গল্প ।। দুর্ঘটনা বনাম আত্মহত্যা ।। সমীর কুমার দত্ত

 

দুর্ঘটনা বনাম আত্মহত্যা 

                — সমীর কুমার দত্ত  

  

মধুময় হালদার সেদিন সাঁতরাগাছি প্ল্যাটফর্মের ওভার ব্রিজ দিয়ে ওপারে যেতে গিয়ে একটা দৃশ্য তার নজরে এলে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গেলো। ষাটোর্দ্ধো এক মহিলা সিঁড়ির কোণায় বসে আঁচল দিয়ে চোখ মুচ্ছে আর চলমান লোকেদের মুখের দিকে চেয়ে কী যেন বিড়বিড় করে বলছে। সামনে তার দুটো বড়ো বড়ো অ্যালুমিনিয়ামের ঢাকা যুক্ত ক্যান ও একটা কাঁধ ঝোলা ব্যাগ রাখা আছে।

আজ ব্রিজে অন্যদিনের মতো লোক নেই। লাইনে কাজ চলছে। তাই ট্রেন চলাচল কয়েক ঘন্টার  জন্য বন্ধ। সুতরাং প্যাসেঞ্জার অপেক্ষাকৃত কম। তবুও পারাপার করার জন্য দু চার জন হাঁটাচলা করছে। মধুময় মাঝে মধ্যে ওভার ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু ওই মহিলাকে আগে দেখেছে বলে তো মনে হচ্ছে না। মধুময় একটু পরোপকারী। কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলো, " কি মাসীমা, আপনি এখানে একা বসে কাঁদছেন কেন, কী হয়েছে?
মহিলা মুখ তুলে দেখলো মধুময়ের মুখের দিকে চেয়ে। বললো," লুচি, আলুর দম আছে, দেবো বাবা? খাওনা, ক্ষিদের মুখে ভালো লাগবে।"

