বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

গল্প ।। পবিত্র পাপী ।। সমীর কুমার দত্ত

 


 

পবিত্র  পাপী

    সমীর কুমার দত্ত

            

ছেলেটির নাম নিতাই দাস । বয়স তেরো–চোদ্দর কাছাকাছি।  কলকাতার দর্জি পাড়ার এক ছোট  হোটেলে সে কাজ করে। বাড়ি হাওড়ার প্রত্যন্ত এক গ্রামে। বাবা মদন দাস পেশায়  একজন ক্ষৌরকার।  বাজারে এক চিলতে জায়গায় পৈতৃক  ছোট্ট একটা দোকান আছে। মদনের বাবা প্রসাদ দাস ঐ দোকান চালাতো। প্রসাদ সন্ধ্যাবেলা হলেই চোলাই মদ  গিলতো। রাতের বেলায় দোকান বন্ধ করে এক পাঁট মদ ও মাংস নিয়ে বাড়ি ঢুকতো। মদন তখন ঘুমিয়ে পড়তো। প্রসাদ মদ ও মাংস খেয়ে তার ভুক্তাবশেষ একটা জায়গায় রেখে হাত  মুখ ধুয়ে শুয়ে পড়তো নেশার ঝোঁকে। মদন সকালে উঠে  বলতো, " বাবা আমার মাংস রাখনি ? " প্রসাদ ভুক্তাবশেষের দিকে আঙুল দিয়ে নির্দেশ  করে বলতো, " ওখানে আছে  খা ।" মদন দেখে বলতো, " ধুস্ , এ  তো ছিবড়ে!"  প্রসাদ  বলতো, " ঐ পেয়েছিস্ খা ।" অনেক সময় মদনের মা তার স্বামী প্রসাদকে বলতো, " কি কথার ছিরি। আমার জন্য না রেখেছো ঠিক আছে। ছেলেটার জন্যে  তো রাখতে পারো। " মুখের কথা কেড়ে নিয়ে প্রসাদ বলতো, " ভাত ডাল খেতে পাচ্ছিস এই যথেষ্ট। এর  বেশি কিছু চাইবি নি।"  পাঠক মাত্রই বুঝতে পারছেন মদন  ও তার উত্তরপুরুষদের ভবিষ্যৎ  কি।
ফিরে আসি নিতাইয়ের কথায়। নিতাইয়ের একটা বোন আছে একেবারে পিঠাপিঠি  নয়। বয়স বছর তিনেকের  কাছাকাছি। তার সঙ্গে নিতাইয়ের বয়সের  পার্থক্য বেশ অনেকটাই। কারণ নিতাইয়ের মা নেই। এ তার সৎ  বোন। অভাবের তাড়নায় দিনের পর দিন অর্ধভুক্ত বা অভুক্ত  থেকে  অবশেষে একদিন স্বর্গে পাড়ি দিলো নিতাইয়ের মা।নিতাই তখন বছর আট নয়েকের হবে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই প্রধানতঃ নিতাইকে দেখাশোনার অজুহাতে মদন আবার বিয়ে করে পণ হিসাবে বেশ কিছু টাকা ও গহনা  শ্বশুরবাড়ি থেকে আদায় করে। আগের বৌ এর গহনা বেচে সব মদ খেয়ে উড়িয়ে দিয়েছে।
মদন আসলে খুব অলস প্রকৃতির আর বাপের মতো নেশা খোর। মাসের মধ্যে অর্দ্ধেক দিন দোকান  খোলে না। তার বাঁধাধরা খদ্দেররা এদিক ওদিক ছিটকে গেছে। তার ওপর আজকাল ফ্যাসানের যুগে লোকে বিউটি পার্লারে যাতায়াত করছে। কিছু বুড়োহাবড়া আর ফ্যাসানহীন লোকেরা তার দোকানে চুল দাড়ি  কাটতে আসে। তাও মাসের শেষের দিকে তেমন খদ্দের হয়  না। হাঁ করে বসে মাছি তাড়াতে হয়। এইজন্য তার  সংসারে অভাব লেগেই আছে। তাই দোকানে দোকানে ধার ।  সন্ধ্যে  হলেই অল্প আয়ের কিছু অংশ দিয়ে মদ গিলে বাড়ি ফেরে আর  ভালো মন্দ খাবারের ফরমাইশ করে। না পেলেই স্ত্রীকে গালমন্দ করে। প্রতিবাদ করলে কখন‌ও মারধরও  দেয়। যাহোক আবার আর এক হতভাগীকে বিয়ে করে তার কপাল তো পোড়াল‌ই এবং তার সঙ্গে নিতাইয়ের কপাল‌ও  পোড়ালো। নিতাই ছেলেটা বেশ বুদ্ধিমান। বেশ ভালো ছবি আঁকতে পারে। লেখাপড়ায় বেশ মনোযোগী। তিন চার বছর স্কুলে পড়ে সে তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় রেখেছে। এরজন্য  সে শিক্ষকদের সুনজরে এসেছে। খানিকটা গোবরে পদ্মফুল ফোটার মতো। মদন চায় না নিতাই জাত ব্যবসা করুক। কারণ, ব্যবসার তো এই হাল — হতাশা ব্যজ্ঞক। কিন্তু ভাগ্য তাকে সহায়তা দেয় নি। দিলে মদন আবার বিয়ে করবে কেন? কজন সৎমা আজ আর আছে যে তিনি তাঁর সতীন সন্তানকে নিজের সন্তান তূল্য চোখে দেখেন ।  তবে ব্যতিক্রম তো  উদাহরণ হয়েই আছে। কিছুদিন পর মদনের একটা মেয়ে হলো। বড় আদরের মেয়ে। এই  সময়  একদিন মদনের দ্বিতীয় পক্ষ বললো, " দেখো, সংসারে বড়ো অভাব  আর  তোমার‌ও  আয় ভালো নয়। এই  যে মেয়েটা  হয়েছে এর  কি হবে?  দুবেলা একটু  দুধ‌ও  তো জুটবে না। মেয়ের  কিছু  হলে আমি আত্মহত্যা করবো —এই বলে রাখছি। তাই  আমি  বলি  কি, নিতাইকে  আর পড়াবার  দরকার নেই। ওকে একটা  কাজে লাগিয়ে  দাও।
—কি  বলছো  কি?  কাজে লাগিয়ে দেবো। এমন ভালো ছেলে , লেখাপড়া ছাড়িয়ে  কাজে লাগিয়ে দেবো?
—হ্যাঁ  দেবে। পড়ে তো সব হবে। 
 তুমি  ডাক্তার হয়ে‌‌ছো , আর ও মোক্তার হবে। ভালো ছেলে হলেই হয় না। বলি, ওকে মাষ্টার দিতে হবে তো। তোমার মুরোদ আছে?  এমনিতেই তো খাবার জোটাতে পারো না।
মদন  ভেবে  দেখে  কথাটা  বৌ  মন্দ  বলেনি । আর  তার  কোন ভরসা  নেই।  কিছু টাকাকড়ি পেলে  নয়  দোকানটাকে সাজানো  যেতো । তখন  হঠাৎই তার মাথায় একটা উপায়  উদ্ভাবিত  হলো। ভাবলো, দোকান বেচে দিলে কেমন হয় ?টাকা যা পাওয়া যাবে তাতে একটা রিক্সা কিনে চালানো যায় তো মন্দ কি ?  বাকি টাকা  সংসারে  কিছু  সাশ্রয়  দেবে।
মদন  তাই  করলো। দালাল ধরে সে  দোকানটা বিক্রি করে দিলো।  একটা পুরাতন রিক্সা  কিনে বাকি টাকায়  বেশ  কিছু  দিন সংসারে  বেপরোয়া  খরচ  করে আর  মদ খেয়ে উড়িয়ে দিলে। আর পুরাতন রিক্সায় আয়ের থেকে  মেরামতি  খরচ হতে লাগলো বেশি।  তারপর  যথা পূর্বং  তথা  পরং । যেই  অভাব, সেই অভাব।  একে তো ঠিকমতো খেতে  পায় না তার ওপর মদ  গিলে গিলে শরীরটার বারোটা বাজিয়ে রেখেছে। দুদিন রিক্সা নিয়ে বের হয় তো পরের দিন বের হতে পারে না। হয় রিক্সা  খারাপ নয়তো নিজের শরীর খারাপ।

