বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

গল্প ।। কর্মফল ।। অভীক মুখার্জী



 
কর্মফল
অভীক মুখার্জী
 
দীনুবাবু মানে দীনবন্ধু কর্মকার খুব অস্বস্তিতে রয়েছেন। এই বয়সে এসে এইসব অস্বস্তি কারই বা ভালো লাগে! দীনুবাবুরও ভালো লাগছে না, স্বাভাবিকভাবেই। সারাদিন মাথা ধরে থাকছে, মুখটা তেঁতো হয়ে থাকছে, সব থেকে প্রিয় খাবারগুলোও কেমন যেন বিস্বাদ লাগছে, সকলের ওপর খিটখিট করছেন, সারাদিন ঘুমোতে ইচ্ছে করছে আর সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারছেন না। অথচ মাস খানেক আগেও এরকম ছিল না, তোফা ছিলেন দীনুবাবু। সকালে ঘুম চোখ খুলে বিছানায় বসেই বেডটি খাচ্ছিলেন, দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে গিন্নীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করছিলেন কোনদিন লুচি ছোলার ডাল দিয়ে  আবার কোন দিন কচুরি আলুরদম দিয়ে। তারপর ঘন্টাখানেক খবরের কাগজ। স্নান করে বেলা দশটা নাগাদ গাড়ি করে  একবার দোকান যাওয়া।  বেলা দুটো নাগাদ  বাড়ি এসে আবার রাজকীয় দ্বিপ্রাহরিক ভোজন ও তারপর ঘন্টা খানেকের ভাতঘুম।বিকেল বেলা পাঁচটা নাগাদ আবার চা আর সামান্য টা মানে শিঙাড়া –চপ সহযোগে জলখাবারের পর আবার গাড়ি করে অভিজাত ক্লাবে গিয়ে বন্ধু ও বয়স্থদের সঙ্গে তাস, আড্ডার পর রাত দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরে আবার একচোট জমিদারী স্টাইলে ডীনার, সব শেষে শুতে যাবার আগে বারান্দায় বসে এক পেগ সিঙ্গল মল্ট। সব মিলিয়ে এক নিশ্চিন্ত বিলাসী উচ্চবিত্ত জীবন যাপন।
দীনুবাবুর জীবনটা কিন্তু বরাবর এই রকম ছিল না। গ্রামের স্কুলের আদর্শবাদী সংস্কৃত শিক্ষকের বড় ছেলে দীনবন্ধু বাবার আদর্শবাদী চরিত্রটা জন্মসূত্রে পাননি। ছাত্রাবস্থায় নিদারুণ দারিদ্রের মধ্যে কাটানোয় একটা প্রবল  উচ্চাকাঙ্খা ছিল অনেক পয়সা করার। ম্যাট্রিক কোনরকমে পাস করে এক-বস্ত্রে গ্রামের বাড়ি ত্যাগ করেছিলেন রাতের অন্ধকারে লোক চক্ষুর অন্তরালে। গ্রামের বাড়ি থেকে সোজা কোলকাতা। কপর্দকশূন্য অবস্থায় কোলকাতা এসে হাজির হলেও, স্বজনবান্ধবহীন অচেনা পরিবেশে, যেখানে রাতে মাথা গোঁজার ঠাই নেই, পকেটে একবেলা খাবার কেনার মত পয়সাও নেই, খালি মনের অদম্য জোরে কয়েক ঘন্টার মধ্যে ফাইফরমাস খাটার কাজ জুটিয়ে নিয়েছিলেন বড়বাজারের রাজা কাটরার কাছে এক বাঙালীর হার্ড ওয়্যার দোকানে।
দীনুবাবুর বয়স তখন অল্প, ষোল সতের বড়জোর। হার্ডওয়্যার দোকানের মালিক বিশ্বনাথ মাইতির কেমন যেন মায়া পড়ে গেছিল কিশোর ছেলেটার ওপর। তাঁর নিজের সন্তান সত্তর  দশকের সেই উত্তাল সময়ে রাজনৈতিক আন্দলনে জড়িয়ে পড়ে নিখোঁজ। প্রশাসনের তরফ থেকে স্পষ্ট করে কিছু না বললেও বিশ্বনাথবাবু এটা জেনে গেছিলেন তাঁর জীবদ্দশায় আর সন্তানের মুখদর্শন খুব সম্ভবত ভাগ্যে লেখা নেই। আর সেই সন্তান বিচ্ছেদের হাহাকার থেকেই তিনি অপত্যস্নেহ ঢেলে দিয়েছিলেন দীনবন্ধু কর্মকারের ওপর। শুধু কাজে নেওয়াই নয়, কিশোর ছেলেটাকে রবীন্দ্র সরণীতে নিজের  বাড়িতে থাকতেও দিয়েছিলেন সঙ্গে খাওয়াদাওয়াও।
