লোহার পাতের টুলে পাশাপাশি বসানো ইয়া বড় বড় হাঁড়িতে চিকেন বিরিয়ানি, মটন বিরিয়ানি, চাউমিন। পাশে বড় বড় প্লেটে চিকেন রোস্ট , চিকেন কাটলেট, আলু -গরুর মাংসের বীফ কারি। থালায় শাহী রেজালা । আর একটি হাঁড়িতে বীফ বিরিয়ানি সেটা বসানো জাকিরের ক্যাশ বাক্সের কাছাকাছি । ঝলমলে আলোয় দেখা যাচ্ছে দোকানের নাম "মোস্তাগীর ইসলামিয়া হোটেল"। আব্বার নামে নাম । রাজু ও ফকির সামনে থাকে অর্ডার মতো খদ্দের সামলায় । ক্যাসে জাকির হোসেন বসে থাকে । ভিতরে রোহিনা আর মাসুম । ভিতরে ডাল- ভাত - সব্জি তরকারি সামলায় । সবার গলায় কালো কারে তাবিজ বাঁধা। রোহিনা গরিব । সামান্য দূরে বাড়ি । পরণে সালোয়ার কামিজ । সবার মুখে মাস্ক। রোহিনার গলায় বুকে ওড়না জড়ানো থাকে । সকলের মাথায় কালো টুপি জাকির ছাড়া । তার মাথায় নক্সাঙ্কিত সাদা টুপি । পরণে পা-জামা সাদা পাঞ্জাবি কালো অথবা সাদা। তবে যেদিন যেমন ইচ্ছে মতো পরিধান করে আসে । ফর্সা মুখে কলপ করা সৌখিন যত্নের দাড়ি ।
এই তল্লাটে এই একটাই দোকান । একটু দূরে চা দোকানে সনাতন অল্প ঘুগনি ডিম সিদ্ধ করে । তবে বিক্রি বাজার বুঝে হয় । প্রত্যেক দিন হয় না । দশটা বাজলেই বন্ধ হয়ে যায় । পঞ্চায়েতে সনাতন কাজ করে । ঝাঁট দেবার কাজ । সেই কাজ বউ সামলাতে পারে না বলে নিজে গিয়ে সহযোগিতা করে । টেবিলে টেবিলে জলের বোতল চেয়ার-টেবিল গোছানো মোছা ইত্যাদি করে ।
জাকিরের খদ্দের বেশি । সাইকেল বাইকে করে অর্ডার সাপ্লাই দেয় । খদ্দের নিজেরাও আসে । ধরা খদ্দের । বাকি ধারও চলে । তবে বেশি নগতে বিক্রি হয় । বসিয়েও খাওয়ায়।
-----.রোহিনা সসের বোতল দু'টো আনবি। স্যালাডের গামলা ভর্তি হয়েছে ? এখানে গোলাপ জল কেন ?
------ হয়েছে তো । পিঁয়াজ আর গোটা ছয়েক আছে । হয়ে গেছে এবারের বস্তাটা তত ভালো পড়েনি ।
---- ও শালার আড়ৎদার বলল, ভালো পিঁয়াজ । টাকা দিইনি । তবে বলছিস যখন কম দেবো।
---- টাকা দিবেন না । যদিও দেন কম দেবেন ।
নবীন গোঁসাই এসেছে । গলায় নামের জপমালার ঝোলা । গায়ে নামাবলী । সামনে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে বলল , ভাই এখানে আর কোনো হোটেল তো নেই ?
----- না বাবু ; নেই । রাজু বলল ।
------ আচ্ছা , ভাত কি পাওয়া যাবে ?
জাকির ইশারা করল "না" বলে দিতে ।
তারও আগে অলক্ষ্যে রোহিনা বলে দিল ফস্ করে , ভাত আছে।
---- তাহলে ডাল ভাত হবে না ? দিন না --
----- না হবে না । এখানে বাবু গরুর মাংস রান্না হয়। সব তরকারিতে ছোঁয়াছুঁয়ি তো হয় । ডিম মাংসের যা চাইবেন তা পাবেন ।
------ খুব খিদে লাগছে ডাল ভাত হবে ?
----- না হবে না । জাকির বলল ।
ততক্ষণে নবীন গোঁসাই ক্ষিধেয় তর সামলাতে পারছে না। সামনে রাখা ব্যারেলের জলে মগ চুবিয়ে জল তুলে হাত ধুয়ে বেঞ্চে এসে বসে গেছে খাবার জন্য ।
---- তাহলে এগ্ চাউ আছে না ভেজ্ চাউ ?