মধুময়ের বুঝতে আর বাকি র‌ইলো না যে এই বৃদ্ধ মহিলা বাড়ি থেকে আলুর দম আর লুচি তৈরি করে এনে এখানে বসে বিক্রি কোরে পেট চালায়। আজ হয়তো তেমন বিক্রি না হ‌ওয়াতে , একদিকে যেমন মাল নষ্ট হ‌ওয়ার সম্ভাবনা আছে, অন্যদিকে তেমনি বাড়িতে দুটো পয়সা না নিয়ে গেলে অন্যান্য খরচ সামলানো দায় হবে। এই কথা ভেবে হয়তো বুড়িমা চোখের জল ফেলছে। সহৃদয় মধুময় ক্ষিদে না থাকলেও বললো, "হ্যাঁ, ক্ষিদেটাও বেশ পেয়েছে। সেই কখোন  সাতসকালে বেরিয়েছি।ক্ষিদের আর দোষ কী। দেখি খান কতেক দাও দিকি। ভালো লাগলে বাড়ির জন্য খান কতেক নিয়ে যাবো।
— ঠিক আছে বাবা। খেয়েই দ্যাখো না। খেতে ভালোই লাগবে। 
বলে আঁচল দিয়ে পাশের জায়গাটা ঝেড়ে দিয়ে বলে, "এখানে বসো না বাবা। দাঁড়িয়ে খাবে। " বলেই কাঁধের ঝোলা থেকে শালপাতার একটা প্লেট বের করে, ক্যানের ঢাকা খুলে,খান কতেক লুচি আর আলুর দম বের করে প্লেটে রেখে এগিয়ে দিয়ে বললো,  
" এই নাও বাবা, এখনও গরম আছে খেয়ে নাও।"
খেতে খেতে মধুময় জিজ্ঞাসা করলো," তা মাসিমা, আপনি কি রোজ‌ই এখানে বসেন? বাড়িতে কেউ নেই? থাকেন কোথায়?"
—ওই ও পারে  যে ঝিলটা আছে, ওর পরে যে রেল কলোনি আছে, সেখানে থাকি, বাবা। থাকার মধ্যে আমার এক নাতনি আছে। বয়স,এই বছর বারো। তার জন্যেই তো চিন্তা!
—কেন ওর বাবা মা নেই? এ তোমার ছেলের ঘরের নাতনি, নাকি মেয়ের ঘরের? 
— ছেলের ঘরের।
তা তোমার ছেলে বৌমা নেই? তারা কোথায়?
— একদিন সবাই ছিলো বাবা।
স্বামী চটকলে কাজ করতেন। চটকল বন্ধ হয়ে গেলো। আর কোন কাজ কর্ম ছিলো না। শরীরটাও ভালো যাচ্ছিল না। চিন্তায় চিন্তায় হার্ট ফেল করে মারা গেলেন। একমাত্র ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ট্রেনে হকারি করতো। ওই মন্দের ভালো চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ একদিন একটা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে এনে তুললো। বৌমাও একটা কাজ করছিলো। বৌমার শরীরটাও  ভালো যাচ্ছিল না। ক্যান্সার ধরা পড়লো। গরীবের ঘরে ঘোড়া রোগ । ছেলে মাঝে মাঝেই কাজ কামাই করে বৌমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতো। বেরোলে পয়সা।  না বেরোলে নয়। কপাল মন্দ। সাঁতরাগাছি স্টেশনে  দু জনেই কাটা পড়লো। লাইনে বৌমার জুতো আটকে গিয়েছিল। আর থ্রু ট্রেন ছিলো।বৌমাকে বাঁচাতে গিয়ে ছেলেও মারা গেলো। সব‌ই পোড়া কপাল। নাতনিকে নিয়েই আমার চিন্তা। দু দুটো পেট চালানো! লোকের  বাড়ি কাজ নিতে হলো। ঘর পোঁছা, বাসন মাজা। তিন চার বাড়ি কাজ ধরে ছিলুম। তাও স‌ইলো না। বয়েস হয়েছে, তাল মেলাতে পারি না।  পান থেকে চুন খসলেই কথার ফুলঝুরি।বাসন মাজার সাবান দেবে কম। তেলচিটে থাকলে কতো কথা।একটু দয়া মায়া বলে কিছু নেই। ধিৎকার ধরে গেলো। ছেড়ে দিলুম।তারপর রান্নার কাজ নিলুম। বাড়ির গিন্নীদের যা মুখ! মশলাপাতি কম দিয়ে রান্না করতে হবে। অথচ খাবার সুস্বাদু হ‌ওয়া চাই।। আচ্ছা তুমিই বলো, একটু আধটু ঝাল মশলা না দিলে খাবার মুখে লাগে। শেষ মেশ এই কাজ ধরলুম।

বুড়িমা এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে চললো। তাকে থামিয়ে দিয়ে মধুময় বললো," তোমার ছেলের বয়স কতো ছিলো?"
— বয়স খুব একটা বেশি ছিলো না, বাবা।
— তবে এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দিলে কেন?
— বিয়ে আমি দিই নি , আর ও বিয়ে করতে চায় নি।
—বাঃ, তুমি দাওনি আর ও চায়নি, তা হলে বিয়েটা হলো কি করে?
— সে আর এক গল্প। ও একপ্রকার বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছে।
— মানে?
— বৌমার মা মারা যাবার পর, ওর বাবা আবার বিয়ে করে।সৎ মা বৌমাকে স্কুল ছাড়িয়ে ঘরের কাজে খুব খাটিয়ে মারতো। একটু পান থেকে চুন খসলে, মারধর করতো, ঘর থেকে বের করে দিতো। একদিন ওকে একটা বাজে লোকের সঙ্গে বিয়ে দেবার নামে বিক্রি করে দেবার মতলব করছিলো। কথাটা জানতে পেরে ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রেল লাইনে মাথা দিতে যাচ্ছিলো। আমার ছেলে ওকে বাঁচায়। ওর মুখে সব কথা শুনে ওকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে এসে তোলে।
— তা ভালো কাজ‌ই করেছে। আচ্ছা তোমার নাতনি এখন কি করে?
— নাতনি আমাকে এই কাজে সাহায্য করে। প্রথম প্রথম আমার সঙ্গে আসতো। আমি একা পেরে উঠতুম না তো তাই। স্কুলে পড়তো। সবদিন আসতে পারতো না। এই আয়ে কুলিয়ে উঠতুম না। তাই, পড়াশোনা ছাড়িয়ে এক বাড়ি কাজে লাগিয়ে দিলুম। কি করবো বাবা , একা হাতে পেরে উঠতুম না। সমত্থ মেয়ে, একা ছাড়তেও ভয় করে।
সব শুনে মধুময় দয়াপরবশ হয়ে বললো, " আচ্ছা আমি যদি তোমাদের একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারি, তোমরা যাবে আমার সঙ্গে?
— কোথায় বাবা?
— ভালো জায়গায়। আমার গুরু বাবার একটা আশ্রম আছে। সেখানে অনাথ বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, যুবক, যুবতীদের ঘরে বসে হাতের কাজ করতে দেওয়া হয়। সেই মাল ওনারা বাজারে বিক্রি করেন। তোমাদের থাকা, খাওয়া, পরা, রোগ নারা ইত্যাদির সব দায়িত্ব ওনাদের। বাচ্চা ছেলে মেয়েদের পড়ার দায়িত্ব‌ও ওনারা নেন।

