতে ঘুমাতে পারি না বাবা! তোমাদের মনে পড়লেই আমার বুকের ভিতর ব্যথায় টনটন করে বাবা! বাবা, আমায় ক্ষমা করে দাও বাবা!"

পলি যত শুনছে তত অবাক হচ্ছে কী সাংঘাতিক মেয়ে শিপ্রা! কী হাসিখুশি মেয়ে সে! অথচ তারই ভিতরে এতোটা যন্ত্রণা? এতোখানি? সে রাতে ঘুমায় না? একবারও তো সে বুঝতেও পারেনি?

শিপ্রা এবার জিজ্ঞাসা করল--"বাবা, মা কেমন আছে?"

বলতেই ব্রজবন্ধু হাউমাউ করে উঠলেন--"তোর মায়ের শরীরটাই আছে শুধু কোনোদিন তার কোনো অসুখ ছিল না রে মা তুই চলে আসার পর তারই প্রেশার হাই হলো সেইসাথে সুগার তোর জন্য ভিতরে ভিতরে কাঁদত আমাকে একদিনও বলেনি, পাছে আমি রাগ করি মানুষটার চোখ দুটো নষ্ট হয়ে গেছে রে মা! ডাক্তার দেখানো হয়েছে তা সেই ডাক্তার বলেছেন তাঁর  হাই ব্লাড প্রেশার অবস্থা বিশেষ ভালো নয় আজ সন্ধেরাতে সে আমাকে অনুরোধ করে কী বলেছে জানিস?"

ব্রজবন্ধুবাবু বলে চলেন এক নি:শ্বাসে--"সে বলেছে, আমার শিপুর সাথে দেখা করো তারে ক্ষমা করে দাও মনে কষ্ট রেখো না আমরা কাছে না গেলে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যত সুখই দিক, মেয়ের স্বামী যতই ভালোবাসুক না কেন মেয়ের বুক খালি থেকে যাবে তারপর অসময়ে ঠিক আমার

মতোই রোগে ভুগবে! আমার মেয়েটারে দেখো তুমি আমি মরতেও পারছি না ওর সাথে তোমার মিলতাল না হলে!"

ব্রজবাবু বলেন--"আমি তখন বুঝতে পারলাম তুই তো জানিস তোর মা তোকে কেমন ভালোবাসে তোর মা আরও কী বলেছে জানিস শিপু, বলেছে সব মানুষই সমান সব্বাই ঈশ্বরের সন্তান জাত তো আমরা বজ্জাতেরা বানিয়েছি"

শিপ্রা হাপুশনয়নে কাঁদছে আর তৈরি হচ্ছে! ওকে কখনো এভাবে কাঁদতে দেখেনি সোনা! তার খুব কষ্ট হচ্ছিল শিপ্রার জন্য  

বেশি দেরি লাগল না তৈরি হতে সোনা আর শিপ্রাই শুধু নয়, পলি, অর্পণ, সুপর্ণা এমনকি বাপির  মা- চললেন শিপ্রার মাকে দেখতেবাইরে বেরিয়েই বোঝা গেল ভোর হয়ে আসছে  মানুষোগুলো যে সারারাত ঘুমায়নি তা তারা বুঝতেও পারেনি আপন মানুষদের সাথে মিলন এমনই সুখের

তখন সূর্য উঠে গেছে পূব আকাশে ক্যাবলাকেই পলি ফোন করেছিল

"ভাই একটু আসবি?"

ক্যাবলা সাথে সাথে বলে--"কেমন কথা বলো দিদি, তুম ডেকেচো আর মুই যাব না? তাই ককোনো হয়?"

পলি  মনে মনে হিসেব করে নেয় সে তার সাইকেলে শিপ্রা আর অর্পণের সাইকেলে সুপর্ণা বসবে সেইভাবেই ওরা দুই ভাই বোন এসেছে বাকি থাকলেন ব্রজবন্ধুবাবু আর বাপির মা আর সোনা

পলিরা দ্রুত তৈরি হয়ে দরজায় তালা লাগাল

বেরবার সময় শিপ্রা একটা কাগজ সেঁটে দিল মিষ্টির দোকানের গায়ে

পলি দেখল সেখানে লেখা আছে--"অনিবার্যকারণবশত আজ দোকান বন্ধ থাকছে এমারজেন্সি থাকলে সুবল জামাইবাবুর দোকানে যেতে পারেন অথবা এই নাম্বারে ফোন করতেও পারেন",

নীচে সোনার নাম্বার দেওয়া

পলি সপ্রশংস চোখে চাইল শিপ্রার দিকে

মনে মনে তাকে একটা চুমু খেল

বাপির মা বসেছেন টোটোতে

 

 

বললেন--"শিপ্রা মেয়েটা যেন লক্ষ্মী-প্রতিমা একদম"

পলি স্বীকার করল বলল--"সত্যি"

টোটো বেশ জোরেই চলছে কিছুক্ষণ বাদেই  তারা পোঁছে গেল

শিপ্রা দৌঁড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল মাও বুকের মধ্যে সন্তানকে নিয়ে কাঁদতে থাকেন তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন অথচ সেই মানুষটা বিছানায় উঠে বসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছেন সবাই শুনেছিল যে, শিপ্রার মায়ের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ প্রেশার হাই ডাক্তার নাকি বলেছিলেন ওষুধেও যে প্রেশার নর্ম্যাল হচ্ছে নাতাঁর শরীরের ব্যাপারে তিনি কোনো গ্যারাণ্টি দিতে পারবেন না অথচ মেয়েকে বুকে পাবার পর তার মাথা ঘোরা বা গা গোলানো একদম কমে গেল তিনিই বিছানা ছেড়ে উঠলেন তাড়াতাড়ি করে সবার জলখাবারের ব্যবস্থা করলেন শিপ্রা বলল--"মা, তোমার হাই প্রেশার তুমি শুয়ে থাকো আমরাই করে নিচ্ছি"

শিপ্রার মা বলেন--"আমার মাথা ঘোরা নেই গা গোলানো নেই আমি বুঝতে পারছি আমার প্রেশারও নর্ম্যাল"

কেউ বিশ্বাস করে না

অবশেষে পলি বলল--"মায়ইমা, আপনি চুপচাপ শুয়ে থাকবেন আমরাই করে নিচ্ছি"

শিপ্রার মা বলেন--"যদি আমি অসুস্থ হতাম সত্যিই শুয়ে থাকতাম!"

ব্রজবন্ধুবাবু বলেন--"আমরা এতগুলো মানুষ আছি তুমি শুয়ে থাকো নইলে কিন্তু আমরা কেউ খাবো না"

এই কথাটা সকলেরই মনে ধরল সব্বাই বলল--"ঠিক তাই আমরা রান্না করে নেবো"

সোনা বলল--"শিপ্রার রান্না তো দারুণ তাই নারে দিদি!"

পলি বলল--"হ্যাঁ শিপ্রা আমার গুণে লক্ষ্মী, রূপে সরস্বতী"

শিপ্রার মা শিপ্রার দিকে চেয়ে বললেন--"আশীর্বাদ করি মা আমার! সারাজীবন স্বামীর সংসারে এমনই সুনামের সাথে বাস করো"

বলে তিনি সোনার দিকে চেয়ে বললেন--"বাবা, আমার মেয়ে গুণী তাই তোমরা ভালোবাসো শুধু তোমরা কেন, এই ত্রভূবনে তারই কদর আছে, যার গুণ আছে একজন গুণী মানুষকে সব্বাইই ভালোবাসে আর আমি ভালোবাসি আমার পেটের সন্তান বলে আমি ওকে কতোদিন দুটো খেতে দেই না নিজের হাতে আজ দুটো খাক আমার হাতের রান্না!"

 

 

শিপ্রার মায়ের চোখে আবার জল দেখে শিপ্রার বাবা বল্লেন--"তুমি ভালো থাকবে বলে আমি মেয়েকে নিয়ে এসেছি যদি আবার আগুনের তাতে গিয়ে অসুস্থ হও? যদি আবার প্রেশার বিপদসীমা ছাড়িয়ে যায়?"

শিপ্রার মা বলেন--"তোমরা পুরুষেরা সব্বাই আসলে বোকার  হদ্দ এই স্থূল পৃথিবী বোঝো পৃথিবীর মাটি বোঝো না পৃথিবীর প্রাণ বোঝো না!"

একটু থেমে আবার তিনি বলেন--"আমার মুখের কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তো? আচ্ছা বেশ! ডাক্তার বিশ্বাসকে ডাকো আমার প্রেশার মেপে যাক  আবার টাকা যাবে তা যাক তবুও তুমি ডাকো!"

নয়ানজুলি গ্রামের বিখ্যাত ডাক্তার হলেন এই পিকে বিশ্বাস তাঁর পসার আছে কিন্তু তিনি আসলে হাতুড়ে তবে জ্বর-পেট খারাপ, প্রেশার মাপা, ইঞ্জেকশান দেওয়া এইসব করেন ভালোই

পলি সব বুঝতে পারল সে বলল--"তালইমশাই, আপনি ডক্টর বিশ্বাসকে ডাকুন যদি সত্যিই ওনার প্রেশার ঠিক থাকে তাহলে আমরা ওনার কথা শুনব আর যদি  তা না হয় তাহলে ওনাকে শুয়েই থাকতে হবে!"

অবশেষে ফোন করা হলো : বিশ্বাসকে তিনি এলেন লোকজন দেখে প্রথমে ঘাবড়ে গেলেন খুব তারপর ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন শিপ্রাকে দেখে শিপ্রাকে তিনি ফ্রক পরা কুমারী মেয়ে দেখেছেন সেই মেয়েই এখন হঠাৎ শাঁখা-সিঁদূর আর শাড়ি পরে একদম পালটে গেছে খুব মিষ্টি লাগছে তাকে দেখতে তিনি বললেন--"মেয়ের জোরাজুরিতে বুঝি এই অসময়ে প্রেশার মাপতে চাইছেন? তা ভালো"

বলে তিনি শিপ্রাকে বললেন--"কেমন আছিস মা? তোকে তো চেনাই যাচ্ছে না রে!"

বলে হাসলেন

শিপ্রাও হেসে হেসেই বলল--"ভালো আছি কাকু"

বলে একে একে সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিল

এদিকে ডাক্তার প্রেশার দেখেন তিনি চমকে ওঠেন আবার মাপেন বারবার করে তিনি প্রেশার মাপেন আর বলেন--"আশ্চর্য তো"

শিপ্রা বলে--"কী আশ্চর্য ডাক্তার কাকু?"

ডাক্তার বলেন--"আরে একদিন দুইদিন নয়, দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে তোমার মায়ের প্রেশার দেখছি প্রচুর হাই ১৭০/১২০ দেখেছি এর থেকে বেশিও দেখেছি সেইজন্যই তো ওষুধ খেতে দিয়েছি অথচ এখন প্রেশার একদম নর্ম্যাল"

বললেন--"১২৫/৯০? আমি তো ভাবতেও পারছি না! কেমন করে সম্ভব?ওশুধ খেয়েও ওনার প্রেশার ১৬০/১১৫ এর নিচে নামাতেই পারতাম না! আর এখন তো দেখছি একদম নর্ম্যাল!"

জিত হল শিপ্রার মায়ের শিপ্রার আনন্দ হলো সব থেকে বেশি সে এলো আর তার মা সুস্থ হলো সে যে কী খুশি তা যেন ভাষা দিয়ে বোঝাবার মতো নয় সে আনন্দে নেচে নেচে বেড়াচ্ছিল পলির বারবার তার দাদু আর ঠামির কথা মনে পড়ছিল শিপ্রা বাবাকে বলল--"বাবা, বাজারে যাও অনেক দিন মায়ের হাতের মাটন খাই না"

বাবা হাসেন

বলেন--"আর কী খাবি বল"

শিপ্রা বলে--"পটল-চিংড়ি আর কচু শাক আর ইলিশ মাছ মাথা দিয়ে শাকটা করবে মা!"

ব্রজবন্ধুবাবু হাসেন

বলেন--" কচুশাক আবার কবে তোর পছন্দ ছিল? তুই তো পুঁই শাক দিয়ে কাতলা মাছের মাথা পছন্দ করতিস!"

শিপ্রার মা বলেন--" যা বলছে তাইই আনবে তোমার অতো জেনে কী হবে? মানুষের রুচি পাল্টাতেওতো পারে"

ব্রজবন্ধুবাবু বুঝলেন না কিন্তু পলি বুঝল শিপ্রা সেইসব কিছুই বাজার করতে বলছে যা সে আর সোনা পছন্দ করে সে যত দেখছে শিপ্রাকে ততই তার প্রতি এক গভীর অনুভূতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে মেয়েটা এতোটুকু বয়সে এতোখানি পরিণত কেমন করে হয়েছে? সে শিপ্রাকে ভালোবাসে বাসতো আগে থেকেই কিন্তু এই গুণের পরিচয় সে আগে তো পায়নি আসলে একজন নারী বিয়ে হলেই শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকের কথা ভাবে প্রত্যেককে সুখী করার কথা ভাবে নিজের কথা তারা ভাবে না এক বিন্দুও অথচ সেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন কখনো তো খোঁজ নেয় না যে, মেয়েটা কী খেতে ভালোবাসে? কখন তার ঘুমানোর অভ্যাস? সে কেমন ভাবে ঘুমালে স্বস্তিতে ঘুমাতে পারে? কোন পোশাকে সে স্বচ্ছন্দ? সেকি গান শুনতে পছন্দ করে? নাকি নাচতে ভালোবাসে? কখন সে অতিরিক্ত এক কাপ চা খায়? সে কি দুধ চা পছন্দ করে? নাকি কফি খায়? সে বিকালে কটার সময় টিফিন খায়? পৃথিবীর কোত্থাও তো এমন শোনা যায় না যে, যে মেয়েটিকে তাদের বাড়ির বউ হয়ে আসতে হয়, সেই মেয়েটির পছন্দ-অপছন্দ কোনোদিন

কেউ জানতে চায় না! সে নিজেওতো জানতে চায়নি! সে আর এই ভুল করবে না! ছি ছি! পলির নিজেকে খুব ছোটো মনে হচ্ছে মেয়েটা তার থেকে বয়সে কতোখানি ছোটো! এইটুকু বয়সেই সে মেয়েটাকে নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করছে? সে ভাবল যে সে এরপর থেকে শিপ্রার পছন্দমতোই বাজার করবে সেইমতোই রান্না হবে সে ব্রজবন্ধুবাবুকে ডাকল--"মেসোমশায়, একটা কথা ছিল"

সে ভাবল যে, তার বলে দেওয়াই উচিত যে, শিপ্রা যা যা পছন্দ করে তাই তাইই বাজার করতে বলবেন কিন্তু তার ডাকের সাড়া শব্দ না পেয়ে যখন সে আরও দুইতিনবার ডাকল তখন শিপ্রা বলল--"দিদি, বাবা তো বাজারে গিয়েছেন"

পলি চুপ করে গেল! সুযোগটা কাজে লাগানো গেল না পরে জিজ্ঞাসা করে নেবে পলি ভাবল

শিপ্রাদের বাড়িতে দুটো হাস আছে তাদের আবার নামও আছে শিপ্রা ওদের নাম দিয়েছে টুব্রি আর কুব্রি সে ডাকল--"টুব্রি কুব্রি?"

হাসদুটো সত্যি সত্যি প্যাঁক প্যাঁক করে সাড়া দিল শিপ্রা দুটোকে ধরে খুব আদর করল মাকে বলল--"মা,ওরা আমার কথা কিছু বলে না?"

মা বলেন--"বলে না আবার? স্কুলের ছেলে-মেয়েরা যখন স্কুলে যায় বা যখন ফেরে ওরা দুজন গিয়ে রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে আমি কতো বলি এই টুব্রি-কুব্রি বাড়ি আয় বাড়ি আয় কী যে বলে দুজনে প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক করে তা ওরাই জানে!"

শিপ্রা সত্যিই যেন ওদের দিদি যেন সত্যিই ওদের সাথে ওর রক্তের সম্পর্ক! এভাবেই ওরা গল্প করছে বাড়ির পিছনদিকে কী করছে শিপ্রা কে জানে! পলি তাকে অনুসরণ করে সেখানেও গেছে শিপ্রা একটা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে কী যেন বলছে এদিক ওদিক দেখে টেখে চলে এল রান্না ঘরে গিয়ে বলল--"মা, পিছনে একটা লংকাজবা গাছ ছিল অমিতা এনে দিয়েছিল কোথায় গেল সেটা, মা?"