----- এগ্ চাউ, ভেজ্ দু'টোই আছে ।
----- তাহলে ভেজ্ এক প্লেট দেবেন।
----- না হবে না ।
---- কেন ? যা চাইছি তাই বলছেন হবে না, কেন ? তাহলে পরোটা দেন ।
----- তাতেও তো গোস্তর ঝোল দিয়ে ডাল হয়েছে ।
----- শুধু ভাত দেন আমি লেবু নুন মাখিয়ে খাবো। মাসুম বাধ্য হয়ে ভাত -আলু ভাজা -সবজি নিয়ে আসে। ডালের বাটি পাশে বসিয়ে দেয় । ওগুলো সরিয়ে দিয়ে শুধু ভাতে জল ঢেলে ভাত খেয়ে পয়সা দিতে গেল । জাকির পয়সা নেবার সময় বলল, ওই খবর কাগজে রেখে দেন । নবীন একটা ঢেকুর তুলে বলল , আহ ক্ষিদে যা লেগেছিল। টাকা নেবার সময় জাকিরের চোখে মুখে ঘৃণার ব্যাপ্তি দেখে নবীন অবাক হলো ।
আসলে জাকির হিন্দুদের দেখতে পারে না । হিন্দুরা না কি নীচু জাতি । নমাজের সময় হতে জাকির গেল মসজিদে । মসজিদের ইমামকে নমাজ শেষে বলল কথাগুলো। ইমাম বলল, হিন্দুকে খাওয়ানো কি হারাম না হালাল ? তোমার মত ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী লোকগুলো নিজের ধর্মকে ছোট করছ । ধর্ম সম্বন্ধে তুমি কিছুই জানো না । সব ধর্মের সারকথা মানবতা । শুধু ইসলাম ধর্ম কেন কোনও ধর্মে অন্য কোনও ধর্মকে ছোট করতে বলেনি । তোমরাই বেশি অবুঝ নির্বোধের মতো বাড়াবাড়ি করছ । হিন্দু -মুসলিম -জৈন -খ্রীস্টান যে কোনও ধর্মের প্রতি পারস্পরিক সহনশীলতা-উদারতা- সম্প্রীতি দেখানো । সমান উচ্চতায় সবার ধর্ম । মানুষের সেবা করাই হচ্ছে আল্লাহর সেবা । ক্ষুধাতুর মানুষকে অন্ন দেবার মত পূণ্য কাজের চেয়ে বড় কাজ আর কি আছে ? তুমি ইসলাম ধর্মের কলঙ্ক । সেই মুহূর্তে জাকির কিছু না বললেও মনে মনে তার অন্ধকারময় -অবচেতন- কুসংস্কার বুকে চেপে রাখল। তবুও বাড়িতে গিয়ে বিবি রোশনাকে বিষয়টা বলায় সেও দু 'কথা শোনাতে বলল , এত গোঁড়ামি ভালো নয় গো । তুমি এই কথা বললে তাহলে আমি বলি , আমরা তো সাধারণ স্কুল- কলেজে পড়াশোনা করেছি । সব বিদ্যালয়ে তো কমবেশি হিন্দু -মুসলিম - বৌদ্ধ -খ্রীস্টান -জৈন ছাত্র -ছাত্রী আছে । সব বিদ্যালয়ে তো অধিকাংশ শিক্ষক- শিক্ষিকামন্ডলী হিন্দু ধর্মাবলম্বী । তারা কি ওখানে কোনও বাছ-বিচার করেন ? সেরকম যদি হিন্দুরা ভাবত মুসলিম ভিন্ন অন্য ধর্মের যে কাউকে উৎপীড়ন করত । প্রয়োজনে একঘরে করে নির্বিচারে গুলি করত । এমন নজির আমাদের দেশে কখনো দেখাতে পারবে ? হিন্দুরা অপর ধর্মাবলম্বী মানুষের নীচু নজরে দেখেছে ?
