অচিন্তনীয়
স্বপন চক্রবর্তী
অনেক দিন আগের কথা। শীতকাল। মাঘ মাস। কিন্তু নিম্নচাপের জেরে সকাল থেকেই দফায় দফায় বৃষ্টি পড়ছিল। ফলে কনকনে ঠাণ্ডায় সকলেই কাবু। তবে তার মধ্যেও আমাদের বাড়ী ছিল সরগরম। কারণ আমার দিদি জামাইবাবু আর ভাগনে ভাগনীরা প্রায় বছর তিনেক পরে দুদিন আগে সবাই সুদূর রাজস্হানের আলোয়ার থেকে আমাদের বাড়ীতে এসেছে। জামাইবাবু কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ত দপ্তরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী। তিন বছর আগে আলোয়ারে বদলী হবার পরে আর কলকাতায় আসার সুযোগ হয়নি । এবার একমাসের ছুটি নিয়ে তিনি সপরিবারে এসেছেন ।এখান থেকে আমরা সবাই একসাথে আগামী সপ্তাহে ভাইজ্যাগ বেড়াতে যাব।
সন্ধ্যাবেলা। হঠাৎ আলো নিভে গেল। বাইরে ঝমঝমিইয়ে বৃষ্টি নেমেছে।এমন পরিবেশে সবথেকে জমাটি হল মুড়ি আলুর চপ সহযোগে ভূতের গল্প। আর গল্প বলতে জামাইবাবুর জুড়ি ছিল না। অতএব জামাইবাবুকে ঘিরে আমরা ভাইবোন সকলে বসে পড়লাম। বড়রাও দেখলাম একে একে সকলে হাজির। আলুর চপে একটা কামড় দিয়ে জামাইবাবুর গল্প বলা শুরু হল।
— "আজ থেকে বহু বছর আগে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া এক অদ্ভুত ঘটনাই আজ তোদেরকে বলবো । তোরা ত' জানিস, আমার ছোট থেকে বড় বেলার সবটাই কেটেছে ২৪ পরগণার প্রত্যন্ত গ্রাম ধপধপীতে। সেই সময়ের কাহিনী। তখন আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। যখনকার কথা বলছি তখন ধপধপী ছিল একেবারেই পাড়াগাঁ। বিজলী বাতি থেকে সভ্যতার আলো কিছুই প্রায় সেখানে তখনো পৌঁছয় নি। কেবল ট্রেন ছাড়া বলতে গেলে তেমন আর কোন পরিবহন ব্যবস্থাও ছিল না। অবশ্য আজও সে অন্চলে সেভাবে তথাকথিত শহুরে সভ্যতার আঁচ গিয়ে পৌঁছতে পারেনি। সুতরাং ষাট বছর আগের ধপধপির অবস্থা সহজেই অনুমানসাপেক্ষ।
বিজলী বাতির বালাই ছিল না। দূরে দূরে দুএকখানি খড়ের চালের বাড়ী। দুধারে ধান জমি, ফলের বাগান,পুকুর আর ফাঁকা মাঠ। সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে না নামতেই এক ভয়াল ভয়াবহ অন্ধকার আর তার সঙ্গে বিভিন্ন কীট পতঙ্গ এবং বাদুড়, পেঁচার অদ্ভুত রব যেন এক মোহময় ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি করতো। সারা এলাকাটিতে গোটা চারেক পাকা বাড়ী ছিল যার মধ্যে একটি ছিল আমাদের।আমার বাবা ছিলেন ধপধপী গ্রামীণ হাসপাতালের একমাত্র ডাক্তারবাবু তথা কম্পাউন্ডার অর্থাৎ ওষুধের ব্যবস্থা দেওয়া থেকে ওষুধ তৈরী করা অবধি সবই তাঁর একার হাতেই করতে হতো। এটাই ছিল সে সময়কার দস্তুর। গ্রামীণ হাসপাতাল ছাড়া ধপধপীতে ছিল ছেলেদের আর মেয়েদের একটি করে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়।