মা বলেন--"আর বলিস না আমার শরীর খারাপ ছিল মনটনও ভালো নয় তাই ওসব কদিন দেখা টেখা হয়নি মনেহয় পাড়ার কারো গরু-টরুতে খেয়ে নিয়েছে"

শিপ্রার চোখে জল চলে এসেছে সে বলল--"তুমি জানো মা, আমার জন্মদিনে অমিতা আমাকে ওটা গিফ্ট করেছিল আমাদের গ্রামের কারুর কাছেই অতো গভীর লাল রঙ নেই! খেয়ে নিল অত সুন্দর গাছটা?"

মা বলেন--"নে আমি সুস্থ হয়ে গিয়েছি তো আর কিচ্ছু নষ্ট, ক্ষতি হবে না"

আরও কতো প্রশ্ন শিপ্রার

"মা, এবার আম হয়েছে গাছে? মা, আমার সেই হলুদ ফ্রকটা কোথায়? মা, আমার ঘরের দেওয়াল আয়নাটা কোথায় গেল গো?আচ্ছা মা, রোজ সকালে সেই কাঠবিড়ালিটা আসে?"

মা বলেন--"হ্যাঁ রে আমি যতদিন বেঁচে আছি, তোর কাঠবেড়ালি ঠিক আসবে আর আমিও ওকে ঠিক খেতে দেবো!"

হঠাৎ সাইকেলের ঘণ্টি বাজল আর ঘর থেকে লাফিয়ে বাইরে বেরলো শিপ্রা তারই বয়সি একটি মেয়ে সাইকেল নিয়ে এসে হাজির দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে কী আনন্দে হাসছে কাঁদছে! শিপ্রার মা একবার উঁকি দিয়ে দেখে বললেন--'অমিতা মা, আয় বোস না খেয়ে যাবিনে কিন্তু"

অমিতা এক গাল হাসে

"কী হচ্ছে আজ রান্না? বিরিয়ানি নিয্যস!"

শিপ্রার মা অধোবদন হলেন একটু হেসে বললেন--"না, এবেলা মাটন হচ্ছে রাতে বিরিয়ানি হবেখন"

অমিতা বলল--"কিন্তুক মুই রাতে থাকতি পারব না খুড়িমা"

কী সুন্দর সম্পর্ক পলি ভাবছে তার আর সোনার  তো হতভাগ্য বাবা-মা কেউ নেই! ছিল এক দাদু আর ঠামি! সে দুজনও চলে গেলেন! গ্রামের এই সরলতা-মাখা জীবন বাড়ির বয়স্করা না থাকলে কোথাও যেন  শূন্য হয়ে যায়! আরও একটা বিষয় তার বোধোদয় হলো শিপ্রা বিরিয়ানি পছন্দ করে সত্যি বলতে অনেকেই পছন্দ করে কিন্তু এই খাবারটার প্রতি পলির দুর্বলতা একটু কমই তার পছন্দ নয় বলে তার বাড়িতেও শিপ্রা বিরিয়ানি খুব একটা করে না পলির মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যাচ্ছে ইতিমধ্যে ফোন এসেছে একটা কুলতলি থেকে মিষ্টির বায়না দিতে চায় কেউ তার বাড়ির বিয়ের জন্য পলি বলে দিয়েছে সন্ধেবেলায় আসতে সে বুঝতে পেরেছে যে, তার আজও কলকাতায় ফেরা হবে না

দুপুরে অসাধারণ সব পদ দিয়ে খাওয়া-দাওয়া হলো

সবাই একসাথেই খেতে বসেছে কিন্তু কিছুতেই শিপ্রার মা তো বসলেনই না এমন কি শিপ্রাও বসল না একসাথে

 তখন পলি বলল--"তাহলে আমিও খাবো না এখন বরং মেশোমশায়, আপনি বসুন আমি বরং শিপ্রার সাথেই বসবো"

সহজে না মানলেও অবশেষে তাইই হলো

বাপির মা, ব্রজবন্ধুবাবু আর সোনা আর অমিতা একসাথে খেতে বসল

অমিতা খেতে খেতে বলল--"তোমরা তুম এজ্ঞে না মুই এজ্ঞে নে ঝামালি করো, মুই ততকুন খেয়ি নেই তাপ্পর শিপ্রার সাতেও খাবানি!"

সবাই হাসল আর শিপ্রার মা বলল--"সে তুই খাসকুন কেডা মানা করেচ!"

শিপ্রার মা যত্ন করে খাওয়ালেন পলি ভাবছিল অন্য কথা শিপ্রাদের অবস্থা এমন কিছু ভালো নয় সামান্য জমি-জায়গা আছে ডাল-ভাতটুকু জুটে যায় এই যে আজ এই একদিনে এত্তোকিছু রান্না করলেন, কষ্টের সাথে সাথে প্রচুর খরচ হলো তো! পলি ভাবছে ভাবছে খেতে খেতে শিপ্রার মা বললেন--"পলি মা, ওই টোটোর ডেরাইভারের বাড়ি কোথায়? একটু ডাকা যায়?"

পলি বলল--"নিশ্চয়ই তালইমা!"

অতএব তাকেও ডাকা হলো তার জন্যও পাত পড়ল  এবং খাবার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই শিপ্রা উঠে পড়ল

বলল--"দিদি, আমরা এবার ফিরব তুমি নাহয় আর একটু বিশ্রাম নাও"

শিপ্রার মা হা হা করে উঠলেন--"আজ এলি, আজই চলে যাবি? দুটো দিন থাক না মা!"

পলিও বলল--"হ্যাঁ শিপ্রা, দুদিন মায়ের কাছে থেকে যাও"

শিপ্রা বলল--" না,না দিদি ওরে বাবা! এখন থাকলে চলে? কতো কাজ!"

সোনা বলে--"ইচ্ছে করলে থেকে যাওনা দুদিন!"

সোনার গলায় তেমন জোর নেই! পলি মনে মনে ভাবছে তাহলে শিপ্রা তাদের বাড়িতে মনেহয় সুখেই আছে বরের ভালোবাসাই মেয়েদের আশিভাগ সুখ দিতে পারে

শিপ্রা সোনাকে প্রায় ধমকে বলল--"তুমিও এমন বলছো? বেশ থাকলাম পারবে তো সামলাতে? অর্ডার যাবে তো সময়মতো? সুপর্ণাদিদিকে আর অর্পণদাদাকে সময়মতো তৈরি করতে পারবে তো? সবদিক ভাবনা চিন্তা করে কথা বলছো তো?"

সোনা চুপ

শিপ্রা বলল--"বাপির মা দিদুকে কিন্তু ডাক্তার দেখাতে হবে একদম সময়মতো সবার রান্না-খাওয়া হবে তো?"

সোনা চুপ করে থাকে সে কিচ্ছু বলতে পারে না

পলি বলে--"সব ঠিক বলেছো তুমি তোমাকে ছাড়া আমরা অচল কিন্তু তোমার মা-বাবারওতো তোমাকে পেতে ইচ্ছে করে"

শিপ্রা বলল--"দিদি, তোমরা আমাকে যতটুকু ভালোবেসেছো সে তুলনায় আমি কিচ্ছু করতে পারিনা  তবুও তুমি যেভাবে ভাবছো তা কেউ ভাবে না দিদি আমি একটা কথা বলি?"

পলি মাথা নাড়ে

শিপ্রা বলে--"মাকে আমাদের সাথে নিয়ে যাই বাপির মা দিদুর সাথে থাকবে তারপর সুপর্ণাদি রয়েছে খুব ভালো হবে দি তাহলে"

সব্বাই লুফে নিল কথাটা

বেরোবার আগে পলি শিপ্রাকে আড়ালে ডেকে বলল--"এই টাকাটা তোমার বাবাকে দাও আর হ্যাঁ, এখন থেকে প্রতিমাসে তোমার মা-বাবাকে তুমি হাত খরচ দেবে,কেমন?"

শিপ্রার চোখদুটো ছলছলিয়ে উঠল

 

ত্রিপর্ণার আজকাল বেশ রাত হয় বাড়ি ফিরতে প্রোমোশান হয়েছে দায়িত্ব বেড়েছে সবচেয়ে বড়ো কথা পলি আসার পর অনেকটাই ফুরসৎ পেয়েছে রান্নার মেয়েটা খারাপ করত না কিন্তু প্রায় দিনই কামাই করত আর রিনি মেয়েটার বয়সটাও অল্প ত্রিপর্ণার মাঝে মাঝে খারাপ লাগত অনেক দিনই ফিরতে লেট করলে রিনিকে থেকে যেতে বলত থাকত বটে মেয়েটা কিন্তু তার খুব একটা ভালো লাগত না অল্প বয়স তারউপর অভাবী অমলেশ আর একটা যুবতী দিনের পর দিন অনেকটা সময় একসাথে থাকুক, সে পছন্দ করত না কিন্তু উপায়ও ছিল না পলি আসার পর ত্রিপর্ণাই একদিন বলল পলিকে--"তুই তো কিছু একটা চাকরি টাকরি নিতে পারতিস অতো ভালো রেজাল্ট করেছিস!"

পলি বলেছিল--"নারে অত সময় নেই রে আমার"

ত্রিপর্ণা বলল--"তুই তো আমার মেয়েটাকে দেখিস তো যদি সম্ভব হয়, রান্নাটাও করবি?"

পলি বলল--"দেখতেই পারি তোর তো অফিসের খুব চাপদেখি, সুবলকে জিজ্ঞাসা করে!"

ত্রিপর্ণার শরীর রি রি করে যেন জ্বলে ওঠে ওই তো কেলে বান্দর একখানা তারপর অশিক্ষিত তারও অনুমতি নিতে হবে! এই মেয়েগুলোর জন্যই না মেয়েরা এগুতে পারে না! এরাই সমাজটাকে পুরুষ-শাসিত করে রেখেছে ডিসগাস্টিং!

মুখে বলে--"আসলে তোর লিলি আর পুটুশ এক সাথেই বড়ো হচ্ছে তো সহজেই সব হয়ে যাচ্ছে তাই বলছিলাম আর কী!"

পলি বলে--"সুবলকে না জিজ্ঞাসা করে কথা দিতে পারছি নারে!"

ত্রিপর্ণার ভিতরে এতোটাই জ্বলে ওঠে যে সামলাতে পারে না অথচ এই মেয়েটাকে কেন যেন ভিতরের সমস্ত রাগ উজাড় করে  কিছু বলতে পারে না কী অদ্ভুত একজন নারী যেন পলি অবাক হয়ে ভাবে ত্রিপর্ণা  পলি তাকে কোনোদিন কটু কথা বলেওনি বলবেও না ওর সেই যোগ্যতাও নেই কিন্তু কী দিয়ে সে যেন নিজের চারিদিকে একটা সম্ভ্রমের বাতাবরণ তৈরি করে নেয় কিছুতেই সেই বর্ম ভেদ করে ওকে ছুঁতে পারেনা ত্রিপর্ণার অপমান এই যে এত্তোখানি অপমানকর একটা প্রোপোজাল ত্রিপর্ণা দিল, সোজা কথায় রাঁধুনির কাজের অফার দিল, কই এক বিন্দুও অপমান ওকে ছুঁতে পারল না তো! বরং পলি যদি চিৎকার করে বলত--"কী বললি? আমি তোর বাড়ি রান্না করব? আমি তোর মেয়েকে দেখবো? আমাকে তুই চাকর-বাকরের মতো ট্রিট করছিস? তোর এত্ত সাহস হয় কী করে? থাকব না তোর বাড়ি রইল তোর মেয়ে! চললাম আমি!" যদি বলত তাহলে ঠিক অপমানটা করা হয়েছে বলে মনে হতো ত্রিপর্ণা  ভাবে সেও তখন খুব কষে অপমান করে ঘর থেকে বার করে দিত তখন পলি অনুরোধ করত বলত--"এই রাত্তিরে আমি এইটুক মেয়ে নিয়ে কোথায় যাবো?"

কিংবা ওর ওই কেলে কুচ্ছিত বরটাও অনুরোধ করত ফোন করত বলত--"আমি তো ওখানে নেই আমার বউ-মেয়েকে এখন কিছুতেই বের করে দেবেন না"

আরও বলত--"আমি হাত জোড় করে অনুরোধ করছি রাতটুকু থাকতে দিন"

তখন ত্রিপর্ণা ঘর ভাড়ার কথা তুলতো

তখন বলতো--"তোমরা কি জানো, আমার এই ফ্ল্যাটের ভাড়া মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা  সেই টাকা দাও নইলে এই মুহূর্তে বের হও!"

ত্রিপর্ণা ভেবে পায় না ওই মেয়েটা কিসের জোরে অমন করে নিজেকে রক্ষা করে? সে- বা কেন তাকে সে নিজের মনের ইচ্ছেমতো

 ব্যবহার করতে পারে না? কী আছে ওর?

এদিকে অমলেশের সাথে গত সপ্তাহে তার একটু মন কষাকষি হয়েছে বিষয়টা পলি ধরতে পেরেছে

 

 

 

ত্রিপর্ণার সেদিন অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয়েছে অনেকটা দেরিই হয়েছে অমলেশ মনেহয় ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল পুটুশকে নিয়ে সে দেখেছে যে ত্রিপর্ণাকে ওর বস পৌঁছে দিয়েছে ঘটনা এইটুকুই অমলেশ যদি জিজ্ঞাসা করত--"তুমি বসের গাড়িতে ফিরলে কেন?"

কোনো সমস্যাই হতো না কিন্তু অমলেশ সে কথা না বলে কী বিশ্রীভাবে বলল--"তোমাকে কি আজকাল তোমার বসই পৌঁছে দেন আর নিয়েও যান? নিজের গাড়ি কোথায় তোমার?"

ত্রিপর্ণার তখন ঘুমে চোখ জুড়ে আসছিল খাটুনিটাও বেড়েছে বড্ড দায়িত্ব নিতে হয়েছে অতিরিক্ত কাজের ক্লান্তি আসাটা স্বাভাবিক ত্রিপর্ণা বলেছিল--"হুম আমার গাড়িটা যাবার সময় খারাপ হয়ে গেছিল আর বলো না আজ সারাদিনই ভোগান্তির একশেষ হয়েছে"

অমলেশ বলল--" তা আমাকে বলোনি কেন? আমিই নাহয় ড্রপ করে দিতাম!"

ত্রিপর্ণা বলল--"আমি এখন ঘুমাব অমল খুব ঘুম পাচ্ছে"

বলতে না বলতেই ত্রিপর্ণা ঘুমিয়ে পড়েছে সারাদিনের ধকলের শেষে মানুষের ঘুম পাওয়া, ক্লান্তি লাগাটা স্বাভাবিক

সকালে জেগেই দেখে পুটুশকে কোলে করে নিয়ে পায়চারি করছে অমলেশ ত্রিপর্না বলল--"এতো সকালে মেয়ে উঠে গেছে?"

অমলেশ কোনো জবাব দেয় না কিন্তু ডাইনিং হলের এস্ট্রেতে প্রচুর সিগারেটের টুকরো ঘরে একটা গুমোট আবহাওয়া আর তীব্র নিকোটিনের গন্ধ

ত্রিপর্ণার মনে পড়ল আগের দিন রাত্তিরে কী যেন বলেছিল অমলেশ তার গলায় বেশ খানিকটা রাগ রাগ মতোই ছিল তাহলে কি সারারাত ঘুমায়নি? মনে হতেই ত্রিপর্ণা বলল--"কী হয়েছে অমলেশ?"

অমলেশ বলল--"কী হয়নি তাই বলো? মেয়েটার শরীর খারাপ সেদিকেও তোমার নজর নেই আর ছুটি আজকাল কটায় হয়? বাড়ি ফিরতে মাঝরাত হয়ে যায়?"

ত্রিপর্ণা বলল--"সাড়ে নয়টাকে মাঝরাত বলে না!"