এইভাবে সংসারের  অভাব আর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর  প্ররোচনায় মদন বাধ্য  হয়ে নিতাইকে  স্কুল ছাড়িয়ে দূরের একটা  ছোটো খাটো  হোটেলে কাজে লাগিয়ে দেয়। দূরে  দেওয়ার  কারণ প্রধানতঃ  শিক্ষকদের  নজরে  না  পড়া  ও  ওর  সৎ মায়ের থেকে  দূরে  রাখা। শিক্ষকদের নজরে এলে হাজারো কৈফিয়ৎ আর ঘরে বাইরে দু-জায়গার খাটুনির  হাত থেকে বাঁচানো। আবার শুধু  নিতাই  বাঁচলে চলবে  না, সংসারকেও  বাঁচাতে হবে , সংসারকে  বাঁচাতে  চাই টাকা । তাই থাকা খাওয়া আর মাস  মাইনে  দুশো টাকার  বিনিময়ে  নিতাই  কাজে  লেগে গেলো  সংসার থেকে  দূরে। একে তো  মায়ের সঙ্গ লাভে বঞ্চিত  হয়েছে তার ওপর বাবার। বাবার ওপর তার রাগও হয় আবার দুঃখ‌ও  হয়। বাবার শরীর  স্বাস্থ্য  ভেঙে গেছে। আর বাঁচবে না বোধহয় । এখন সে সম্পূর্ণ  একা  এই  পৃথিবীতে।
মদন  মাসে একবার  করে হোটেলে  যায়। উদ্দেশ্যে  মাইনের   টাকা  আদায় আর  নিতাইকে একবার  চোখের  দেখা  দেখে যাওয়া।  হাজার হোক নিজের ছেলে  তো। 
মাস মাইনে দুশো টাকা নামেই,  মাসে  মাইনে  হিসাবে  দুশো টাকা সব মাসে পাওয়া যায় না। দুশো টাকা  মাইনেতে একটা চুক্তি  আছে। কাপ, প্লেট, গ্লাস ইত্যাদি  ভেঙে ফেললে কিংবা অন্য  কোন  ক্ষয়ক্ষতি  হলে তার মূল্য  কাটা যাবে ঐ মাইনে থেকে ।  তাই  নিতাইকে অতি  সাবধানে   কাজ করতে হয় । তবুও  অসাবধানতা বশতঃ  অথবা  তাড়াহুড়ো  করার  জন্য কিছু  না কিছু ভাঙতোই  আর মাইনে থেকে কাটা  যেতো। উপরি পাওনা  হিসাবে মালিকের মুখ ঝামটা, চড়চাপড়টা কপালে জুটে যেতো। মদন মাইনের টাকা নিতে  এসে যদি দেখে ক্ষয়ক্ষতি বাবদ  টাকা কাটা গেছে  অর্থাৎ মাইনে  পুরোপুরি দুশো টাকা হাতে  আসেনি,  তখন সেও নিতাইকে দু-চারটে চড়-চাপড় বকশিস্  দিতো । এই হলো হতভাগ্যদের জীবন। এরমধ্যে যদি দেখা যায় সে অধিক  মূল্যের ক্ষয়ক্ষতি  করে  ফেলেছে, তবে তার ব্যবস্থাও আলাদা আছে। খরিদারের উপস্থিতিতে যার  পরনাই অপমানিত  হ‌ওয়া  এবং সবচেয়ে মর্মান্তিক এই  যে তার খাবার বন্ধ  করে দেয়া । এ যেন মধ্যযুগীয় ক্রীতদাস প্রথাকেও হার মানায়। কেননা জেল খাটা আসামিকেও অভুক্ত  রাখা যায়  না। হোটেলে খাবার  বেঁচে  গেলে  কুকুরকে দেওয়া হয় তবু তাকে  নয়। এটা তার শাস্তি। অনেক দিন সে অভুক্ত অথবা অর্ধভুক্ত থেকেছে আর দুর্বলতাজনিত  কারণে কাজে এসেছে শ্লথ গতি। আর  শ্লথ গতির  জন্য‌ও  মালিকের দুর্ব্যবহার  পুরস্কার হিসাবে  পাওনা  থাকে।
