আজ দুপুর থেকেই বিমানের মেজাজটা ভীষণ চটে আছে। ফোনের পর ফোন এসেই চলেছে। একটুও যেন নিস্তার নেই। আজ আবার তার একমাত্র ছেলে হৃদয়ের জন্মদিন। আজ তার পাঁচ বছর পূর্ণ হল। গত চার চারটি বছর জন্মদিনে একবারও কেক কাটার সময় ছেলের সঙ্গে থাকা হয়নি তার। ব্যাস্ততার দরূন বাড়ি পৌঁছতে এতটাই রাত হয়ে যেত যে ছেলে ঘুমিয়ে পরত।আজ তার একান্ত আবদার গিফ্ট হিসেবে তার বাবা যাতে তার সাথে কেক কাটে। কথাটা ভাবতে ভাবতে আবেগে তার চোখের কোণ থেকে একফোঁটা অশ্রু ঝরে পরল।
সূর্য অস্ত যেতে চলেছে প্রায়, কিন্তু কাজের আর যেন শেষ নেই। সব কাজ ফেলে গাড়িতে উঠে গাড়ির দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল সে।
যেতে যেতে পথের মাঝে দেখল কতগুলো ছেলে খুব আনন্দে খেলছে। প্রায় বছর কুড়ি আগের কথা, এরকম-ই এক গোধুলীর লগ্নের কথা বিমানের স্মৃতির কোণায় ভেসে আসে। যেদিন বিমান তার বন্ধুদের সাথে খেলছিল, আর অনন্ত তাদের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখছিল। প্রায় প্রতিদিনই অনন্ত তাদের খেলা দেখতো। তাকে খেলতে ডাকলে সে আসত না।বললে বলতো বাবা বারণ করেছে। সেটাতে বিমানের মনে হত বড়ো লোকের অহংকার। আর একদিন সেও অনেক টাকা ইনকাম করে দেখিয়ে দেবে।তবে সেদিন অনন্তের জন্মদিন শুনে সে পকেট থেকে একটি কলম বের করে দিয়েছিল। কলমটা অনন্তের হাতে দিয়ে বলেছিল , 'আজ সকালে পাঁচ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম, নিতান্তই স্বল্প মূল্যের, তুই এটা রাখ।এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে অনন্ত বলেছিল "জানিস আমার মা বলে উপহারের মূল্য টাকা দিয়ে পরিমাপ করতে নেই"।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা লাইটের আলোতে তার দৃষ্টি বর্তমানে ফিরে এল।দেখল সামনে একটা আর্ট এক্সিবিশন হচ্ছে। এখান থেকে ছেলের জন্য একখানা গিফট নেওয়া যায় ভেবে গাড়ি থামিয়ে সে এক্সিবিশন হলটির মধ্যে ঢুকল। একটি ছবিকে ঘিরে খুব ভীড় জমেছে।সবাই বলাবলি করছে কলম দিয়ে এতো সুন্দর ছবি শুধুমাত্র ওনার মতো আর্টিস্ট এর পক্ষেই সম্ভব। বিমান অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখল ছবিটিতে ফুটে উঠেছে কয়েকটি ছেলে খুব উৎসাহিত হয়ে খেলছে। ছবিটি যেন জীবন্ত। নীচে আর্টিস্টের নামটা দেখতে গিয়ে দেখে -অনন্ত।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা হাত বিমানের ঘারে পরে, পেছন ফিরে চাইতেই, "কিরে বিমান,কেমন আছিস? তুই আমাকে চিনতে না পারলেও আমি কিন্তু তোকে চিনতে পেরেছি। তুই তো এখন খুব বড়ো বিজনেস ম্যান। তোর ফটো তো প্রায় খবরের কাগজে বের হয়।জানিস, তুই যে সেদিন আমায় কলমটা গিফট করেছিলি সেটা দিয়েই আমি প্রথম তোদের খেলার ছবিটি আঁকি। আর আমার মাকে দেখাই ছবিটি।মা ভীষণ খুশি হয়, আমাকে ছবি আঁকতে ইন্সপায়ার করে।আর তারপর আজ এই...একটু থেমে, জানিস আমার বাবা আমাকে সময় দিতে পারতো না বলে ভীষণ খারাপ লাগতো আমার, আর সংকল্প নিয়েছিলাম এমন কিছু করবো যা থেকে প্রয়োজনীয়তা মিটবে অবশ্যই কিন্তু সন্তানের সাথে যাতে সময় কাটাতে পারি। টাকা ইনকাম-ই যাতে প্রধান লক্ষ্য না হয়। তাই একটা আর্ট স্কুল খুলেছি। জানিস গতকাল আমার মেয়ের জন্মদিন ছিল। ওর পঞ্চম জন্মদিনে আমরা সকলে সারাদিন খুব মজা করেছি।ভাগ্যিস তুই কলমটা দিয়েছিলি!"
====================
পাপিয়া বিশ্বাস দত্ত
সুভাষ নগর
দমদম ক্যান্টনমেন্ট
কলকাতা- ৭০০০৬৫