সেই বিদ্যালয় থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে 'সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং' বিভাগে ভর্তি হই। তবে বাবা দক্ষিণরায়ের মন্দির সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই ধপধপীতে আছে , সেই যখন ধপধপী ছিল সুন্দরবনের অন্তর্গত ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। সুন্দরবনের ভিতরে ঢোকার আগে জেলে থেকে মধু সংগ্রহকারী সকলেই বাবার পূজো দিত যাতে নিরাপদে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারত সকলে। তিনি যেন সবার মনোকামনা পূর্ণ করেন। এখনও বাবার পূজা দিয়ে যে কত মানুষের মনস্কামনা পূর্ণ হয়, তা বোধ হয় বলে শেষ করা যাবে না। বাবা আমাদের খুবই জাগ্রত।
যেদিনের ঘটনা বলার জন্য এত গৌরচন্দ্রিকা, সেদিনটা ছিল শনিবার, তায় অমাবস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির পরে প্রতি শনিবার বিকালে এক অধ্যাপকের কাছে পড়তে যেতাম। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই। সেদিনও গেছিলাম। বৈশাখ মাস। তখন প্রায়শই কিন্তু সন্ধ্যায় কালবৈশাখী হতো। অধ্যাপকের বাড়ী থেকে যখন বেরুলাম, তখন দেখি আকাশ ঘন মেঘে ছেয়ে গেছে। যাদবপুর স্টেশনে আসতে না আসতেই ঝড়বৃষ্টির তাণ্ডব শুরু হল। এক ঘণ্টারও বেশী সময় ধরে সেই তাণ্ডব চলল। গাছপালা বেশ কিছু ভেঙে পড়ল, বিদ্যুৎ চলে গেল। ফলে ট্রেনও বন্ধ হয়ে গেল। সবকিছু স্বাভাবিক হতে প্রায় ঘণ্টা চারেক লেগে গেল। অতএব যখন ধপধপী স্টেশনে এসে নামলাম তখন প্রায় মাঝ রাত্রি। স্টেশনে আমার সঙ্গে আরও দু তিনজন নামল বটে, কিন্তু তারা অন্য অন্য দিকে চলে গেল। আমার বাড়ী ছিল স্টেশন থেকে প্রায় দু ক্রোশ অর্থাৎ চার মাইল দূরে। রোজ সাইকেলেই যাতায়াত করতাম। স্টেশনের বাইরে মাসিক বন্দোবস্তে একজনের দোকানে সাইকেল রেখে দিতাম । কিন্তু তখন ত' অনেক রাত। ভাবতে ভাবতেই আসছিলাম যে কপালে অনেক দু:খ আছে। সত্যিই তাই। ধপধপী স্টেশনে নেমে দেখলাম সব অন্ধকার। যাঁর দোকানে সাইকেল রাখতাম তিনি দোকান বন্ধ করে চলে গেছেন। তাঁর আর দোষ কি ! রাত্রি বারটা বেজে গেছে । ভাবলাম আমারও বারটা বেজে গেল। এই চার মাইল অন্ধকারময় মেঠোপথ যার বেশীর ভাগটাই হয়ত আজ ঝড়বৃষ্টির কল্যাণে কর্দমাক্ত হয়ে গেছে , তারপর সাপখোপের দেখা পাওয়াও যেখানে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, সেখানে হাঁটব কি করে ! তবে ছোটবেলা থেকেই আমি খুব ডানপিটে আর দু:সাহসী ছিলাম। এছাড়া রোজ ব্যায়ামের কল্যাণে আমার চেহারা ছিল খুবই সবল। অতএব পরোয়া না করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সম্বল বলতে সাথে ছিল একটি পাঁচ ব্যাটারীর টর্চ যেটি কেবল আলোই দেখাত না রাত্রে , বিপদে আপদে লাঠিরও কাজ করতো।