অমলেশ যেন তৈরি হয়েই ছিল ঠোঁটের আগায় তার কথাগুলো যেন সাজানোই ছিল

সে গড়গড় করে বলতে আরম্ভ করল--"হ্যাঁ সেতো ঠিকই তুমি এক কাজ করো অফিসেই থেকে যাও তোমার বসেরও কষ্ট করতে হবে না গাড়ি থেকে নামার পরও সে ছাড়তে চায় না তোমাকে তুমিও ছাড়তে চাও না তাই তো গাড়ি থেকে নেমেও ঝুঁকে কিছু...!আচ্ছা, কাল গাড়ি থেকে নেমেও

অতোটা ঢুকে গেলে কেন? বসকে কিস করছিলে? নাকি আরও বেশি কিছু ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছো বুঝি আজকাল?"

ত্রিপর্ণার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল

সে বলে বসল--"নিজেকে দিয়ে সব্বাইকে বিচার করো না তোমার প্রোমোশানের সময় আমাকে থাই খোলা  পোশাক পরিয়ে তোমার বিদেশি কাস্টমারকে আনতে পাঠিয়েছিলে এয়ারপোর্টে মনে নেই? আমি কি নিজে থেকে গেছিলাম? ওই ব্যক্তির সাথে হোটেলে রাত পর্যন্ত কাটাতে বাধ্য করেছিলে আমাকে তখন দোষ হয়নি! আর এখন আমার গাড়ি খারাপ হয়েছে তাই বসের গাড়িতে এসেছি এইটুকুতেই এতো জ্বালা!"

অমলেশেরও গলা উঠে যায়--"যা করেছি আমাদের ভালোর জন্য আর তুমি যা করছো তা তোমার একার ভালোর জন্য তোমার মতো নোংরা মেয়েকে বিয়ে করাটাই আমার ভুল হয়ে গেছে"

ত্রিপর্ণাও গলা তোলে আরও--"হ্যাঁ, এখন তো বলবেই তোমার প্রোমোশান তো হয়ে গেছে এখন আমি যদি আরও প্রোমোশান পাই, পুরুষ মানুষ না! ইগোতে লাগে তাই না?"

এতক্ষণ অমলেশের কোলেই ছিল পুটুশ সে একবার বাবার দিকে আর একবার মায়ের দিকে চাইছিল আর প্রচণ্ড ভয়ে ভয়ে কাঁদছিল কিন্তু তারদিকে তখন কেউই একবারো চেয়ে  দেখছিল না

ত্রিপর্ণা ঝগড়া করতে করতে রেডি হচ্ছিল আজ একটা স্কিন টাইট টপ আর স্কার্ট পরেছিল স্কার্টটা খুবই ছোট্ট ত্রিপর্ণার থাই দুটো ভীষণ সুন্দর মোলায়েম মনেহয় পার্লার থেকে ওয়াক্সিং করিয়ে এসেছিল ঝকঝকে ফর্সা আর মোটাসোটা থাইদুটোর দিকে চেয়ে অমলেশ বলল--"দিনদিন তোমার পোশাকের যা ছিরি হচ্ছে না! একেবারে রাস্তার মহিলা বিয়ে করেছি আমি!"

তীব্র ঘৃণায় হিসহিস করছিল অমলেশের কণ্ঠ! ত্রিপর্ণা তখন হাই হিল পরে টকটক করে হাঁটছিল

বলল--"হ্যাঁ, তোমার পার্টির সাথে গেলে দোষ নেই, তাই না?"

অমলেশ --"আরে ধেত্তেরিকা" বলে হঠাৎ ড্রেসিং টেবিলের টেবিল ক্লথটা টান মেরে ফেলে দেয় নুন, বিভিন্ন আচার, বিভিন্ন ভাজা ইত্যাদি যা যা ছিল সমস্তই মেঝেতে ঠনঠন ঠনঠন আওয়াজ করে উঠল অমলেশ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল আর ঠিক সেই সময়েই পলি ঢুকল ত্রিপর্ণার মনে হলো পলি বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল কিছু  হয়ত শুনেছে কিছু নয়, হয়তো পুরোটাই শুনেছে

ত্রিপর্ণা সেসব বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দিল না মাথাটায় একটু চিরুনি বোলাল, লিপস্টিকটা একটু বুলিয়ে নিয়ে পলিকে বলল--"আমাকে একটা অমলেট আর চা করে দে পলি"

মানেটা পরিস্কার

সে এইভাবে কথা কি আগে কখনো বলেছে? মনে করতে পারল না এখন কেন বলল? ত্রিপর্ণার মনেই হলো যে, পলি সব শুনেছে পলির চোখের ভাষায় তেমনই ইঙ্গিত ছিল এই অনুভূতিটাই তাকে দিয়ে এইরকম একটা বাক্য বলিয়ে নিল ভাবটা এই, যেন আমাদের মধ্যে কি হয়েছে তা তোর জানার অধিকার নেই অথচ পলি যে তার বাচ্চাকে দেখা এবং রান্না করার জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেয় না, তা ভুলে গেল ত্রিপর্ণা জবাবে পলি পুটুশকে কোলে নিয়ে বলল--"না,না সোনা মেয়ে এই তো আমি তোমার মাসিমনি তো! কাঁদে না না,না"

ত্রিপর্ণার আদেশকে সে জাস্ট ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল ত্রিপর্ণা উড়েও গেল সে তখন নিজেই রান্না ঘরে ঢুকল পলি বলল--"বাচ্চাটা তোদের দুজনের জন্য অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে পর্ণা তোর খাওয়ার থেকেও একটা সুস্থ পরিবেশ ওর বেশি দরকার আগে তুই এই ঘর গোছাবি ডাইনিং টেবিল গোছাবি কাচের টুকরোগুলো ভালো করে পরিষ্কার করিস"

বলে পুটুশকে নিয়ে বাইরে চলে গেল ত্রিপর্ণাকে বললও না যে কোথায় যাচ্ছে

ত্রিপর্ণা পোশাক ছেড়ে ঘরের কাজ করতে আরম্ভ করল কয়েক ঘণ্টা বাদে ফোন করল--"কীরে, ঘর পরিষ্কার হয়েছে?"

ত্রিপর্ণা বলল--"না আমি অতো পারব না তুই করে দে"

পলি বলল--"তাহলে তুই আমার ফ্ল্যাটে আয়  মেয়েদুটোকে সামলা আমি তোর ঘরে যাচ্ছি সব ঠিক করে দেবো"

ত্রিপর্ণা কিছু বলার আগেই পলি আবার বলল--"তোর মেয়েটা কমজোরি হয়ে যাচ্ছে শিশুদের মনের স্বাস্থ্য নষ্ট হলে শরীর ভেঙে যায় আর আমি ভাই গরিব মানুষ অনেক কষ্টে লেখাপড়া শিখেছি আমার মেয়েকে কিছুতেই তোদের ওই পরিবেশে নিয়ে যাব না ঘর একদম গুছিয়ে ফিট করবি,তারপর যাব অথবা তুই এখানে আসবি"

বলে সে চুপ করল কিছুক্ষণ পরে আবার বলল--"পর্ণা, ক্যান্সার একটা মারণ রোগ কিন্তু মজার কথা হলো এইটাই যে, শুরুতে ধরা পড়লে ক্যান্সারও সেরে যায়"

বলে ফোন রেখে দিল পলি আর ত্রিপর্ণা সমানে ভেবে গেল যে, পলি এইকথা কেন বলল? কি অন্য কিছু ইঙ্গিত করল? কী ইঙ্গিত করতে চাইল পলি

 

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

 

অমলেশ অনেক পালটে গেছে যে মানুষটা মেয়ে হবার পর অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরত, আর অনেক দেরি করে যেতো আর বলতো-- "দূর সন্তান হলে চাকরি করতেও মন লাগে না

 কী যে মিস করি সোনাটাকে!" সেই অমলেশ এখন কথায় কথায় রাগ দেখিয়ে কোথাও চলে যায় ফোন অফ থাকে তখন সারাদিন জিজ্ঞাসা করলে বেশিরভাগ দিন বলে না কিছুই জোরাজুরি করলে বলে--"দরকার ছিল" ব্যাস এইটুকুই ত্রিপর্ণার কিচ্ছু আজকাল ভাল্লাগে না তারও প্রোমোশান হয়েছে মাইনে বেড়েছে ইচ্ছে মতো স্বাধীনতাও ভোগ করে সে কিন্তু অমলেশ তার থেকে অনেক দূরে সরে গেছে এই চিন্তাটাই তার সমস্ত সুখ নষ্ট করে দিয়েছে তার এখনো সুন্দর শরীর যৌবনবতী কিন্তু অমলেশের তার প্রতি এক বিন্দুও আকর্ষণ নেই পুটুশ পেটে আসার পর তার রূপ নষ্ট হয়ে গেছিল সেই সময় অমলেশ তাকে একদম ভালোবাসতো না তার শরীর যেই আবার সুন্দর হয়ে উঠল, অমনি অমলেশও পালটে গেছিল কিন্তু এখন অমলেশ এমন করে দূরে সরে যাচ্ছে কেন? ত্রিপর্ণা কোনো কারণ খুঁজে পায়না মনে মনে খুব ভয় পায় সে সে ভীষণ স্বার্থপর সে জানে কিন্তু সে চরিত্রহীন নয় একেবারেই সে অমলেশকেই ভালোবাসে তাকে নিয়েই তার পুরো জীবন কাটাতে চায় সেদিন যখন অমলেশ ডাইনিংএর সমস্ত কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে চলে গিয়েছিল, ত্রিপর্ণা অফিস যায়নি সেদিন পলি এসেছিল পরে তারা দুটো বাচ্চা পুটুশ আর লিলিকে নিয়ে খুব সুন্দর একটা সময় কাটিয়েছে অমলেশ সেদিন সারাদিন একবারো ফোন করেনি ত্রিপর্ণা করবে বলে ভেবেছিল করেনি পলি একবারো জিজ্ঞাসা করেনি তাদের অশান্তির কারণটা কী? কিন্তু রাতে যখন অমলেশ এলো না, তখন আবার বলল পলি--"ক্যান্সার মারণ রোগ কিন্তু শুরুতে ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময় হওয়া সম্ভব"

ত্রিপর্ণার সেদিন খুব কষ্ট হচ্ছিল মানুষ ভালোবাসা না পেলে মানিয়ে নেয় কিন্তু  কোনো একটা জায়গা থেকে  যদি বারবার ভালোবাসা পায়আর পরে  সেই ভালোবাসা না পেলে খুবই কষ্ট হয় জীবনে প্রথম অমলেশ তাদের ছেড়ে অন্য কোথাও রাত কাটাচ্ছে ত্রিপর্ণার একবার মনে হয়েছে যে, সে পলিকে সব বলবে কীনা তারপর আবার ভাবল, গ্রামে সে না গেলেও পলি যায় যদিও তার গ্রামের লোক তার সম্পর্কে কী ভাবলো বা ভাবলো না সে বিষয়ে  সে কোনো কিছুই পাত্তা দেয় না তবুও একটু খারাপ তো লাগেই সে গ্রামে না গেলেও পলি তো যায় পলি নিশ্চয়ই গ্রামে গিয়ে এইসব কথা আলোচনা করে তাই অমলেশ সম্পর্কিত সব কথা পলির সাথে আলোচনা করতে ভয় পায়

সেবার অমলেশ তিনদিন বাদে এসেছিল এসেই শোনে মেয়ের ধুম জ্বর আর ত্রিপর্ণা অফিসে অমলেশের রাগে মাথা কাজ করছিল না পলি বলল--"আমার মনেহয় একজন ডাক্তার দেখানো উচিত"

অমলেশ পুটুশকে কোলে নিতেই বুঝতে পারল জ্বরে মেয়ের সমস্ত শরীর আগুন হয়ে আছে

সে পলিকে বলল--"কবে থেকে হয়েছে জ্বর?"

পলি জানে যে গত তিনদিন অমলেশ বাড়িতে আসে না নাহ ত্রিপর্ণা তাকে কিছুই বলেনি এমনিতে সে যখন রান্না করতে আসে তখন অমলেশ থাকে ত্রিপর্ণা বেরিয়ে যায় তবুও এই তিনদিন যে রাতেও অমলেশ ফেরেনি তা বোঝার জন্য অনেক ছবিই পুরো সংসার জুড়ে পড়ে থাকে খাবার রান্না হয় যা তার একটা ভাগ পড়েই থাকে স্নানের ঘরের বাস্কেটেও একজনের পোশাক পড়ে না ঘরে পরার জুতো জোড়া একই জায়গায় পড়ে থাকে বোঝা যায় তাকে কেউ দীর্ঘদিন ব্যবহার করেনি তাছাড়া পুটুশের এখন পরিষ্কার কথা ফুটে গেছে সেও অনেককিছু বলে বাবা না থাকা নিয়ে সেও অনেক আপত্তিজনক কথা বলেছে সত্যি বলতে পুটুশ মা এবং বাবা দুইজনকেই সমান  ভালোবাসে কাউকেই ছেড়ে থাকতে চায় না সে

এখন "কবে থেকে হয়েছে জ্বর?" এর মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে যে সে অনেক দিন বাড়িতে আসেনা অমলেশ যে বাড়িতে অনেকদিন আসে না, তা ত্রিপর্ণা পলিকে জানাতে চায়নি অমলেশ কিন্তু পরিষ্কার করে দিল

পলিও বলল--" আপনি যেদিন থেকে বাড়িতে আসেন না, আপনার মেয়ের সেদিন থেকেই জ্বর"

অমলেশ পলির দিকে চকিতে একবার তাকিয়েই মুখ নামিয়ে নিল অপরাধবোধ!

মেয়ে কেমন অচৈতন্য হয়ে পড়ে রয়েছে অমলেশ ডাক্তারকে ফোন করল তারপর মেয়ের মাথার কাছে বসল

পলি মেয়ের মাথায় যেমন জলপটি দিচ্ছিল, তেমনই দিয়েই চলল ডাক্তার এলেন দেখলেন ওষুধ দিলেন বললেন--" ঠাণ্ডা লাগিয়েছে অসুবিধা নেই সেরে যাবে"

সত্যি সত্যি পুটুশ সেরেও উঠল বাবাকে দেখে তার হাসি আর ধরে না

একবার বাবার মুখে চুমু খাচ্ছে একবার বুকে শুয়ে পড়ছে আর অনর্গল বকর বকর করে যাচ্ছে সব কিছু অতি স্বাভাবিক কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায় বারবার সে জানালায় আঙুল দেখায় আর চোখে মুখে ভয় মাখিয়ে বলে--"বাবা, ওখানে একটা রাক্ষস এসে বসেছে"

অমলেশ বলে--"রাক্ষসকে আমি এক ঘুষি মেরে তাড়িয়ে দেবো!"

মেয়ের মুখ থেকে ভয় সরে যায়

সন্ধের আগেই মেয়ে পুরো ফিট হয়ে গেল ত্রিপর্ণার ফেরার সময় পার হয়ে যায় ঘড়ির কাটাকে টিক টিক করিয়ে রাত গভীর হতে থাকে ত্রিপর্ণা ফেরে না অমলেশ নিজেই পুটুশকে খাওয়ায় ওষুধ খাওয়ায় তারপর নিজেও খেয়ে মেয়েকে নিয়ে শুয়ে পড়ে শুয়ে পড়ার আগে অমলেশ বলে-

-"পলি আপনি কি থাকবেন? থাকতেও পারেন কাজ থাকলে, নইলে চলে যেতেই পারেন আমার পুটুশের আর কাউকে দরকার হবে না তাই না পুটুশ সোনা?"

পুটুশ এক গাল হেসে বলে--"রাক্ষসকে বাবা এক ঘুষি মেরে তাড়িয়ে দেবে না বাবা?"