বুড়ি মা যেন শত দুঃখের মধ্যে খানিকটা আসার আলো দেখতে পেয়ে বললো," ঠিক আছে বাবা, তুমি যখন বলছো, তাই হবে।"
মধুময় বললো, আমি গিয়ে গুরু বাবার সঙ্গে কথা বলে তোমাদের নিয়ে যাবো। তুমি এখানেই বসো তো?"
—হ্যাঁ বাবা, আমি এখানেই বসি।
— বাঃ, বেশ খেতে।  বাকি লুচি আর আলুর দম প্যাকেটে ভরে দাও, বাড়ির জন্য নিয়ে যাবো।
—সবগুলো নেবে। একটু কম করে দিয়ে দেবো।
— না, না। কম করতে হবে না। তোমার যা দাম তাই নেবে। তোমার লোকশান  করে দিতে হবে না।
মনে মনে বললো — খরিদ্দার না হ‌ওয়াতে ওর যতটা ক্ষতি পূরণ করে দেওয়া যায়।  কতো অভুক্ত লোক আছে, তাদের দিয়ে দিলেই হবে। প্ল্যাটফর্মেই আছে কতো না খেতে পাওয়া ছেলে ছোকরা।
"তোমার কতো হলো বলো। 
— এই দুশো পঁচিশ  টাকার মত হয় । তুমি বরং পঁচিশ টাকা কম দাও। 
— না না, আমায় কম দেওয়ার কথা তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি বরং এই তিনশো টাকা রাখো , তোমার কাজে লাগবে।
— না বাবা। ঠিক আছে,আমার যা দাম হয় তাই দাও। তুমি একদিন দিলে কি আমার দুঃখ ঘুচে যাবে। আমরা গরীব হতে পারি, কিন্তু ভিখারী ন‌ই। তা  হলে তো এতো কষ্ট করার দরকার‌ই হতো না। হাত পাতলেই চলে যেতো। না বাবা, সৎ ভাবে ঘেটে খাওয়াতে কষ্ট আছে যেমন, আনন্দ‌ও আছে, আছে মনের জোর। তুমি এ মনের জোর ভেঙে দিয়ো না।