টর্চটা জ্বালিয়ে পথ চলতে শুরু করলাম। খুবই আস্তে আস্তে চলতে হচ্ছিল, কারণ রাস্তা ছিল কর্দমাক্ত, পিচ্ছিল।তারপর কালবৈশাখী ঝড়ের ফলে চারদিকে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে ছিল।চলার শুরু থেকেই পিছনে যেন একটা শব্দ হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল কেউ বুঝি পিছন পিছন আসছে। যেই থেমে যাচ্ছিলাম সঙ্গে সঙ্গে শব্দটাও থেমে যাচ্ছিল। এইভাবে কিছুক্ষণ যাবার পর আমি থেমে গিয়ে চারিদিকে টর্চের আলোয় দেখবার চেষ্টা করলাম কেউ পেছনে আছে কিনা। বলেছি ত' আমি খুবই বেপরোয়া, সাহসী এবং ব্যায়ামবীর ছিলাম। কিন্তু যদি কোন দুর্বৃত্ত বদমাশ কেউ পিছু নিয়ে থাকে ! বলা ত' যায় না। তাহলে আজ তার একদিন কি আমার একদিন। এরকমই সব সাতপাঁচ ভাবছি,এমন সময় উল্টোদিক থেকে একজন লোক যেন হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে আবির্ভূত হল। মনে হল একটা সাদা ধূতি পরণে। আধো অন্ধকারে মুখটা ঠিক দেখতে পেলাম না। আর মুখের ওপর ত' টর্চের আলো ফেলা যায় না। লোকটিকে আমি চিনতে না পারলেও সে কিন্তু আমায় চিনতে পেরে বলল-'কি ,হলধর ডাক্তারের বড় ছেলে না !' আমি বললাম-'হ্যাঁ'। লোকটি শুধালে-'ঝড়বৃষ্টির জন্য আটকে গেছিলে বুঝি ! ভয় নেই, সাবধানে বাড়ী যাও। বাড়ীতে সকলে খুব চিন্তা করছে।' আমি জিজ্ঞাসা করলাম-'আপনি কে কাকু ? আর আমার বাড়ীর লোকেরা চিন্তা করছে আপনি জানলেন কি করে ?' লোকটি উত্তর দিলে - 'আমাকে তুমি চিনবে না খোকাবাবু। আমি তোমার বাবার সাথী আবার রূগীও ছিলাম একসময়। আমার নাম বটকেষ্ট। বোকা ছেলে, তোমার বাড়ী ফিরতে এত রাত হচ্ছে, সকলে চিন্তা করবে না !' এই বলে আমাকে আর কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই লোকটি যেমন আচমকাই এসেছিল তেমনি আচমকাই উধাও হয়ে গেল। বটকেষ্ট বলে বাবার কোনো রুগীর নাম মনে এল না যাকে আমি চিনি।যাই হোক,আমি আবার ধীরে ধীরে পথ চলতে শুরু করলাম। কিন্তু সেই শব্দটাও আমার সাথেই চলতে শুরু করল।
হয়ত আরো আধঘণ্টা কেটে গেছিল। হঠাৎ করেই মনে এল সামনে ত' ডাকাত কালীর মাঠ। এই মাঠটা পেরিয়ে আরো কিছুটা গেলেই আমাদের বাডী। মাঠের মাঝখানে রয়েছে বয়োবৃদ্ধ একটা বটগাছ।