ছোট ছেলে ভোর পাঁচটায়  উঠে রাত  বারোটা অবধি জাগতে  পারে না। আবার ভোর  পাঁচটায় ঘুম ভাঙতে  চায়  না।  ঘুম  চোখে  কাজে  ভুল  হয়  ক্ষয়ক্ষতি  হয়, বার্ধক্যে  যা  ঘটে  তা  কৈশোরে  ঘটে যায়।  তবুও মালিক  তাকে  কাজ থেকে  ছাড়াতে  পারে  না।  কারণ মালিক  ও  তার উপরে  হোটেলটা  চলে। খাবার  দেওয়া থেকে  বাসন মাজা, চা  তৈরি, আনাজ কাটা  কোনটাই  বাদ  নেই  তার  কাজে।  আজকাল বাচ্চা  ছেলে  পাওয়া খুবই মুশকিল, আর  বড়রা  এই  মাইনেতে  এতসব কাজ করতে আসবে  না। বড়রা  অনেক  সেয়ানা।  তারা শ্রম সম্পর্কে সচেতন। শুধু মাত্র  পেটভাতা আর  দুশো  টাকা  মাইনেতে লোক  পাওয়া  ভার। তাই  এই মূক প্রাণীর মতো শিশুগুলো ভুল করলে,  ক্ষতি করলে  মেরে, মাইনে কেটে পার পাওয়া  যায়, যেটা  বড়দের  ক্ষেত্রে  প্রয়োগ  করা  যায়  না। শ্রম  শোষণের  পক্ষে  এরাই   উপযুক্ত । সুতরাং যত  এদের  কাজে  লাগানো  যায়  ততোই মালিকের সুবিধে। কখনও  কখনও  শারীরিক  নির্যাতন  এতো নিষ্ঠুর হয়,  যা দেখাও  এক ধরনের শাস্তি — মানসিক  শাস্তি । একদিন নিতাইয়ের  ঘুম ভাঙতে  দেরি হয়ে গেল। না ডাকলে  ওর ঘুম ভাঙে  না। রোজ  ওকে ডেকে দেওয়া হয়।  ও  উঠে  ঝাঁট দিয়ে,  মুছে, হোটেলের সামনেটা  জল ঢেলে ধুয়ে দেয় ।  মালিক ইতিমধ্যে  স্টোভ জ্বালিয়ে  দেয়। নিতাই  চায়ের জল  চড়িয়ে  কাপ, গেলাস  পর  পর  সাজিয়ে রাখে। মালিক  চা তৈরি করে  ছেঁকে  কাপ, গেলাসে চা  ঢেলে দেয়। নিতাই  হাতে হাতে খরিদ্দারদের ধরিয়ে দেয়। শীতকাল  এলে ভোরের দিকে  ভীড়টা  বেশি হয়, তখন তাড়াহুড়ো  করতে হয়।
সেদিন  মালিকের পরিবার আগেরদিন  সন্ধ্যায় কোন কারনে বাপের বাড়ি চলে গেছে। তাই পরের দিন সকালে নিতাইকে  ডেকে  দেবার কেউ ছিল না। মালিক উঠেই দেখে নিতাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে । ইদানিং নিতাইয়ের শরীরটা  ভালো যাচ্ছে  না। একে খাওয়া দাওয়া হচ্ছে  না, তার ওপর হাড় খাটুনি ওই  টুকু একটা শরীরে কি সয় ? তার ওপর দুপুরে  একটু  বিশ্রাম হয় না। কারণ  খরিদ্দাররা  খেতে খেতে  দুটো তিনটে  হয়ে যায়।  তারপর সে খেতে পায়। তাও মালিক তাকে তাড়া দেয়। বেচারির খাওয়াও ঠিকমতো হয় না। দুপুরে মালিকের একটা সুখনিদ্রা না হলে চলে না। আর নিতাইয়ের যদি একটু ঘুমের ঝোঁক আসে তখন গিন্নীর কি মুখ ঝামটা। যাহোক ঘুম থেকে উঠে মালিক দেখে ঘড়িতে  ছটা। এতক্ষণ হয়তো অনেক খরিদ্দার ফিরে গিয়ে থাকবে । এরপর  ঝাঁটপোঁছ করে বাইরেটা ধুয়ে, স্টোভ জ্বেলে জল গরম করতে করতে  পঁয়তাল্লিশ  মিনিট মানে পৌনে সাতটা। মালিক আর ভাবতে পারে না।  ঘুম ভেঙে নিতাইকে এভাবে অঘোরে ঘুমতে দেখে মালিকের মাথা গরম হয়ে উঠলো। এক মগ ঠাণ্ডা জল তার গায়ে ঢেলে দিল। বললে, " নবাব পুত্তুর এতো বেলা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমচ্ছো। ব্যাটাচ্ছেলে খদ্দের যে সব ফিরে গেলো। আমার এক কাঁড়ি পয়সা লোকসান করিয়ে দিলি হতভাগা। আজ তোর‌ই একদিন কি আমার‌ই একদিন । কাঁড়ি কাঁড়ি গিল্ছিস্। বলি খাওয়া  আসবে কোত্থেকে?"

