মুক্তগদ্য ।। বাঙালি মানসে নববর্ষ।। পাভেল আমান

 

 বাঙালি মানসে নববর্ষ

 পাভেল আমান

 
"মুছে যাক গ্লানি ঘুছে যাক জরা অগ্নি স্নানে সূচী হোক ধরা। রসের আবেশ রাশি শুষ্ক  করে  দাও আসি আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক "কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গান দিয়েই নতুন বছরকে বরণ করি।নববর্ষ বিদায়ী বছরের গ্লানি মুছে দিয়ে বাঙালি জীবনে ওড়ায় নতুনের কেতন, চেতনায় বাজায় মহামিলনের সুর। সব ভেদাভেদ ভুলে সব বাঙালিকে দাঁড় করায় এক সম্প্রীতির মোহনায়। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে নববর্ষ নিঃসন্দেহে একটি বড় পার্বণ। ১৪৩২ সালের বিদায়ের মধ্যে দিয়ে নববর্ষ পালনে আমরা ১৪৩৩ সালে পহেলা বৈশাখে বরণ করে নিচ্ছি।নববর্ষের আগমনী ধ্বনি শুনলেই সমগ্রজাতি নতুনের আহ্বানে জেগে ওঠে। আবহমান বাংলার চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার মূলে রয়েছে এক অসাধারণ অনুষঙ্গ; সেটি হল বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখ।বাঙালি জীবনের অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন একটি উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ। এ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসব আমেজ আর  একরাশ উচ্ছ্বাস ও বাঙালিয়ানার অনুভূতি। বাঙালির প্রাণের উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখ। বছরের প্রথম দিনটি বাঙালিরই শুধু নয়, বাংলা ভাষী আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জীবন-জগতে স্বপ্নময় নতুন বছরের শুভ সূচনা ঘটায়। জীর্ণ-পুরনোকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নতুন বছরে প্রবেশ করে বাঙালি জাতি।মানুষে মানুষে মহাপ্রাণের মিলন ঘটানোর বর্ষবরণের এই উৎসব গভীর তাৎপর্যময় হয়ে আছে আমাদের জীবনে। এ উৎসব বাঙালির আত্মপরিচয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর এক মহতী লগ্ন।বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিনটি শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের শুরু। এর মধ্য দিয়েই আসে নতুন সকাল, নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা; গড়ে ওঠে মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে অপূর্ব মেলবন্ধন।এবারে বাংলা নববর্ষের ইতিহাসের পাতায় একটু চোখ বোলানো যাক। যেভাবে এলো পহেলা বৈশাখ: বাংলা সনের প্রবর্তনে দুই মুসলিম শাসকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—সুলতান হোসেন শাহ ও মোগল সম্রাট আকবর। তবে অধিকাংশ গবেষকের মতে, আকবরই বাংলা সনের প্রধান প্রবর্তক।কৃষির সুবিধার্থে আকবরের নির্দেশনায় পণ্ডিত ফতেহ উল্লাহ সিরাজী সৌর সন ও আরবি হিজরি সালের সমন্বয়ে বাংলা সন প্রণয়ন করেন। প্রথমে এর নাম ছিল ‘ফসলি সন’; পরে তা ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা সন নামে পরিচিতি পায়।কেউ কেউ মনে করেন, গৌড়েশ্বর রাজা শশাঙ্কের আমলেই বাংলা পঞ্জিকার সূচনা। তখন খাজনা আদায় হতো চন্দ্রবর্ষ অনুযায়ী, অথচ কৃষিকাজ নির্ভর করত সৌরবর্ষের ওপর। ফলে চৈত্রের শেষ দিনে খাজনা পরিশোধের পর পহেলা বৈশাখে জমিদারেরা মিষ্টান্ন দিয়ে প্রজাদের আপ্যায়ন করতেন। সেখান থেকেই শুরু হয় নববর্ষ উদযাপনের প্রথা, যা ক্রমে সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়। আকবরের চালু করা ফসলি সনের এই রেওয়াজ ‘হালখাতা’ হিসেবেও পরিচিত। ফারসি শব্দযুগল ‘হালখাতা’ বলতে নতুন খাতা বোঝায়। এর মাধ্যমে সাধারণত পুরোনো খাতার পুরোনো হিসাব পরিশোধ করে নতুন খাতায় নতুন হিসাব তোলা হয়।বাঙালি হয়ে জন্ম নিয়ে বাংলায় কথা বলা, বাংলায় বেড়ে ওঠার কি যে আনন্দ কি যে মজা তা সবাই আমরা অনুভব করি। দেশের মাটি, দেশের সংস্কৃতি যেন আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। সংস্কৃতি মানেই সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে আর মহৎভাবে বাঁচা। আর প্রতিনিয়ত মরতে মরতে বেঁচে থাকাটার নামই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতিতে বাংলা ও বাঙালির প্রতিটি বৈশাখেরই মৃত্যু হচ্ছে।এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে চলছে অপসংস্কৃতির প্রচণ্ড দাপট লোভ লালসা, ষড়যন্ত্র, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, দূর্নীতি, সন্ত্রাস, অপরাজনীতি আমাদের চিরন্তন বাঙালীয়ানাকে ম্লান করে দিচ্ছে। আমাদের জীবনাচরণ, খাদ্যাভ্যাস, বিনোদন, আবেগ উচ্ছাস সব কিছুতেই এখন বিদেশী সংস্কৃতির ছাপ সুষ্পষ্ট। বৈশাখ এলেই আমরা সবাই একদিনের জন্য যথার্থ বাঙালি হতে নানা কসরত করি।শুধুমাত্র একটি দিনের জন্য বাঙালি সাজার প্রহসন না করে সারা বছরের জন্য বাঙালি হওয়ার শপথ নিতে হবে সবাইকে।আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি, বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে হবে আমরণ। সারা বছর জুড়েই আমরা বাঙালি থাকতে চাই। পোশাক আশাকে, চিন্তা চেতনায় মননশীলতায় বাঙালি সংস্কৃতি ও জীবনবোধকে গুরুত্ব দিতে সবাইকে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। আসুন, এবারের পহেলা বৈশাখে নববর্ষের আনন্দ উৎসবে হৃদয়ের গভীর থেকে আত্নোপলদ্ধির চেষ্টা করি যে আমরা সবাই প্রত্যেকে খাঁটি বাঙালি। আমাদের বৈশাখী উৎসবে বিনোদনে আর উদযাপনে স্বদেশীয় বিশ্বাস, প্রথা ও চেতনাকে যুক্ত করতে যত্নবান হই। যারা অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে স্বদেশীয় আর স্বজাতীয়, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে তৎপর তাদের প্রতিরোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এখনই। বাঙালি জীবনের অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন একটি উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ। এ দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসুক অফুরন্ত আনন্দ উৎসবের মেজাজ সর্বোপরি ষোলআনা বাঙালিয়ানা। বাঙালি যেনো আবারোহয়ে ওঠে নববর্ষের প্রভাতী লগ্নে পহেলা বৈশাখে  কৃষ্টি ঐতিহ্য সাহিত্য সংস্কৃতি ও বাঙালিত্বকে আঁকড়ে ধরে পুরোদস্তুর মনে প্রানে খাঁটি বাঙালি। 
======================
 
রচনা -পাভেল আমান- হরিহরপাড়া- মুর্শিদাবাদ

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.