সংক্রান্তি
মোঃ চাঁন মিয়া ফকির
আজ সোমবার ৩০শে চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিন। বাংলা বছরের শেষ দিন ও চৈত্রের শেষ দিন হওয়ায় আজ চৈত্র সংক্রান্তি। বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারায় আমরা বাঙালিরা পুরনো বছরের সব দুঃখ গ্লানি ও হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে উদযাপন করছি চৈত্র সংক্রান্তি।
স্বাভাবিক প্রশ্ন সংক্রান্তি কি? সংক্রান্তি শব্দের অর্থ হলো এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গমন। সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন করাকেই সংক্রান্তি বলে।অনন্তকাল ধরে সময় প্রবাহমান| এই প্রবাহমান সময়ের আবর্তে সৌরজগতের বয়স যতই বাড়ছে পৃথিবীর বয়সও ততই বেড়ে চলেছে| যার ফলে আজ যা নতুন কাল সেটা পুরাতন| সবকিছুই অতীতের গর্ভে বিলীন হচ্ছে| এই প্রকৃতির প্রবাহমান সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে মানুষ তৈরী করেছে বর্ষপুঞ্জি| প্রকৃতির নিয়মানুসারে ঋতুর পরিবর্তনের ধারায় গ্রীষ্মের পর আসছে বর্ষা এভাবে শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত| সে রকম বাংলা বারোটি মাসও আবর্তিত হতে থাকে| এই আবর্তনে প্রতিমাসের শেষদিন অর্থাৎ যেদিন মাস পূর্ণ হবে সে দিনকে বলা হয় সংক্রান্তি| সংক্রান্তি অর্থ সঞ্চার বা গমন করা| সূর্যাদির এক রাশি হতে অন্য রাশিতে সঞ্চার যা গমন করাকে সংক্রান্তি বলে| সংক্রান্তি শব্দটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সং + ক্রান্তি, সং অর্থ সঙ সাজা এবং ক্রান্তি অর্থ সংক্রমন| ভিন্নরূপে সেজে অর্থাৎ নতুন রূপে সেজে অন্যত্র সঞ্চার হওয়া বা গমন করাকে বুঝায়|
ভোলা সংক্রান্তিঃ
চল্লিশ, পঁয়তাল্লিশ বছর আগের স্মৃতি কথন ছোট মামনির সাথে যা এই রূপঃ কার্তিক মাসের শেষদিন গ্রামাঞ্চলে ভোলা সংক্রান্তি (কার্তিক সংক্রান্তি) নামে সন্ধ্যাক্ষনে একটি উৎসবমুখর উৎসব হতো যা এখন আর হয়না| দুপুর হতেই প্রস্তুতি চলত ভোলা বানানোর কার্যক্রম| খড়, পাটসোলা, বাঁশ ও ছাউললা (পাটের ছাল) দিয়ে ˆতরি হতো মানুষ আকৃতির ভোলা| মশা ও মাছি ধরে ভোলার মুখে গুঁজে তা প্রস্তুত করে রাখতাম সন্ধার ভোলা উৎসবের জন্যে| সন্ধার পূর্বে অপরাহ্নে একজন কুড়াল কাঁধে ছুটতাম ফলের গাছকে ভয় দেখানো সামনের দিনে বেশি ফলফলাদি পাওয়ার আশায়| কুড়ালওয়ালার সাথে থাকতাম আরো কয়েকজন| কার্যক্রমটা চলত এভাবে কুড়ালওয়ালা ফলের গাছে কুপ বসিয়ে দিয়ে জোরে চিৎকার করে বলতে থাকত “কাইটালাইগো কাইটালাই” সাথে যারা থাকত তারা বলত “কাটইননাযে গো কাটইননাযে সামনে বছর নাও ভরা কাডল অইব”| কুড়ালওয়ালা তার কুপ বসানো থামাত আর একজন উক্ত গাছে কলাগাছের ডাউগগা দিয়ে বেধে দিত| কুড়ালওয়ালা আবার সামনের দিকে যেয়ে তেমনিভাবে আমগাছে, লিচু গাছে কুপ বসাতো এবং বলত “কাইটালাইগো কাইটালাই” সাথের জনেরা বলত “কাটইননাযে গো কাটইননাযে সামনের বছর নাও ভরা আম অইব বা লিচু অইব” ইত্যাদি| এভাবে বিকেল শেষে সন্ধ্যায় ভোলার মুখে আগুন ধরিয়ে সবাই (সেলিম, আনু চাচু, শহিদুল চাচু, সাজেম, জজ মিয়া, নজরুল, নুরু আরো অনেকেই) ভোঁ দৌড় মাঠে আর সবাই চিৎকার করে বলতে থাকতাম “ভালা আইয়ে বুরা যায়, মশা মাছির মুখ পোড়া যায়”| সেকি সুন্দর দৃশ্য! আমাদের বাড়ীর পশ্চিমে কদমতলার মাঠ| এই মাঠের উত্তরে উত্তর পাড়া তার পশ্চিমে ব্যাপারী বাড়ী, মাঠের দক্ষিণে মাঝপাড়া তার পশ্চিমে নোনা পাড়া| এই পাড়াগুলোর প্রায় সকল ছেলেরা ভোলা নিয়ে দৌড়াচ্ছে, মনে হত