----- তুমি পড়াশোনা শিখেছ বলে ধর্ম মানো না ।
---- কেন? বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল , প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত , ইন্দিরাগান্ধী, ফজলু হক, হাজার হাজার খ্যাতিমান সুশিক্ষিত মানুষ জীবন সাথী হিসেবে বেছে নিয়েছেন আর তুমি সামান্য খাবার দিতে গররাজি হলে ? আমার এখন মরণাপন্ন অবস্থা। আমি মা হতে চলেছি । তুমি পূণ্য কর্ম ভাবলে না ! রোশনা শাশুড়ির দিকে লক্ষ্য পড়তেই কেমন যেন ক্ষুব্ধ দৃষ্টি লক্ষ্যে পড়ল । তারপর জিজ্ঞেস করল , জাকির তুই কি চিনিস যে লোকটা তোর দোকানে খেয়েছিল ?
----- ওই যে নবীন গোঁসাই । পাশের গ্রামে থাকে । তুমি চিনবে হয়তো । পাকুড়তলার পাশ দিয়ে যে খাল গেছে , খাল পাড়ে যে রাধাকৃষ্ণের মন্দির ওখানেই গোঁসাই থাকে । আম্মা কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দেখো ! সাবিনাদের বাড়ি যেতে ডান ধারে যে বাঁশের ঝাড় তারপর কৃষ্ণচূড়া গাছ । তার পাশেই মন্দির আর বড় পুকুর । ফুলে ফলের গাছ ভর্তি। বিশাল বড় মন্দির স্কুল।
----- বুঝেছি -- বুঝেছি ।
হ্যাঁ । মায়ের বুঝতে অসুবিধা হয়নি । কিশোর বেলায় নবীনকে ভালোবাসত ওর মা। ভালোবাসত বিয়ে করে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে সারা জীবন থাকবে বলে । তা আর হয়নি । ওর আব্বার কড়া শাসনের ভয়ে । জবাই করে মেরে ফেলার হুমকি পেয়ে আব্বার কথায় ওকে 'না' বলেছিল । আর নবীন বাধ্য হয়ে আজও অবিবাহিত । পৈতৃক সম্পত্তি পেয়ে আশ্রম নির্মাণ করে ওখানে থাকে । আরো ওই মন্দিরে অনাথ শিশুরা থাকে । হিন্দু- মুসলমান তো আছে । তবে তারা গরীব সহায় সম্বলহীন বাড়ির ছেলে মেয়ে । গোঁসাইজীরা তাদের শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ গড়ার কাজে উৎসাহিত করে । ফলে জাকিরের মা জানেনা তো আর কে জানবে ?
এদিকে রাত ভোর হতে অনেক বাকি । রোশনার প্রসবকালীন গর্ভ যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে । পাড়ার আশা দিদিমণিকে ফোন করল জাকিরের মা । আশা কর্মী সুজাতা আবার ফোন করে জানাল , এত রাত্রে যাবে কি করে ? সকালে অ্যাম্বুলেন্স আসবে বৌমাকে নিয়ে যাবো । এতদূর থেকে আমিও একা যাবো কেমন করে ? ফলে সময় অতিক্রম হওয়ার সঙ্গে রোশনার অবস্থা খারাপের দিকে বইছে । সকাল সাতটায় অ্যাম্বুলেন্স আসল সঙ্গে দিদিমণি । আবেগ উৎকণ্ঠায় রোশনার শারীরিক পরিস্থিতি দেখে সকলে ভেঙে পড়েছে । যত সময় যাচ্ছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় জাকিরকেও বিহ্বল হতে দেখা গেল । মুমূর্ষু রোশনাকে এমার্জেন্সিতে তুললে নার্স ডাক্তার সকলে খুবই বকাবকি করে জকিরকে তিরস্কার করতে লাগল । অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগে বন্ড কাগজে সই করিয়ে নিল । ডাক্তার মাদার কার্ড দেখে বলল , ইমিডিয়েট "ও নেগেটিভ" রক্ত লাগবে । না হলে রোগীকে বাঁচানো যাবে না । অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পেসেন্টকে বাঁচাতে গেলে চাইল্ড বাঁচে না অথবা চাইল্ড বাঁচাতে গেলে প্রসূতি বাঁচে না । তবুও দেখছি কি --
জাকিরের মা শুনে তড়িঘড়ি ছেলেকে ব্যবস্থা করতে বলল । ওরা সামনে বেঞ্চে বসে । রোগী গেল ও.টি.তে । জাকির বেরিয়ে গেল বাইকে চেপে ওদের ক্লাবে রক্তদান শিবির হয় প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসের দিন । সে সেক্রেটারিকে বলতে বলল , না । নারে জাকির । ওই গ্রুপের রক্ত আমাদের জমা নেই । তবে হ্যাঁ -- শুনেছি, কিন্তু মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে এখানে কার যেন "ও নেগেটিভ" আছে । ভাবতে দে বলছি ।
এই লোকটা প্রত্যেক বছর আমাদের এই রক্ত দানশিবিরে এসে রক্তদান করে ।
নবীনের ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর গলা খুবই পরিচিত তবে অনেকদিন আগের।
---- কে বলছেন ?