আর তার সামনেই আছে একটা ভাঙাচোরা কালীমন্দির। অনেক অনেক দিন আগে নাকি ডাকাতরা মা কালীর সামনে নরবলি দিয়ে মুণ্ডগুলি ঐ বটগাছে টাঙিয়ে রেখে ডাকাতি করতে যেত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে এর ফলে নাকি তাদের কার্যকলাপে কোন বাধা আসবে না। মনে হতেই বুকটা দুরদুর করে উঠল। শুনেছি রাতবিরেতে নাকি এখানে অনেকে শিশুর কান্না, বহু মানুষের কলরব শুনতে পেয়েছে। তবে সবটাই শোনা কথা। সাধারণত: আমরা স্টেশনে যাতায়াতের পথে বিশেষত: সূর্যাস্তের পরে একটা ঘুরপথ ব্যবহার করি। কিন্তু কেন সেদিন আমি ওই পথ ব্যবহার করেছিলাম তার ব্যাখ্যা আজও আমার কাছে পরিস্কার নয়।
হঠাৎ যেন মনে হল কেউ বুঝি আমার হাতটা ধরে আমাকে আটকে দিল। সামনে একটা সরসর আওয়াজ। টর্চের আলোয় যা দেখলাম তাতে মেরুদণ্ডের ভিতরে রক্তের একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। দেখলাম কিছুটা দূরে একটা বেশ মোটাসোটা বিষধর সাপ হেলেদুলে রাস্তার এপার থেকে ওপারে চলেছে । খুব সম্ভব চন্দ্রবোড়া । আর একটু হলেই তার ওপরে আমার পাদুটো পড়তো। একেবারেই মৃত্যুর পরোয়ানা । কিন্তু কে সে ? যে আমার হাতদুটো ধরে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে আমাকে রক্ষা করলো ! তার সেই শীতল হাতের স্পর্শ আমার প্রতিটি রোমকূপে শিহরণ জাগিয়েছিল।তবে সে যেই হোক,সে যে আমার শুভাকাঙ্খী, তা বুঝতে আমার বিন্দুমাত্র বিলম্ব হলো না। টর্চের আলোয় কিন্তু কারোকেই দেখতে পেলাম না। যাই হোক্, সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আবার চলতে শুরু করলাম।আর আমার পিছনে সেই শব্দটিও। কিন্তু এবার যা দেখলাম তা আমার মত সাহসী নওজোয়ানকেও কাঁপিয়ে দিল।
দেখলাম সামনের সেই বটগাছের ডালে কয়েকটি নরমুণ্ড ঝুলছে । তাদের গলা থেকে রক্ত পড়ে মাটির রঙ লাল হয়ে গেছে। আর কালী মন্দিরে মায়ের জিহ্বার রঙও সেরকমই লাল। মন্দিরের সামনে রক্তস্নাত খাঁড়া হাতে ভয়ংকর চেহারার দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমি বোধহয় ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। মনে হল আমি অজ্ঞান হয়ে যাব। কিন্তু হঠাৎই যেন কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে বললে-'কি খোকন, ভয় পেলে নাকি ! ভয় নেই। চোখ খোল। বাড়ি ত' প্রায় এসে গেছে।' যেন সেই বটকেষ্টর গলা। আমি ধীরে ধীরে চোখ খুলে সামনে তাকিয়ে দেখলাম কোথাও কিছু নেই । এবার টর্চ জ্বালাতে দেখতে পেলাম কিছুটা দূরে বটগাছের একটা মোটা ডাল মাটিতে পড়ে আছে। মনে হয় আজকের ঝড়েই সেটা ভেঙে পড়েছে।
তাড়াতাড়ি করে গাছটার নীচ দিয়ে গিয়ে ভাঙা ডালটাকে টপকে মাঠের ওপারে চলে গেলাম। এবার পাকা রাস্তা। প্রায় ছুটতেই শুরু করলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, আমার সাথে সাথে সেই শব্দটাও যেন ছুটতে শুরু করল।