বছর কয়েকের মধ্যে দেখা গেল সামান্য ফাইফরমাস  খাটতে ঢুকেছিল যে ছেলে, পুরো ব্যাবসাটাই কার্যত তার হাতে। বিশ্বনাথবাবু নিজের হাতে ব্যবাসার সব খুঁটিনাটি শিখিয়েছিলেন দীনুবাবুকে। বছর দশেক বাদে "মাইতি হার্ডওয়্যার এম্পরিয়াম"  বোর্ড সরে গিয়ে যখন "দীনবন্ধু এন্টারপ্রাইস" হয়ে গেল তখন বিশেষ লক্ষ্য করল না কেউই, কারণ সবাই জানে, ব্যাবসাটা চালায়  দীনবন্ধু কর্মকারই। আদত মালিক কোন এক অজ্ঞাত কারণে দীনবন্ধু কর্মকারকে সব কিছু দানপত্র করে দিয়ে কোন এক অজ্ঞাতবাসে চলে গেলেন সস্ত্রীক। অনেকের মনে অনেক প্রশ্ন জাগলেও কেউ জিজ্ঞেস করতে সাহস করেনি। স্থানীয় ব্যাবসায়ী মহলে দীনবন্ধু কর্মকার তখন এক হোমরাচোমরা ব্যক্তিত্ব।
তবে ওনার ব্যবাসায়ীক বুদ্ধি ছিল অতুলনীয়। সেই ছোট্ট হার্ডওয়্যারের দোকান এখন রীতিমত ডিপার্টমেন্টাল স্টোর।   হার্ডওয়্যার, ইলেকট্রিক্যাল, মেশিনারি থেকে শুরু করে তাঁর দোকানের সর্বশেষ সংযোজন ইলেক্ট্রিক্যাল সারভিলেন্স মেশিনারি। রবীন্দ্র সরণীর একতলা বাড়ি এখন চারতলা অট্টালিকা। বাড়ির নীচের গ্যারেজে অন্তত গোটা চারেক একদম লেটেস্ট মডেলের দেশী বিদেশী গাড়ি। প্রায় সত্তর ছুঁইছুঁই দীনুবাবু গত বছর খানেক ব্যবসায়ীক কাজকর্ম থেকে ছুটি নিয়েছেন,  না না বলা ভালো  ব্যবসার দৈনন্দিন কাজ থেকে ছুটি নিয়েছেন। ব্যবসার দৈনন্দিন খুঁটিনাটি এখন জামাই দেখাশোনা করে। দীনুবাবুর একটিই মেয়ে, তার বিয়ে দিয়েছেন এই বড়বাজারেরই এক নামকরা বস্ত্রব্যবসায়ীর ছোট ছেলের সঙ্গে। জামাইয়ের বড় দাদা তাদের  পারিবারিক শাড়ির ব্যবসা সামলায় আর ছোটভাই , মানে দীনুবাবুর জামাই, সামলায় তাঁর শ্বশুরের ব্যবসা।
বিগত বছরখানেক দীনুবাবু খালি সকালবেলা কয়েকঘন্টার জন্য দোকানে বসেন। দোকানে বসলে এখনও অভ্যাসমত ক্যাশ কাউন্টার সামলান। এখন আর আগেকার মত জমানা নেই, চালান, ইনভয়েস সব কিছুই এখন কম্পিউটারাইসড, নগদ লেনদেনের পরিমান কোভিদের পর থেকে কমতে কমতে এখন প্রায় শূন্ তে ঠেকেছে। পুরোটাই এখন অনলাইন। দীনুবাবুর মাথায় এইসব ঢোকে না একদম। তিনি ম্যানুয়াল চালান, বিল বানাতেই বেশী স্বচ্ছন্দ। কম্পিউটারের দিকটা জামাই নিজেই সামলায়, তাই রোজ সকালে এসে ক্যাশ কাউন্টারে বসলেও দীনুবাবুর কাজ থাকে না খুব একটা। তাঁর দোকান থেকে এখন পাইকারী বিক্রিই বেশী তাই খুচরো ক্যাশ সেল প্রায় নেই বললেই চলে।