অমলেশ মেয়েকে চুমু খেয়ে বলে--"একদম"

পলি বেরিয়ে পড়ে তারও ঘণ্টা খানেক বাদে ত্রিপর্ণা ঘরে ঢোকে বেল বাজালো কেউ দরজা খুলল না দু-তিনবার বাজালো কিন্তু দরজা খুলল না কেউ তখন নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল নাইট ল্যাম্প জ্বলছে কেন ঘরে? মেয়েটা কি অসুস্থ? ত্রিপর্ণা চেঞ্জ করার আগেই  বেড রুমে ঢোকে দেখে পুটুশকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে অমলেশ! ত্রিপর্ণা লোভীর মতো চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল তার অমলেশকে তার অমলকে কতোদূরে যেন চলে গেছে সে তিন তিনটে দিন সে আসেনি বাড়ি একটা ফোনও করেনি ত্রিপর্ণাও ফোন করেনি বয়ে গেছে তার ফোন করতে কোথায় কার সাথে কী সম্পর্কে লিপ্ত আছে কে জানে! থাকুক তাই থাকুক! সে পুটুশকে নিয়ে কাটিয়ে দেবে তার পুরো জীবনটা! তার চাই না অমলেশকে আজ হঠাৎ অমলকে পুটুশকে বুকে নিয়ে ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে তার ভীষণ ইচ্ছে করছে পুটুশের অন্য পাশে শুয়ে পড়তে তারা তিনজন মানেই একটা আস্ত পৃথিবী সে এই দুজনকে ছাড়া কোনোদিন সুখী হতে পারবে না! সে মনেহয় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল তাদের শোবার ঘরে এই ঘর অমলেশ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বানিয়েছিল সুখী হবার জন্য তারা কী না করেছে! আজ সব পেয়েছে কিন্তু ওই সুখটাই যেন ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে তাদের মধ্যে এতোটাই বিরোধ যে, এই যে সে ঘুমন্ত অমলেশকে দেখে এভাবে তার কাছে যেতে চাইছে তা ভাষা দিয়ে অমলকে বোঝাতে পারবে না এমনকি অমলও তার দৃষ্টিতে প্রেম দেখলেও মানতে চাইবে না একদম হঠাৎ অমলের ঘুম ভেঙে গেল সে চোখ চেয়েই ত্রিপর্ণাকে দেখল কোনো কথা বলল না কয়েক সেকেণ্ড যেন কিছু ভাবল তারপর উঠে পড়ল ত্রিপর্ণাও তাড়াতাড়ি ডাইনিং রুমে চলে এলো অমলেশ উঠল আর বাইরের ঘরে এসে বসল আর একটা সিগারেট ধরালো ত্রিপর্ণা আড়ে আড়ে দেখলো বিয়ের পর এই প্রথম এতোদিন তারা দুজনে দুজনকে ছেড়ে থাকল ত্রিপর্ণা আজ অফিসে গেছিল শর্ট ড্রেস পরে অমলেশ দেখলে আবার অশান্তি করবে জানে ইচ্ছে করে অমলেশের সামনে দিয়ে কয়েকবার ঘুরল এদিক ওদিক করল অমলেশ মুখ তুলে একবারও তাকালো না ত্রিপর্ণার এবারে ড্রেস চেঞ্জ করে কিছু খেতে হবে কিন্তু অমলেশ একবারও ওর দিকে চাইছে না কেন? তিন দিন বাইরে কোথায় না কোথায় কাটিয়ে এসেছে...! এখন দেখুক আমিও ওর জন্য কেঁদে কেঁদে মরে যাইনি বরং আরও মজা করেছি দেখুক চাইছে মনে মনে ত্রিপর্ণা অমলেশের  মুখ কিছুতেই তাকে দেখল না ত্রিপর্ণা এবার বলল--"কখন এলে?"

উদ্দেশ্য তাকে অমলেশ চোখ তুলে দেখুক

অমলেশ চোখ তুলল

বলল--"সন্ধেবেলায়"

খুব সহজ ভাবে গলায় কোনো অপরাধবোধ নেই দৃষ্টিতে কোনো রাগ নেই ত্রিপর্ণার রাগ চড়াৎ করে মাথায় উঠে গেল সন্ধেবেলায় এসেছে! অথচ তাকে একবারও জানায়নিপলিও ফোন করে একবার বলেনি! আশ্চর্য!

সে অমলেশের সামনে দিয়ে আবার গটগট করে হেঁটে গেল অমলেশ দেখল অপরিচিত মানুষের মতো  চোখে রাগ,দ্বেষ, ঘৃণা কিচ্ছু নেই! ত্রিপর্ণা ভাবল কেন এমন করছে অমলেশ? ঝগড়ার ভয়ে? নিশ্চয়ই তাইই হবে ভাবলো ত্রিপর্ণা! সে চেঞ্জ করে ডাইনিংএ এসে জল খেলো আর ঢেকুর তুলল সে আসলে বোঝাতে চাইল অমলশকে যে, সে বাইরে খেয়ে এসেছে অমলেশ তাও চুপচাপ রইল ত্রিপর্ণার পেটে খিদে তাও শুধু জল খেয়েই সে শুয়ে পড়ল অমলেশ তাকে একবারও জিজ্ঞাসা করল না--"খেয়েছো?"

সেও শুতে যাবার সময় একবারো বলল না--"শোবে না?"

অমলেশ বসে থাকল সোফায় ত্রিপর্ণা ভিতরে গিয়ে শুয়ে পড়ল মেয়ের পাশে অমলেশের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ল ত্রিপর্ণা পরদিন খুব ভোরেই ঘুম ভাঙল ত্রিপর্ণার রোজকার মতোই জেগেই সে দেখল অমলেশ আসেনি শোবার ঘরে তার রাগ উত্তরোত্তর  বাড়তেই লাগল সে দ্রুত তৈরি হতে চাইল রেডি হয়ে সাধারণত চা খেয়েই বেরিয়ে যায় সকালে তেমন খিদে পায়না অফিসেই ব্রেকফাস্ট করে নেয় সে বাথরুম থেকে বেরিয়েই দেখে অমলেশ সোফায় নেই ত্রিপর্ণা চা নিয়ে বসলে অমলেশ বাথরুম থেকে বেরল ত্রিপর্ণা চা টা আর না করে পারেনি অমলেশকে এবার সে বলল--"চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে"

অমলেশ বলল--"কোনো দরকার ছিল না!"

ত্রিপর্ণা বলে--"সে জানি কিন্তু এতো বছরের অভ্যাস তো করে ফেলেছি"

অমলেশ বলল--"অভ্যাস একদিনে হয় না গড়ে যেমন তুলতে হয় ধীরে ধীরে ভাঙাও যায় চেষ্টা করো হয়ে যাবে"

বলে অমলেশ বেরতে চাইল ত্রিপর্ণার পক্ষে এই কথাটুকই ঝগড়া করার জন্য যথেষ্ট

সে বলল--"জানি তো রাত্তিরে কী এমনি এমনি বাড়িতে ফেরো না? নিশ্চয়ই কোথাও পাত পেড়ে খাবার নিয়ে কেউ বসে থাকে"

অমলেশও বলল--"নিশ্চয়ই থাকেই তো তোমার মতো নষ্ট চরিত্রের মেয়ের সাথে ঘর করা যায়? তুমি যেমন নোংরা তেমন স্বার্থপর তোমাকে আমি দু চক্ষে দেখতে পারি না!"

অমলেশ যে এমনই হিংস্র তা জানতো ত্রিপর্ণা প্রমাণ তো আগেই পেয়েছিল মেয়ে পেটে থাকার সময় সেই সময় সে রুগ্ন আর শুকনো হয়ে গেছিল কিন্তু এখন সে যথেষ্ট সুন্দরী তার ত্বক যথেষ্ট গ্লো করে তার শরীর দেখেই চারজনকে ল্যাং মেরে তার প্রোমোশান পাকা করেছিলেন তার বস অমলেশ তাকে পাত্তা না দিলো তো তার ভারি বয়েই গেল পৃথিবীর একশো ভাগ পুরুষই সুন্দরী নারীর আকর্ষণকে এড়িয়ে যেতে পারে না পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ত্রিপর্ণার অহংকার ওকে স্থির হতে দেয় না

স্বার্থপর হ্যাঁ তা ঠিক এই দুনিয়া তাকে স্বার্থপর হতে শিখিয়েছে ওর মায়ের মতো জীবন চায় না সারাটা জীবন ওর চোখের সামনে ওর মা চরম আত্মত্যাগ করে গেছে ওর মাকে তাই ঘেন্না করে কী পেয়েছে জীবনে ওই মহিলা? শুধু নিজের মাকে নয় এই পৃথিবীর সমস্ত মাকেই ঘেন্না করে সমস্ত মহিলাদেরই সে ঘেন্না করে সব জ্যান্ত বেহুলা এক একটা! নিজের যৌবন দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়েও পোষায় না নিজেদেরকেই উৎসর্গ করে দেয় সে দেবে না যতটুক করার দরকার, তার বেশি করতে নেই বলেই মনে করে!

চিৎকার করে বলল--"আমি স্বার্থপর? তুমি নও?"

অমলেশ বলল--"আমিও চরম স্বার্থপরতার কাজ করেছি কিন্তু ভুল করেছি খুব ভুল করেছি ওভাবে শান্তি তো পাচ্ছি না! শান্তি কোথায়?"

ত্রিপর্ণা বলে--"এই যে ঘরটাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেকচার ঝাড়ছো তা দুজনেই স্বার্থপরতা করেছিলাম বলেই আমাদের মেয়েকে সুখে রাখব বলেই...!"

অমলেশ বলে--"যে মানুষ নিজের মা-ভাই-বোনকে ঠকায় তার মুখে এসব মানায় না!"

ত্রিপর্ণা বলল--"যা করেছি দুজন মিলে! আজ হাত ধুয়ে কার কাছে যেতে চাও? কে বুঝিয়েছে তোমায় এইসব?"

অমলেশ বলল--"সত্যিই আমি কাউকে পেয়েছি অথবা আমাকে কেউ!"

কলিং বেল বাজতেই অমলেশই খুলল

পলি ঢুকেই বলল--"তোরা মারামারি কর, যা খুশি কর... কিন্তু মেয়েটার দিকে একটু দেখবি না?"

অমলেশ ততক্ষণে ঘর থেকে তির বেগে বেরিয়ে পড়েছে ত্রিপর্ণার এতোদিনের রাগ আজ বার্স্ট করলো সে খড়্গহস্ত হলো পলির প্রতি

 

 

 "কাল সন্ধেবেলায়  অমলেশ এসেছে সে কথা আমাকে বলিস নি কেন?"

পলি বলল--"তুই এভাবে কথা বলছিস কেন?"

পলি ততক্ষণে পুটুশকে কোলে তুলে নিয়েছে পুটুশ মা-বাবার ঝগড়ার শুরু থেকেই চিল চিৎকার করে কাঁদছে বাবা-মার সেদিকে কোনো নজরই নেই পলির কোলে উঠেই পুটুশ আবার সেই জানালার দিকে  আঙুল দেখাচ্ছে

বলছে--"রাক্ষস মাসি এত্তো বড়ো রাক্ষস!"

মাসির গলা জড়িয়ে ধরে পুটুশ কেঁদেই চলেছে ভয়ে সে কাঁপছে নাক থেকে সর্দি গড়াচ্ছে পলি মুছে দিচ্ছে নিজের কাপড় দিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরছে দোলা দিয়ে দিয়ে থামাবার চেষ্টা করছে ত্রিপর্ণা তখন কাউকে ফোন করছে

ফোনটা সে ধরলেই বলছে--"হ্যালো রুবি আয়া সেণ্টার? আমার এখুনি, এই মুহূর্তে একজন গভর্নেস লাগবে"

একটু থেমে বলল--"ঠিকানাটা লিখে নিন... আচ্ছা, কতোখানি সময় লাগবে আসতে?"

একটু থেমে আবার বলল--"শুনুন ট্যাক্সি করে পাঠিয়ে দিন আমার একটু তাড়া আছে"

পলি তখনো পুটুশকে কোলে নিয়ে থামানোর চেষ্টা করছে অবাক হয়ে সে ত্রিপর্ণার দিকে চেয়ে রয়েছে

ত্রিপর্ণা কথা শেষ করেই বলল--"তুই চলে যা পলি তোকে আমি আর রাখবো না তিন দিন সময় দিচ্ছি  আমার ফ্ল্যাট ছেড়ে দিবি

 

পলি হাসল খুব অল্প ত্রিপর্ণার রাগ তাতে আরো বেড়ে গেল অল্প অল্প হাসতে হাসতেই পলি ফোন করল

বলল--"সুবল, আমাদের ফ্ল্যাট ছেড়ে দিতে হবে আজই তুমি এসো তৈরি হয়ে এখুনি"

ত্রিপর্ণা বলল--"শোন, সুবল বলুক বা কৃষ্ণ, আমার ফ্ল্যাট আমি বলছি ছেড়ে দিতে ছেড়ে  দিবি"

পলি আবার মুচকি হাসল ততক্ষনে সুবল এসে গেছে সেই সস্তা পোশাকই পরা রয়েছে তার মিশকালো চেহারা সে এসেই বলল--"হ্যাঁ, আমরা এমনিতেই ছেড়ে দেবার কথা ভাবছিলাম কেননা, আমাদের বাড়িতে সদস্য-সংখ্যা বেড়েছে পলিই ছাড়তে চাইছিল না পুটুশের কথা ভেবে!"

ত্রিপর্ণা হাত উঁচু করে থামিয়ে দিল বলল--"আমার মেয়েকে অন্য কারও দেখতে হবে না আমি ট্রেণ্ড গভর্নেস রাখছি তোমরা এবার এসো  তিন দিনের মধ্যে ঘর না ছাড়লে আমি কিন্তু ব্যবস্থা নেবো সেটা মোটেও ভালো হবে না"

সুবল বলল--"আমরা আজই চলে যাচ্ছি আমাদের ফ্ল্যাট গোছানোও হয়ে গেছে"

বলে সুবল একটা চেক বই বার করল

সেখানে সই করা এবং টাকার  অঙ্কটাও বসানো ছিল পলি চেয়ে চেয়ে দেখলো

কী একটা কোম্পানির নামে চেক বইটা সেখানে সুবলই সই করল ত্রিপর্ণাকে সেটা এগিয়ে ধরল আর বলল--"আমরা মোট তিন বছর চার মাস তেরো দিন থেকেছি কুড়ি হাজার করে দিয়েছি দেওয়া উচিত ছিল পঞ্চাশ করে বাকি টাকা লিখে দিয়েছি চেকে হিসেব মিলিয়ে নেবেন"

বলে সুবল পলিকে প্রায় জড়িয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পলি বলল--"এক মিনিট!" বলে ডাইনিংএর উপরে চাবির গোছাটা রাখল পুটুশ কী বুঝেছে সে - জানে সে হাপুশনয়নে কাঁদছে

"আমি গভন্নেস চাইনা মাসি চাই থাকবো না আমি আমি মাসি চাই লিলি চাই"

ত্রিপর্ণা এতোটাই অবাক হয়েছে যে, সে পলক ফেলতেও যেন ভুলে গেছে

বারবার চেকটার দিকে তাকাচ্ছে নাম লেখা "কুসুমতলি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার"!  তারমানে সুবল সেই মিষ্টির দোকানটাই বেশ বড়ো করেছে বাব্বাহ! তো মিষ্টিই বানাতো তাই বলে এতোটাও গুছিয়ে ব্যবসা করছে! কেল্টুটার তাহলে যোগ্যতা আছে বলতে হবে আর তাছাড়া কী স্পষ্ট আর শুদ্ধ ভাষায় কথা বলল! বাপরে! ঠিক এই সময় কলিং বেল বাজল! অল্পবয়সি একটি মেয়ে এসেছে সে- গভর্নেস ঘরে ঢুকতেই পুটুশ ঘরের কোনায় গিয়ে ঢুকল ত্রিপর্ণা মেয়েটির  কাগজ-পত্র দেখল মিলিয়ে আধার কার্ড ইত্যাদি দেখল তারপর সব ঘর, রান্নাঘর ঘুরিয়ে দেখালো কী কী করতে হবে সব বলল আর অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল

সারাদিন সে একবারো অমলেশকে ফোন করেনি অমলেশ ওকে যা বলেছে তা সে যেন বিশ্বাস করতেই পারছে না বিয়ের সময় থেকেই দুজনের চাহিদার মিল দেখেছিল সে সেই কারণেই সে বিয়েও করেছিল মনে মনে মিল না থাকলে কখনোই সুখী হওয়া যায় না বলেই সে মনে করে আজ তার প্রতি এতোটাই বিষিয়ে গেল কেন অমলেশ! সামান্য কারণেই সে রেগে যায় এবং কোথাও চলে যায় বাড়ি আসেনা দুই তিন দিন সে যদি যেতে পারে তাহলে ত্রিপর্ণাই বা পারবে না কেন? ত্রিপর্ণার বস তাকে খুবই পছন্দ করে ত্রিপর্ণাই বরং এক্কেবারে পছন্দ করে না তাই সে দূরত্ব রেখেছে দূরত্ব রাখার কারণ অন্য কিছু না সে অমলেশকেই ভালোবাসে আজ হঠাৎ ত্রিপর্ণার ভীষণ ইচ্ছা করছে

বাড়ি না ফিরতে দেখুক, অমলেশ কেমন লাগে! সে পারলে ত্রিপর্ণা কেন পারবে না? এইসব যখন ভাবছিল ঠিক সেই মুহূর্তেই অমলেশ ফোন করেছে--"বলছিলাম, কখন ফিরবে?"