ঘুমন্ত অবস্থায় এই শীতকালে এক মগ ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিতেই নিতাই ধড়পড় করে উঠে পড়লো । মলিক তার ওপর একটা ছড়ি দিয়ে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলে। নিতাই কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো ,"আর হবে না বাবু, শরীরটা খারাপ লাগছিল বলে উঠতে  পারিনি। আর এমনটি হবে না বাবু। " মলিকের ক্রোধ তবুও  দমে না। সে গর্জাতে থাকে —"হবে না, যত ক্ষতি করলি, সব মাইনে থেকে উসুল করবো, দেখিস্ ।"
হোটেলে কত নিত্য নতুন, নানান ধরনের খদ্দের আসে। তাদের কারোর কারোর সঙ্গে নিতাইয়ের  বেশ ভাব হয়ে যায়। কেউ কেউ তাকে ভালোবেসে কিছু টাকা পয়সা বকশিস্ দেয়। মালিক তা জানে না। বাচ্চা ছেলে, তাদের বাড়িতেও  তো ওর‌ই  বয়সী  ছেলে রয়েছে, তারা  লেখাপড়া শেখে , ভালোমন্দ খায়,পরে। আর এইটুকু একরত্তি ছেলে পেটের দায়ে অসুরের মতো খেটে চলেছে। ওরোও  তো ইচ্ছে করে আমোদ আহ্লাদ করার। নিতাইয়ের প্রতি তাদের একটা মমতা জন্মেছে। তাতেও বিপদ  কম নেই। একদিন মালিক নিতাইয়ের বকশিস্  হিসাবে প্রাপ্ত  জমানো  টাকা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা  করে, 
" এতো টাকা তুই কোথায় পেলি? চোর কোথাকার! একটু ফাঁক পেলেই  চুরি। " বলে, টাকাগুলো নিতাইয়ের  কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেয়। নিতাই যত বলে  এ টাকা আমায় খদ্দেররা দিয়েছে । আমি জমিয়েছি।"
— খদ্দেররা তোর নানা হয় তাই তোকে দিয়েছে, নয়?  ফের মিথ্যে কথা।
বলে, মালিক চড় থাপ্পড় মারতে  থাকে। নিতাই  কেঁদে ফেলে নীরবে মার হজম করে নেয়। কি করবে ওর ভাগ্য‌ই  খারাপ। কে তার হয়ে বলবে? তার বাবা জানলেও  তো কেড়ে নেবে। তবু ভাল  যে  বাবার সংসারে যাবে।  তবু  আমার হকের  টাকা মালিক  কেন নেবে?— নিতাই ভাবতে থাকে।