শত অভাবেও বুড়িমার সততা, আত্মবিশ্বাস ও মনের জোরে মোহিত হয়ে লুচির দাম মিটিয়ে দিয়ে বাকি লুচি নিয়ে মধুময় চলে গেলো। মনে মনে ভাবলো— বাংলাদেশে এরকম অসহায় বুড়িমার সংখ্যা নেহাতই কম নয়, যারা জীবন যুদ্ধে সততার সঙ্গে বেঁচে থাকতে চায়। অথচ আজকের সমাজ ব্যবস্থা এদের পাশে থেকে সৎভাবে বাঁচতে সাহায্য  করবে না। এটা সভ্যতার বিড়ম্বনা ছাড়া আর কি? সেই জন্যই ফুট ব্রিজের সিঁড়ির এক কোণায় বসে ছোট খাটো ব্যবসা করে দিন গুজরান করতে হবে এক অসহায় বৃদ্ধাকে। এর পরেও বড়ো গলা করে বলা যায় কি যে আমাদের দেশ উন্নতিশীল দেশ। ইনি কারোর মা, মাসিমার মতো। তবুও মনের ভিতরে যে মানুষটা রয়েছে, যার নাম বিবেক, সাড়া দেয় না। মানুষ বাড়িতে উচ্চ মূল্যের দেশী বিদেশী পোষ্য ক্রয় করার এবং তাদের প্রতিপালনের জন্য ব্যয় করতে পারে, তবু নূন্যতম সাহায্যের হাতটুকুও এদের দিকে বাড়াতে পারে না। এর উত্তরে অনেকে বলবেন ,পশুরা মানুষের মতো বেইমান নয়। তাহলে তো পেটের সন্তান‌ও বেইমান হয় কখনো কখনো। তাদের জন্য কি বাবা মায়েরা কিছু করে না। এর কোন যথার্থ উত্তর নেই। কারণ এমন অনেকে আছে, সংখ্যায় যদিও কম, তথাপি আছে , যারা তাদের সন্তানদের জন্যেও কিছু করে না। সে কথা আলাদা। যাই হোক মধুময় মায়ের জন্য খান কয়েক লুচি ও আলুরদম রেখে বাকি গুলো প্ল্যাটফর্মে আশ্রয় নেওয়া ছেলেপুলেদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। তারা খুব আনন্দের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়ে খেতে শুরু করলো। তা দেখে মধুময় খুব খুশি হলো। মধুময় আসলে অকৃতদার। বৃদ্ধ মাকে নিয়ে থাকে। মা কতোবার মধুময় কে  বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি 
করেছে ।  মধুময় করতে চায়নি। শুধু অজুহাত দেয়। বলে, বৌ এলে তোমায় দেখবে?  তারচেয়ে নিজের বিপদ আর বাড়িও না। এইসব বলে এড়িয়ে যায়। ভালো চাকরি করে।  মা ব্যাটার ভালোভাবে চলে যায়। কারোর দুঃখ দেখলে থাকতে পারে না। একটা বড়ো হৃদয় আছে।

পরের দিন গুরুদেব ,যিনি বিবেকানন্দের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত,  সেই সচ্চিদানন্দের কাছে গিয়ে মধুময় সব কথা বলে পরের দিন বুড়িমার সঙ্গে দেখা করে সমস্ত বৃত্তান্ত বললো এবং পরের দিন তাদের নিয়ে যাবে বলে ওই জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ে থাকতে বলে চলে গেলো। বুড়িমার মনে হলো মধুময় সত্যিই একজন ভালো মানুষ। ওকে বিশ্বাস করা যায়। সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করে পরের দিন বেরিয়ে পড়লো নাতনির হাত ধরে । যথা সময়ে পূর্ব কথিত জায়গায় মধুময়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। অপেক্ষার পর অপেক্ষা। বহুক্ষণ সময় পার হয়ে যায়, তবূও মধুময়ের দেখা নেই। বুড়িমা মনে মনে ভাবে তা হলে কি মধুময় মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু কেন‌ই বা দেবে? এতে ওর লাভ কি?  বিমর্ষ হয়ে নাতনির হাত ধরে ধীরে ধীরে ওভার ব্রিজ থেকে নেমে গুটি গুটি পায়ে লেভেল ক্রসিং এর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে উদ্দেশ্যহীন ভাবে। কোন কারণে বিলম্ব হ‌ওয়ায় মধুময় উদ্বিগ্ন হয়ে কিছুটা পথ দৌড়ে, আবার কিছুটা পথ দ্রুতপদে চলতে থাকে। দূর থেকে তার নজরে আসে বুড়িমার  নাতনির হাত ধরে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য। মনে মনে বিলম্ব হ‌ওয়ার জন্য আফসোস করতে থাকে। লেভেল ক্রসিং এর দিকে ছুটতে ছুটতে 'বুড়িমা' বলে চিৎকার করে ডাকতে থাকে। ততোক্ষণে বুড়িমা এমন এক দূরত্বে চলে যায়, যেখানে তার ডাক গিয়ে পৌঁছায়নি। মধুময় উদভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকে। এদিকে  দুদিক থেকে দুটো থ্রু ট্রেন  পাশ করছিলো। মধুময় ভাবে তাকে আগেই পার হয়ে যেতে হবে, না হলে ট্রেন দুটোকে পাশ হয়ে যেতে  দিলে সময়  লাগবে আর বুড়িমা আর‌ও দূরে চলে যাবে, যেখানে থেকে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ট্রেনের আগে লাইন পার হতে গিয়ে যা হবার তাই হলো। মধুময় ট্রেনে কাটা পড়ে গেলো। 

