শিশু কিশোর সাহিত্য উপযোগী রচনা ।। মিনি ও মাতৃভাষা ।। কাবেরী মিত্র


 

মিনি ও মাতৃভাষা 

কাবেরী মিত্র   


মিনি আজ কদিন ধরেই একদম চুপচাপ। কারও সঙ্গে কথা বলে না, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেও ঠিকমতো উত্তর দেয় না। স্কুল থেকেও মিনির বাবা-মাকে ডেকে বলা হলো, এমন হাসিখুশি মিষ্টি মেয়েটার হঠাৎ কী হলো! পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে গেছে, ক্লাস টেস্টেও খুব খারাপ ফল করেছে।
মিনিকে নিয়ে যখন এসব কথা হচ্ছিল, মিনি নির্বিকার মুখে বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল।
বাড়ি ফিরে মিনির মা মৃত্তিকা রাগে মিনিকে মারতে যায়, কিন্তু মিনির বাবা দীপ্তময় তাকে থামিয়ে দেয়। বলে,
— ওভাবে বাচ্চাকে মেরে কিছু শেখানো যায় না। আগে জানতে হবে ওর কী হয়েছে।
মৃত্তিকা বিরক্ত হয়ে বলে,
— তুমি শুধু মেয়ের দোষ ঢাকো। শাসন করতে জানো না বলেই ও দিনদিন অবাধ্য হচ্ছে।
দীপ্ত কিছু না বলে মিনিকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
— আমার লক্ষ্মী মেয়ে, যা হয়েছে বাবাকে বলবে তো? এখন যাও, জামা বদলে খেয়ে বিশ্রাম নাও।
সেদিন সন্ধ্যায় মৃত্তিকা মিনিকে ইংরেজি কবিতা শেখাতে বসে। সামনে স্কুলে অনুষ্ঠান, সবাইকে কিছু না কিছু বলতে হবে। কিন্তু মিনি কিছুই মন দিয়ে করছে না। মোবাইলে ভিডিও গেম খেলেই যাচ্ছে।
রেগে গিয়ে মৃত্তিকা মিনির গালে একটা চড় মারে। মিনি কেঁদে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
রাতে মৃত্তিকা ভয় পেয়ে দীপ্তকে বলে,
— মিনিকে কি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে হবে?
দীপ্ত রেগে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়।
রাতে মিনির পাশে শুয়ে দীপ্ত আদর করে জিজ্ঞেস করে,
— আমার ছোট্ট মা টার কী হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে? স্কুলে বকেছে? না বাবার ওপর রাগ হয়েছে?
বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে মিনি আস্তে করে বলে,
— বাবা... ঠাম্মি... দাদাই...
দীপ্ত স্তব্ধ হয়ে যায়। বুঝতে পারে, মিনি তার ঠাম্মি-দাদাইকে খুব মিস করছে।
পরের দিন মিনি স্কুলে যায়। দীপ্ত আর মৃত্তিকাও অফিসে যায়। স্কুল থেকে ফিরে মিনি কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ে। কাজের মাসি শুধু একটু দুধ খাওয়াতে পারে।
অফিস থেকে ফিরে মৃত্তিকা মিনির গায়ে হাত দিতেই আঁতকে ওঠে। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে সে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়।
রাত নটা বেজে গেল, এখনও দীপ্ত ফিরল না। এমন সময় কলিং বেল বেজে ওঠে। দরজা খুলে মৃত্তিকা অবাক হয়ে যায়।
দরজার সামনে দীপ্ত একা নয়, সঙ্গে তার মা-বাবাও দাঁড়িয়ে।
মৃত্তিকা মুহূর্তের অবাকভাব সামলে শ্বশুর-শাশুড়িকে ভেতরে ডেকে নেয়, প্রণাম করে, কুশল জিজ্ঞেস করে— এমনভাবে যেন সবই আগে থেকে জানত।
আসলে সে চায়নি যে তার শ্বশুর শাশুড়ি মা জানুক  এই বাড়িতে তার গুরুত্ব নেই।
দীপ্ত যে তাকে কিছুই জানায় নি তাঁদের আসার ব্যাপারে।
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে মৃত্তিকা দীপ্তকে জিজ্ঞেস করল,
— এটা কী হলো? তুমি যে বাবা-মাকে আনবে, আমাকে জানাওনি কেন?
দীপ্ত বলল,
— বাবা-মাকে নিজের ঘরে আনতে কি তোমার পারমিশন নিতে হবে?
মৃত্তিকা বলল,
— এটা আমারও বাড়ি, একা তোমার নয়। আমাকে জানানো উচিত ছিল।
দীপ্ত রেগে উঠল।
— জানাইনি, কারণ তোমার আধুনিকতা আর মেকি আভিজাত্যের জন্য সেবার বাবা-মা নিজেদের এই বাড়িতে ব্রাত্য মনে করে চলে গিয়েছিলেন।
মৃত্তিকা কষ্ট পেয়ে বলল,
— আমি কি তাঁদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলাম?
— না, কিন্তু তোমার হাবভাব, মিনিকে বাংলায় কিছু শেখালে নাক সিটকানো— এসবই যথেষ্ট ছিল।
মৃত্তিকা অভিমানে বলল,
— তার মানে আমাকেই দোষ দিচ্ছ?
দীপ্ত ক্লান্ত গলায় বলল,
— ওহ মাটি, প্লিজ... অনেক রাত হয়েছে। খুব ঘুম পাচ্ছে। বাকি কথা কাল বলো।
এত বছর পর দীপ্তর মুখে আবার সেই “মাটি” নামটা শুনে মৃত্তিকা যেন ফিরে গেল কলেজ জীবনে।
যেখানে ভালোবেসে দীপ্ত শুধু তাকেই এই নামে ডাকত।
আজ এত বছর পর সেই নামের টানেই মৃত্তিকার সব রাগ গলে জল হয়ে গেল।