আবার কত বদ্  খদ্দের‌ও  না আসে। তদের মধ্যে হারু সাঁতরা বলে  একজন মধ্য  বয়সী লোক মাঝে মাঝে চা এটা ওটা খেতে আসে। নিতাইয়ের তার সঙ্গে একটু একটু ভাব জমেছে।  হারু তার  মুখের দিকে তাকিয়ে  থাকে। নিতাই ভাবে তাকে বুঝি হারুর ভালো লাগে।  লোকটা বোধ হয় বাচ্চাদের  ভালোবাসে। হারুও মাঝে মাঝে ওর হাতে দু-চার পয়সা দেয়। হারু ওর খোঁজ খবর নেয়। হারুকে নিজের ভেবে  নিতাই তার মনের কথা, দুঃখের কথা বলে। হারু মন দিয়ে সব কথা শোনে।
এ পৃথিবীতে  ওর আপনজন বলতে কেই  বা আছে? ওর আপনজন  ওর মা'ই ওকে অকালে অসহায় অবস্থায় ফেলে চলে গেল। জন্মদাতা পিতা সেও  ওর  পর। তার নতুন সংসার নিয়ে সে বেশ সুখেই আছে। বাবা হওয়ার সুবাদে  ওর কাছ থেকে টাকা আদায় করতে আসে। তার নিতাইয়ের ওপর দাবি আছে কিন্তু  কোন  কর্তব্য নেই। ওর বাবার কাছে ওর জন্য কোন স্নেহ নেই, নেই  কোনো মর্যাদা । মা মরে গেছে  তাই  ও পর হয়ে গেছে।