দিনটা ছিল সোমবার। সদ্য আধঘন্টাটাক দোকানে বসেছেন দীনুবাবু, এক ভদ্রলোক দোকানে ঢুকে, একদম দরজার সামনে পেন্টসএর কাউন্টারে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেন। কাউন্টারের ছেলেটা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল দীনুবাবুকে। ভদ্রলোক ক্যাশ কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো মাত্র দীনুবাবু বুকে কেউ যেন একটা সজোরে ধাক্কা দিল। এত মিল হতে পারে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
"আচ্ছা, এই দোকানের মালিক কি আপনি?" ভদ্রলোকের গলাটাও যেন একদম এক রকম। বয়সটা নেহাত এক নয়, নয়তো ! ভাবাই যায় না।  মনের উত্তেজনা মনে চেপে ওয়াভাবিক গলাতেই উত্তর দেন দীনুবাবু
"হ্যাঁ, এই দোকান আমার, বলুন কি চাই?"
"অনেকদিন আগে, এখানে একটা ছোট্ট দোকান ছিল, মালিকের নাম বিশ্বনাথ মাইতি। বলতে পারবেন সেই দোকানটার কি হল? আর বিশ্বনাথ মাইতি এখন কোথায়?" ভদ্রলোকের কথাগুলো কেমন যেন অসংলগ্ন, ছাড়া ছাড়া।  দীনুবাবু ভালোভাবে লক্ষ্য করলেন ভদ্রলোককে। বয়স ওনার মতই বা একটু বেশিই হোবে। গায়ে একদম সস্তার একটা ফতুয়া, ফুল প্যান্টটাও ঠিক কতদিনের বলা সম্ভব নয়, কাঁধে একটা রঙচটা শান্তিনিকেতনী ব্যাগ।
"আপনি কে? কি দরকার এত সব খবরে?" দীনুবাবুর গলায় তাচ্ছিল্য আর বিরক্তি বুঝতে কারোরই অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ভদ্রলোক সেদিকে আমল দিলেন বলে মনে হল না।
"আমার নাম সুকান্ত মাইতি, এখানে যার দোকান ছিল সেই বিশ্বনাথ মাইতি আমার বাবা।" ভদ্রলোকের উত্তর শুনে  শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা  ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল দীনুবাবুর। চোখের সামনেটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেল, চোখের সামনের দৃশ্যপট পালটে যেতে লাগল দ্রুত।
বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটা চোখের নিমেষে গায়েব হয়ে ফিরে এল সেই ছোট্ট দোকানটা, লম্বা কাঠের কাউন্টারের ক্যাশ বাক্সের সামনে বসা বিশ্বনাথ মাইতি, পাশে দাঁড়িয়ে পূর্ণযুবক দীনবন্ধু কর্মকার। দোকানে কোন খদ্দের নেই, একজন কালো কোট পরা উকিল বসে সই করাচ্ছে বিশ্বনাথ মাইতিকে দিয়ে দলিলের মত কয়েকটা পাতার ওপর। দোকানের দরজায় দুজন ভয়াল দর্শন পালোয়ান দাঁড়িয়ে। বিশ্বনাথ মাইতি যন্ত্রবৎ সই করে চলেছেন, খালি দুচোখ দিয়ে জল পড়ছে অবিরত।
"দেখুন আমি যতদূর জানি, উনি দোকান বিক্রি করে দিয়েছিলেন কোন এক মাড়োয়াড়িকে, তার অনেক পরে তিন চার হাত ঘোরার পর আমি কিনি শেঠ ছোটুলাল বাগাড়িয়ার থেকে। আমি এর থেকে বেশী কিছূ জানি না। আর আপনার বাবার দোকান, আপনি নিজেই জানেন না! তাজ্জব ব্যাপার!" নিজের অজান্তেই গলাটা যেন একটু বেশীই চড়ে যায় দীনুবাবুর। দোকানের কর্মচারীরা কাজ থামিয়ে ফিরে তাকায় তাঁদের দিকে, মালিককে এমন গলা তুলে কথা বলতে কেউ কোনদিনও শোনেনি। ওনার জামাই একটু ব্যস্ত ছিল, কম্পিউটারে কিছু কাজ করছিল বোধহয়, উঠে এসে জিজ্ঞেস করে ,"কিছূ প্রব্লেম?"
