শিবচরণ
সুনন্দা সিংহ
সন্ধ্যেবেলা হতেই কুকুরটা আজ ভীষন ডাকছে। কিন্তু এই সাত সন্ধ্যেবেলা তো কুকুর ডাকার কোনো কারণ নেই! এই সময়টা চারিদিকে সুনসান থাকে ঠিক কথা। কাজের বৌ, রান্নার মাসি, বিকেলে যারা বেড়াতে বা দরকারে আসে, তারা সবাই একসাথেই চলে যায়। আমিও সেই সময়টায় দুদিকের গ্রীলে তালা-টালা দিয়ে দিই। তারপর কাপড় ছেড়ে ঠাকুর ঘরে ঢুকি সন্ধ্যে দিতে, একেবারে পূজো সেরে গোপালকে শয়ন দিয়ে বেরোই। কুকুরটা বাইরের দিকে শুয়ে বসে থাকে। কখনো তো এভাবে ডাকে না! ওর নাম চিমু। আমি ঠাকুর ঘর থেকেই চিমুকে দুবার বকা দিলাম। তাতে ও আরও জোরে চ্যাঁচাতে লাগলো! কোনো মানে হয়! এই ভর সন্ধেবেলা কি চোর আসবে নাকি! তখনি মনে পরলো আমি বাইরের টিউবওয়েল এর একবার আওয়াজ পেলাম না? কেউ কি এসেছে তবে? কিন্তু চেনা কেউ হলে তো চিমু এভাবে ডাকবে না! আমি ঠাকুর ঘর থেকেই জোরে "কে...." বলে হাঁক দিলাম। নাঃ, কেউ কথা বলেনি। বরং আমার আওয়াজে চিমুই দ্বিগুন জোরে চ্যাঁচাতে লাগলো। শঙ্খ বাজাবার সময় চিমু -ও উ... করে যে শব্দ করে আজ তাও করেনি। ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে তো! আমি পূজো সেরে, গোপালকে শয়ন দিয়ে ঠাকুর ঘরের দরজা বন্ধ করে বাইরে এলাম। চিমু দেখি দাঁত মুখ খিঁচিয়ে গ্রীলের ওপরে ঝাঁপিয়ে পরলো। আবার ওদিকের গ্রীলের দিকে ছুটে গেল। কি ব্যাপার! সাপখোপ ঢুকলো নাকি!
দুমাস আগে, জৈষ্ঠ মাসের প্রচন্ড দাবদাহের একটা দিন। দুপুরের দিকে হঠাৎ করে ছোট ছোট মেঘের দল চারিদিক দিয়ে ধেয়ে এলো আর জমতে লাগলো ঈশান আকাশে। দেখতে দেখতে গাঢ় ধূমরো বর্ণ ধারণ করলো পূর্বাকাশ। প্রবল ঝড় বৃষ্টি এলো বলে!" ওরে কাপড় তোল, ঘুটে সরা, জানলা বন্ধ কর "... ত্রস্থ হয়ে উঠল সবাই। কিন্তু তখনি ঝড় বৃষ্টি এলোনা। মুহু র্মুহু বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো ও শুরু হলো মেঘের গর্জন।
শেষে বিনা বর্ষণে এত জোরে মেঘ ডাকতে শুরু করলো যে সবাই ভয়ে ঘরে ঢুকে পরলাম। কারণ তখন ভীষন শব্দ করে বাজও পড়তে শুরু করে দিয়েছে। এর পরে শুরু হলো বৃষ্টি, তুমুল বৃষ্টি। কিন্তু মেঘ গর্জন সমানে চলছে। কাছাকাছি বেশ কয়েকটা বজ্রপাত হয়েছে মনে হলো।
এমন সময় বৃষ্টিটা একটু ধরে এলো। সবাই ঘরের বাইরে বেরিয়ে এটা ওটা করছে। তখনি কাজের বৌ তুলসী বলে উঠল, ওদিকে কিছু হয়েছে বোধহয় দিদি, সবাই ওদিকেই দৌড়োছে! দেখি তো কি হলো! বলেই সে দৌড়ে গেল। আমি ছাদ থেকেই এদিকও দিক দেখার চেষ্টা করছি। যারা দৌড়োছে, তাদের জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে গো.. হলোটা কি? মিনিট দশেক পরে তুলসী বৌ কাঁদো কাঁদো স্বরে কোথা থেকে যেন চিৎকার করে উঠল, দিদি গো! শিবচরনের ওপরে বাজ পরেছে গো! শুনেই আমি নিচে নেমে ওদিকে ছুটলাম। দেখি কয়েকজন