----- আমি জাহানারা ।
----- জা-হা-না-রা ! তুমি মানে হঠাৎ --?
---- তোমাকে এখনই রামনগর হাসপাতালে আসতেই হবে ভাই । আমি খুব বিপদের মধ্যে সময় কাটাচ্ছি। ---- কেন , কি হয়েছে ? আমি তো ভোগ আরতিতে বসেছি ।
----- এত কথা বলার সময় নেই । তোমার রক্তের গ্রুপ "ও নেগেটিভ" আমি জানি । আমার বৌমার বাচ্চা হবে -- প্রসবকালীন অবস্থায় জরুরি বিভাগে ভর্তি । রক্ত লাগবে । না হলে --
----- ঠিক আছে । আমি আসছি তৈরি থাকতে বলো।
নবীন গোঁসাই আশ্রমের গাড়িতে দ্রুত এসে রোশনার বেডের পাশে শুয়ে যত রক্ত লাগবে ডাক্তারবাবুকে বলল ট্রান্সফার করতে । তাই হলো। একটু পরে ডাক্তারবাবু বেরিয়ে এসে বলল , গুড্ নিউজ্। কেসটা রেয়ার হলো । মা ও বাচ্চার বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে।
জাকির এসে গেছে । বলল , নাহ কোথাও কিছু ব্যবস্থা করতে পারলাম না। আম্মা রুগীকে বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে । কলকাতায় ব্ল্যাড ব্যাংকে যেতে হবে । রুগীর অবস্থা কি ? শুনেছ কি অবস্থা ?
----- মাথা ঠান্ডা করে বস । জাহানারা বলল ।
একটু পরে নার্সসহ -স্বাস্থ্যকর্মী ও.টি. থেকে বেরিয়ে গেলে জাহানারা ছেলেকে নিয়ে ভিতরে গেল। পাশাপাশি বেডে নবীন আর রোশনাকে দেখে জাকির অবাক ! রোশনা অচৈতন্য হয়ে পড়ে । নবীনের রক্ত নল বেয়ে রোশনা আর সদ্যোজাতের শরীরে ধীরগতিতে বইছে।
========================
এই তল্লাটে এই একটাই দোকান । একটু দূরে চা দোকানে সনাতন অল্প ঘুগনি ডিম সিদ্ধ করে । তবে বিক্রি বাজার বুঝে হয় । প্রত্যেক দিন হয় না । দশটা বাজলেই বন্ধ হয়ে যায় । পঞ্চায়েতে সনাতন কাজ করে । ঝাঁট দেবার কাজ । সেই কাজ বউ সামলাতে পারে না বলে নিজে গিয়ে সহযোগিতা করে । টেবিলে টেবিলে জলের বোতল চেয়ার-টেবিল গোছানো মোছা ইত্যাদি করে ।
জাকিরের খদ্দের বেশি । সাইকেল বাইকে করে অর্ডার সাপ্লাই দেয় । খদ্দের নিজেরাও আসে । ধরা খদ্দের । বাকি ধারও চলে । তবে বেশি নগতে বিক্রি হয় । বসিয়েও খাওয়ায়।
-----.রোহিনা সসের বোতল দু'টো আনবি। স্যালাডের গামলা ভর্তি হয়েছে ? এখানে গোলাপ জল কেন ?
------ হয়েছে তো । পিঁয়াজ আর গোটা ছয়েক আছে । হয়ে গেছে এবারের বস্তাটা তত ভালো পড়েনি ।
---- ও শালার আড়ৎদার বলল, ভালো পিঁয়াজ । টাকা দিইনি । তবে বলছিস যখন কম দেবো।
---- টাকা দিবেন না । যদিও দেন কম দেবেন ।
নবীন গোঁসাই এসেছে । গলায় নামের জপমালার ঝোলা । গায়ে নামাবলী । সামনে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে বলল , ভাই এখানে আর কোনো হোটেল তো নেই ?