এদিকে বুড়িমার মন পড়ে ছিলো পিছনের দিকে।  হঠাৎ যেন শুনতে পেলো কিছু লোকের সাবধান বাণী "ট্রেন আসছে,  দাঁড়িয়ে যান,দাঁড়িয়ে যান। ----যাঃ,  যাঃ, সেই কাটা পড়ে গেলো!  নিয়তি কেনো বাধ্যতে।" বুড়ি মনে মনে ভাবে কিছু যেন একটা ঘটেছে। মধুময়ের কিছু হলো না তো। বলতে বলতে পিছনে ফিরে স্টেশনের দিকে এগোতে লাগলো। স্টেশনে গিয়ে লেবেল ক্রসিং লোকের ভিড় দেখতে পেলো। জিজ্ঞাসাবাদ করে জানলো যে একজন ট্রেনে কাটা পড়েছে। দৌড়ে দেখতে গেলো। দেখেই চক্ষু চড়কগাছ। এ তো মধুময়। এ কি সর্বনাশ হলো। দেরি হয়ে গেছে বলে তাড়াহুড়ো করে কথা রাখতে গিয়েই এই সর্বনাশ ডেকে আনলো।  ছিঃ ছিঃ, আমি মধুময়ের সম্বন্ধে কি সব ভাবছিলাম!  আমার জন্য  ওর মতো ভালোমানুষের  প্রাণটাই চলে গেলো। আমার আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই। এখানকার পাট চুকিয়ে চলে যাবো বলে বেরিয়ে ছিলাম। ফিরে যাবার আর পথ নেই। সব থেকে বড়ো তাজ্জবের বিষয় এই যে ঠিক একই জায়গায় বছর দুয়েক আগে তার ছেলে, বৌ ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায়। তাহলে তাদের আত্মাই কি মধুময় কে টেনে নিলো আমাদের আরও বিপদে ফেলার জন্যে। মধুময় আমাদের কেউ নয়। তাহলে ওকে প্রাণ দিতে হলো কেনো? আমাদের কপালে কোন সুখ নেই। অনেক দুর্ভোগ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে। তারচেয়ে এ পোড়া ভাগ্য যিনি দিয়েছেন, তার কাছে ফিরে যাওয়াই ভালো। বুড়িমা তার নাতনির হাত ধরে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইলো। লাইন থেকে লাশ সরিয়ে নিয়ে গেলে, আবার ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলো। বুড়িমা নাতনিকে নিয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছিল। নাতনি তাকে জিজ্ঞাসা করলো,  "ঠাকুমা , যেখানে যাবার কথা ছিলো , সেখানে যাবো না?
—আর কী করে যাবো। আমি তো পথ চিনি না।
—এখন কি আমরা বাড়ি ফিরে যাবো?
— হ্যাঁ, আমরা আমাদের আসল বাড়িতে ফিরে যাবো।
— আসল বাড়ি?  আমাদের আসল বাড়ি আছে? কোথায়?
— একটু পরেই আমরা সেখানে চলে যাবো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই এক‌ই লাইনে একটা দূর পাল্লার থ্রু ট্রেন পাস করার অ্যানাউন্সমেন্ট হলো। বুড়ি মা নাতনির হাত ধরে এগিয়ে এলো।
নাতনি জিজ্ঞাসা করলো, " এই গাড়িতে যাবে ঠাকুমা? 
নিরুত্তর ঠাকুমা নাতনির হাত ধরে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ধেয়ে আসা মেল ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লো!আর ওদিকে মধুময়ের মা হাঁ করে অনাথের নাথ মধুময়ের জন্য পথ চেয়ে বসে র‌ইলো।
==============================
Samir Kumar Dutta
Pune, Maharashtra

Uploaded Image

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.