ভৌতিক কাহিনি ।। রুট নম্বর ৮১ ।। স্বপন চক্রবর্তী


Uploaded Image

 

রুট নম্বর ৮১ 

স্বপন চক্রবর্তী

বাসটা যখন জয়নগর স্টেশনের কাছ থেকে বাঁদিকে ঘুরলো তখন ঘড়িতে রাত প্রায় নটা। শীতকাল, অথচ ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে, তার সঙ্গে মাঝে মাঝেই হিমেল দমকা বাতাস। সময়টা আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন যুগেরও বেশী আগে। ১৯৮১ সাল। অতএব না বললেও বুঝতে পারা যায় যে তখন জয়নগর মজিলপুর এমন কিছু একটা জমজমাট মফস্বল শহর ছিল না, আর জয়নগর থেকে যত আগে যাওয়া যেতো, সবই একেবারেই গ্রাম। ওই রাস্তায় প্রায় ২৫ কিলোমিটার মত গেলে তবে জামতলা বাজার বা হাট।কলকাতার ধর্মতলা থেকে জয়নগর অবধি একটা বেসরকারি বাস চলতো, ৮০ নম্বর বাস। তবে সকালে, দুপুরে এবং সন্ধ্যায় ধর্মতলা থেকে আর একটি করে ৮১ নম্বর বাস জামতলা হাট অবধি চলতো। প্রায় সাড়ে তিন থেকে চারঘন্টা লাগতো বাসে ধর্মতলা থেকে জামতলা হাট পৌঁছতে। শেষ বাসটা ধর্মতলা থেকে ছাড়ত বিকেল পাঁচটায় আর জামতলা পৌঁছত রাত সাড়ে আটটা, নটা নাগাদ। 

কিন্তু সেদিন খারাপ আবহাওয়ার দরুণ বাসটা যখন জয়নগরেই পৌঁছল, তখন ঘড়িতে রাত নটা বেজে গেছে। জয়নগরে বাসে যে কজন যাত্রী ছিলেন সকলেই প্রায় নেমে গেলেন। রইলেন বসে এক বছর চল্লিশ কি তার একটু বেশী বয়সের একজন মহিলা আর তাঁর ঠিক সামনের আসনে বছর বাইশের এক তরুণ,সম্পর্কে ঐ মহিলারই ভাই ওঁদের কথোপকথন থেকেই পরে জানা গিয়েছিল। আর চালকের ঠিক পিছনের আসনে এক প্রৌঢ় গ্রাম‍্য দম্পতি বসেছিলেন যাদের বাড়ি ছিল নিমপীঠের কিছু আগে জীবনের মোড়ের থেকে সামান্য দূরে। 

অন‍্যদিন এই শেষ বাসটায় জয়নগর স্টেশন থেকে কয়েকজন যাত্রী উঠতেন নিয়মিত। কিন্তু সেদিন বাসটির জয়নগর পৌঁছতেই অনেক দেরী হয়ে গেছিল। তারপর আবহাওয়াও খারাপ, ফলতঃ আর কোন যাত্রীই জয়নগর থেকে বাসে উঠলেন না। প্রায় ফাঁকা অবস্থায় বাসটি এগিয়ে চলছিল সেই বর্ষণমুখর কনকনে ঠান্ডায় রাতের অন্ধকারের বুক চিরে কখনো ঝমঝম, কখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ‍্যে দিয়ে তার গন্তব্য জামতলা হাটের দিকে। 

বেশ কিছুটা যাবার পর চালক যেন বাসের হেডলাইটের আলোয় সামনে দুজন দাঁড়িয়ে আছে এমনটাই দেখতে পেলেন। তিনি সজোরে ব্রেক কষে বাসটাকে দাঁড় করালেন। বাসে উঠলেন লাল রঙের ধূতি আর উড়নি গায়ে দেওয়া দুজন মাঝবয়সী লোক। মুখে দাড়ি, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। চালচলনে যেন তাঁদেরকে ভয়ানক কাপালিক বলেই মনে হচ্ছিলো। তাঁদের চোখগুলিও লাল, যেন নেশাগ্রস্ত, হাবভাবও যেন কেমন অপার্থিব। কন্ডাক্টরটি তাঁদের দেখে বললে- “তোমরা আবার ! সেদিন মার খেতে খেতে বেঁচে গেছিলে। নেমে যাও তোমরা।” চালকটিও তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে একজন কাপালিক হেঁকে বললেন - নামবো বলে ত’ উঠিনি আজ ! কি হলো কন্ডাক্টর ! ঘণ্টা বাজাও, আমাদের দিকে তাকিয়ে আছ কেন?” যেমন বাজখাঁই কণ্ঠস্বর, তেমনই ভয়ানক চাহনি। কণ্ডাকটার কেমন যেন ভয় পেয়ে চালককে গাড়ি চালিয়ে যেতে ঘন্টি বাজিয়ে দিলেন। আসলে মাস দুই আগেও বাসে একবার ঐ দুজন কাপালিক বাসে উঠেছিলেন। ভাড়া দেওয়া নিয়ে তাঁদের সাথে ঐ কন্ডাক্টরের খুব বচসা হয়েছিল যা আরও জোরালো রূপ নিয়েছিল জামতলা হাটে ৮১ নম্বর বাস স্ট্যান্ডে। প্রায় মারতে মারতেই কাপালিক দুজনকে বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন   স্ট্যান্ডে উপস্থিত সকলে মিলে। 