----- না বাবু ; নেই । রাজু বলল ।
------ আচ্ছা , ভাত কি পাওয়া যাবে ?
জাকির ইশারা করল "না" বলে দিতে ।
তারও আগে অলক্ষ্যে রোহিনা বলে দিল ফস্ করে , ভাত আছে।
---- তাহলে ডাল ভাত হবে না ? দিন না --
----- না হবে না । এখানে বাবু গরুর মাংস রান্না হয়। সব তরকারিতে ছোঁয়াছুঁয়ি তো হয় । ডিম মাংসের যা চাইবেন তা পাবেন ।
------ খুব খিদে লাগছে ডাল ভাত হবে ?
----- না হবে না । জাকির বলল ।
ততক্ষণে নবীন গোঁসাই ক্ষিধেয় তর সামলাতে পারছে না। সামনে রাখা ব্যারেলের জলে মগ চুবিয়ে জল তুলে হাত ধুয়ে বেঞ্চে এসে বসে গেছে খাবার জন্য ।
---- তাহলে এগ্ চাউ আছে না ভেজ্ চাউ ?
----- এগ্ চাউ, ভেজ্ দু'টোই আছে ।
----- তাহলে ভেজ্ এক প্লেট দেবেন।
----- না হবে না ।
---- কেন ? যা চাইছি তাই বলছেন হবে না, কেন ? তাহলে পরোটা দেন ।
----- তাতেও তো গোস্তর ঝোল দিয়ে ডাল হয়েছে ।
----- শুধু ভাত দেন আমি লেবু নুন মাখিয়ে খাবো। মাসুম বাধ্য হয়ে ভাত -আলু ভাজা -সবজি নিয়ে আসে। ডালের বাটি পাশে বসিয়ে দেয় । ওগুলো সরিয়ে দিয়ে শুধু ভাতে জল ঢেলে ভাত খেয়ে পয়সা দিতে গেল । জাকির পয়সা নেবার সময় বলল, ওই খবর কাগজে রেখে দেন । নবীন একটা ঢেকুর তুলে বলল , আহ ক্ষিদে যা লেগেছিল। টাকা নেবার সময় জাকিরের চোখে মুখে ঘৃণার ব্যাপ্তি দেখে নবীন অবাক হলো ।
আসলে জাকির হিন্দুদের দেখতে পারে না । হিন্দুরা না কি নীচু জাতি । নমাজের সময় হতে জাকির গেল মসজিদে । মসজিদের ইমামকে নমাজ শেষে বলল কথাগুলো। ইমাম বলল, হিন্দুকে খাওয়ানো কি হারাম না হালাল ? তোমার মত ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী লোকগুলো নিজের ধর্মকে ছোট করছ । ধর্ম সম্বন্ধে তুমি কিছুই জানো না । সব ধর্মের সারকথা মানবতা । শুধু ইসলাম ধর্ম কেন কোনও ধর্মে অন্য কোনও ধর্মকে ছোট করতে বলেনি । তোমরাই বেশি অবুঝ নির্বোধের মতো বাড়াবাড়ি করছ । হিন্দু -মুসলিম -জৈন -খ্রীস্টান যে কোনও ধর্মের প্রতি পারস্পরিক সহনশীলতা-উদারতা- সম্প্রীতি দেখানো । সমান উচ্চতায় সবার ধর্ম । মানুষের সেবা করাই হচ্ছে আল্লাহর সেবা । ক্ষুধাতুর মানুষকে অন্ন দেবার মত পূণ্য কাজের চেয়ে বড় কাজ আর কি আছে ? তুমি ইসলাম ধর্মের কলঙ্ক । সেই মুহূর্তে জাকির কিছু না বললেও মনে মনে তার অন্ধকারময় -অবচেতন- কুসংস্কার বুকে চেপে রাখল। তবুও বাড়িতে গিয়ে বিবি রোশনাকে বিষয়টা বলায় সেও দু 'কথা শোনাতে বলল , এত গোঁড়ামি ভালো নয় গো । তুমি এই কথা বললে তাহলে আমি বলি , আমরা তো সাধারণ স্কুল- কলেজে পড়াশোনা করেছি । সব বিদ্যালয়ে তো কমবেশি হিন্দু -মুসলিম - বৌদ্ধ -খ্রীস্টান -জৈন ছাত্র -ছাত্রী আছে । সব বিদ্যালয়ে তো অধিকাংশ শিক্ষক- শিক্ষিকামন্ডলী হিন্দু ধর্মাবলম্বী । তারা কি ওখানে কোনও বাছ-বিচার করেন ? সেরকম যদি হিন্দুরা ভাবত মুসলিম ভিন্ন অন্য ধর্মের যে কাউকে উৎপীড়ন করত । প্রয়োজনে একঘরে করে নির্বিচারে গুলি করত । এমন নজির আমাদের দেশে কখনো দেখাতে পারবে ? হিন্দুরা অপর ধর্মাবলম্বী মানুষের নীচু নজরে দেখেছে ?