যা  হোক  ওই  হারুর  উদ্দেশ্য ভালো নয়। ওর হাবভাব, চালচলন  সবটাই  কি রকম সন্দেহজনক। কার‌ও সঙ্গে বেশি কথা বলে না। কার‌ও সঙ্গে পরিচিত হতে চায় না। সবসময় মনে হয় কর্মব্যস্ত । হারু নিতাইয়ের  কাছে তার বাড়ির কথা, বাবার কথা, মালিকের ব্যবহার ইত্যাদি জেনে  নেয়। বুঝতে পারে  যে ওর কেউ নেই। তখন সে বলে — " তোকে একটা ভালো চাকরি করে দেবো। আরামে থাকবি। আমার তো অনেকের সঙ্গে আলাপ আছে। আমি বলে দেখবো।"
নিতাই  তার  জীবনের চরম হতাশার মধ্যে  আশার এক ক্ষীণ আলো দেখতে  পায় হারুর কথায়। আর মনে মনে কত স্বপ্ন দেখে । হারু  একদিন না এলে নিতাই তার প্রতীক্ষায় পথের দিকে চেয়ে থাকে । মাঝে মাঝে অন্য মনস্ক  হয়ে যায়, কাজে গাফিলতি আসে, ভুল হয়ে যায়। আর তখন মালিকের গালাগালি শুরু হয়ে যায়। বাবা ও  মালিকের অত্যাচার ও শোষণ থেকে সে মুক্তি চায়। হারু মাঝে মাঝে  তাকে দু - চারটে উৎসাহ- ব্যজ্ঞক কথা বলে তাকে আগ্রহী করে তোলে , যাতে তাগিদটা নিতাইয়ের কাছ থেকে বেশি আসে। সে  নিজে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করলে, নিতাই ধরে ফেলতে  পারে তার দুরভিসন্ধি, আর  তখন ও ওর সঙ্গে আর যেতে চাইবে না । পার্টি বেহাত  হয়ে যাবে। কোন রকমে যদি ওকে লোকচক্ষুর অন্তরালে একবার দোকানের  বাইরে বের করে আনা যায় তা হলেই কাজ হাসিল।
এদিকে  সেই  রাতে নিতাইয়ের ধুম জ্বর। সকালে ঐ ভাবে এক মগ জল ঢেলে দেওয়ায় বেচারির ঠাণ্ডা লেগে যায়। তারপর সারাদিন জল ঘাঁটা। জ্বর না হয়ে যাবে কোথায় । কেই বা আছে তার সেবা করার। জ্বরের ঘোরে সারা রাত ছট্ফট্ করে চলে আর  চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তার মায়ের কথা ভীষণ ভাবে মনে পড়ে।  ও মাকে হারিয়েছে  চার -পাঁচ বছর হবে । জ্বরের ঘোরে  মায়ের হাতের স্নেহস্পর্শটুকু পাওয়ার জন্য অস্ফুটে  ' মা '  'মা' করে চলে। সন্তানের এই ডাক স্বর্গলোকে ওর মায়ের  কাছে পৌঁছবে কিনা কে জানে, যদি  পৌঁছায় তবে সে মরেও শান্তি পাবে না। ওর খুব শীত শীত  করতে লাগলো। হাত বাড়িয়ে চাদর কিংবা কম্বল ঠাহর করার চেষ্টা করলো। সকালে কম্বল, বিছানা সব ভিজে ডাঁই । বেলায় খড় বোঝাই গরুর গাড়ি থেকে দু আঁটি খড় টেনে নিয়ে ছিলো,সেই বিচালি পেতে তাকে শুতে হয়েছে। বিচালির বিছানায় শুয়ে  এপাশ  ওপাশ করে চলে আর নিজের ওপর রাগ হয় তার। ও এক বালাই , সকলের গলগ্রহ। ওর মতো ছেলের বেঁচে থাকার কোন অর্থ হয় না। যে দিকে চোখ যায়, চলে যেতে  ইচ্ছে করে। ওর বাবার ওপরে প্রচণ্ড রাগ হয় আবার তেমনি কষ্ট‌ও হয়। আহা বাপটা খাটতে পারে না। সংসারে  বড় অভাব।  বোনটা না জানি কত বড় হয়েছে। ওর জন্য নিতাইয়ের  কষ্ট হয়। ও কাজ করে বলে সংসারে কিছু সাহায্য করতে পারে। ন‌ইলে বোনটা বুঝি  খেতে পাবে না,  লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে। ও বাড়ি যেতে পারে না বোন, বাবা কেমন আছে কে জানে?  তাই সে ভাবে — যত কষ্টই  হোক সে এই হোটেলেই  কাজ করবে। সে জ্বরের ঘোরে এ সব ভাবতে থাকে। মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা অনুভব করে ও । জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে । সে খানিকটা বিচালি  টেনে নিয়ে শীত থেকে বাঁচার চেষ্টা করে । উঠে বসার ক্ষমতা নেই। মালিক এসময় নাক ডেকে সুখনিদ্রা যাপন করে চলেছে । ঘরে ডাকাত পড়লে কিংবা আগুন লাগলেও ঘুম ভাঙার কোন লক্ষণ নেই।