যাই হোক, সেই যে প্রৌঢ় দম্পতি চালকের আসনের পিছনে বসেছিলেন, ঐ কাপালিকের দিকে চোখ পড়তেই তাঁরা যেন কেমন চমকে উঠলেন। গাড়ি তখন খুব জোরে চলছে। তার মধ্যেই তাঁরা উঠে কণ্ডাকটারকে বললেন যে তাঁরা নেমে যাবেন। কণ্ডাকটার শুনে বললেন, “তোমরা ত’ প্রায়ই এই শেষ বাসটাতে আসো। কিন্তু কখনো ত’ এখানে নামো না ? আরও কিছুটা দূরে নিমপীঠের আগে জীবনের মোড়ে ত’ তোমাদের বাড়ি, তোমরা যেখানে রোজ নামো । তাহলে এই দুর্যোগের মধ‍্যে , এত রাতে এখানে নামবে কেন ? প্রৌঢ় লোকটি বেশ বিরক্তির সঙ্গেই যেন বললেন - জীবন থাকলে তবে ত’ জীবনের মোড়ে যেতে পারবো, বাবা । যতই দুর্যোগ হোক না কেন, জীবন থাকতে আর এই বাসে করে জীবনের মোড় যাব না। তুই বাবা এখানে আমাদের নামিয়ে দে না !”হঠাৎ পিছনে বসে থাকা  সেই কাপালিক দুজন যেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। কণ্ডাকটার আর কি করেন, ঘণ্টি বাজিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিলেন। আর গাড়ি পুরোপুরি থামবার আগেই যেন চলন্ত গাড়ি থেকে সেই প্রৌঢ় দম্পতি দুজন লাফিয়ে নেমে গেলেন । তবে কি ঐ প্রৌঢ়ের সাথে কাপালিকদের পরিচয় ছিল ! আর তাঁদের অপার্থিব কোন ক্ষমতার সম্পর্কে তাঁরা কিছু জানতেন ! নয়তো তাঁরা কেন হঠাৎ অত ভয় পেয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন ! এর উত্তর তাঁদের কাছেই নিশ্চয়ই পাওয়া যেত, কিন্তু তাঁদেরকে পরে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। সেই রাতে বাস থেকে নামার পরে তাঁরা আর বাড়ি পৌঁছতে পারেননি, মাঝপথেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। পুলিশ অনেক তদন্ত করেও তাঁদেরকে জীবন্ত অথবা মৃত কোন অবস্থাতেই খুঁজে পায়নি। 