ত্রিপর্ণার এইটুক ভদ্র কথা যেন অসহ্য লাগল গত কাল সারাটা সন্ধে সে আর পলি কী করেছে? তার বিরুদ্ধে আলোচনা? নইলে একটিবার কেউ ফোন কেন করল না?

রাগে জ্বলছে শরীর ত্রিপর্ণার

 কাল থেকে মোবাইলে চার্জ নেই চার্জে বসানোও হয়নি কখন মোবাইলটা অফ হয়ে পড়ে আছে তা খেয়ালও করেনি ত্রিপর্ণা চারিদিকে এত্তো অশান্তি হলে আর কিছু কি মনে থাকে? মোবাইলটা অন করতেই অমলেশের ফোন এসেছে ত্রিপর্ণা ভাবছে যে, তাহলে অমলেশ নিশ্চয়ই অনেকবার ফোন করেছে পিরিত জেগেছে নাকি হঠাৎ? ত্রিপর্ণা ভাবছে! সে আজ যাবে না বাড়ি পিরিত করতে হবে না আর তার সাথে! বলল তো কে আছে ওর ওকে ভালোবাসার জন্য! তাহলে আবার ত্রিপর্ণাকে কেন? ত্রিপর্ণার ফোন অফ হয়ে গেল আর অনও করল না চার্জেও বসালো না যা খুশি অমলেশ করতে পারলে সে কেন পারবে না?

সে তার বস মি:চ্যাটার্জিকে বলল--" আজ একটু তাড়াতাড়ি ছুটি পেতে পারি?"

মি:চ্যাটার্জি বলেন--"শ্যিওর কটায় চাই শুধু আদেশ করো!"

মি:চ্যাটার্জী প্রচণ্ডই চরিত্রহীন এবং সুযোগ পেলেই ফ্ল্যার্ট করেন যে কারো সাথে

গা জ্বলে যায় ত্রিপর্ণার

তবুও সে হাসি মুখেই বলে যে সে বিকেল চারটেতে ছুটি চায় সেইদিন ত্রিপর্ণাকে যেন ভূতে পেয়েছে কী যেন এক জেদে সে উন্মাদের মতো আচরণ করছে সে বাড়িতে সেদিন ফিরল না শুধু গভর্নেসকে একটা মেসেজ করে দিল--"অফিসের কাজে যাচ্ছি রাতে ফিরতে পারব না তুমি আজ রাতটুকু ম্যানেজ করো পুষিয়ে দেবো তোমাকে" মেসেজটা পাঠিয়েই মোবাইলের সুইচ অফ করে দিল সে জানে টাকার গন্ধ পেলে কাঠের পুতুলও কথা শোনে ত্রিপর্ণার তবুও একবার কিছু মনে হলো সে পরে আবার ফোন অন করল আর গভর্নেসকে মেসেজ করল--"কাল ফিরতে একটু দেরি হতে পারে আমার তোমাকে রান্না ঘর ইত্যাদি সব দেখিয়েই তো দিয়েছি ফ্রিজে মাছ-মাংস-ডিম-সব্জি সবই আছে যা খুশি খেয়ে নিও আমি ফেরা পর্যন্ত থেকো যা রেট তার ডবল দিয়ে দেবো চিন্তা করো না"

লিখল, সেণ্ড করল আর মোবাইলটা আবার অফ করে দিল

গাড়িও সেদিন সে নিয়ে আসেনি থাকুক টেনশানে সব্বাই বুঝুক তার মর্ম ত্রিপর্ণা অফিস থেকেই একটা ট্যাক্সি নিল ডালহৌসি পাড়ারই একটা হোটেল ভাড়া নিল রুমেই মদ আনাল মাংস এবং বিরিয়ানিও টিভিটা অন করে সে স্বাধীনতা ভোগ করতে চাইল মুখে অমলেশকে সে যতোই বলুক, বা অমলেশও তাকে যতোই বলুক, সে জানে অমলেশের কোনো প্রেমিকা নেই অমলেশও এই রকম কোনো হোটেলেই তিন দিন ছিল মদ খেয়েছে সিগারেট খেয়েছে আর টিভি দেখেছে ত্রিপর্ণাও সেইটাই করতে চায় ওরও বোঝা উচিত যে, বাড়ির মানুষগুলো কষ্ট পায় ত্রিপর্ণা কতো রাত পর্যন্ত জেগে থাকল আর কতো পেগ মদ খেলো তা সে  নিজেও জানে না কিন্তু এতো নেশা করেও সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না অমলেশ তাকে আর পুটুশকে ছেড়ে কী অবলীলায় কাটিয়েছে তিনতিনটে রাত আর পুরো দুটো দিন একবার একটা ফোন পর্যন্ত করেনি তার কথা সে ছেড়ে দিচ্ছে কিন্তু পুটুশের জন্যও তার মন কাঁদেনি? সে এতোটা নিষ্ঠুর? ভাবতেই ত্রিপর্ণার সেই দিনগুলোর কথাই মনে পড়ল পুটুশ তখন চার মাস মতন সে না খেতে না খেতে একদম শুকনো হয়ে গেছিল অমলেশ কী চরম নিষ্ঠুরের মতো আচরণই না করেছিল! আর সে এই অমলেশের জন্য জীবন দিতে পারে পুটুশের জন্য জীবন দিতে পারে পুটুশ আর অমলেশ এই দুজনই তার জীবন তার পৃথিবী কষ্টে তার বুক ফেটে যাচ্ছে তবুও সে আজ দাঁতে দাঁত চেপে থেকে যাবে নাহ শুধু আজকেই শুধু নয় সেও থাকবে তিন রাত আর দুই দিন তার টাকা নেই? নাকি সে অথর্ব? হাঁটতে-চলতে পারে না? তবে কেন সে- শুধু সংসারের পুরো দায়িত্ব নিয়ে কাটাবে?

ভাবতে ভাবতে কখন ত্রিপর্ণা ঘুমিয়ে গেছে বুঝতেও পারেনি বেশ বেলায় ঘুম ভেঙেছে ওর ঘুম ভাঙতেই সে উঠে বসল ভীষণ মাথা ধরে আছে হ্যাং ওভার হয়েছে মাথার যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে বাথরুমে গিয়ে হাতে-মুখে জল দিল বাথরুম করল তারপর আবার শুয়ে পড়ল কতোক্ষণ ঘুমিয়েছে তা সে বুঝতেও পারেনি চোখ চেয়েই হোটেলের রিসেপশনে ফোন করে কড়া করে চা চাইল তারপর বাথরুম থেকে ফিরে ভাবল গভর্নেস মেয়েটাকে কি থাকতে বলেছে সে গতদিন? মনে পড়ছে না ঠিক অনেক খেয়ে ফেলেছিল ত্রিপর্ণা মোবাইল অন করল অমলেশের কোনো মেসেজ নেই ফোনও করেনি সে কিন্তু গভর্নেস প্রচুর বার ফোন করেছে মেসেজের পর মেসেজ করেছে পুটুশের জ্বর সে তো জানে না যে তাকে রাতেও থাকতে হবে তাকে সে কথা তো আগেই বলতে হতো তাহলে সে আসতো না অন্য কাউকে পাঠাতো তার নিজেরও ছোটো একটা বাচ্চা রয়েছে ত্রিপর্ণার মেয়ের থেকেও তার মেয়ের বয়স অনেক কম ত্রিপর্ণার তো তবু মেয়ের বাবা আছে তার কেউ নেই টাকা দিয়ে তাকে পুষিয়ে দেওয়া যাবে না কারণ সে যে কোনো মূল্যেই তার সন্তানের কাছে যাবেই অত্যন্ত দুঃখিত হয়েই সে লিখেছে

"আপনাকে মোবাইলে পাচ্ছি না আমি আমার ডিউটি সম্পূর্ণ করেই ফিরছি আপনি ফোন অফ করে রেখেছেন আমার কিছু করার নেই আটটা পর্যন্ত ডিউটি ছিল এখন আটটা বেজে কুড়ি মিনিট হয়ে গেছে আমি চলে যাচ্ছি"

ত্রিপর্ণার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল সে অমলেশকে ফোন করল অমলেশ ফোন ধরতেই সে বলল--"পুটুশ কেমন আছে?"

অমলেশ বলল--"পুটুশ কেমন আছে আমি কেমন করে জানব? আমি তো কাল বাড়িই যাইনি কেন? তুমি কোথায়?"

ত্রিপর্ণা পড়ি কি মরি করে দৌড়াচ্ছে এই বিপদের দিনে আবার ট্যাক্সি পাওয়া যাচ্ছে না যদি দুটো ডানা থাকত তবে সে উড়ে যেত তার পুটুশের কাছে হায়! ইশ্বর!আমার পুটুশকে রক্ষা করো মোবাইলে সে চার্জও দেয়নি স্ক্রিনটাতে কোনো আলোও নেই তারমানে মোবাইলটা আর অন হবে না! সে ট্যাক্সিতে বসে বসেই এমন ছটফট করছে যে ট্যাক্সির ট্যাক্সির ড্রাইভারও আপ্রাণ চেষ্টা করছেন দ্রুত পৌঁছাতেঅবশেষে নিজের বাংলোর সামনে গিয়েই ট্যাক্সি দাঁড়াতেই ত্রিপর্ণা লাফিয়ে নামল পকেট হাতড়াচ্ছে তখন ত্রিপর্ণা ট্যাক্সিভাড়া দেবে বলে ড্রাইভার বললেন--"থাক ম্যাডাম!" বলে একটু অপেক্ষা করে বললেন--"ইয়ে বলছিলাম কি ম্যাডাম, কেউ কি মারা গেছে?"

ত্রিপর্ণা দুই কানে হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠল

পড়ি কি মরি করে ঊর্ধশ্বাসে ছুটতে লাগল ড্রাইভার সেদিকে তাকিয়ে বলল--"পাগল হয়ে গেছে গো! আহা! নির্ঘাৎ মা মারা গেছে!"

ড্রাইভারের মা মারা গেছেন তাই মা মারা যাবার যন্ত্রণা তিনি জানেন কিন্তু একমাত্র সন্তানের চরম বিপদের কারণ যদি মা নিজেই হয়ে যায়, তাহলে মায়ের অবস্থা কেমন হতে পারে তা তিনি জানেন না!

ত্রিপর্ণা তার বাংলোর সামনে যখন পৌঁছিয়েছে, তখন অমলেশও পৌঁছে গেছে পুরো এলাকা কালো মেঘে ঢাকা কোত্থাও কোনো সাড়া শব্দ নেই ত্রিপর্ণা দরজার সামনে গিয়েই হাতল ধরল ভিতর থেকে লক পুটুশের কোনো সাড়া নেই ত্রিপর্ণা ডাকল--"পুটুশ?"

কেউ সাড়া দিচ্ছে না ত্রিপর্ণা তার ব্যাগ খুলল চাবি নেই অমলেশকে বলল--"তোমার কাছে আছে চাবি?"

অমলেশ খুঁজছে তার পকেটে চাবি নেই ত্রিপর্ণা ব্যাগের ভিতরে আবার খুঁজল চাবি নেই

অষ্টমবিংশতি পরিচ্ছেদ

সেইদিনই ছিল পলির গৃহপ্রবেশ কুসুমতলি গ্রামের প্রায় সমস্ত লোকই আজ পলির ফ্ল্যাটে পলি ফ্ল্যাট কিনেছে আসলে পলি আর সুবলের মিষ্টির ব্যবসা অনেকটাই বড় হয়েছে কলকাতা শহরের বুকে ওদের এখন সতেরো খানা ব্রাঞ্চ প্রতিটি ব্রাঞ্চেই পলি কুসুমতলির ছেলেদেরই রেখেছে অবশ্য

আশেপাশের কয়েকজনও আছে অনেক ভালো কাজ করে সেই তাড়ি খেয়ে রাতের অন্ধকারে কুকীর্তি করা ছেলেগুলোও পলিকে তারা সম্মান করে মন থেকে তারা লেখাপড়াটুকুও মন দিয়ে করেনি কখনো জানে যে, চাকরি পাবে না চাকরি পেতে গেলে পড়াশুনার সাথে সাথে ঘুষ দেবারও যোগ্যতা থাকতে হবে তারা সব জানে তাই পড়াশুনা আর করেনি কিন্তু এদের মধ্যে থেকেই যে পলি বার হয় ত্রিপর্ণার মতো মেয়েরাও বড়ো চাকরি করে এগুলো অতি স্বাভাবিক কিন্তু যেটা স্বাভাবিক নয়, সেটা হলো পলির কাজ শুধু ভালোবাসা দিয়ে মেয়েটা একটা গ্রামকে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে দিয়েছে যে সুবল ওই মিটমিটে হ্যারিকেন জ্বেলে অতি ছোট্ট একটা মিষ্টির দোকান চালাতো আজ তার কলকাতার বুকে এতোগুলো  ব্রাঞ্চ তার দোকানের মিষ্টির নাম এখন খবরের কাগজে টিভির বিজ্ঞাপনে এই বিরাট কর্মকাণ্ড সম্ভব হয়েছে পলির চেষ্টায় আর আগ্রহে সে চাকরি নেয়নি কারণ সে একা ভালো থাকতে চায়নি তাছাড়া সে বলে যে তাদের গ্রামেই খাঁটি দুধ থেকে শুরু করে খাঁটি আঁখের গুড়, তালের গুড় পাওয়া যায় মিষ্টি তৈরি করতে এগুলোর অবদান অনস্বীকার্য তারপর শুরুতে পেয়েছে কম পারিশ্রমিকে শ্রমিক একমাত্র তার চেষ্টাতেই তাদের গ্রামের সেই তাড়ির ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে এখন সেই ছেলেগুলোই দামি দামি গাড়িতে করে মিষ্টি নিয়ে আসে কলকাতায় এতোগুলো দোকান সামলানো তো আর ছোটোখাটো বিষয় নয় পলি নিজেই সমস্ত দিকে তীক্ষ্ণ নজর দেয় কোথায় কাকে কোন কাজটা দিতে হবে তাও - ঠিক করে দেয়

বাপির মা, অর্পণ, সুপর্ণা সব্বাইই পলির এই কলকাতার ফ্ল্যাটেই থাকে পলি যাতায়াত করে  অবশ্য সুবলকেও যেতে হয় পলির শ্বশুর-শাশুড়িও এখন কলকাতার ফ্ল্যাটে শিপ্রা আর সোনাও এসেছে শিপ্রার বাবা-মাও কলকাতার এই ফ্ল্যাটেই থাকেন মানুষ যত বেশি হয়, ব্যবসা তত বড়ো হয় যাঁর কিচ্ছু করার ক্ষমতা নেই, তিনি দোকান পাহারা দিতে কখনো বা টেস্ট করতে বা ফোন ধরতে কাজে লাগেন পলি সেইভাবেই প্রত্যেককে কাজে লাগিয়েছে মোটামুটি বিশাল এই গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে জাঁকজমকের অভাব নেই

গান বাজছে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের সাথে সাথে পলির মেয়ে লিলি খুব নাচছিল তার দাদু আর ঠামিও তার সাথে হাত তালি দিচ্ছিলেন সেখানে বাপির মাও ছিলেন এবং তিনিও খুব হাসছিলেন শিপ্রার বাবা-মাও ছিলেন শিপ্রার মা মেয়েকে কাছে পাওয়ার পর আর অসুস্থ হননি

পলির ফোনে অনেকক্ষণ থেকেই রিং হচ্ছিল ফোনটা ধরার কেউ ছিল না অবশ্য ধরার আগে তো শুনতে হবে বিভিন্ন শব্দে সেই শব্দ কারও কানে পৌঁছাচ্ছিল না যার একেবারেই শোনবার কথা নয়, সে- লিলিই ফোনটা নিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বাপির মাকে মোবাইলটা দিয়ে বলল--"ঠামি মায়ের ফোন"

লিলি এখন সব বোঝে সে জানে যে ওটা তার মায়ের ফোন বাপির মা এদিক ওদিক চেয়ে পলিকে না পেয়ে নিজেই অন করলেন

কেউ যেন হাঁফাতে হাঁফাতে বলল--"হ্যালো পলি?"