----- তুমি পড়াশোনা শিখেছ বলে ধর্ম মানো না ।
---- কেন? বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল , প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত , ইন্দিরাগান্ধী, ফজলু হক, হাজার হাজার খ্যাতিমান সুশিক্ষিত মানুষ জীবন সাথী হিসেবে বেছে নিয়েছেন আর তুমি সামান্য খাবার দিতে গররাজি হলে ? আমার এখন মরণাপন্ন অবস্থা। আমি মা হতে চলেছি । তুমি পূণ্য কর্ম ভাবলে না ! রোশনা শাশুড়ির দিকে লক্ষ্য পড়তেই কেমন যেন ক্ষুব্ধ দৃষ্টি লক্ষ্যে পড়ল । তারপর জিজ্ঞেস করল , জাকির তুই কি চিনিস যে লোকটা তোর দোকানে খেয়েছিল ?
----- ওই যে নবীন গোঁসাই । পাশের গ্রামে থাকে । তুমি চিনবে হয়তো । পাকুড়তলার পাশ দিয়ে যে খাল গেছে , খাল পাড়ে যে রাধাকৃষ্ণের মন্দির ওখানেই গোঁসাই থাকে । আম্মা কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দেখো ! সাবিনাদের বাড়ি যেতে ডান ধারে যে বাঁশের ঝাড় তারপর কৃষ্ণচূড়া গাছ । তার পাশেই মন্দির আর বড় পুকুর । ফুলে ফলের গাছ ভর্তি। বিশাল বড় মন্দির স্কুল।
----- বুঝেছি -- বুঝেছি ।
হ্যাঁ । মায়ের বুঝতে অসুবিধা হয়নি । কিশোর বেলায় নবীনকে ভালোবাসত ওর মা। ভালোবাসত বিয়ে করে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে সারা জীবন থাকবে বলে । তা আর হয়নি । ওর আব্বার কড়া শাসনের ভয়ে । জবাই করে মেরে ফেলার হুমকি পেয়ে আব্বার কথায় ওকে 'না' বলেছিল । আর নবীন বাধ্য হয়ে আজও অবিবাহিত । পৈতৃক সম্পত্তি পেয়ে আশ্রম নির্মাণ করে ওখানে থাকে । আরো ওই মন্দিরে অনাথ শিশুরা থাকে । হিন্দু- মুসলমান তো আছে । তবে তারা গরীব সহায় সম্বলহীন বাড়ির ছেলে মেয়ে । গোঁসাইজীরা তাদের শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ গড়ার কাজে উৎসাহিত করে । ফলে জাকিরের মা জানেনা তো আর কে জানবে ?