কিছুক্ষনের মধ্যেই বাড়ি পৌঁছে গেলাম। দেখলাম বাবা মা ভাই আর দুই বোন হ্যাজাক জ্বালিয়ে আমার জন্য উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছে। কিন্তু আমি কোন কথা বলার মত অবস্থায় ছিলাম না। 'মাগো' বলে একটা চিৎকার করে আমি মাটিতে পড়ে যাবার মুখে বোধহয় কেউ এসে আমায় ধরে ফেলল। আমি আর কিছু বুঝতে পারিনি। আমার আর জ্ঞান ছিল না। পরের দিন ধাতস্থ হয়ে আগের রাতের সব ঘটনার আনুপূর্বিক বর্ণনা দিলাম সকলকে। সবাই দেখলাম কেমন চুপচাপ। অবশেষে বাবা বললেন - 'দেখ্ প্রদীপ, গত রাত্রে তোর সাথে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার কিছু কিছু ব্যাখ্যা করাই যেতে পারে। যেমন, তোর পিছন পিছন যে শব্দটা হচ্ছিল সেটা তোর পকেটের ভিতর যে মুড়ি ছিল তার থেকে হচ্ছিল হয়তো। তুই জোরে হোক আর আস্তে হোক যেমনভাবে হাঁটছিলিস, মুড়িগুলোও তেমন করে নড়ছিল। তারই শব্দ হচ্ছিল। তুই ভাবছিলিস কেউ তোর পিছন পিছন আসছিল।'
আমার তখন মনে পড়ল-সত্যিই ত' । আমি যাদবপুর স্টেশনে খিদে মেটানোর জন্য মুড়ি কিনেছিলাম। সবগুলো খেতে পারিনি। পকেটে ঠোঙ্গা শুদ্ধ রেখে ছিলাম । ট্রেনে ভিড়ের চাপে হয়তো ঠোঙাটা ছিঁড়ে গেছিল। এবার বাবা বললেন - 'আর ডাকাত কালীর মাঠে যে সব দৃশ্য তুই দেখেছিলিস গত রাত্রে, সেগুলি সবই মায়া বা চোখের ভ্রম ইংরাজীতে যাকে বলে 'hallucination'. এর আর একটা নাম হচ্ছে অমূল প্রত্যক্ষ। তোর অবচেতন মনের কোন অলীক কল্পনাই তোর চোখের সামনে প্রত্যক্ষ হয়।তখন অবাস্তবটাই যেন বাস্তবতার রূপ ধারণ করে দৃশ্যমান হয়। অনেকের মুখেই আমরা ডাকাত কালীর মাঠের অনেক ভৌতিক কাহিনী শুনেছি।গতকাল রাত্রে অমন একটা অন্ধকারময় একাকী পরিবেশে সেই কথাগুলিই তোর অবচেতন মনে ভেসে উঠেছিল যার ফলস্বরূপ তুই ঐ দৃশ্যগুলি প্রত্যক্ষ করেছিলিস। কিন্তু আসলে সবগুলিই ছিল তোর অলীক কল্পনা মাত্র।'
আমি বললাম-'সেটা হতে পারে, কিন্তু চন্দ্রবোড়া সাপের কামড়ের হাত থেকে আমায় কে বাঁচাল ! কে সেই সময় আমার হাতটা চেপে ধরে আমাকে আটকালো ! এর কি কোন ব্যাখ্যা আছে তোমার কাছে ?'
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবা বললেন - 'না, এর সত্যিই কোন ব্যাখ্যা নেই। হয়ত সে সময় তোর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ই তোকে সাহায্য করেছিল।' আমি বললাম - 'হয়তো। কিন্তু আমার অনুভূতি সম্পর্কে তুমি কি বলবে ? অতএব ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে কথাটি আমি বাস্তব সম্মত বলে মেনে নিতে পারছি না। আর যখন আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম তখন কে আমার কানে ফিসফিস করে কথা বলে আমার মনে সাহস জুগিয়েছিল ! বলো, এর কি কোন উত্তর আছে তোমার কাছে ?'
কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তরে এবার বাবা যা বললেন তা আমাকে চমকে দিল। বাবা বললেন - 'হ্যাঁ, সেটা অবশ্যই একটা কথা বটে। কিন্তু এছাড়া আরো দুটো বিষয়ের কোন উত্তর নেই আমার কাছে। যার মধ্যে একটা হলো তোর সাথে বটকেষ্টর দেখা হওয়াটা । আর দ্বিতীয় ঘটনাটি আমাদের বাড়ীতেই ঘটেছিল কাল রাত্রে। কাল রাত্রি সওয়া বারটা নাগাদ যখন আমরা সকলে তোর পথ চেয়ে খুবই উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছি, তখন আমাদের সদর দরজায় কড়া নাড়ার একটা মৃদু আওয়াজ পাই। আমি দরজাটা খুলতে যাই। পিছন পিছন সন্দীপ মানে তোর ছোট ভাই হ্যাজাকটা নিয়ে আসে। দরজা খুলে কারোকেই দেখতে পেলাম না। অবশেষে দরজা বন্ধ করে যখন ফিরে আসছি তখন হঠাৎ কানে এল একটা কণ্ঠস্বর। তবে খুবই ক্ষীণ। কেউ যেন পিছন থেকে আমায় বললে - 'ডাক্তারবাবু,চিন্তা করবেন না। প্রদীপ ধপধপী স্টেশনে একটু আগে নেমেছে। তবে সাইকেলের দোকান ত' বন্ধ হয়ে গেছে, তাই এই দুক্রোশ পথ হেঁটে আসতে ওর কিছুটা সময় লাগবে। যদিও আমি ওর সাথে আছি। কোন বিপদই ওকে ছুঁতে পারবে না।' তোর কাছে বটকেষ্টর কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে ওটা ছিল বটকেষ্টরই গলা।'
আমি জিজ্ঞাসা করলাম - 'কিন্তু বাবা, বটকেষ্ট কে?' বাবা বললেন-'বটকেষ্টকে তুই চিনবি না।বটকেষ্ট ছিল একদিকে আমার রুগী, অপরদিকে আমার কম্পাউন্ডার। খুব ভাল মানুষ ছিল আর খুব কাজেরও ছিল। কিন্তু ওর একটাই দোষ ছিল। অতিরিক্ত খাবার লোভ। আমি বারবার বারণ করতাম, বলতাম একটু সাবধানে চল বটকেষ্ট। তোমার কিছু হয়ে গেলে তোমার ছেলে মেয়ে বৌ সকলে পথে বসবে। কিন্তু সে আমার কোন কথাই শুনত না। খাবার সামনে পেলে সে লোভ সামলাতে পারত না।' আমি অবাক হয়ে গেলাম। বাবাকে বললাম- 'কি তুমি তখন থেকে 'ছিল', 'পারত' এসব বলছ বাবা ! বটকেষ্টর সঙ্গে আমার ত' গতকাল রাত্রেই দেখা হয়েছে।' বাবা একটু হাসলেন - ' অত উত্তেজিত হোস নি, খোকা। যা বলছি ঠাণ্ডা মাথায় শোন। তোর তখন বছর চারেক বয়স। একদিন বিয়ের বাড়িতে প্রচুর খেয়ে বটকেষ্ট অসুস্থ হয়ে পড়লো। রাতে প্রচণ্ড বুকের যন্ত্রণা।খবর পেয়ে ছুটে গেলাম। কিন্তু কিছু করার ছিল না। এমনিতেই হৃদরোগের কোন চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তখনও ছিল না, এখনো নেই। তার ওপরে বটকেষ্টর তখন শেষ অবস্থা। আমার হাতদুটো ধরে সে বললে - 'ডাক্তারবাবু ,আমি চললাম। দেখবেন,আমার পরিবারটা যেন ভেসে না যায়।' তার মৃত্যুর পরে তার স্ত্রী শ্যামলীকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একটা কাজ জোগাড় করে দিয়েছিলাম। সে এখনো সেখানে কাজ করছে। তার ছেলে নবীনকে ধপধপী স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলাম। তোর থেকে বয়সে কিছুটা বড় ছিল।