যেন বিশাল এলাকা জুড়ে আলোর মিছিল| আগুনের কুন্ডি উপরে উঠছে নিচে নামছে এ যেন এক আলোর নাচন| আমাদের বাড়ীর পশ্চিম পাশে আমার বড় চাচা আব্দুল কদ্দুছ ফকিরের একটি ফলের বাগান ছিল এর একপাশে ছিল কলাগাছ| এই কলাগাছ এর শুকনো পাতায় লাগিয়ে দিতাম ভোলার আগুন আর হৈ হল্লোড় চিৎকার “ভালা আইয়ে বুরা যায়, মশা মাছির মুখ পোড়া যায়”| আমন ধান ক্ষেতের আইল দিয়ে দৌড়ানো ভোলার আগুনের উঠা নামার সেই চমৎকার দৃশ্য এখনও চোখের সামনে ভাসে| ভোলা যখন পোড়ে প্রায় শেষ তখন এটি আমরা রবিশস্যের ক্ষেতে অর্থাৎ মরিচ, আলো অথবা মূলা ক্ষেতের নরম মাটিতে পুতে দিতাম| তারপর শুরু হত ভূত প্রেত দৌড়নোর পালা উরি ভরে মাটির ঢেলা নিয়ে বাড়ী গিয়ে ঘরের চালের উপড় দিয়ে ছুড়ে ভূতপ্রেত তাড়িয়ে দিতাম| হিন্দু বাড়ীতে হত কার্তিক পুজা| এভাবেই ভোলা সংক্রান্তি বা কার্তিক সংক্রান্তি উৎসব হত যা এখন আর নেই| সনাতন ধর্মের লোকদের মধ্যেও তা এখন সীমিত হয়েগেছে| যুগের বদলে হারিয়ে যাচ্ছে এর ব্যাপকতা|
পৌষ সংক্রান্তি: বারোটি মাসের বারোটি সংক্রান্তির মধ্যে বিশেষভাবে পৌষ সংক্রান্তি তাৎপর্যপূর্ণ| পৌষ মাসের শেষ দিনে সূর্য উত্তরায়ণের দিকে যাত্রা শুরু করে বলে এই সংক্রান্তিকে উত্তরায়ণ সংক্রান্তি বলে| শাস্ত্র মতে মানুষের এক বছর দেবতাদের একটি দিন ও এক রাতের সমান| মানুষের উত্তরায়ণের ছয়মাস দেবতাদের একটি দিন ও দক্ষিণায়নের ছয়মাস দেবতাদের একটি রাত| রাতে মানুষ যেমন সকল দরজা জানালা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন তেমনি দেবতাগণও রাতে অর্থাৎ দক্ষিণায়নে সবকিছু বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন| এ সময় বাহির থেকে প্রবেশ করার সুযোগ নেই, অর্থাৎ দক্ষিণায়ণে সবকিছু বন্ধ করে দেবতাগণ ঘুমিয়ে পড়েন| অর্থাৎ দক্ষিণায়ণে দেবলোক পুরোপুরি বন্ধ| আর দেবগণের এই রাত পৌষ সংক্রান্তির দিন শেষ হয় ফলে পরবর্তী উদয়ের ব্রহ্মমুহূর্ত থেকে (গোস্বামী মতে) দেবগণের দিন শুরু হয়| এ সময়ে স্বর্গবাসী, দেবলোকের সকলেই ঘুমভেঙ্গে উঠে এবং নিত্য ভগবৎ সেবামূলক ক্রিয়াদি শুরু হয়| এই জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ ব্রহ্মমুহুর্তে স্নান, নামযজ্ঞ, গীতাপাঠ, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি ইত্যাদি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটিকে আনন্দময় করে তোলেন| পৌষ সংক্রান্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে বিশ্বখ্যাত বীর, মহাপ্রাজ্ঞ, সর্বত্যাগী ও জিতেন্দ্রিয় মহাপুরুষ ভীষ্মের মহাপ্রয়াণের স্মৃতির জন্যেও উত্তরায়ন সংক্রান্তি অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তি আরও মর্যাদাপূর্ণ হয়েছে| আমরা দেখি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব পক্ষের চারজন সেনাপতির মধ্যে তিনিই প্রথম সেনাপতি| উভয়পক্ষের আঠারদিন যুদ্ধের দশম দিবসে সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পূর্বে পাণ্ডব পক্ষের সেনাপতি অর্জুনের শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ভীষ্মদের রথ থেকে পড়ে যান| কিন্তু তিনি মাটি স্পর্শ না করে আটান্ন দিন তীক্ষ্ম শরশয্যায় শুয়ে উত্তরায়ণের অপেক্ষা করে| পৌষ সংক্রান্তির দিন যোগবলে দেহত্যাগ করেন|
পৌষ সংক্রান্তি বা উত্তরায়ন সংক্রান্তিকে তিল সংক্রান্তিও বলা হয়| সনাতন ধর্মের অনুসারীগণ উক্ত দিনে তিলের নাড়ু, মিষ্টি, ফলফলাদি ইত্যাদি দিয়ে পূজার নৈবদ্য নিবেদন করে| এছাড়াও নানা জাতের পিঠা, পায়েস বিতরণ, খাওয়ার আয়োজনে দিনটিকে আনন্দময় উৎসব মুখর করে তোলেন| এসব কিছুই কল্যানের জন্য| আমরা মানুষের কল্যানেই অপেক্ষা করি|