এদিকে রাত ভোর হতে অনেক বাকি । রোশনার প্রসবকালীন গর্ভ যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে । পাড়ার আশা দিদিমণিকে ফোন করল জাকিরের মা । আশা কর্মী সুজাতা আবার ফোন করে জানাল , এত রাত্রে যাবে কি করে ? সকালে অ্যাম্বুলেন্স আসবে বৌমাকে নিয়ে যাবো । এতদূর থেকে আমিও একা যাবো কেমন করে ? ফলে সময় অতিক্রম হওয়ার সঙ্গে রোশনার অবস্থা খারাপের দিকে বইছে । সকাল সাতটায় অ্যাম্বুলেন্স আসল সঙ্গে দিদিমণি । আবেগ উৎকণ্ঠায় রোশনার শারীরিক পরিস্থিতি দেখে সকলে ভেঙে পড়েছে । যত সময় যাচ্ছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় জাকিরকেও বিহ্বল হতে দেখা গেল । মুমূর্ষু রোশনাকে এমার্জেন্সিতে তুললে নার্স ডাক্তার সকলে খুবই বকাবকি করে জকিরকে তিরস্কার করতে লাগল । অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার আগে বন্ড কাগজে সই করিয়ে নিল । ডাক্তার মাদার কার্ড দেখে বলল , ইমিডিয়েট "ও নেগেটিভ" রক্ত লাগবে । না হলে রোগীকে বাঁচানো যাবে না । অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পেসেন্টকে বাঁচাতে গেলে চাইল্ড বাঁচে না অথবা চাইল্ড বাঁচাতে গেলে প্রসূতি বাঁচে না । তবুও দেখছি কি --
জাকিরের মা শুনে তড়িঘড়ি ছেলেকে ব্যবস্থা করতে বলল । ওরা সামনে বেঞ্চে বসে । রোগী গেল ও.টি.তে । জাকির বেরিয়ে গেল বাইকে চেপে ওদের ক্লাবে রক্তদান শিবির হয় প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসের দিন । সে সেক্রেটারিকে বলতে বলল , না । নারে জাকির । ওই গ্রুপের রক্ত আমাদের জমা নেই । তবে হ্যাঁ -- শুনেছি, কিন্তু মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে এখানে কার যেন "ও নেগেটিভ" আছে । ভাবতে দে বলছি ।
এই লোকটা প্রত্যেক বছর আমাদের এই রক্ত দানশিবিরে এসে রক্তদান করে ।
নবীনের ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর গলা খুবই পরিচিত তবে অনেকদিন আগের।
---- কে বলছেন ?
----- আমি জাহানারা ।
----- জা-হা-না-রা ! তুমি মানে হঠাৎ --?
---- তোমাকে এখনই রামনগর হাসপাতালে আসতেই হবে ভাই । আমি খুব বিপদের মধ্যে সময় কাটাচ্ছি। ---- কেন , কি হয়েছে ? আমি তো ভোগ আরতিতে বসেছি ।
----- এত কথা বলার সময় নেই । তোমার রক্তের গ্রুপ "ও নেগেটিভ" আমি জানি । আমার বৌমার বাচ্চা হবে -- প্রসবকালীন অবস্থায় জরুরি বিভাগে ভর্তি । রক্ত লাগবে । না হলে --
----- ঠিক আছে । আমি আসছি তৈরি থাকতে বলো।
নবীন গোঁসাই আশ্রমের গাড়িতে দ্রুত এসে রোশনার বেডের পাশে শুয়ে যত রক্ত লাগবে ডাক্তারবাবুকে বলল ট্রান্সফার করতে । তাই হলো। একটু পরে ডাক্তারবাবু বেরিয়ে এসে বলল , গুড্ নিউজ্। কেসটা রেয়ার হলো । মা ও বাচ্চার বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে।
জাকির এসে গেছে । বলল , নাহ কোথাও কিছু ব্যবস্থা করতে পারলাম না। আম্মা রুগীকে বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে । কলকাতায় ব্ল্যাড ব্যাংকে যেতে হবে । রুগীর অবস্থা কি ? শুনেছ কি অবস্থা ?
----- মাথা ঠান্ডা করে বস । জাহানারা বলল ।
একটু পরে নার্সসহ -স্বাস্থ্যকর্মী ও.টি. থেকে বেরিয়ে গেলে জাহানারা ছেলেকে নিয়ে ভিতরে গেল। পাশাপাশি বেডে নবীন আর রোশনাকে দেখে জাকির অবাক ! রোশনা অচৈতন্য হয়ে পড়ে । নবীনের রক্ত নল বেয়ে রোশনা আর সদ্যোজাতের শরীরে ধীরগতিতে বইছে।
========================
সুদামকৃষ্ণ মন্ডল
গ্রাম - পুরন্দর পুর (অক্ষয় নগর )
পোষ্ট - অক্ষয় নগর
কাকদ্বীপ,দঃ চব্বিশ পরগণা
পিন কোড - 743347
নেশা /পেশা : সাহিত্যচর্চা
গ্রাম - পুরন্দর পুর (অক্ষয় নগর )
পোষ্ট - অক্ষয় নগর
কাকদ্বীপ,দঃ চব্বিশ পরগণা
পিন কোড - 743347
নেশা /পেশা : সাহিত্যচর্চা