"নাহ, সব ঠিক আছে, এই ভদ্রলোককে একটু চা টা খাইয়ে বিদেয় কর, যতসব উটকো উৎপাত"।  দিনুবাবুর মুখ থেকে কথা খসতে জা দেরী, দোকানের প্রাইভেট সিকিউরিটি গার্ড  প্রায় হিড়হিড় করে সরিয়ে নিয়ে যায় ভদ্রলোককে , কাউন্টারের সামনে থেকে। "বেশী জোরাজুরি কোর না, বয়স্ক মানুষ!" দীনুবাবু গার্ডকে বললেন বটে তবে সেটা যে মন থেকে নয় সেটা বুঝতে কারোরই অসুবিধে হবার কথা নয়।  আবার যেন চোখের সামনেটা চেঞ্জ হয়ে যায়, এবার রবীন্দ্র সরণীর  সেই একতলা বাড়িটা। মেন গেটের সামনে একটা হলুদ ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। সেই মুশকো পালোয়ানদুটো প্রায় টেনে হিঁচড়ে  গাড়িতে তুলছে বিশ্বনাথ মাইতিকে, সঙ্গে ওনার স্ত্রীও। মেন গেটের সামনে কোমরে হাত দিয়ে  কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে দীনবন্ধু কর্মকার।
তা দীনুবাবু ভদ্রলোককে তো নাহয় দোকান থেকে বের করে দিলেন , কিন্তু মন থেকে তো পারলেন না। মুডটা কেমন যেন তেঁতো  হয়ে গেল । অন্যদিন দোকানে বসে বিক্রিবাটা দেখতে যতটা ভালো লাগে, এবার ঠিক ততটাই অসহ্য লাগতে লাগল। প্রতিদিন এক ভবঘুরে  সন্ন্যাসী এসে পাঁচ টাকা করে নিয়ে যায় নিয়ম করে। দীনুবাবু যে নজের হাতে তাকে টাকা দেন তাইই নয় দু চারটে কথাও বলেন। সেই সন্ন্যাসী আসা মাত্র তাকে দূরদূর করে তাড়িয়ে দিলেন, কর্মচারীদের অকারণে বকাঝকা শুরু করে দিলেন, এমনকি জামাইয়ের সঙ্গেও বাকবিতন্ডা হয়ে গেল সামান্য একটা ডেলিভারি চালান নিয়ে। দীনুবাবু বুঝতে পারছিলেন তিনি ঠিক কাজ করছেন না, কিন্তু নিজের মেজাজকেও বাগে রাখতে পারছিলেন না, কেমন একটা দমবন্ধকরা অস্থির অস্থির ভাব।  এই রকম ভাবে কতক্ষণই বা থাকা যায়।  অন্যদিন যেখানে বেলা দেড়টা নাগাদ দোকানের সবাই টিফিন করে তখন দীনুবাবু বাড়ি ফিরে যান, সেখানে  বেলা বারোটা বাজতে না বাজতেই উঠে পড়লেন।  বাড়ি ফেরার পথে একটা বজরংবলীর মন্দির পড়ে, সেখানে প্রতিদিন গাড়ি থামিয়ে , ভক্তিভরে একটা প্রণাম করে তবেই বাড়ি যান। ড্রাইভার রোজের মত সেখানে গাড়ি থামাতেই দীনুবাবু হাতের ইশারায় জানান উনি নামবেন না।  গাড়ির ড্রাইভার ছগনলাল ওনার গাড়ি চালাচ্ছে তা কিছু না হলেও বছর ত্রিশেক তো বটেই। বাবুর হেন কোন স্বভাব বা অভ্যেস নেই যেটা তার অজানা। শেষ পনেরো বছরে এমন কোনদিনও হয়নি যেদিন বাবু বাড়ি ফেরার সময় বজরংবলীর এই মন্দিরে নামেননি। যখন একলাই সব কিছু সামলাতেন, সকাল দশটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দোকানেই থাকতেন, তখনও রাতে বাড়ি ফেরার সময় মন্দিরে ঠিক নামতেনই।  