চিঠি
উৎপল সরকার
আলিপুরদুয়ার শহরের পুরোনো পোস্ট অফিসের সামনে একটি লাল বেঞ্চ। রঙটা অনেক আগেই ফিকে হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও লোহার গা বেরিয়ে পড়েছে। তবুও বেঞ্চটার এক অদ্ভুত টান আছে। বিকেল নামলেই সেখানে এসে বসে অন্বেষা। চারপাশে ধীরে ধীরে আলো বদলায়—দুপুরের তেজ কমে এসে একরকম নরম সোনালি ছায়া পড়ে পুরোনো ভবনের দেয়ালে।
অন্বেষার হাতে থাকে একটি নীল খাম। সাধারণ, তবুও তার কাছে খুব অসাধারণ। খামটির ভেতরে একটি চিঠি—তিন বছর আগে লেখা। সে লিখেছিল এক নিঃশ্বাসে, কিন্তু পোস্ট করার সাহস পায়নি। যার জন্য লেখা, সে তখন অন্য শহরে নতুন জীবন শুরু করছিল। নতুন কাজ, নতুন মানুষ, নতুন ব্যস্ততা—সেই ভিড়ে অন্বেষার জন্য কোনো জায়গা আছে কি না, সে কখনও জানতে চায়নি, বা হয়তো জানতে ভয় পেয়েছিল।
প্রতিদিনের মতো সে আজও বেঞ্চে বসে। ব্যাগ খুলে খামটা বের করে, আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে তার কিনারা ছুঁয়ে দেখে। যেন কাগজটার ভেতরে জমে আছে তার পুরোনো সময়।
এই সময় পাশের চায়ের দোকান থেকে রমেশ ডাক দেয়, — “দিদি, আজও সেই চিঠিটা?”
অন্বেষা হালকা হেসে বলে, — “হ্যাঁ রমেশদা, আজও।”
রমেশ কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলে, — “কতদিন দেখছি আপনাকে। পাঠিয়ে দিন না। এত ভাবছেন কেন?”
— “সব কথা পাঠানো যায় না,” অন্বেষা চুপচাপ উত্তর দেয়।
— “না পাঠালে তো কেউ জানবেও না,” রমেশ একটু হেসে বলে।
অন্বেষা কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। দূরে কয়েকজন ম্যাক উইলিয়াম স্কুলের ছাত্র হেসে কথা বলতে বলতে চলে যায়। পোস্ট অফিসের ভেতরে তখনও কাজ চলছে—পুরোনো কাঠের জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, কেউ স্ট্যাম্প মারছে, কেউ খাম গুছিয়ে রাখছে।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসে এক কর্মচারী। মাঝবয়সী মানুষ, চোখে চশমা, মুখে ক্লান্তি কিন্তু আচরণে এক ধরনের মমতা। তিনি কিছুক্ষণ অন্বেষার দিকে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে আসেন।
— “মাফ করবেন,” তিনি বলেন, “আপনি কি প্রতিদিন এই খামটা নিয়ে আসেন?”
অন্বেষা একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। — “হ্যাঁ… মানে… আসি। কিন্তু পাঠাই না।”
লোকটি মৃদু হেসে বেঞ্চের একপাশে দাঁড়ায়। — “আমি ভিতর থেকে আপনাকে প্রায়ই দেখি। ভাবছিলাম, হয়তো কোনো বিশেষ কারণ আছে।”
— “আছে,” অন্বেষা ধীরে বলে, “কিন্তু হয়তো খুব সাধারণও।”
— “চিঠিটা অনেক পুরোনো?”
— “তিন বছর।”
লোকটি অবাক হয়ে বলে, — “তিন বছর ধরে একটা চিঠি নিজের কাছে রাখা… এটা সহজ নয়।”
অন্বেষা হালকা হাসে, — “পাঠানোটা আরও কঠিন।”
লোকটি একটু চুপ করে থেকে বলে, — “জানেন, আমি এখানে পঁচিশ বছর কাজ করছি। হাজার হাজার চিঠি দেখেছি। কিছু চিঠি খুব জরুরি, কিছু একেবারেই নয়। কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছি—চিঠি না পাঠালে উত্তরও আসে না।”
এই কথাটা যেন অন্বেষার ভেতরে কোথাও গিয়ে লাগে। সে খামটার দিকে তাকিয়ে থাকে। কাগজের ভাঁজে যেন তার নিজের কণ্ঠস্বর আটকে আছে।
এই সময় পাশেই এক বৃদ্ধা এসে বসেন। হাতে পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ। তিনি কথোপকথন শুনে হালকা হেসে বলেন, — “এই যে মেয়ে, আমি একবার একটা চিঠি পাঠাতে দেরি করেছিলাম। পরে আর সুযোগই পাইনি।”
অন্বেষা তাকায়, — “কি হয়েছিল?”