আই টি আই থেকে পাশ করে সে এখন একটা বড় সরকারী কারখানায় বেশ ভাল কাজ করছে। তার বোনকেও আমি লেখাপড়া শিখিয়ে পাত্রস্থ করেছি কিছুদিন আগে। ছেলেটিও ভাল। হয়ত এইসব কারণেই সে গতকাল তোকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করে আমার উপকারের ঋণ শোধ করেছে।আর বটকেষ্টর মৃত্যুর পর থেকে আমি আর কোন কম্পাউণ্ডার রাখি নি। তবে সরকার ত' এখন ঐ ব্যবস্থা তুলেই দিয়েছে।' বাবার কথায় আমি হতবাক হয়ে গেলাম। সত্যিই যেসব ঘটনা গতকাল আমার এবং আমাদের পরিবারের সাথে ঘটেছে তার ব্যাখ্যা করা একান্তই অসম্ভব।
এমনও হয় ! বিদেহী আত্মাও কি এমনভাবে পরপারের ওপার থেকে এসে তার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যায় ! জানি না। এর উত্তর যেমন সেদিন আমার বাবার কাছেও ছিল না, তেমনি আমার কাছেও ছিল না। আজও নেই। তবে তারপর থেকে সন্ধ্যার মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসার চেষ্টা করতাম।যদিও বা কোনদিন রাত্রি হয়ে যেত, একা একা ফিরতাম না। কেউ না কেউ সাথে থাকত। অবশ্য আমার মনের মধ্যে একটা স্থির বিশ্বাস ছিল যে বটকেষ্ট কাকা অলক্ষ্যে থেকে আমাকে ঠিকই রক্ষা করবেন।তবে আজও কোন বর্ষার রাত্রে যদি একা একা কোথাও যাই, তাহলে বটকেষ্ট কাকার সেই কথাটা যেন কানে বাজে-'কি খোকন, ভয় পেলে নাকি !' " — এই কথা বলে জামাইবাবু এবার তাঁর গল্পের ইতি টানলেন।
নিভু নিভু লণ্ঠনের আলোয় ঘরের মধ্যে একটা আলো আঁধারী পরিবেশ। সবাই যেন কেমন চুপচাপ। বুঝি কথা বলতেই সবাই ভুলে গেছে,এমন কি বড়রাও। কেবল বাইরে থেকে তখনও ভেসে আসছে রিমঝিম রিমঝিম বৃষ্টি পড়ার শব্দ। অবশেষে আমিই সেই অসহনীয় নীরবতা তথা ভয় ভয় ভাবটা ভাঙবার জন্যে বললাম - 'প্রদীপদা, এই গল্পটা কি সত্যি ঘটনা !' জামাইবাবু হেসে বললেন - 'দূর বোকা, গল্প কি কখনো সত্যি হয় !' আর ঠিক তখনই আমার কানে কানে কেউ ফিসফিস করে বললে - 'কি খোকন, ভয় পেলে নাকি'!' আমি চমকে উঠে বললাম - 'কে, কে !' এমন সময় বিদ্যুতের আলোয় চারিদিক ঝলমল করে উঠল। 'কই, কেউ ত' আশেপাশে নেই ! তবে কি এসব আমার মনের ভুল, আমার অবচেতন মনের প্রতিক্রিয়া !' যাই হোক্, বিদ্যুৎ ফিরে আসার আনন্দে আমার কথাটা চাপা পড়ে গেল।
কিন্তু আজও যখন কোনো অন্ধকার বর্ষণমুখর রাতে একাকী বসে থাকি আর প্রদীপদার সেই গল্পটা মনে পড়ে যায়, তখন ভাবি যে সেই রাতে কি বটকেষ্টকাকার বিদেহী আত্মাও আমাদের পাশে বসে ঐ গল্পটা শুনছিল ! সে-ই কি আমার কানে কানে শুধিয়েছিল - কি খোকন, ভয় পেলে নাকি !' তবে এর উত্তর আমার কাছে নেই। আসলে এমন কিছু কিছু অতীন্দ্রিয় ঘটনা আমাদেরকে কেন্দ্র করে এই পৃথিবীতে আজও ঘটে যা সত্যিই ব্যাখ্যাতীত,স্বাভাবিক বুদ্ধিতে যার ব্যাখা করা যায় না॥ —————————————————————
স্বপন চক্রবর্তী।
মাতৃ কুটীর, শিবাণী পীঠ লেন, শিবাণী পীঠ মন্দিরের সন্নিকটে, ভট্টাচার্য্য পাড়া, ওয়ার্ড নং - ৫ , বারুইপুর, ২৪ পরগণা (দক্ষিণ), কলকাতা-৭০০১৪৪.