মন্দির বন্ধ হয়ে গেলেও, বন্ধ দরজার সামনেই প্রণাম করতেন। ছগনলাল তাই খুব অবাক হলেও কথা বাড়াল না। রিয়ার ভিউ মিরর  দিয়ে মালিক কে এক নজর দেখে নিল। আজব বাত আছে, মনে মনে ভাবে। বাবুর এত গোমড়া মুখ সে কোনদিনও দেখেনি।  সে নিঃশব্দে গাড়ি চালাতে থাকল। এই সময় বাবুকে ঘাঁটালে হিতে বিপরীত হতে পারে, সে খুব ভালো জানে।
এত তাড়াতাড়ি দীনুবাবুকে বাড়ি ঢুকতে দেখে সবাই তো অবাক। সবাই মানে দীনুবাবুর স্ত্রী আর মেয়ে। দিনুবাবুর মুখের অবস্থা দেখে কারোর আর সাহস হলনা জিজ্ঞেস করে এই অসময়ে বাড়ি ফিরে আসার কারণ।  বাড়ি ফিরেই  দীনুবাবু সোজা  গিয়ে ঢুকলেন  নিজের শোবার ঘরে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়াল জোড়া বড় শোকেশটার একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা কয়েকটা ছবির ফ্রেম সরিয়ে পেছনে লুকনো বড় আয়রন সেফ খুলে বের করলেন এক তাড়া দলিল দস্তাবেজ, বেশ খানিক্ষণ ভালোভাবে পড়ে দেখলেন কাগজপত্রগুলো। নাহ, সব ঠিকঠাকই আছে, কোথাও এমন কিছু সূত্র রাখা নেই যেগুলো তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। মনের চাপটা সামান্য হলেও একটু কমল যেন। দরজা খুলে বাইরে ড্রয়িং রূমের সফায় এসে বসলেন   ধপ করে।
স্ত্রী অপেক্ষাতেই ছিলেন, বসা মাত্র এক গ্লাস ঠান্ডা জল ধরলেন মুখের কাছে
"হ্যাঁগো, কিছু গন্ডগোল হয়েছে নাকি দোকানে?"
"তোমাকে মাথা ঘামাতে বলেছি আমি? জা বোঝ না সেসব নিয়ে  বকবক কোর না তো।" ঝাঁঝিয়ে ওঠেন দীনুবাবু।
স্বামীর মেজাজ দেখে চুপ করে যান স্ত্রী। প্রত্যেক কথায় এই  তুচ্ছ তাচ্ছিল্য তিনি মেনেই নিয়েছেন। তাঁদের দীর্ঘ্য দাম্পত্য জীবনে সুখ সাচ্ছন্দের কোন অভাব তো রাখেনইনি দিনুবাবু , উপরন্তু  অঢেল  প্রাচুর্জ্যে ঢেকে রেখেছেন। অত্যন্ত গরীব ঘরের মেয়ে হিসেবে এই জীবন তাঁর স্ত্রীর কাছে হয়ত ছিল স্বপ্নেরও অতীত।  তাই দীনুবাবুর এই প্রাত্যহিক তুচ্ছতাচ্ছিল্যকে হয়ত তিনি  ভবিতব্য বলেই মেনে নিয়েছেন। আর এই এতগুলো বছরে এটা তিনি ভালোভাবেই বুঝে গেছেন যে মাথা গরম থাকলে দীনুবাবু কাওকেই রেয়াত করেন না, তা সে যত কাছের লোকই হোন না কেন।
ঠান্ডা জলটা খেয়ে শরীরটা কোথায় একটু জুড়োবে তা না, আরো কেমন যেন আনচান করতে লাগল, ঘরে এসি চলছে, গরম লাগার কোন ব্যাপার নেই, তবুও সারা গায়ে কেমন যেন ঘাম ঘাম হতে থাকল।  তাহলে, প্রেসারটা বাড়ল নাকি? অস্বাভাবিক নয় !, সকাল থেকে যা সব অনাসৃষ্টি কান্ডকারখানা হচ্ছে!