চৈত্র সংক্রান্তিঃ-চৈত্র মাসের শেষ দিনে সূর্য মীন রাশি থেকে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে তাই একে মহাবিষুব সংক্রান্তিও বলা হয়।চৈত্র সংক্রান্তি শুধু মাসের শেষ দিন নয় এটি বাংলা সনেরও শেষ দিন। এটি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন উৎসব। এদিনটি বিভিন্নভাবে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে স্পেশাল। যেমনঃ-* কৃষিজীবী মানুষের উৎসব।সেই প্রাচীন কাল থেকেই বাংলা কৃষি প্রধান দেশ।চৈত্র মাসের খরতাপে যখন মাঠঘাট ফেটে চৌচির তখন বৃষ্টির আশায় এবং ভালো ফসলের আশায় কৃষকরা বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান পালন করে আসছে। আমার বয়সী যারা একটু লক্ষ্য করুন আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন দেখেছি এই চৈত্র সংক্রান্তি দিনে তাদের গরুগুলো গোসল করিয়ে হুক্কার কলকীতে রং মেখে গরুর গা রাঙিয়ে দিতেন।আমরাও এগুলো করেছি বিশেষ করে আমি এগুলো করেছি। স্বর্ণ রূপার পানিতে অর্থাৎ স্বর্ণ রূপা ধৌয়া পানি হাত পাখায় ঢেলে তা দিয়ে সবাইকে বাতাস করতাম। আরো কতরকম কার্যক্রম।
* হিসাব নিকাশের সমাপ্তি।ব্যবসায়ীরা এদিন পুরনো বছরের সব বকেয়া হিসাব চুকিয়ে ফেলেন।পরের দিন ১লা বৈশাখ খোলা হয় নতুন খাতা। এই নতুন খাতাই হলো হালখাতা।
* সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস। তাদের ধর্ম বিশ্বাসে চৈত্র সংক্রান্তি হলো পূণ্যস্নানের দিন।এছাড়াও রয়েছে চড়ক পূজা, গাজন উৎসব ইত্যাদি।
চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে গ্রাম বাংলায় বসে বিশাল মেলা। মাটির পুতুল, বাঁশের বাঁশি, নাগরদোলা ইত্যাদির শব্দে মুখরিত হয়ে থাকে মেলা প্রাঙ্গণ। গ্রামের কিশোর কিশোরীরা মেলা থেকে তাদের পছন্দমতো খেলনা ঘর সাজানোর জিনিসপত্র কেনে তেমনি কৃষকেরা তাদের প্রয়োজনীয় কৃষি সহায়ক পণ্য কিনে বাড়ি ফেরে।মেলা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালেই দেখা যায় হরেক রকমের ঘুড়ি আকাশে উড়ছে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি আমার শৈশবে মেলা থেকে বাঁশি কিনে বাজানো ঘুড়ি উড়ানো এগুলো মহানন্দে করেছি। বিশেষ করে আব্দুল হাই চাচ্চুর বানানো কমরকাটা ঘুড়ি আকাশে উড়িয়ে দলবেঁধে আনন্দ করেছি।
চৈত্র সংক্রান্তিতে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা হতো। বিশেষ করে তেতো খাবার - গিমা শাক,নিম পাতা, করলা নাইলা শাক ইত্যাদি। বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশ্বাস বছরের শেষ দিনে তেতো খেলে বছরের রোগ-বালাই দূরে থাকবে।
আধুনিক সভ্যতার যান্ত্রিকতায় আমরা অনেকেই আমাদের ঐতিহ্য ইতিহাস এর সহজ সাবলীল জীবন ধারার সংস্কৃতি ভুলতে বসেছি। এর অন্যতম একটি সংক্রান্তি।গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে এখনো ভোলা সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি, চৈত্র সংক্রান্তি, ঋতু বরণ,নববর্ষ পরম আবেগের নাম।আজ চৈত্র সংক্রান্তিতে পুরনো সব জরাজীর্ণতা বিদায় জানিয়ে নতুনত্বকে বরণ কর নেওয়ার সেরা সময়। আমরা তাই করি দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে সুখী সমৃদ্ধ জাতি ও দেশ গড়ি।
=====================
আমার নাম ও ঠিকানা ঃ
মোঃ চাঁন মিয়া ফকির
১১৩/১৯ ফকির বাড়ি, ঢোলাদিয়া ময়মনসিংহ,
বাংলাদেশ।

.webp)