আগের দিন সকালে হারু তাকে বলেছিলো — " তোর জন্য একটা ভালো কাজের ব্যবস্থা করেছি। তুই তোর জামা প্যান্ট একটা প্যাকেটে পুরে নিয়ে সবার ঘুম ভাঙার আগেই বেরিয়ে এসে বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকবি । তোকে নিয়ে আমি তোর নতুন মালিকের কাছে যাবো।"
— কতো দূর হারু কাকা ? মালিক ভালো তো ?
— একটু দূর আছে। বাসে করে যেতে হয়। মালিক খুব ভালো। তোর কোন কষ্ট থাকবে না।

নিতাই সারারাত  জ্বর ভোগ করে ভোরের প্রতীক্ষা করতে থাকে। ভোরের দিকে জ্বরটা একটু কমে  আসে , ঘাম দিতে  থাকে। আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে  অতি  কষ্টে  সে  একটা প্যাকেটে তার দু-একটা জামা প্যান্ট ঢুকিয়ে নিয়ে টলতে টলতে দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ে। আর দেরি করা চলে না। এরপর মালিকের ঘুম ভেঙে যাবে, অন্য লোকেরাও জেগে পড়বে। সবার অলক্ষ্যে চলে  যেতে হবে। তাই অতিকষ্টে সে বাসস্টপের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলে। কিছুদূর যাওয়ার পর সে হারুকে দেখতে পায়। হারু দূর থেকে ইশারা করে ওকে বাস এলে উঠে পড়তে বলে। বাসে উঠে হারু হঠাৎই নিতাইয়ের গায়ে হাত দিয়ে বুঝতে পারে নিতাইয়ের গায়ে  জ্বর।
— তোর গায়ে তো জ্বর আছে দেখছি। মুখটাও শুকনো শুকনো লাগছে। এই তো গোলমাল বাঁধালি।
সৌভাগ্যবশতঃ ভোরের বাস  ফাঁকাই  ছিল। পিছনের  সীটগুলো  খালি  ছিল। হারু নিতাইকে  সীটে শুয়ে পড়তে  বলে  নিজে একটা জায়গায় বসে পড়ে।  নিতাই গুটিসুটি মেরে একটা জায়গায় শুয়ে পড়ে। একরাতের জ্বরে, অর্ধাহারে নিতাই যেন শুকিয়ে গেছে। ওকে দেখে খুব দুর্বল মনে  হচ্ছে। পথে দু-একটা করে যাত্রী উঠতে লাগলো। খালি সীটগুলো আস্তে আস্তে ভর্তি  হয়ে গেল। দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা নিতাইকে সীটে শুয়ে থাকতে দেখে কেউ কেউ বলতে লাগলো, "কি রে খোকা শরীর খারাপ?" নিতাই কোন কথা বলতে পারে না, শুধু মাথা নাড়লো। " তোর সঙ্গে কেউ নেই ?" নিতাই আঙুল দিয়ে হারুর দিকে দেখায়। হারু নিতাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে। নিতাইয়ের  যে খুব শরীর খারাপ দেখে বোঝাই যাচ্ছে। এমতবস্থায় কি করে মেহেতাবের হাতে তুলে দেবে নিতাইকে। নিতাইয়ের মিষ্টি করে ' কাকু'  ডাক তার কানে বাজে। কদিনে নিতাই যেন হারুকে সত্যিকারের নিজের  কাকা বলে ভাবতে থাকে। আহা বেচারীর কেউ নেই। পেটের দায়ে বাবাটা তাকে খাটতে পাঠিয়ে দিয়েছে  এক চশমখোর কসাইয়ের কাছে। দোকানদার লোকটা মোটেই সুবিধের নয়। নিতাইয়ের প্রতি তার দুর্ব্যবহার তার চোখ এড়ায়নি। নিতাইয়ের অবস্থা দেখে হারুর মনটা আস্তে আস্তে ঘুরে যেতে থাকে —যা করুণাঘন , আবেগাপ্লুত। মা নেই যার  আর বাবা  থেকেও  নেই, আমাকে কাকা বলে ও ডেকেছে, আমাকে নিজের বলে ভাবে। ওর ক্ষতি কি আমি করতে পারি ? না  না  আমি  মেহেতাবের  হাতে ওকে তুলে দিতে পারবো না। অনেক ছেলেমেয়েকে আমি মেহেতাবের হাতে তুলে দিয়েছি তাদের যে কি গতি হয়েছে কে জানে?  মেহেতাব এক হাতে টাকা  দেয় অন্যহাতে এদের নেয, মাল কেনাবেচার মতো। মেহেতাব কোথায় থাকে  কেউ জানে না। বিভিন্ন মেকআপে  বিভিন্ন জায়গায় এই লেনদেনের কারবার  করে যাতে কেউ হদিশ করতে  না  পারে।  একবার কার কাছ থেকে যেন  জানতে পেরেছিল মেহেতাব ঐ সমস্ত  ছেলেদের মোটা টাকার বিনিময়ে কোন সংস্থার কাছে বিক্রি করে দেয়। তারপর  ওই ছেলেদের ভবিষ্যৎ কি হয় তা সে জানে না। যদিও তার সেসব জানার দরকার নেই । চুক্তি মতো টাকা পেলেই হলো। নিতাইকেও মেহেতাবের কাছে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রির চুক্তিতে  সে  নিয়ে যাচ্ছে। নিতাইয়ের পরিণতি ভয়ঙ্কর কিছু একটা হবে হয়তো। ক্রীতদাস‌ও হয়ে কোথাও  চালান হয়ে যেতে পারে। হলে ক্ষতি কিছু নেই। কারণ নিতাইকে এমনিতেই একটু একটু করে দগ্ধে মরতে হবে। তার পাঁচ হাজার টাকা উপায় হলে কিছু দিনের মতো রোজগারের চিন্তা করতে হবে না । তা ছাড়া রোজ তো শিকার মেলে না। এ শিকার হাত থেকে বেরিয়ে গেলে হাতে কামড়াতে  হবে। অনেকদিন শিকার না পেলে মেহেতাব তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করে। তার দিকটাও ওর দেখা উচিত। এভাবেই তো চলছে জগৎ সংসার। একজনকে মেরে আর  একজন বেঁচে আছে। যেমন নদীর এক কূল ভেঙে আর এক কূল গড়ে ওঠে। পৃথিবীতে কে কার কথা ভাবে? বাপ‌ই তার ছেলের কথা ভাবলো না। সে তো পরের লোক।
কিন্তু আজ নিতাইকে দেখে তার মনটা দুলে উঠলো। নিতাই যেন তার ছেলের মতো। হঠাৎই এক স্নেহের বন্ধনে বাঁধা পড়ে গেলো। মনে মনে সে গর্জে উঠলো নিতাইয়ের বাবার ওপর আর ঐ হোটেল মালিকের ওপর। সে মনে মনে ঠিক করলো — না সে কোনভাবেই এই অসুস্থ নিতাইকে মেহেতাবের হাতে তুলে দেবে না। কিন্তু কোথায় নিয়ে যাবে সে এই অসুস্থ ছেলেটিকে। দোকানে ফেরার‌ও পথ নেই। এতক্ষণে বোধহয় নিতাই নেই দেখে হৈ চৈ পড়ে গিয়ে থাকবে। এর ওপর দোকানে ফিরিয়ে নিয়ে  গেলে ছেলে ফুঁসলিয়ে নিয়ে যাবার দায়ে ফেঁসে যাবে সে। আবার বাড়িতে নিয়ে গেলে ওর বাবা -মা ওর ওপর অত্যাচার করবে। না সে তা পারবে না। নিতাই তার হারু কাকার  কাছে বাঁচাতে চেয়েছে — মরতে নয়। তার বাবা আর ওই নিষ্ঠুর দোকানদারকে শাস্তি না  দিলে হবে না। হঠাৎ তার শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে যে আইন তৈরি হয়েছে সেকথা মনে পড়লো। এদের ঐ আইনেই বেঁধে শাস্তি দিতে হবে।