দুপুরবেলার লাঞ্চটা দীনুবাবু খুব রসিয়ে রসিয়ে খান। সেদিন আবার মেনূতে ছিল মাছের মাথা দিয়ে ঘন মুগের ডাল, পোস্তর বড়া, কাতলা মাছের কালিয়া, দীনুবাবুর একান্ত প্রিয় খাবার সব। কিন্তু কি আশ্চর্য! খেতে বসে সব কিছু কেমন  যেন জোলো বিস্বাদ লাগতে লাগল। মাঝপথে খাওয়া থামিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন
"এগুলো রান্না হয়েছে ! ছাই পাঁশ যতসব , মুখে দেওয়া যায় না",  ঠেলে ভাতের থালা সরিয়ে দিয়ে রেগে উঠে পড়লেন দীনুবাবু। প্রতিদিনের মত পাশে বসে খাওয়ার  তদারকি করেছিলেন স্ত্রী, তিনিও অবাক। রান্নার  করে যে মেয়েটি সে কিছু না হোক বছর দশেক রান্না করছে এ বাড়িতে। এই তো সকালেই ওরই হাতে বানানো লুচি আলুরদম খেয়ে ধন্যধন্য করেছিলেন দীনুবাবু। তাই এই খাওয়ার মাঝপথে উঠে যাওয়াটা ওনার  স্ত্রীর কাছেও খুবই অবাকের।  বিয়ে হয়ে আসা ইস্তক দীনুবাবুকে কোনদিনও খাওয়া ফেলে উঠে যেতে দেখেননি তিনি, খাদ্য রসিক দীনুবাবু পাতে খাবার নষ্ট করার ঘোর বিরোধী।
"না খেয়ে উঠে পড়লে যে ? কি হয়েছে বলবে একটু?" আর থাকতে  না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেলেন স্ত্রী।
"হয়েছে! আমার গুষ্টির ষষ্ঠী পুজো হয়েছে" তেরিয়া হয়ে জবাব দেন দীনুবাবু। কথাটা বলা মাত্র কানে খট করে লাগে দীনুবাবুর। কি বললেন ? গুষ্টি? হ্যাঁ গুষ্টিই তো! কোথায় দীনুবাবুর গুষ্টি? কোথায় তারা? সেই ষোলো সতেরো বছর বয়সে যখন বাড়ি ছেড়েছিলেন তারপর থেকেই না চেষ্টা করেছেন ফেরার না রেখেছেন কোন যোগাযোগ। বহু বছর বাদে যখন দোকান মালিক হয়ে পুরোপুরি ব্যাবসায়ী তখন তাঁর দোকানেই হঠাৎ দেখা হয়ে গেছিল গ্রামের এক বাল্য বন্ধুর সঙ্গে। দীনুবাবু একেবারেই চাননি যে বন্ধু তাঁকে চিনতে পারুক, কিন্তু পেরেছিল। তার মুখ থেকেই  জানতে পেরেছিলেন বাবা মায়ের মৃত্যুর কথা, ভাইয়ের অসহায় দূরবস্থার কথা। শুনেছিলেন কিন্তু মনে দাগ কাটেনি কথাগুলো। এটা তো সত্যিই যে পারিবারিক দুঃখ কষ্ট যদি দাগই কাটত, তাহলে দীনুবাবু রাতারাতি বাড়ি ছাড়তে পারতেন না। বন্ধুকে পই পই বারণ করে দিয়েছিলেন জাতে সে গ্রামের গিয়ে তাঁর কথা না বলে, তবু বন্ধু চলে যাওয়ার দিন দশেকের মধ্যে ছোট ভাই দোকানে হাজির। তখনও বিরক্ত হয়েছিলেন দীনুবাবু। চূড়ান্ত উদাসীনতা আর উপেক্ষা বুঝতে তাঁর ভায়ের সময় লাগেনি। সে প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিল ঠিকই কিন্তু তার আত্মসম্মান ছিল প্রবল। দীর্ঘ দিন নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া দাদার খবর পেয়ে তার আনন্দ হয়েছিল,  ভেবেছিল, যদি আবার একসাথে হওয়া যায়। অরথনইতিক প্রত্যাশা যে তার এক্কেবারে ছিল না তা নয়, কিন্তু সবার ওপরে ছিল আত্মসম্মান। অর্থের জন্য আত্মসম্মানের সঙ্গে  আপোস না করার এই ঋজু চারিত্রিক বৈশিষ্ট