**********--***-**
পরের দিন খুব সকাল সকাল মৃত্তিকা উঠে পড়ে। আজ মিনির স্কুলে অনুষ্ঠান। তাই তাড়াতাড়ি সবার জন্য ব্রেকফাস্ট বানিয়ে মিনিকে আর একবার ভালো করে কবিতাটা মুখস্থ করাতে হবে। কাল তো জ্বরের জন্য কিছুই করানো যায়নি।
কিন্তু উঠে মৃত্তিকা অবাক হয়ে দেখে, যে মিনিকে রোজ স্কুলে যাওয়ার জন্য ঠেলে তুলতে হতো, সে আজ ভোরেই উঠে দাদাইয়ের সঙ্গে বসে প্রাণায়াম করছে।
মৃত্তিকাকে দেখে তার শ্বশুরমশাই হেসে বলেন,
— দেখো বউমা, কাল দিদিভাইকে বলেছিলাম, তোমার তো আজ স্কুলে অনুষ্ঠান। ভালো পারফরম্যান্স করতে হলে সকালে উঠে একটু প্রাণায়াম করো। তাহলে মন আর মাথা দুটোই ঠিক থাকবে। তাই আজ উঠেই করতে শুরু করেছে।
সব দেখে মৃত্তিকার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
এরপর মিনি তৈরি হয়ে স্কুলবাসে উঠে যায়। যাওয়ার সময় বাবার কানে কানে কী যেন বলে যায়।
মিনি চলে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পরে দীপ্ত, মৃত্তিকা আর দীপ্তর বাবা-মা সবাই একসঙ্গে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠান শুরু হয়। একে একে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা নাচ, গান, আবৃত্তি করে সবাইকে মুগ্ধ করে।
প্রায় পাঁচজনের পর মিনির নাম ঘোষণা হয়। মঞ্চে উঠে সামনে বাবা-মা, দাদাই আর ঠাম্মিকে দেখে সে খুব খুশি হয়ে যায়।
তারপর চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়। এটা তার দাদাই শিখিয়েছে। বলেছেন, বড় কোনো কাজ করার আগে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিতে হয়, তাহলে মন স্থির থাকে।
মিনি তাই করল।
তারপর দু’হাত জোড় করে পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠল—
“নমস্কার। আমার এই বিদ্যালয়ের যত শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন, তাঁদের প্রণাম জানাই। প্রণাম জানাই আমার বাবা-মা, দাদাই আর ঠাম্মিকে।
আজ এখানে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে। সবাই খুব ভালো করেছে। আমিও কিছু বলব, তারপর একটা কবিতা বলব।
তোমরা ভাবছ, আমি কেন বাংলা বলছি? এই স্কুলে তো ইংলিশ বলতে হয়। আমি ইংলিশও বলব, কিন্তু তার আগে আমার দাদাই যে কথাগুলো বলে, সেগুলোই বলছি।
দাদাই বলে, তুমি যদি তোমার মাতৃভাষাকেই না জানো, তবে অন্য ভাষাকে ভালোবাসবে কী করে? শুধু কথা বলতে আর লিখতে পারলেই তো হয় না। একটা ভাষাকে জানতে হলে তাকে ভালোবেসে তার গভীরে যেতে হয়। আর তার জন্য সবার আগে দরকার নিজের মাতৃভাষাকে ভালোবাসতে শেখা।
আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্যাসাগর মহাশয়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়— কত সুন্দর গল্প, কবিতা লিখে গেছেন, সবই তো মাতৃভাষায়। তাই বলে কি তাঁদের মূল্য কমে গেছে?
সব ভাষাকেই সমান মর্যাদা দিতে হয়, তবেই হবে আসল শিক্ষা। আর মানুষকে সম্মান দিতে হয়, তবেই তুমি প্রকৃত মানুষ হবে।”
হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
মিনি আবার বলে,
“আমি এতক্ষণ সব বাংলায় বললাম। এবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কবিতা ইংলিশে বলব। আমার ঠাম্মি কাল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে এটা শিখিয়ে দিয়েছে।”
এই বলে মিনি শুদ্ধ উচ্চারণে একটি ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করে।
শেষ হতেই দু’হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়।
ঠিক তখনই স্কুলের প্রিন্সিপাল নিজে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে মিনিকে কোলে তুলে নেন। তারপর বলেন,
— মিনিকে এত সুন্দর শিক্ষা দেওয়ার জন্য আজ এই মঞ্চে আমি মিনির দাদাই আর ঠাম্মিকে ডেকে নিচ্ছি।
মিনি নেমে ছুটে গিয়ে দাদাই আর ঠাম্মির হাত ধরে মঞ্চে নিয়ে আসে।
সারা হলঘর হাততালিতে ভরে ওঠে।
দীপ্ত আর মৃত্তিকা তখন গর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে— মিনির জন্য, আর এমন বাবা-মা ও শ্বশুর-শাশুড়ি পাওয়ার জন্য।
মৃত্তিকা মনে মনে ভাবে—
সত্যিই দীপ্ত ঠিকই বলেছিল... এতদিন আমি ভুলই করেছি। আগে মাতৃভাষা, তারপর অন্য ভাষা।
========================

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.