শিবচরণকে ধরাধরি করে আমাদের শিব মন্দিরের বারান্দায় নিয়ে শুইয়ে দিলো। আমি গিয়ে ওর শরীরে হাত বুলিয়ে বললাম, কে বলল যে বাজ পরেছে? শিবচরণ অজ্ঞান হয়ে গেছে, কিছু হয়নি ওর। কেউ যাওতো! অসীম ডাক্তারকে ডেকে আনো তো! বৃষ্টি যা হচ্ছে তাতে কারোর কোনো কেয়ার নেই। দু-তিনজন বলল, ও গিয়েছিলো জমিতে হাল দিতে। বাজ পড়তে শুরু করলেই ও গরুদের খুলে হাঁকিয়ে দিয়ে লাঙ্গলটা ঘাড়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে যাচ্ছিল! তখনি একটু দূরে বাজ পরলো আর অমনি ওর লাঙ্গলটা বিদ্যুৎ টেনে নিয়েছে। অমনি শিবচরণ মাটিতে পরে যায়। ও আর বেঁচে নেই গো পিসিমা। কিন্তু আমার বিশ্বাস হলো না। ছেলেটার কোথাও কোনো পোড়া নেই, ক্ষত নেই! পরণে একটা লাল টিশার্ট আর লুঙ্গি! মনে হচ্ছে শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। আমি মাথার চুলে আর গায়ে হাত বুলিয়ে শিব নাম করছি। না না, আমার মন বলছে ও অজ্ঞান হয়ে গেছে ভয়ে, মরে নি, মরতে পারে না। এই তো ৩/৪ দিন আগেই বলল, পিসিমা, ফ্রাইরাইস খেয়েছি, কিন্তু পোলাও কাকে বলে? আমি অবাক হয়ে বললাম, পোলাও খাস নি কখনো? দাঁড়া, আগামী পূর্ণিমায় গোপালের পোলাও ভোগ হয় তো, সেদিন খাওয়াবো তোকে! শিবচরণ খুশি হয়ে বলল, একটু বেশি করে করবেন পিসিমা। আমি হেসে বললাম, ঠিক আছে! এই তো আর দুদিন পরেই পূর্ণিমা! শিবচরণ গোপালের প্রসাদ খাবে। আজ সে মরে যাবে কি করে? আমার চোখ দিয়ে জল পড়তে শুরু করলো।
শিবচরনের ঠাকুরদার সময় হতে ওরা আমাদের জমি চাষ করে। এখন ওর বাবা ও মারা গেছে। অতএব ওরা দুই ভাই মিলে জমিগুলোতে দুবার ধান লাগায়। এখন ওরা ভাগ চাষী আমাদের। কিন্তু শিবচরণ ও ওর ভাই সমীর সাঁওতাল জাতির হয়েও একদম কোনো নেশা করে না। শিবচরণ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে আর সমীর ক্লাস নাইন-এ পড়ে। তবে ওদের বয়েস কিছু বেশি। সমীরের ১৭ আর শিবের ১৯ বছর। শিবচরণ পাড়ার ক্লাব-এর সক্রিয় মেম্বার। ফুটবল টিম-এর ক্যাপ্টেনও। এসব কারণে আমি ছেলেটাকে খুবই পছন্দ করি, ভালোবাসি। নতুন ক্লাসে উঠেই প্রণাম করতে আসে। আমিও আশীর্বাদ করে বই কেনার জন্য ১০০০ টাকা প্রতিবার দিই। ক্লাস টেন এবার এক্সট্রা ২ টো সাজেশন বুক ও কিনে দিয়েছি। সন্ধেবেলা এসে ও পড়তে বসে রোজ আমাদের বার- বারান্দার চৌকিতে। ১০ টা পর্যন্ত পড়ে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে খেয়ে আসে। রাত্রিতে সমীর ও আসে। দুই ভাই এখানেই ঘুমায়। সমীরকেও কতবার বলেছি একসাথে আসতে, এখানে শান্তিতে পড়াশোনা করতে। কিন্তু ও একটু বেয়ারা, কথা শোনে না। শিবচরণ যখন মন দিয়ে পড়ে তখন কোনোদিন দুধ, কোনোদিন হরলিক্স, কখনো প্রসাদ এর সুজি, কখনো লুচি দিই ওকে খেতে। শিবচরনের দুই চোখে কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে। লাজুক ভাবে বলে, আপনি আমার মায়ের চেয়েও ভালো পিসিমা। আমি হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছি। সেই শিবচরণ আমার সামনে নিথর হয়ে পরে আছে, চারিদিকে কান্নার রোল উঠেছে। সবাই বলছে, নাকি মরে গেছে ও। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি নি। ডাক্তার এসে ওকে পরীক্ষা করে যখন আমাকে বলল যে "He is no more, শিবচরণ বেঁচে নেই".. তখনো আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না! কিন্তু আমার বিশ্বাসে ও আর বেঁচে ওঠেনি। কান্নাকাটির মধ্যে লোকে বাঁশ কাটলো, ওর খাট বানালো, ওকে তাতে শুইয়ে " বলো হরি, হরি বোল " বলে নিয়ে চলে গেল শ্মশানে। আমি সেখানেই বসেছিলাম আর সবাই চলে যেতে হাউহাউ করে কেঁদে উঠেছিলাম। একসময় শ্রাদ্ধশান্তি হয়ে গেল। আমি শ্রাদ্ধে পোলাও এর সব খরচটা দিয়েছিলাম। সবাই বলেছিলো, পোলাও হয়না এসব জায়গায়, ফ্রাইরাইস হয়। আর পোলাও বানাবেই বা কে? বলেছিলাম,রাধুনি ও আমিই ঠিক করে দেবো। অতএব পোলাও, আলুর দম, বেগনি ও মিষ্টির খরচ আর রাঁধুনির টাকা আমি দিয়েছি। কেউ বোঝেনি যে ওর শ্রাদ্ধে আমার পোলাও এর জেদ কেন! জানতাম শুধু আমি আর আমার ছেলেসম শিবচরনের আত্মা। দু'মাস হলো, শিবচরণ সন্ধেবেলা টিউবওয়েল টিপে পা ধুয়ে ডেকে আর বলে না, এসেছি পিসিমা। আমিও বলি না আর, পড়তে বসে যাও, এবছর বোর্ডের পরীক্ষা, পাস করতে হবে কিন্তু! পড়ার সময় মাঝে কিছুক্ষনের গ্যাপ দিতাম, ওকে কিছু খেতে দিতাম। শিবচরণ খেতে খেতে সাড়ে আটটায় একটা সিরিয়াল দেখতো, ক্রাইম পেট্রোল। আমি শনিবার রাত্রি ১০ টায় দেখতাম,১ ঘন্টার একটা ফুল স্টোরি সিরিয়াল 'ডিটেকটিভ', সেদিন শিবচরণ ও আমার সঙ্গে ওটাও দেখতো। সারাদিন খেটেখুটে যেখানে গ্রামের প্রায় মানুষ ঘুমিয়ে পরে, সেখানে ও সমানে জেগে সিরিয়ালটা দেখতো! ওর ভাই সমীর ততক্ষনে গভীর ঘুমে। শিবচরনের বোধশক্তি ভালো দেখে আমি খুশি হয়ে উঠতাম।
স্বপ্ন দেখতাম, শিবচরণ কলেজ পাস করে একটা চাকরি করবে। S.T. কোটায় ঠিক ওর চাকরি হবে একটা। তারপর একটা সুন্দর সংসার হবে আর ওকে দেখে অন্য সাঁওতাল ছেলেমেয়েরা এগিয়ে যাবে জীবনের সফলতার পথে। কিন্তু এখন সবই শূণ্য। শিবচরণ নেই।
কুকুর চামু এখন ও ডেকে চলেছে, কিন্ত থেমে থেমে ডাকছে। ঘড়িতে দেখলাম ৭ টা বাজে। এখন এখানে ঘুমাতে আসে শিবচরনের ভাই সমীর আর ওর এক মামাতো ভাই মঙ্গল। ওরা আসবে সাড়ে আটটা নাগাদ। এখনো দেরি আছে। আসলে আমার একটু ভয় ভয় করছিলো এভাবে কুকুরের ডাকাডাকিতে। যা দিনকালের অবস্থা, ঘটনা ঘটতে কতক্ষন! ঠিক তখনি আমার মনে পরলো, সমীর দুপুরের দিকে একবার এসেছিলো আজ সুখবর নিয়ে। ম্যাট্রিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে আর শিবচরণ 2nd ডিভিশনে পাস করেছে। ভেবে পেলাম না, হাঁসবো না কাঁদবো! একটা দীর্ঘশ্বাস পরলো আমার। সমীর বলল, আজ স্কুলে শিবদার স্মৃতিতে একটা সভা করে ছুটি দেবে স্কুল। আর বিকেলে ক্লাব এর পক্ষ থেকে দাদার ছবিতে মাল্যদান ও স্মরনসভা হবে। হয়তো আমাদের রাত্রিতে আসতে একটু দেরি হতে পারে। আমি বলেছি, ও ঠিক আছে। এখন মনে পরলো তাইতো! সমীররা তো আজ দেরি করে আসবে!