সে পেয়েছিল তাদের বাবার কাছ থেকে। অবশ্য দীনুবাবুর তখন এত সময় ছিল না এসব নিয়ে ভাবার। চক্ষু লজ্জার খাতিরে ভায়ের হাতে হাজার খানেক টাকা  তুলে দিতে গিয়েছিলেন, কিন্তু সোজা শিরদাঁড়ার ভাই নেয়নি সে টাকা। সে এসেছিল হারিয়ে যাওয়া দাদার সঙ্গের আশায়। ভাই চলে যাওয়ার পরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন দীনুবাবু। উন্নতির পথে জ্ঞাতি গুষ্টিরা  অন্তরায় হয়ে দারাতে পারে , তাই তাদের জীবন থেকে একদন ধরা ছোঁয়ার বাওরে রেখেছিলেন নিজেকে।
কিন্তু এতদিন পর হঠাৎই তাঁর মনে হল, আছে তো তাঁর জ্ঞাতি গুষ্টি, হয়তো ভাইটা বেঁচে আছে এখনও। কিন্তু সে সব তো স্ত্রী কে বলা যাবে না। তাঁর জীবনে স্ত্রীর আগমন এই সব ঘটনা পরে ফলে ওনার জানার কথা নয়। স্ত্রী জদিও বহুবার জানতে চেয়েছিলেন, দীনুবাবুই বলেননি। নিজের বিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করায় তাঁর একান্ত অনিহা দেখে স্ত্রীও  জিজ্ঞেস করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন এক সময়।
তা যাই হোক  এই কথাটা বলার পর থেকেই মনটা আরো যেন বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল।  এতদিন পর কেন উদয় হলেন ওই ভদ্রলোক। দীনুবাবু নিশ্চিত ছিলেন যে বিশ্বনাথ মাইতির একমাত্র পুত্র সেই নকশাল আমল থেকে নিখোঁজ। জতদূর তিনি খবর পেয়েছিলেন পুলিশের এনকাউন্টারে সে মারা গেছে, যদিও , বিশ্বনাথ মাইতি জতদিন ছিলেন , দ্রিঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন ছেলে ঠিক ফিরে আসবে। আর এই বিশ্বাসই হল তাঁর কাল। দিনুবাবু যখন দেখলেন বহু চেষ্টাতেও সেই বিশ্বাস ভাঙা সম্ভব নয় তখন সমূলে উপড়ে ফেলে দিলেন তাঁর আশ্রয়দাতাকেই। জীবনে উন্নতির পথে কোন্রকম কাঁটা দিনুবাবু রাখেননি। একবার মনে হল , এটা বিশ্বনাথ মাইতির কোন চাল নয়ত! কিন্তু সেটাই বা কি করে সম্ভব! বিশ্বনাথ মাইতি, দীনুবাবু  যতটুকু জানেন মারা গেছেন বহুদিন আগে। তাঁর কাছ থেকে খবর নিয়ে কারুর যদি ঝামেলা করার হত  তাহলে এতদিন পরে কেন! নাহ, কোন কিছুই আন্দাজ করা যাচ্ছে না।
সেই থেকে দীনুবাবুর এই উৎকণ্ঠা আর অস্বস্তির শুরু। সারাদন খালি মনে হচ্ছে এই বুঝি সব কিছু শেষ হয়ে গেল। দিনে শান্তি নেই, রাতে ঘুম নেই এক কথায় এক যাচ্ছেতাই অবস্থা। স্ত্রী মেয়ে জামাই সবাই গভীর উৎকণ্ঠায়। বেশ কয়েকজন ডাক্তার, ঝুড়ি ঝুড়ি টেস্ট সব হয়ে গেল। কোত্থাও কোন গরমিল নেই কিন্তু দীনুবাবু শুকিয়ে যাচ্ছেন দিন কে দিন। খাদ্য রসিক দীনুবাবুকে এখন যা দেওয়া হয় খেয়ে নেন উচ্চবাচ্চ না করে, ভালো খারাপ কিছুই বলেন না, নিত্যনতুন খাবারের ফরমায়েসও করেননা, ক্লাবে যান না। সকাল বেলা দোকানে গেলেও দরজার দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন , যেন কারুর প্রতীক্ষায়। খালি তাঁর মনে হয়, এই বুঝি এলেন সেই ভদ্রলোক। টানা বেশ কয়েক সপ্তাহ যখন আর কেউ এল না, একটু যেন নিশ্চিন্ত বোধ করলেন দিনুবাবু। আবার একটু স্বাভাবিক হচ্ছেন ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা।