— “যার জন্য লিখেছিলাম, সে আর ছিল না,” বৃদ্ধা শান্ত গলায় বলেন।
চারপাশটা হঠাৎ যেন আরও নিঃশব্দ হয়ে যায়।
সূর্য প্রায় ডুবে যেতে থাকে। আকাশে অদ্ভুত রঙ—কমলা, বেগুনি, আর হালকা নীলের মিশ্রণ। বাতাসে একটা অচেনা স্থিরতা।
অন্বেষা আবার খামটা বের করে। এবার সে খামটা খোলে না। শুধু শক্ত করে ধরে রাখে। মনে পড়ে যায় সেই দিনটা—বৃষ্টি পড়ছিল, সে জানালার পাশে বসে এই চিঠি লিখছিল। প্রতিটি শব্দ যেন ভেবেচিন্তে লেখা, তবুও অসম্পূর্ণ।
পোস্ট অফিসের কর্মচারী আবার বলে, — “আপনি চাইলে এখনই পাঠাতে পারেন। আজও সময় আছে।”
রমেশ দূর থেকে বলে ওঠে, — “দিদি, একবার চেষ্টা করে দেখুন।”
অন্বেষা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। পায়ে যেন একটু কাঁপুনি। সে পোস্ট অফিসের দরজার দিকে হাঁটে। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হয়, সে শুধু কয়েক কদম এগোচ্ছে না—যেনো তিন তিনটে বছর পার করছে।
ভেতরে ঢুকে সে লাল রঙের লেটারবক্সের সামনে দাঁড়ায়। হাতটা একটু কাঁপে। কয়েক সেকেন্ড থেমে থাকে। তারপর চোখ বন্ধ করে খামটা ফেলে দেয়।
টুং করে একটা শব্দ হয়।
ছোট্ট, কিন্তু গভীর।
বাইরে বেরিয়ে এসে সে একবার আকাশের দিকে তাকায়। যেন বুকের ভেতর থেকে কিছু হালকা হয়ে গেছে।
দু’সপ্তাহ কেটে যায়।
অন্বেষা প্রতিদিনের মতোই একদিন বেঞ্চে বসে আছে, কিন্তু আজ তার হাতে কোনো খাম নেই। তার বদলে একটা নতুন চিঠি—খোলা।
রমেশ দৌড়ে এসে বলে, — “দিদি! আজ তো হাসছেন দেখছি!”
অন্বেষা মৃদু হেসে বলে, — “উত্তর এসেছে।”
— “সত্যি? কি লিখেছে?”
অন্বেষা চিঠিটা খুলে পড়ে শোনায়, — “ভেবেছিলাম তুমি ভুলে গেছ। কিন্তু বুঝলাম, কিছু জিনিস সময় নেয়… তবুও হারায় না।”
পোস্ট অফিসের সেই কর্মচারীও কাছে এসে দাঁড়ান। — “দেখলেন তো? চিঠি গেলে উত্তর আসে।”
অন্বেষা মাথা নাড়ে, — “হ্যাঁ… কিন্তু সব উত্তরই যে আমরা চাই, তা নয়।”
— “তবুও উত্তর থাকা ভালো,” লোকটি বলে।
অন্বেষা চুপ করে থাকে। তার চোখে জল নেই, কিন্তু একটা অদ্ভুত শান্তি আছে।
সে বুঝতে পারে—সব গল্প মিলনের নয়। কিছু গল্প সাহসের। কিছু গল্প নিজের ভয়কে অতিক্রম করার।
লাল বেঞ্চে বসে সে আকাশের দিকে তাকায়। বিকেলের আলো আবার ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। কিন্তু আজকের আলোটা অন্যরকম।
কারণ আজ, একটা ছোট্ট খাম শুধু একটি চিঠি পাঠায়নি—একটা আটকে থাকা সময়কে মুক্ত করেছে ওই সীমাহীন আকাশের মত ।
=========================
লেখায়--- উৎপল সরকার
নিউটাউন, জেলা আলিপুরদুয়ার