আর ঠিক তখনি আমার মনে হলো, শিবচরনের আত্মা এসেছে নাকি আমাকে ম্যাট্রিক পাসের খবর দিতে! ওহ! তাইতো! টিউবওয়েল এর শব্দ পেয়েও আমার বুঝতে এত দেরি হলো! আমি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। তারপর শিবচরনের আত্মাকে উদ্দেশ্য করে জোরে জোরে বললাম, "শিবচরণ এসেছো নাকি বাবা, পাসের খবর দিতে এসেছো? আমি খবর পেয়েছি আর কত যে খুশি হয়েছি! কিন্তু তুমি তো নেই, তাই আর কি করবো বলো! তুমি বেঁচে থাকলে মিষ্টি আনিয়ে সবাইকে খাওয়াতাম। তবে আজ তোমাকে স্মরণ করে স্কুলে আর ক্লাবে সভা হয়েছে, তুমি নিশ্চয়ই দেখেছো! তুমি তো খুব ভালো ছেলে ছিলে বাবু, তাই আজ সবাই তোমাকে মনে করছে আর সবাই তোমাকে মনে রাখবে। তবে এই জন্মের মোহে বেশিদিন থেকো না। মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের শরণ নাও, যাতে এর পরের জন্ম যেন ভালো ঘরে হয়। জীবনের সব সুখ সুবিধা পাবে, অনেক নাম করবে। আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি বাবা, তুমি খুব ভালো জন্ম পাও, ভালো মা বাবা পাবে, জন্ম যেন সার্থক হয় তোমার!" এসব বলতে বলতে সমানে চোখ দিয়ে জল পড়ছিলো আমার। আর কি আশ্চর্য! চিমু একবার এ গ্রীলে একবার ও গ্রীলের কাছে দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছিল আর সমানে ডাকাডাকি করছিল। তারপর কুকুরটা বাইরের মুচুকুন্দি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকিয়ে গলা ফাটাচ্ছিল। আমার কথা শেষ হলে আমি যখন বললাম যে শিবচরণ, কুকুরটা তোমাকে খুব জ্বালাচ্ছে! তুমি যাও বাবা! তোমার লোকে ফিরে যাও। অমনি চিমু যেন কার পেছনে ছুটে গেল শিবমন্দিরের দিকে। আমি ডাকলাম চিমুকে। চিমু এলে ওকে রুটি দিলাম। ও খেয়ে দেয়ে শান্ত ভাবে বাইরের সিঁড়িতে কুন্ডলি পাকিয়ে বসে চোখ বুজলো। ঘন্টাখানেক চেঁচিয়ে খুব ক্লান্ত! চিমুর চ্যাঁচানিতে শিবচরনের আত্মারও খুব নাকাল হয়েছে আজ। ওর উপস্থিতি বোঝানোর জন্য ও -ও কতটা চেষ্টা করে যাচ্ছিলো, বেচারা! শেষে গাছের ওপরে গিয়ে বসে আমার সব কথা মন দিয়ে শুনেছে। আর যেই যেতে বলেছি অমনি চলে গেছে বাধ্য ছেলের মত! তাহলে আত্মরা ও আসে কর্তব্য কর্ম করতে! হবে নাই বা কেন! আত্মার সঙ্গে চিন্তা ভাবনা, সংস্কার সবই তো থাকে, থাকে না শুধু দৃশ্য শরির। তবে কায়া না থাকলেও ছায়া তো কিছু একটা থাকে নইলে কুকুরটা কি দেখে অমন করে চ্যাঁচাচ্ছিলো?
===============