সকালবেলা দোকানের সামনে গাড়ি থেকে নামছেন, চোখে পড়ল রাস্তার ঠিক উল্টোদিকের চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে সেই ভদ্রলোক তাকিয়ে আছে তাঁর দোকানের দিকে।  দেখা মাত্র বুকের মধ্যে যেন ধক করে উঠল। দোকানের সিকিউরিটিকে  ডেকে বলে দিলেন, ওই ভদ্রলোককে যেন একদম ঢুকতে দেওয়া না হয় দোকানে।  এটা বলায় সিকিউরিটি যা বলল সেটা শুনে তো  দীনুবাবুর মাথায় হাত।  রাত্তিরবেলা মাঝে মাঝেই নাকি ভদ্রলোক নাকি দোকানের বন্ধ দরজার সামনে শুয়ে থাকেন। রাতের ডিউটিতে সে  নিজেও দেখেছে  কয়েকবার। কথাটা শুনেই তেলে বেগুনে জ্বলে গেলেন দীনুবাবু। কেন তাঁকে এই কথাটা আগে জানানো হয়নি! সিকিউরিটি গার্ডকে  এই মারেন তো সেই মারেন। দোকানের সব কর্মচারী আর জামাই ছুটে এসে কোন রকমে নিরস্ত করে দীনুবাবুকে। মাথা সামান্য ঠাণ্ডা হলে দীনুবাবু যা জানতে পারেন সেটা আরো ভয়ঙ্কর। দীনুবাবুর অনুপস্থিতিতে ওই ভদ্রলোক বেশ কয়েকবার দোকানে এসেছেন, খোঁজ খবর করেছেন  বিশ্বনাথ মাইতির নামে। তাতে অবশ্য বিশেষ সুবিধে হয়নি কারণ দোকানের বর্তমান কর্মচারী থেকে শুরু করে  দীনুবাবুর জামাই কেউই জানে না বিশ্বনাথ মাইতির কথা। একটু মাথা ঠান্ডা হতে, দীনুবাবু এক কর্মচারীকে বলেন  ডেকে আনতে ভদ্রলোককে। যা হোক একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে আজ। কিন্তু কর্মচারীটি বাইরে দেখে এসে বলে, ভদ্রলোককে কোথাও দেখা যাচ্ছে না আসেপাশে। প্রচন্ড উৎকণ্ঠায় শরীরটা যেন খারাপ লাগতে থাকে দীনুবাবুর। বাড়িতে ফিরে যাওয়াই বোধহয় ভালো।  বাড়ি যাবেন বলে দোকানের বাইরে বেরোচ্ছেন দেখে, জামাই ফোন  করে। সব কিছু বন্দ্যবস্ত করে রাখা দরকার।
প্রচন্ড ঘামতে ঘামতে দীনুবাবু যখন বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি থেকে নামছেন, চোখে পড়ল, রাস্তার উল্টো ফুটে দাঁড়িয়ে সেই ভদ্রলোক, আনমনা হয়ে তাকিয়ে আছে তাঁরই বাড়ির দিকে।
এটা কি করে সম্ভব! দোকান থেকে বাড়ি পর্যন্ত এসে গেল কি করে? তখনই মনে হল, যদি সত্যিই বিশ্বনাথ মাইতির ছেলে হয় তাহলে তো না চেনার কিছু নেই! মাথার মধ্যে তীব্র একটা যন্ত্রণায় সারা শরীর অবস হয়ে গেল দীনুবাবুর। চোখের সামনে সব অন্ধকার হবার আগে একটাই কথা তাঁর মাথায় এল, "কর্মফল"।
খানিক পরে ঘরের মধ্যে তাঁর মৃতদেহ ঘিরে অনেক লোকের ভিড়ে কেউ লক্ষ্য করল না দীনুবাবুর জামাই কখন যেন এক তাড়া নোট গুঁজে দিল সেই ভদ্রলোকের হাতে।
=====================
 
অভীক মুখার্জী
৩১/৩ রামনবমী তলা লেন
বালী, হাওড়া

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.