বাপির মা বল্লেন--"আমি বাপির মা বলছি আপনি কে বলছেন?"

বাপির মাও আজকাল শুদ্ধ ভাষা শিখে গেছেন

ফোনের অপর প্রান্ত চুপ অনেক পরে আবার বলে--"একটু পলিকে দেবেন? জানিনা আপনি কে?"

বাপির মা বলেন--"আমি বাপির মা বলছি আপনি কে বলছেন? পলি এখন পুজোয় বসেছে কী দরকার বলুন আমাকে"

অন্য প্রান্ত হাহাকার করে উঠল--"ওগো আমি বড্ড বিপদে পড়েছি পলিকে একটু দিন না ফোনটা!"

বাপির মা বললেন--"শুনুন আজ তো গৃহপ্রবেশের পুজো হচ্ছে আপনি আমাকে বলুন আমি পলিকে বলছি...!"

ফোনটা কেটে গেল হঠাৎ ঠিক সেই সময় সুপর্ণাকে আসতে দেখে বাপির মা ফোনটা তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন--"পলির ফোন আসছে বারবার তোর কাছে রাখ ফোনটা আবার এলে পলিকে দিস"

বলতে না বলতেই আবার রিং হচ্ছে

সুপর্ণা দেখল ফোনের স্ক্রিনে লেখা ফুটে উঠেছে পর্ণা কলিং একটু থমকে গেল সে তারপর অন করে বলল--"হ্যালো"

অন্যদিকের মানুষটি বললেন--"কে? কে আপনি?"

সুপর্ণা বলল--"আপনি আমাকে চিনবেন না আপনি মনেহয় আমার দিদিকে চাইছেন একটু বাদে করুন দিদি ব্যস্ত"

বলে ফোনটা কেটে দিল সুপর্ণা সে বুঝতে পেরেছে এই কণ্ঠ তার দিদির ত্রিপর্ণার কিন্তু তাকে পরিচয় দিতে সে ঘেন্না বোধ করছে

ঠিক সেই সময় সামনে দিয়ে অর্পণ যাচ্ছিল সুপর্ণা বলল--"ভাই ফোনটা ধর দিদির পরিচিত কেউ বারবার ফোন করছে আবার ফোন করলে দিদিকে দিস"

 

 

অন্য সময় হলে সে অর্পণকে এই বিষয় নিয়ে কিছু বলত হয়ত কিন্তু এখন সময় নেই তার

কিছু পরে আবার রিং হলো অর্পণ স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়েই অন করল

বলল--"হ্যালো!"

কণ্ঠ শুনেই ত্রিপর্ণা বলে উঠল--"কে? ভাই? তুই কি অপু? তোরা কি পলির বাড়িতে? আমার খুব বিপদরে ভাই একবার পলিকে দিবি?"

অর্পণ নিষ্ঠুরভাবে বলল--"বড়দি পুজোয় ব্যস্ত আপনি পরে করুন"

ফোনটা সে কাটতেই যাচ্ছিল তার আগেই ত্রিপর্ণা বলল--"ভাইরে, একবার পলিকে দে একটাবার দে ভাই আমার ঘরে ঢোকার চাবি...!"

তার কথা শেষ করার আগেই অর্পণ জোরে জোরে ডাকল--"বড়দি, এই বড়দি...!"

যতবার সে বড়দি বলছে, ততবার সাড়া দিচ্ছে ত্রিপর্ণা সে জানে না যে, মাকে পোড়াবার সাথে সাথে তারা তাকে ত্যাগ করেছে তারা এখন পলিকে বড়দি বলে

পলি এসে ফোনটা ধরল ত্রিপর্ণা কী বলল তা অন্য কেউ বুঝল না কিন্তু পলি বলল--"চাবি তো তোর কাছেই দিয়ে এসেছিলাম সেদিন আমার কাছে তো চাবি নেই রে"

হাহাকার করে উঠল ত্রিপর্ণা--"পলিরে একবারটি আয় এই বিপদ থেকে তুইই বাঁচাতে পারিস"

পলি বলল--"তুই বলছিস তাই যাচ্ছি কিন্তু আমি কিচ্ছু করতে পারব না কারণ তোর ঘরের চাবি আমি তোর হাতেই দিয়ে এসেছিলাম রাখছি এখন"

বলেই পলি সমস্ত গান-বাজনা বন্ধ করে সবাইকে এক জায়গায় ডাকল

তারপর বলল--"ত্রিপর্ণা ফোন করেছিল খুব কাঁদছে"

সুপর্ণা বলল--"বড়দি, আমি তাকে সবথেকে বেশি চিনি আবার কোনো ধান্ধা করছে ওকে বিশ্বাস করা একদম উচিত নয়"

পলি বলল--" বলছে ওর ঘরের চাবি হারিয়ে ফেলেছে আর ওর মেয়েটা নাকি ঘরের ভিতর"

অর্পণ বলল--"বড়দি, আমাদেরও ঘর দুয়ার ছেড়ে পথে বসিয়েছে ওর ব্যাপারে আমারও কিছুই বলার নেই বস্তুত আমরা ওকে মুছে দিয়েছি সেদিন, যেদিন বিনা চিকিৎসায় মৃত মায়ের চিতা জ্বলেছে"

অর্পণের ভিতরের তীব্র ঘৃণা ঝরে ঝরে পড়ল যেন এমনভাবে কথা বলল

পলি বলল--" সত্যিই ক্ষমার অযোগ্য কাজ করেছে ওর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখাই উচিত নয় তবুও ওর পুটুশের কথা বলেছে আমাদের যাওয়া উচিত"

বাপির মা বললেন--"ওকে আমি চিনি সবচেয়ে ভালো কী অভিনয় করতে পারেমাগো মা! ঘোমটা দিয়ে সিঁদূর পরে কীভাবে সমস্ত সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়ে  বেঁচে দিল ওরে বিশ্বাস করার চাইতে বিষাক্ত সাপকে বিশ্বাস করা ভালো"

পলি বলল--"তাকে বিশ্বাস করতে তো বলছি না কিন্তু ভেবে দেখো পুটুশের কোনো ক্ষতি হবার চাইতে বিশ্বাস করে ঠকাও ভালো তাই না?"

সুবল বলল--" তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম না হইবো কেন?"

অতএব সকলের ত্রিপর্ণার বাংলোতে যাওয়াই ঠিক হলো সবাই যখন সেখানে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে, শিপ্রা বলল--"দিদি, তুমি একদম চিন্তা করো না এদিকটা আমি, তোমার ভাই, আমার মা-বাবা  সব্বাই মিলে ঠিক সামলে নেবো"

লিলি হঠাৎ বলল--"আমি যাবো পুটুশের কাছে যাব! মিউএর কাছে যাবো কী মজা! কী মজা!"

ওর কথা অন্য কেউ ধর্তব্যের মধ্যে আনলেন না কিন্তু বাপির মা দিদা বলেন--" মিউটা আবার কে?"

লিলি বলে--"এই যাহ! আমি বলে ফেলেছি!"

বাপির মা দিদা বলেন-- "বলেছো তাতে কী হয়েছে? আমি তো তোমার বন্দু বন্দুর সঙ্গে সব বলা যায়"

লিলি থুতনিতে হাত দিয়ে বলে--"প্রমিস বলো!"

বাপির মা দিদা বলেন--"আচ্ছা প্রমিস আমি কাউকে বলব না"

লিলি বলে--"তাহলে এইখানটায় বসো তুমি তো অনেক বড়ো আমি কি অতো বড়ো কান ছুঁতে পারি?"

বাপির মা বলেন--"একদম ঠিক আমিও বড়ো তাই আমার কানও বড়ো!"

বলে তিনি সোফায় বসে লিলিকে কোলে তুলে নিলেন

লিলি বাপির মায়ের কোলে উঠে কানে কানে বলে--"পুটুশ দিদির বাড়ি দুটো বিড়াল আছে একটা স্বামী বিড়াল আর একটা স্ত্রী বিড়াল স্বামী বিড়ালটা খুব দুষ্টু"

বাপির মা বলেন--" আচ্ছা তুমি কী করে জানলে যে ওরা স্বামী বিড়াল আর স্ত্রী বিড়াল?"

লিলি বলে--"আরে ওরা দুজনে তো দুজনকে খুব আদর করে"

বাপির মা প্রমাদ গোনেন

সর্বনাশ! মেয়ে তো ডেঞ্জারাস!

লিলি বলে--"তুমি এত্তো বোকা কেন গো? কিচ্ছুই জানো না!"

বাপির মা বলেন--"আমি সত্যিই খুব বোকা কিচ্ছু এখনো জানিইনা!"

লিলি পাকা বুড়িদের মতো বলে--"স্বামী বিড়ালটা ভালো নয় খুব দুষ্টু না মাঝে মাঝে স্ত্রী বিড়ালটাকে খুব মারে আর স্ত্রী বিড়ালটা খুব কাঁদে তখন!"

চোখ মোটা মোটা করে বাপির মা বলেন--" ইসসস! তাই? তারপর?"

লিলি বলে--"আমি আর পুটুশ দিদি তখন বাবা বিড়ালটাকে তাড়িয়ে দেই কিন্তু জানো, পুটুশ দিদিটার কী ভয়! ভিতুর ডিম একটা!"

বাপির মা বলেন--"তাই? খুব ভিতু বুঝি?"

লিলি বলে--"খুব ভিতু এদিকে - আমাকে ওই স্বামী বিড়াল আর বউ বিড়ালের আদর করা দেখালো আবার - ওদের দেখে ভয়ে কাঁপছে! কী ভিতুর ডিম পুটুশ দিদিটা! তাই না বাপির মা দিদু?"

বাপির মা মাথা নাড়েন সমঝদারের ভঙ্গিতে

বলেন--"ঠিক ঠিক একদম ভয় পাওয়া উচিত নয়"

লিলি বলে--"স্ত্রী বিড়াল মানে কী জানোতো?"

বাপির মা বলেন--"কী গো ইসতিরি বিড়াল মানে?"

লিলি সঙ্গে সঙ্গে ভুল ধরিয়ে দেয়

--"উফফফ! ইসতিরি নয়, ইসতিরি নয় স্ত্রী! ছোটোবেলায় তোমার মা-বাবা কি একটুও বকে নি তোমাকে? এত্তো বড়ো একটা মানুষ এখনো উচ্চারণই পারো না!"

বাপির মা দিদা বলেন--"সত্যি তো আমি তো ভুল বললামআর হবে না লিলিদিদিমণি!"

লিলি বলে--"স্ত্রী বিড়ালের ছেলে-মেয়ে হয় পুটুশ দিদির বাড়ির স্ত্রী বিড়ালটারও তো তিনটে সন্তান হয়েছে আমরা যে ঘরে থাকতাম ওখানেই তো হয়েছে!"

বলে লিলি খুব দু:খিত হয়ে বলল--"একদম পুচকু পুচকু এইটুকু এইটুকু বাচ্চাগুলো জানো! আমিই তো ওদের খেতে দিতাম!"

বাপির মা দিদা বলেন--"ওমা তাই? তুমি ওদের খেতে দিতে বুঝি?"

লিলি বলে--"আমি ছাড়া আর কে দেবে? পুটুশ দিদির মা তো খুব রাগি পুটুশদিদি ওর মাকে খুব ভয়ও পায় বলে --'আমার মা যদি জানতে পারে আমি বিড়াল বাচ্চাকে খেতে দিয়েছি, মা ঠিক রাগ করবে!"

একটু থেমে বলল--"আচ্ছা, বাপির মা দিদু আমরা তো চলে এসেছি ঘরে তো কিচ্ছু খাবার জিনিস নেই কী খাচ্ছে মা বিড়ালটা?"

বাপির মা একটু ভাবলেন

বললেন--"ওরা তো ইঁদুর খায় তাইই খাচ্ছে নিশ্চয়ই"

লিলি বলল--"মা  বিড়ালের কথা বলছি না তো ঠামি আমি পুচকু দুটোর কথা বলছি"

বাপির মা দিদু বলেন--"ওরাও মায়ের থেকে ভাগ নেবে নিশ্চয়ই"

লিলি বলে--" তুমি কিচ্ছু জানোনা, বাপির মা দিদু!অতো টুকু বাচ্চা ইঁদুর খাবে কী করে? ওরা তো মায়ের দুধ খায়"

বাপির মা চুপ করে গেলেন! আজকালকার বাচ্চাদের বুদ্ধিবৃত্তির পরীক্ষা নিতে যাওয়া বোকামি ছাড়া আর কিচ্ছু নয় ততক্ষণে ড্রাইভার বড়ো গাড়ি বার করেছেন কতোজন যাবেন তা তো তিনি জানেন না

ঊনত্রিংশ পরিচ্ছেদ

ত্রিপর্ণার মাথা কাজ করছে না তার পুটুশের কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না  ঘরের ভিতরে সে একদম চুপচাপ রয়েছে অসুস্থ মানুষ, ভীত মানুষ চুপ থাকে না কখনোই সে নিজের সম্পূর্ণ শক্তি খরচ করে চিৎকার করে বাঁচার জন্য! তার বুকের ধন পুটুশ চুপ কেন!

 সে সবসময় চাবি রাখে সাথে এখন তার ব্যাগে চাবি নেই! সে ব্যাগ ঘাটতে ঘাটতে ব্যাগ ছিঁড়ে ফেলেছে সেখানে চাবি নেই সে নিজের টপের পকেট ঘেঁটেছে পাগলের মতো যে টপ পরে সে দশবার ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে এপাশ ফিরে ওপাশ ফিরে দেখতে থাকত , দেখতেই

থাকত, টপের কালারের সাথে ম্যাচিং করে ব্রা পরতো টপের কাপড় পাতলা হলে ব্রা বোঝা যায় সে সেটাই বোঝাতো বলত--"নারীর স্তন নারীকেই শুধু নয়, সমস্ত পৃথিবীকেই সুন্দর করে তোলে"

বলত আর যেভাবে খোলা এবং ঢাকার মধ্যবর্তী করে রাখলে সব থেকে বেশি তার আকার-আয়তন-রং-নিটোলতা-মসৃনতা-নমনীয়তা এবং দৃঢ়তা বোঝা যায় সব থেকে বেশি তাইই করত এখন সেই টপের পকেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে টপটাও অর্ধেক ছিঁড়ে ফেলেছে বেরিয়ে পড়েছে ব্রাএর ফিতে উন্মুক্ত তার ক্লিভেজ সেদিকে তার নজর নেই সে খুঁজছে চাবি তার পুটুশের কাছে যাবার চাবি ছাড়া আর কিচ্ছু সে চায় না সে খুঁজেই চলেছে কিছুক্ষণ পর পর  সে বিড়বিড় করছে--"কোথায় যেতে পারে চাবি?"

