নীল খামের নৈশব্দ্য
জয় মণ্ডল
শহরের উত্তর প্রান্তের এক জীর্ণ পুরোনো লাইব্রেরিতে অভিকের সাথে বৃষ্টির প্রথম দেখা। বৃষ্টির নেশা ছিল হলদেটে হয়ে যাওয়া পুরনো বইয়ের গন্ধ শোঁকা, আর অভিক সেখানে আসত তার অসমাপ্ত কবিতার খাতা পূর্ণ করতে। চারপাশটা ছিল বইয়ের আলমারিতে ঘেরা এক নিঃশব্দ দ্বীপ। সেখানে একদিন একটি বইয়ের পাতায় অভিক খুঁজে পেল একটা নীল খাম। তাতে কোনো ঠিকানা ছিল না, শুধু লেখা ছিল— "যে সুর হারায়নি, তা কেবল নীরবতায় বেঁচে থাকে।"
সেই শুরু। এরপর থেকে প্রায়ই লাইব্রেরির সেই নির্দিষ্ট তাকে অভিক নীল খাম রেখে যেত, আর বৃষ্টি তার উত্তর দিত অন্য একটি বইয়ের ভাঁজে। তারা একে অপরের সামনে বসত, কিন্তু কথা বলত না। তাদের প্রেমটা ছিল কালির আঁচড়ে আর কাগজের স্পর্শে। অভিক তার চিঠিতে লিখত মাঝরাতের ট্রামলাইনের একাকিত্বের কথা, আর বৃষ্টি তাকে শোনাত পাহাড়ি ঝরনার শব্দের স্মৃতি। কেউ জানত না কার মনে কী চলছে, শুধু নীল খামগুলো জানত এক গভীর অনুরাগের কথা।
হঠাৎ একদিন লাইব্রেরিটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার নোটিশ পড়ল। পুরোনো ইমারত ভেঙে শপিং মল হবে। সেদিন শেষবারের মতো তারা দেখা করল সেই প্রিয় কোণে। অভিক আজ কোনো খাম আনেনি। সে সরাসরি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে একটা ছোট বাক্সে রাখা একটি পুরনো দিনের ব্রোচ বাড়িয়ে দিল। বৃষ্টি অবাক হয়ে তাকাতেই অভিক বলল, "শব্দরা ফুরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু স্মৃতিরা তো থেকে যায়। এই শহর বদলে গেলেও আমাদের এই নীল খামগুলো যেন কোথাও বেঁচে থাকে।"
বৃষ্টি সেদিন কেঁদে ফেলেছিল। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা মানে শুধু কাছে আসা নয়, বরং একে অপরের অস্তিত্বের অংশ হয়ে যাওয়া। লাইব্রেরিটা ভেঙে ফেলা হলো ঠিকই, কিন্তু আজ অনেক বছর বাদেও বৃষ্টির কাছে সেই নীল খামগুলো সযত্নে রাখা আছে। অভিক হয়তো আজ অন্য কোনো শহরে অন্য কোনো কবিতা লেখে, কিন্তু বৃষ্টির জানলার পাশে যখনই বর্ষা নামে, সে আজও নীল খামের সেই পুরনো গন্ধটা পায়। কিছু প্রেম পূর্ণতা পায় না, কিন্তু তারা রূপকথার মতো রয়ে যায় মনের কোনো এক নিভৃত কোণে।
=======================
যোগাযোগ : জয় মণ্ডল,
কালীমন্দির পূর্বপাড়া, কালিকাপুর, পোস্ট - কালিকাপুর, সোনারপুর, পশ্চিমবঙ্গ - ৭৪৩৩৩০

