বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

গল্প।। চিঠির ভিতরে মানুষ।। রাইহান সেখ

 

 চিঠির ভিতরে মানুষ

 রাইহান সেখ

 
গ্রামটার নাম ছিল তালতলা। মানচিত্রে নাম থাকলেও বাস্তবে কেউ আলাদা করে চিনত না। এই গ্রামেই শেষ সীমানায় ছিল একটি পুরোনো টিনের ঘর—জং ধরা চাল, ভাঙা দরজা, আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি শুকিয়ে যাওয়া আমগাছ। সেই ঘরেই থাকত নাসির আলী।
নাসির আলীকে গ্রামের মানুষ ঠিক পছন্দ করত না, আবার অপছন্দও করত না। সে কারো সঙ্গে ঝগড়া করত না, আবার গল্পও করত না। শুধু প্রতি শুক্রবার বিকেলে লাঠিতে ভর দিয়ে সে গ্রাম থেকে দুই কিলোমিটার দূরের ডাকঘরের সামনে গিয়ে বসত। আশ্চর্যের বিষয়, কোনোদিন সে চিঠি নিত না।
ডাকঘরের কর্মচারী রমেশ একদিন কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
—"কাকু, আপনি তো প্রতি সপ্তাহে আসেন। আপনার কোনো চিঠি নেই?"
নাসির আলী হালকা হাসল। সেই হাসিতে দুঃখও ছিল, শান্তিও ছিল।
—"আমার চিঠি আসেনি অনেক বছর। আমি আসি অন্যদের চিঠির জন্য।"
রমেশ কিছু বুঝল না।
ডাকঘরের পেছনে একটা ছোট ডাস্টবিন ছিল। ভুল ঠিকানার, ছেঁড়া, ফেরত আসা চিঠিগুলো সেখানে ফেলে দেওয়া হতো। মানুষ এখন ফোনে কথা বলে, মেসেজে ভালোবাসে—চিঠির আর দরকার নেই। কিন্তু নাসির আলীর কাছে সেই ফেলে দেওয়া চিঠিগুলোই ছিল আসল সম্পদ।
সে চিঠিগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আসত। বাড়িতে এনে শুকোত, সাবধানে ভাঁজ খুলত। তারপর পড়ত—একটার পর একটা।
কোনো চিঠিতে লেখা থাকত, "মা, কাজ ঠিকমতো পাইনি। শরীরও ভালো না। তবু ফিরছি না—লজ্জা লাগে।"
কোনো চিঠিতে, "তোমাকে না জানিয়েই চলে গিয়েছিলাম। এখন বুঝি ভুল করেছি।"
আবার কোনো চিঠি মাঝপথে থেমে গেছে—শেষ কথাটা আর লেখা হয়নি।
নাসির আলী প্রতিটা চিঠি পড়ে চুপচাপ বসে থাকত। কখনো চোখ ভিজে যেত, কখনো দীর্ঘশ্বাস পড়ত। সে মনে মনে উত্তর দিত।
কারো মায়ের হয়ে বলত, "তুই বেঁচে থাকলেই আমার সব পাওয়া।"
কারো বাবার হয়ে বলত, "ভুল করিস, তবু মানুষ থাকিস।"
এই কাজ সে কেন করত—তা কেউ জানত না।
আসলে বহু বছর আগে নাসির আলীর নিজের জীবনেও একটা চিঠি ছিল। তার একমাত্র ছেলে রাশেদ শহরে কাজ করতে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় বলেছিল,
"আব্বা, চিঠি লিখব।"
প্রথম বছর নাসির আলী ডাকঘরে দৌড়ে যেত। দ্বিতীয় বছর ধীরে। তৃতীয় বছর সে আর প্রশ্ন করত না। কোনো চিঠি আর আসেনি।
সেদিন থেকে সে বুঝেছিল—সব চিঠি পৌঁছায় না, কিন্তু সব চিঠির কথা শোনার দরকার আছে।
একদিন ডাকঘর আধুনিক হলো। ডাস্টবিন সরিয়ে দেওয়া হলো। চিঠি আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। নাসির আলী আর শুক্রবার আসত না।
কয়েক মাস পরে গ্রামে গন্ধ ছড়াল। লোকজন দরজা ভেঙে ঢুকল। নাসির আলী মাটির খাটে শুয়ে আছে—চোখ বন্ধ, মুখে শান্ত হাসি।
ঘরের ভেতর সবাই থমকে গেল। দেয়ালজুড়ে ঝোলানো শত শত চিঠি। প্রতিটা চিঠির নিচে ছোট নোট— "এই চিঠিতে একজন একা বাবা আছে।"
"এই চিঠিতে ক্ষমা চাওয়া আছে।"
টেবিলের ওপর শেষ কাগজে লেখা ছিল—
"যাদের কথা কেউ শোনেনি, আমি শুনেছি।
যাদের চিঠি পৌঁছায়নি, আমি তাদের কাছে পৌঁছেছি।
তাই আমি কখনো একা ছিলাম না।"
সেদিনের পর তালতলা গ্রামে কেউ আর চিঠি ফেলে না।
কারণ তারা জানে—
একটা চিঠির ভেতরে কাগজ নয়, একটা মানুষ বেঁচে থাকে।

====================== 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.