এই স্বগতোক্তির মধ্যে দিয়ে তার বিবেকের দ্বন্দ্ব- সংঘাত প্রকট হয়ে ওঠে। হীন কর্মের সঙ্গে যুক্ত  থাকা  ঘৃণ্য এক মানুষের মধ্যে থেকে এক  প্রকৃত মনুষ্যত্বের প্রকাশ ঘটে। যদিও হারু জীবন ধারণের জন্য যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছে ভার থেকে বেরিয়ে আসা খুব‌ই  মুশকিল। তবে মনুষ্যত্বের এই একটি কর্ম তাকে অনেকটাই  সাহায্য  করবে এর থেকে বেরিয়ে আসতে যতদিন বিবেক জাগ্রত থাকবে। সে বুঝতে পারে মন্দ কাজ করার মধ্যে ক্ষণিকের  আত্মতৃপ্তি  আছে আবার ঝুঁকিও আছে। তার  চেয়ে ঢের বেশি আত্মতৃপ্তি আছে ভালো  কাজ করার মধ্যে। না করলে সেটা বোঝা যায় না।

সে  সঙ্গে সঙ্গে নিতাইকে ধরে বাস থেকে নামিয়ে স্থানীয়  থানার মধ্যে ঢুকে পড়লো। থানার মধ্যে ঢুকতে দেখে নিতাই হারুকে জিঞ্জাসা করে, " কাকু, তুমি আমায় থানায় নিয়ে এলে কেন? "
—তোকে অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচানোর  জন্য। আমি তোকে  যেখানে নিয়ে যাবো বলেছিলাম, সেখানেও  অত্যাচার আছে। সব জায়গায় অত্যাচার আছে। কোন জায়গায় নিরাপত্তা  নেই। তাই তো  তোকে এখানে নিয়ে এলাম।
থানায়  পুলিশকে দোকানদার  ও নিতাইয়ের বাবার  অত্যাচার ও  শোষনের  আদ্যপান্ত  ঘটনা  জানিয়ে  তাদের  নামে অভিযোগ দায়ের করে হারু নিতাইকে  তার নিজের জায়গায় ফিরিয়ে দেবার চেষ্টা করে। থানার বড়বাবু  নিতাইকে দেখে  আর সব কথা শুনে  ঐ  চায়ের  দোকানের  মালিক  ও  নিতাইয়ের  বাবাকে  গ্রেপ্তার  করার জন্য  র‌ওনা  দিলেন।

শিশু শ্রম  ও তার  ওপর অত্যাচারের  দায়ে বিচারে দোকানদারের  জেল  ও নিতাইকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়া  ও শিশু  শ্রম থেকে  অব্যাহতি  দেওয়ার  শর্তে  মুক্তি  দেওয়া হলো  নিতাইয়ের  বাবাকে।ছেলের মুখে মদন  সব  শুনে  বললো, " আমি ভুল করেছি, স্যার। বাইরের  লোক আমার ছেলের ওপর  অকথ্য  আত্যাচার করেছে  সে আমার  জন্য। আমি আমার  ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে  যাচ্ছি,  স্যার। আর এমনটা  হবে না । "  হারু মদনকে ধন্যবাদ জানায়। বিনিময়ে মদন‌ও হারুকে ধন্যবাদ দেয় তার ছেলের প্রতি অত্যাচারের বিরুদ্ধে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। যেটা তার নিজের করা উচিত ছিলো।
ভালো  কাজ করতে পারার আনন্দে হারুর মুখে  আত্মতৃপ্তির একটা ভাব ফুটে উঠলো। ভালো  কাজ করতে  পারার মধ্যে  যে  আনন্দ  ও নিতাইয়ের  মতো এক অসহায়  অভ্যাচারিত শিশুর মুখের হাসি হারুর কাছে আজ পাঁচ হাজার টাকার  চেয়ে ঢের বেশি দামী।
হারু  পুলিশ অফিসারকে বলে, 
"  আমি হয়তো খারাপ কাজ করি ঠিক‌ই  তবে  বিবেক বিক্রি  করিনি স্যার , আর তাই  ওকে আপনাদের  হাতে তুলে  দিয়েছি। ওর বাবা  যদি নিতে  না  চায়, তবে যদি আজ্ঞা করেন , আমি নিতাইকে নিতে  পারি । আমার কোন সন্তানাদি  নেই। আমিই ওকে মানুষ করবো স্যার কথা দিচ্ছি।" পুলিশ অফিসার বলেন, "তুই তো খারাপ কাজ করিস।তুই কি ওকে মানুষ করবি।"
উত্তরে হারু বলে, "ওর বাবা সৎভাবে শ্রম করে ওকে মানুষ করতে পারে নি। আমি যদি ওকে মানুষ করার  জন্য খারাপ কাজ করি, তা কি মহৎ কাজ নয়, স্যার?"
===============================
 
 
 
Samir Kumar Dutta
Pune, Maharashtra 


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.