 আর পকেট হাতড়াচ্ছে একসময় টপটাই টান দিয়ে খুলে  ছুঁড়ে ফেলল   উফফফফ অসহ্যকর! বরাবরই ত্রিপর্ণার অপ্রয়োজনীয় জিনিস অসহ্য লেগেছে বরাবরই তার চরিত্র অসংস্কৃত কিন্তু সে জানেনা যে সে মা সে জানত না মা কী জিনিস সে বুঝতো না মায়ের কোমলতা! তার সাধের বুক এখন উন্মুক্ত টলটল করে নড়ছে  সেদিকে তার এক বিন্দুও খেয়াল নেই তার প্রাণের স্তনে এখন তার দৃষ্টি নেই স্তনের অনেক ভিতরে থাকে নারীর হৃদয়  ত্রিপর্ণার সেই অতলে টান লেগেছে! চিৎকার চেঁচামেচিতে অনেক সাধারণ মানুষ তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে শহরে অনেক সমস্যা শহরে তাই নারীদের ব্যবহারও পালটে যায় এই মেয়েরা অন্যের ঝামেলায় জড়াতে পছন্দ করে না তাই কোনো নারী এগিয়ে আসছে না একবার তাকিয়ে দেখেই লজ্জায় অন্যদিকে মুখটা ঘুরিয়ে হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছে আর ছেলেরা তো সারাজীবনের বহির্মুখী নারী তাদের কাছে ভোগ্যবস্তু ছাড়া  আর কিছুই নয় চোখ দিয়ে তারা ত্রিপর্ণাকে গিলে গিলে খাচ্ছে এইরকম পরিস্থিতিতেও তাদের চোখ বলে দিচ্ছে যে সেইদিন থেকে কতোগুলো রাত ত্রিপর্ণার শরীরটাকেই তারা কল্পনায় জাগিয়ে তুলবে ত্রিপর্ণার স্তন কী ভীষণরকম জীবন্ত! অথচ তার সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই! অথচ এই শরীর নিয়েই তার এক বুক অহঙ্কার ছিল সে ভাবতো যতদিন তার এই বক্ষসৌন্দর্য  অটুট থাকবে ততদিন সে পৃথিবীকে রানি মৌমাছির মতো ভোগ করবে তার চারিদিকে  শুধু শ্রমিক মৌমাছিরা  থাকবে সে একা রানি মৌমাছি সেই ত্রিপর্ণার এখন ভিখারির থেকেও ভিখারি দশা তার পাশে যে পুরুষ মৌমাছিরা আছে তাদের চোরা নোংরামি টের পাচ্ছে না ত্রিপর্ণা তারা প্রত্যেকেই  চোরা চোখে তার যৌবন গিলছে কিন্তু অমলেশ একবারো চাইছে না একবারো নয় হয়ত তার পুটুশের জন্যই সে এখন এমন একাগ্র যে অন্য কোনো দিকে তার নজর নেই ভাবছে ত্রিপর্ণা তার শরীর রসকষহীন-শুকনো হয়ে উঠেছিল পুটুশ পেটে থাকার সময় সেই সময় অমলেশ তাকে এক বিন্দুও ভালোবাসত না সেই সময়কার সেই ঘটনায় সে যেমন কষ্ট পেয়েছিল, তেমন আশ্বস্তও হয়েছিল  জীবনে কোনোদিন অমলেশ তাকে ছেড়ে যেতে পারবে না  কোথায় পাবে এই রূপ? এই গড়ন? নারীর রূপ আছে ঠিকই কিন্তু ত্রিপর্ণা লাখে এক সে এমনই জানে নিজের রূপ-যৌবনের প্রতি তার এক  গভীর আস্থা! তার এই ক্লিভেজ  দেখিয়ে  কতো পুরুষকে

পাগল করেছিল! অমলেশও ছিল তাদের মধ্যে একজন সেই অমলেশ তার দিকে ভুলেও তাকাচ্ছে না অমলেশকে সে ভালোবাসে সত্যি বলতে তার আশেপাশে অনেক পুরুষই আছে, যারা তাকে পাবার জন্য অনেক চালাকি করে চোখের দৃষ্টিতেই বুঝিয়ে দেয় অনেককিছু কিন্তু কেউই সেই অর্থে ভালোবাসা জানায়নি আজ পর্যন্ত এসব ভাবতে গেলে তার সবার আগে তার বসের কথা মনে পড়ে  তার বস তাকে খুবই পছন্দ করে কিন্তু সেই পছন্দে সম্মানের ছিটেফোঁটাও নেই আছে শুধু সম্ভোগের চাহিদাটুকু আর কিচ্ছু না একজন রেড লাইট এরিয়ার মেয়েকেও এই ধরণের পুরুষেরা এমনই নোংরা দৃষ্টিতে দেখে ত্রিপর্ণা সব জানে সব

ত্রিপর্ণার মনে বিবিধ চিন্তা খেলা করছে আজকের দিনটায় সে যেন নিজেকেই চিনতে পারছে না তার চারিদিকে এত্তো মানুষ কেন? এরা কারা? পুটুশকে কি কেউই বার করে আনতে পারবে না?

হঠাৎ সে দরজার কাছে আসে ছুটতে ছুটতে দরজায় কান পাতে কিছুই শোনা যায় না! অথচ একবার পোড়ার গন্ধ পায় একবার ছাদের উপর দিকে ধোঁয়া দেখতে পায় সব্বার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য চিৎকার করে লাফায় কেউ অন্যকিছু দেখতে পায় না দেখে তার উন্নত স্তন দেখে তার জীবন্ত স্তন হঠাৎ ছুটে যায় খুলে রাখা টপের কাছে

 বিড়বিড় করে বলে--"নেই? চাবি? নেই? চাবি? নেই? চাবি? নেই?..." আবার দৌড়ে দৌড়ে দরজার হাতল ধরে ঠেলতে থাকে চিৎকার করে ডাকে--"পুটুশ? মারে! এইতো আমি! এইযে তোমার বাবা...! বাবা রাক্ষসকে এক ঘুষি মেরে ভাগিয়ে দেবে! ভয় পাস না মা!"

তারপর আবার খুলে ফেলে রাখা  টপটার কাছে আসছে চাবি খুঁজতে।। উন্মাদের মতো প্যাণ্টের পকেট হাতড়িয়েছে অনেকটা সময় তারপর সেটাও খুলে ফেলেছে পুটুশ তার নয়নের মণি পুটুশ তার বেঁচে থাকার রসদ! সে ভিতরে ত্রিপর্ণা প্যাণ্টি আর ব্রা পরে উস্কো-খুস্কো চুলে, সমস্ত মুখময় লিপস্টিক আর কাজল মাখামাখি করে কী সব যেন বিড়বিড় করছে ঠিক সেই সময় একখানা দামি গাড়ি এসে দাঁড়াল তার বাংলোর সামনে সুপর্ণা নামল অর্পণ নামল পলি নামল বাপির মা নামলেন

ত্রিপর্ণা ফ্যালফ্যাল চেয়ে চেয়ে দেখতে দেখতে বলল--"তাহলে সবাই এসেছো তোমরা? আমাকে মারবেআচ্ছা মারো আরও মারো মেরেই ফেলো কিন্তু পুটুশ যেন সুস্থ থাকে!"

বাপির মায়ের খুব ইচ্ছা করছিল জিজ্ঞাসা করেন যে প্রভাদেবীর মৃত্যুর খবর সে পেয়েছে কীনাকিন্তু ত্রিপর্ণার পরিস্থিতি দেখে তিনি কিচ্ছু বলতে পারলেন না তাঁর সেই যে পরানপুরে শাড়ি-শাঁখা-পলা-সিঁদুর পরিহিত অভিনয়পটু মেয়েটাকে মনে পড়ছে

বাপির মা হাসেন ঠোঁটের কোনে! অস্ফুটে উচ্চারণ করেন ---"মা!"

 

 

ত্রিপর্ণা পলিকে দেখে ছুটে এল

"পলি, আমার পুটুশকে বাঁচা  তুই যা চাইবি তাই দেব আমার এই বাংলো চাই না কিচ্ছু চাই না শুধু পুটুশকে চাই...! তুইই পারবি প্লিজ পলি, দরজাটা খুলে দে!"

পলি বলে--"শোন, তোর ঘরের চাবি আমি সেদিন রাতে ফেরত দিয়ে গেছি আমার কাছে চাবি নেই"

এই সময় অমলেশের কাছে কারও ফোন এলো অমলেশ ফোনটা অন করেই খুব বিষন্ন গলায় কিছু বলল ত্রিপর্ণা কান পেতেও শুনতে পেলো না সে ভাবছে অন্য কথা  পুটুশকে ত্রিপর্ণার থেকেও বেশি ভালোবাসতো অমলেশ! সে এমন নিষ্ক্রিয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! কী বিসদৃশ্য ব্যাপারটা

ইতিমধ্যে সুবল,অর্পণ আর অমলেশ দরজা ধাক্কাতে আরম্ভ করেছে গায়ের জোরে কিন্তু পৃথিবীর মতো ভারী হয়ে উঠেছে যেন দরজাটা এক চুলও নড়ছে না তা এত্তো ধাক্কাধাক্কিতেও

পলি বলল--"এখানে দরজা খোলার মিস্ত্রী কোথাও পাওয়া যায় কীনা জানা আছে কারো?"

কে জবাব দেবে? কারও কি মাথার ঠিক আছে? সব্বাই টেনশানে আছে

পলি ড্রাইভারকে পাঠালো কোথাও হয়তো দরজা খোলার মিস্ত্রী ডাকতে!

এদিকে ঘর থেকে পুটুশের শোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না  আর ত্রিপর্ণা চিৎকার করছে--"আগুন লেগেছে! আগুন লেগেছে! ওই দেখো ধোঁয়া...!"

 ত্রিপর্ণা এখন অমলেশের কাছে এসে ওর জামা ধরে টানছে!

"তোমার কাছে তো চাবি থাকে চাবি কোথায়? বলো, চাবি কোথায়? তোমার চাবি কোথায়?"

শেষ বাক্যটা ত্রিপর্ণা গায়ের জোরে চিৎকার করে বলল জবাবে অমলেশ ত্রিপর্ণাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল  বলল--"নষ্ট মহিলা কোথাকার! রাতে বাড়ি না ফিরে কোথায় না কোথায় মস্তি করে এখন পাগলামো দেখাচ্ছে!"

ত্রিপর্ণা চেয়ে রইল অপলক তাকে  চরিত্রহীনা  বলছে অমল তারই অমলেশ ত্রিপর্ণা এগিয়ে যেতে চাইল অমলেশের কাছে অমলেশ  গরম তেলের উপর বেগুন পড়ার মতো ঝট করে সরে গিয়ে  চিৎকার করল--"ছোঁবে না একদম! একদম ছোঁবে না"

তারপর হাতটা বিশ্রীভাবে নাড়াতে নাড়াতে বলতে লাগল--"দূরে... দূরে...দূরে!"

এইভাবেই ত্রিপর্ণাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেবার জন্য তাকে  তাদের দরজার দিক থেকে মুখটা অন্যদিকে ফেরাতে হয়েছিল আর ঠিক তখনই সে দেখল গাড়ি থেকে সে নামছে সে আর কেউ নয়! পিয়া! অমলেশের পিয়া! অমলেশ যে আকুল আবেদন নিয়ে একজন ভালোবাসার মানুষকে আজীবন জড়িয়ে ধরতে চেয়েছে..., যে তৃষ্ণায় ছটফট করার পর শীতল জল পেতে চেয়েছে আজীবন, ওর মনে হলো সেই জল পেয়ে গেছে! এতোকাল সে  বুঝতেই পারেনি যে, সে আসলে অর্থ নয়, রূপ নয়, ভালোবাসার কাঙাল! নিজেকে চিনতে এতোগুলো বছর লাগলো? ভালোবাসার  অভাবই  তাকে এমন খেপাটে করে রেখেছিল সে স্থান-কাল-পাত্র ভুলে গেল সে আগে যেভাবে অর্থ পেতে গিয়ে সবকিছু হারিয়েছিল, আজও হয়ত ততটাই ভুল করল তার পুটুশকেও ভুলে গেল পুটুশের মায়ের সামনে অন্য নারীকে ভালোবাসলে পুটুশের মায়ের কষ্ট হবে. সাংঘাতিক কষ্ট হবে... কথা সে ভাবল না সে পুটুশের মায়ের উপস্থিতি অগ্রাহ্য করল তাতে হয়ত তাদের দুজনের কারো বিশেষ ক্ষতি বৃদ্ধি না- হতে পারে সময়ের প্রলেপ সমস্তই ভুলিয়ে দিতে পারে কিন্তু পুটুশ? সে কি কোনোদিনও ভুলতে পারবে? তার যে মানসিক, সামাজিক ক্ষতি হবে তা যে অপূরণীয়! অমলেশ তা ভাবল না বস্তুত অমলেশ কোনোদিনই কিচ্ছু ভেবে করে না যেটা ভালোলাগে সেটাই করে আর আজ তো সে একদম আকণ্ঠ পিপাসার্ত! পড়াশুনার সময়ে সে মন দিয়ে শুধু পড়াশুনাই করেছে আধুনিক যুগের ইঁদুর দৌঁড়ে অন্য কোনোদিকে নজরও দেয়নি বিয়ে করতে হবে বলেই বিয়ে করেছে ভালো রেজাল্ট, ভালো মাইনের চাকরি এবং সুন্দরী নারী এই কামনাটুকু নিয়েই তার জগত আবর্তিত হয়েছে যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে  সে নিজের মনের চাহিদাই চিনতে পারেনি যখন চিনল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে তারই স্বীকৃতির অপেক্ষায় তখন তার পুটুশ! কিন্তু প্রেমে আর যুদ্ধে পৃথিবীর সমস্ত অঘটন ঘটে  সে পিয়াকে উন্মাদের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল ঠিক এইভাবেই পিয়া একদিন ওকে জড়িয়ে ধরেছিল পিয়া সেদিন কিচ্ছু বলেনি শুধু চোখের জলে তার বুক ভাসিয়ে দিয়েছিল আজ অমলেশ কাঁদছে হাউহাউ কাঁদতে কাঁদতে সে কিছু একটা বলছে "পুটুশ... পুটুশ...পুটুশ...!"

সে আরও কিছু বলছিল কিন্তু ত্রিপর্ণা আর কিচ্ছু বুঝতে পারেনি পুটুশের জন্য তার মানে অমলেশের বুকের ভিতরে স্নেহ আছে আছে ঠিকই কিন্তু তার পরিমাণ কতোটুকু? আগের মতোই কি? ত্রিপর্ণা দেখছে চোখে তার জল সেই সুন্দরী ত্রিপর্ণা অর্ধ উলঙ্গ হয়ে চোখ দিয়ে খেয়ে নিচ্ছে পিয়াকে সে কোনোদিন ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে অমলেশ অন্য কাউকে ভালোবাসে! তাকে ছাড়া অন্য কোনো নারীকে অমলেশ ভালোবাসতে পারে এটা নিজের চোখে দেখেও ত্রিপর্ণা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না কী আছে এই শ্যামলা মেয়েটার? মনেহয় অনেক টাকা আছে মেয়েটার! ভাবছে ত্রিপর্ণা! অমলেশ তো টাকা আর রূপের পুজারি মেয়েটা দেখতে আহামরি কিছু নয়! তাহলে নির্ঘাত অনেক টাকা আছে! মেয়েটাও জড়িয়ে ধরেছে অমলেশকে! ত্রিপর্ণা তৃষ্ণার্ত চোখে

চেয়ে চেয়ে দেখছে দুইজনকে যে মানুষগুলো সেখানে ছিল এবং পরে যারা এসেছে তারা সব্বাই ওদের দুইজনকে পাঁচ সেকেণ্ড দেখে তো দশ মিনিট ত্রিপর্ণাকে দেখছে

মেয়েটাই একসময় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল--"আগে দরজা খোলো এই নাও চাবি"

পিয়ার হাতে ত্রিপর্ণার ঘরের চাবিতার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যে,অমল তাহলে এই শ্যামলা মেয়েটার কাছেই গিয়ে পড়ে থাকে\ ত্রিপর্ণার সুখের চাবি এই মেয়েটার হাতেই তুলে দিয়েছে ত্রিপর্ণার বেঁচে থাকার চাবি নিজেকে চেনার চাবি আত্মজার কাছে পৌঁছানোর চাবি এই চাবি, এই আত্মজা সব, সবই অমলেশের দান অমলেশ একদিন ভালোবেসে দিয়েছিল উপহার! আজ তা পিয়ার হাতে! অমলেশ চাবিটা হাত বাড়িয়ে নিল চোখের সামনে একবার ধরল হ্যাঁ, এটাই তার ঘরে প্রবেশের চাবি কিন্তু অমলেশ একজন পুরুষ মানুষ! পুরুষ যেভাবে নারী চেনে, যেভাবে নারী শরীর কামনা করে, যেভাবে অপরিচিত শরীরকে চিনতে চায়, জানতে চায় তা পৃথিবীর কোনো হিসেবের সাথে মেলে না এই স্থানে পুরুষের তুল না পুরুষই শুধু 

সে চাবিটা দেখছে মন দিয়ে তার থেকে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে দেখছে ত্রিপর্ণা! তার ঘরের এই চাবি একদিন অমলেশ তারই হাতে তুলে দিয়েছিল আর আজ সেই অমলেশ সেই তারই সামনে সেই একই ঘরে প্রবেশের জন্য অন্য একজন নারীর সাথে সেই একই চাবি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে

ত্রিপর্ণা চেয়েই রয়েছে ওর বুকটা নির্ঘাৎ ফেটে যেত কিন্তু যাচ্ছে না কারণ তার বুকের ভিতর মায়ার রাজ্য, তার বুকের ভিতর মাতৃস্নেহ তার বুকের ভিতর পুটুশ!

 হঠাৎ সে তার সামনে বাপির মাকে দেখতে পেল বাপির মায়ের চোখে তার জন্য দরদ! ত্রিপর্ণা এতোক্ষণে মনে হলো তাকে ভালোবাসার কেউ নেই এখানে অসহায় সর্বহারা এক নারী বাপির মায়ের সামনে হু হু হু হু কেঁদে উঠল দুই হাতে মুখ ঢেকে ত্রিপর্ণা নিজেকে সামলাতে চেয়ে আরও জোরে কেঁদে ফেলল

বাপির মা বলেন--"বউমা, পুরুষ ভালোবাসে রূপকে অর্থকে সেই পুরুষ যদি সত্যিকারের ভালোবাসার সন্ধান পায়, সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে এক মুহূর্তেই!"

ত্রিপর্ণা আর পারল না অর্ধ উলঙ্গ শরীরে ঘেটে যাওয়া কাজল আর সারা মুখে লেপ্টে যাওয়া লিপস্টিকে এখন বদ্ধ উন্মাদ ত্রিপর্ণা বাপির মাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল--" আমার পাপের ফল"

বলল--"আমি অমলেশের মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছি এতোগুলো বছর তাঁর কোনো খোঁজও নেইনি...! একটি পয়সাও পাঠাইওনি...!"

তার প্রত্যুত্তরে বাপির মা ত্রিপর্ণার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন--"তোমার তো তবু পাপবোধ কাজ করছে শাশুড়ি মায়ের জন্য! কিন্তু অমলেশের! নিজের গর্ভধারিণীর জন্য তার মধ্যে তো কোনোই অনুভূতিই নেই!"

এই সেই একই বাপির মা, যিনি ত্রিপর্ণাকে যথেষ্ট গালমন্দ করবেন বলে অথর্ব শরীরেও মাইলের পর মেইল হেঁটেছেন

ত্রিপর্ণা বাপির মায়ের পায়ের কাছে মাটিতে পড়ে রয়েছে

চোখের জলে তার নিজের বুকই শুধু ভিজছে না, বাপির মায়ের বুকও সে ভাসিয়ে দিয়েছে

বাপির মা বলছেন--"শুধুমাত্র গর্ভে ধারণ করে বলেই মেয়েরা ঈশ্বরতুল্য!"

ত্রিপর্ণা বলছে--"পাপ, পাপ, পাপ! পাপ করেছি গো বাপির মা!"

বাপির মা উচ্চারণও করতে পারলেন না যে, কী নির্মমভাবেই না মারা গেছেন অমলেশের মা!

অপরাধ বোধের শাস্তিই হলো সব থেকে বড়ো শাস্তি

 

প্রত্যেকেরই নিজস্ব জগত থাকে সেইখানেই তার সুখ আর দু: বাড়িতে অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ত্রিপর্ণার কান্না দেখে বাপির মা কাঁদছেন পলি কাঁদছে মনেহচ্ছে, ঘরের ইট,কাঠ, পাথর এমনকি আলো, হাওয়া, বাতাসও কাঁদছে!

ঠিক সেই সময় কোথা থেকে যেন ছুটতে ছুটতে লিলি এসেছে

হাপুসনয়নে সে হেচকি তুলে কাঁদছে

পলি জিজ্ঞাসা করল--"এভাবে কাঁদছো কেন? কী হয়েছে?"

মেয়ে বলল--"বাবা বিড়ালটা  আর মা বিড়ালটা ঝগড়া করছে!"

পলি ধমক দিয়ে বলল--"এখন কি খেলার সময়? বোঝো না কেন?"

লিলি বলল--"আমি খেলছি না! আমি ছোট্ট বলে আমাকে দেখে বাবা বিড়াল তো ভয়ই পাচ্ছে না!"

পলি বলল--"বিড়াল কিন্তু খুব দুষ্টু প্রাণী সুযোগ পেলে আচড়ে -কামড়ে দেয়

একদম ওদের কাছে যেতে নেই সোনা"

 লিলি বলল--" বাবা বিড়ালটা মা বিড়ালের তিনটের মধ্যে দুটো বাচ্চাকেই খেয়ে নিয়েছে"

বলে বুক ফাটা কান্না জুড়ে দিল লিলি

ওর দুই চোখ থেকে হড়হড় করে জল পড়ছে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে সে চোখ ডলছে অশ্রু মুছে যাচ্ছে যেমন ঠিক তেমনই পড়ছেও ঝরঝরিয়ে ফলে চোখ তার জল ঝরতে ঝরতে টকটকে লাল হয়ে উঠল পলি এতোক্ষণে মেয়ের কষ্ট বুঝল নিজেদের যন্ত্রণা নিয়ে ব্যস্ত ছিল কিন্তু লিলির কষ্ট তাদের থেকে কোনো অংশে কম নয়! আহারে!

সে মেয়ের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল--"চলো দেখে আসছি চলো!"

মেয়ে মায়ের হাত ছিটকে সরিয়ে দিল

বলল--"এখন আর গিয়ে কী হবে?"

হেচকি তুলে কাঁদছে লিলি সে কখনোই চায়নি বাচ্চাগুলো মারা যাক বস্তুত সে নিজেই হুলোর গার্ড হয়ে ছিল তারা যদি ত্রিপর্ণা মাসির ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে না যেতো, হুলো কিছুতেই খেতে পারত না!

পলি মেয়েকে কোলে  তুলে নিল

বলছে--"বললাম তো, চলো গিয়ে দেখি কোথায় হুলো"

লিলি কাঁদতে কাঁদতে বলছে--"তোমরা সব্বাই খারাপ সব্বাই দুষ্টু সব্বাই স্বার্থপর নিজেরা বড়ো হয়ে গিয়েও ঝগড়া করবে আর যখন ইচ্ছে হবে ঘর ছেড়ে দেবে বন্ধুর বাসা ছেড়ে দেবে!"

বলে আর সুর তুলে কাঁদতে থাকে

"আমি ওই বাসায় থাকলে মুঙ্কি-পুঙ্কি মরত?"

হেঁচকি তুলে কাঁদছে লিলি

"মুঙ্কি খুব ভালো মেয়ে

আর পুঙ্কিও!"

পলির মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল! আহারে তার বাচ্চাটা বিড়ালের বাচ্চাদুটোকে ভীষণ ভালোবাসতো! তাদের নামও রেখেছিল!

লিলি তখনো বলছে--"মুঙ্কির অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল আমার কোলে উঠে খেত কোলে না উঠলে ওর পেট ভরত না"

পলি মেয়েকে বুকে তুলে নিয়ে চুমু দিল

বলল--"আমার ভুল হয়ে গেছে মা!"

লিলি বলল--"এখন ভুল স্বীকার করে আর কী লাভ হবে বলো!"

পলি চমকে উঠল

কে কথা বলছে? তার লিলি কবে কবে এতোখানি বড়ো হয়ে উঠল? আর এতোটাই পরিণত? এইটুকু বয়সে? সে বলল--"মা, কাঁদে না! চলো দেখছি কী করা যায়!"

লিলি বলে--"আমি দেখে এসেছি মা শুধু সুঙ্কি বেঁচে আছে মুঙ্কি-পুঙ্কিকে হুলো খেয়ে নিয়েছে!"

পলি  বলল--"আমি তো জানিনা সোনা আমায় বলোনি কেন?"

মেয়ে জবাব দেয় না

ফোঁপাতেই থাকে

পলি মেয়েকে চুমু খেয়ে বলে--"কোনদিকে যাব বলো কোথায় তোমার পিঙ্কি?"

লিলি বলে--"পিঙ্কি না মুঙ্কি, পুঙ্কি আর সুঙ্কি"

পলি বলে--"হ্যাঁ বলো কোথায় তারা?"

লিলি বলে--"শুধু সুঙ্কি বেঁচে আছে বাকি দুজনকে হুলোটা খেয়ে ফেলেছে! বললাম তো!"

পলি মেয়েকে নিয়ে এগোয় বলে--"আর কখনো তোমাকে না জানিয়ে বাড়ি পাল্টাবো না মা!"

ঠিক এই সময় ফোন আসে পলির

সে ফোন অন করতেই শিপ্রা বলে ওঠে--"দিদি, তাড়াতাড়ি এসো পর্ণাদিদি কেমন যেন করছে!"

পলির আর সুঙ্কিকে বাঁচাতে যাওয়া হলো না সে মেয়েকে নিয়েই দৌড়াল

লিলি সব বুঝতে পারল সুঙ্কির জন্য তার প্রাণটা হাহাকার করলেও সে চুপচাপ দেখতে থাকল বড়োদের ইচ্ছের দামই সব সময় স্বীকৃতি পায় লিলি মনে মনে গর্জায় সে জানে তার সুঙ্কিকেও সে বাঁচাতে পারবে না সুঙ্কির মুখটা মনে পড়ছে তার আর ছোট্ট বুকটার মধ্যে হু হু করে উঠছে

কিন্তু তার যন্ত্রণাও সে ভুলে গেল তার ত্রিপর্ণা মাসিমণিকে দেখ মাসিমণির শরীরে পোশাক নেই সারা মুখে কাজল আর লিপস্টিক ঘেঁটে ভূতের মতো চেহারায় সে ধুলোর মধ্যে চিৎ হয়ে পড়ে আছে মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠছে--"অন্ধকারের দৈত্য আছে কিন্তু জানালায়! সে ঘপ করে গিলে নিয়েছে পুটুশকে আমি জানি! পুটুশ! মা! ওমা! মাগো! কোথায় তুমি?"

 

 

বলেই সে দৌড়াতে দৌড়াতে কোথায় কোন দিকে যেন যেতে চাইছে তাকে ধরে রাখতে হচ্ছে নইলে যে কোনো সময় মেন রোডে চলে গেলে ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটে যেতে পারে

হঠাৎ হঠাৎ বলে উঠছে--"মা, মাগো আমায় ক্ষমা করো"

বলছে--"আমার কারণে আমার তিন তিনটে মা তাদের সন্তান হারা হল..."

অমলেশ ততক্ষণে পিয়ার হাত ধরে কোথাও চলে গেছে যাবার সময় ত্রিপর্ণার হাতে চাবি দিয়ে গেছে

বলেছে--"আজও তোমার ঘরের চাবি তোমার হাতেই দিয়ে গেলাম ইচ্ছে করলে এই ঘরের সমস্তটুকু আমার পিয়ার হাতেই তুলে দিতে পারতাম"

হতভম্ব হয়ে চেয়ে দেখেছিল ত্রিপর্ণা ওই শ্যামলা-প্যাংলা মেয়েটার দিকে মেয়েটার চোখ জোড়া ভালোবাসার প্রশান্তিই শুধু নয়, সেখানে খেলা করছে সুখের সাম্রাজ্য!

বাপির মা ত্রিপর্ণার মাথায় জল দিচ্ছে

 বলছে--"মেয়ে হয়ে জন্মেছো সব সহ্য করতে হবে সব মানিয়ে নিতে হবে!"

বলে নিজেও চোখ মুছছে!

ঠিক সেই সময় কোত্থাও কিছু না, হঠাৎ মেঘে ঢেকে গেল সূর্য যেন পৃথিবীও থেমে গেছে যেন তারও গভীর কোনো কাজ আছে অথবা কিছু শুনতে চাইছে নয়ত কিছু বলতে চাইছে

আর অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখা গেল তখন আকাশের কালো কালো মেঘেদের মধ্যে বিভিন্ন আকৃতি তারা যেন জীবন্ত প্রাণী সব কেউ ছুটছে কেউ দাঁত বার করে কিড়মিড় করছে

ত্রিপর্ণা সেদিকে তাকিয়ে ভুলভাল বকছে বলছে--"ওইটা দেখো আমার মা! ওইটা অমলেশের মা! পাশেরটা শকুন যুধিষ্টিরের সাথে এবার পাশা খেলা হবে দ্রৌপদীর পোশাক খোলা হবে!"

বলেই সে হেসে ওঠে হঠাৎ তারপরই নিজের শরীরের দিকে নজর যায় তার!

দেখতে থাকে গভীর মনোযোগ দিয়ে বুক, নাভি, থাই...!

বলে--" কী সুন্দর, না?"

বাপির মা অশ্রু মুছে দেন বলেন--" সংসার জীবন আসলে যুদ্ধের অন্য নাম সুখ আনে নারী নারীই জন্ম দেয় নারীই সৃষ্টির কারণপৃথিবীও নারী পৃথিবীকেই সব সহ্য করে নিতে হয় নইলে

সৃষ্টি লয় হয়ে যাবে ধ্বংস হয়ে যাবে অমৃত পানও নারীই করায় নারীই পৃথিবীতে স্বর্গ আনতে পারে...!"

আরো কতো কথা তিনি বলতে থাকেন সমস্ত চরাচর যেন এসব শুনতে থাকে চুপচাপ করে বাতাসের প্রবাহও যেন বন্ধ অথচ ত্রিপর্ণাকে নতুন করে যুদ্ধ করতে হবে মেয়েকে বাঁচাতে হবে! একার জীবনে অনেক সমস্যা আসে সেইসবের সাথে যুদ্ধ করতে হবে

তবুও সে বসেই রইল তো বসেই রইল মাতৃহৃদয়কেও যে ভীষণ বন্ধনে বেঁধে রাখলেন বাপির মা, তার নাম মায়া! এই মায়ার মায়া মহাকালস্বরূপ সেই মুহূর্তে তাই বুঝি বাতাস প্রবাহিত হতে ভুলে গেছিল বাপির মা ত্রিপর্ণার গালে চুমু দিচ্ছেন আর হাত নেড়ে নেড়ে কিছু বোঝাচ্ছেন দূর থেকে আকাশ দেখছে বাতাস দেখছে যেন বাপির মা নন, বিরাট কপিধ্বজ রথে বসে জ্ঞানমুদ্রা হাতে নিয়ে উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন স্বয়ং কৃষ্ণ তাই তো রথী মহারথীরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছেন

সংসার জীবন আসলে তো যোগের ফল নারীরাই সেই যোগ রক্ষা করে নারীরাই অমৃত পান করায় নারীই পুতনা রাক্ষসী হয়ে প্রাণ সংহার করে

সৃষ্টি, স্থিতি লয় করে বাতাস ছুটতে আরম্ভ করলো

আর বাপির মা বললেন--"সবাইকে সুখের পথ দেখায় নারী সে- ভালোবাসে, ভালোবাসা শেখায় এই বিশ্বসংসারের মূল চালিকাশক্তি নারী তারাই ঈশ্বরের মতো ভালোবাসে তারাই যৌথতার শিক্ষা দেয় তারাই নিজেরাও পথ দেখায় এগিয়ে নিয়ে চলে অন্ধ আতুরকেও! তাদেরই  ভালোবাসার ভাষারূপ ফুটে ওঠে বিভিন্ন ভাবে  

বাপির মা ত্রিপর্ণার হাত ধরে ঘরের দিকে নিয়ে  চললেন ত্রিপর্ণারও সেই মুহূর্তে মেয়েকে মনে পড়ল সে সব ভুলে গেল যেন অমলেশ বলে কেউ ছিল না তার জীবনে যেন জন্মজন্মান্তরে সে মা সে পুটুশের মা সে বুঝতে পারল যে তার আর কাউকেই চাই না সে সম্পূর্ণ সে জীবন না দিয়েও জীবনের পরম প্রাপ্তিতে ভরে উঠল তার পুটূশের জন্য সে নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিতে পারে 

অর্ধ উলঙ্গ নারী তখন মা শুধু মা সে ছুটল পাগলের মতো নয় মায়ের মতো শুধু মায়ের মতো মা না হলে মায়ের মন চেনে সাধ্য কার?

পাগল না হয়েও পুরো পাগল হতে পারে একমাত্র মা

পৃথিবীতে তখনো জন্ম হচ্ছে নতুন প্রাণের মৃত্যু হচ্ছে অনেক প্রাণীর ভালোবাসছে মানুষ ঘৃণা করছে মানুষ সবই প্রতিদানে দিবে আর নিবে সমানে সমানে

শুধু মা পেল দেবার সুখ

কর্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যক্ত মনীষিণঃ

জন্মবন্ধবিনির্মুক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময়ম।।“ 

সমাপ্ত।  

================  

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.