এদিকে দুজনকে ঐভাবে নামতে দেখে কাপালিক দুজন আবারও জোরে হেসে উঠলেন। এবার কণ্ডাকটার ভদ্রলোক আর চুপ করে থাকতে পারলেন না । বলে উঠলেন - “ তোমরা বারবার এমন করে হাসছো কেন বলতো ! পিলে একবারে চমকে উঠছে। আর তোমরা এমন ছেড়েছেড়েই বা বসেছো কেন ? তোমাদের মাঝে আরেকজন কে বসে আছে বল তো? ঠিক দেখেও যেন দেখতে পারছি না, বুঝতে পারছি না। তোমরা যখন বাসে উঠলে তখনো ঠিক এমনটাই মনে হলো যেন তোমাদের সাথে আরেকজনও কেউ বাসে উঠলো, কিন্তু কে সে !  তাকে আধো অন্ধকারে ভালভাবে ঠাহর করতে পারলাম না, অথচ ঠিক মনে হল কে যেন এগিয়ে যাচ্ছিল তোমাদের সাথে তোমাদেরই ঘাড়ে মাথা রেখে। তার মাথা নিচু করা। আর যেটুকু তাকে দেখতে পাচ্ছি তা কিন্তু বেশ ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো ! তোমরা কারা বলতো ? কি মতলব তোমাদের ? তোমরা নেমে যাও, আমার বাসভাড়া চাই না। সেদিনও বাসে উঠে তোমরা ঝামেলা করেছিলে। জামতলায় তোমাদেরকে জোর করে নামিয়ে দিতে হয়েছিল।”  বাসটা তখনো দাঁড়িয়েছিল, বাসের চালকও বললেন- “তোমরা নেমে যাও, এ বাস আর যাবে না।”  তখন একজন কাপালিক কেমন ফ‍্যাঁসফেসে গলায় বললেন- “যদি বাঁচতে চাস, তাহলে গাড়ি চালা। তোদের জন্যে খুব খারাপ সময় আসছে।” এমনভাবে কথাগুলো বললেন যে শুনে বাসের চালক আর কণ্ডাকটার যেন শিউরে উঠে গাড়ি ছেড়ে দিলেন। 

এদিকে সেই যে বছর চল্লিশের মহিলা আর তার সাথে একটি তরুণ যাঁরা বারুইপুর থেকে বাসে উঠেছিলেন, তাঁদের গন্তব্য ছিল একেবারে শেষ অবধি, অর্থাৎ জামতলার হাট। আগেই বলেছি যে মহিলাটি ছিলেন তরুণটির দিদি। ওঁদের যাবার কথা ছিল পেটকুলচাঁদে, জামতলা থেকে আরও বেশ কিছুটা দূরে কুলতলী এলাকায়, বলতে গেলে একেবারে সুন্দরবনের প্রান্তে। কিন্তু ঐ রাতে তাঁরা পেটকুলচাঁদ যাবেন কি করে ! আসলে সেদিন খারাপ আবহাওয়ার ফলে তাঁদের বাড়ি থেকে বেরোতে দেরী হয়ে গেছিল। ফলে দুপুরের বাসটা তাঁরা ধরতে পারেন নি। আর শেষ বাসটা দেরীতে আসার ফলে তাঁদের আর পেটকুলচাঁদ যাবার কোন উপায়ই ছিল না সেদিন। তাই তাঁরা ঠিক করেছিলেন সেই রাতে  জামতলায় একজন আত্মীয় বন্ধুর বাড়িতে থাকবেন। 

বাসটা চলছিল বেশ জোরে। হঠাৎই যেন সামনে কিছু একটা দেখে বাসটা সজোরে ব্রেক কষে আবার দাঁড়িয়ে গেল। যেন সামনে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল। অথচ কি অদ্ভুত, অনুভূতি হলেও চাক্ষুষ দেখা গেল না তাকে।  অথচ তারপর মনে হল কেউ যেন বাসে উঠে ঐ কাপালিকদের কাছে বসলো। কিন্তু এবারও তাকে ভালভাবে দেখা না গেলেও কাপালিক দুজন সজোরে অট্টহাসি হেসে উঠে তাঁদের পাশেই তাকে যেন বসার জায়গা করে দিলেন। তাঁদের হাসিতে সেই মহিলা পিছন দিকে তাকিয়েই যেন শিউরে উঠলেন। ওরা কারা বসে আছে ঐ কাপালিক দুজনের সাথে। ওদের ত’ কারো পা দেখা যাচ্ছে না, অথচ মুখটা যেন কেমন আবছায়া দেখা যাচ্ছে। কি বীভৎস মুখ, দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে। ওরা কারা? মনে হয় ওরা এই পৃথিবীর কোন প্রাণী নয়। কোন অজানা লোক থেকে ওরা এখানে এসেছে এই পৃথিবীর মানুষের ক্ষতি করতে। আর ঐ কাপালিক দুজন সব জানেন। তাঁরাই বুঝি এদের চালিকা শক্তি। 

বার বার সেই মহিলা পিছন দিকে তাকিয়ে ছিলেন আর তাই দেখে  হঠাৎই একজন কাপালিক চেঁচিয়ে উঠলেন- খুব সাবধান, নেমে যা এখুনি বাস থেকে, যদি বাঁচতে চাস, নয়ত আজ তোদের মৃত‍্যু অনিবার্য। বার বার আমাদের দিকে তাকিয়ে কি দেখছিস?”  এদিকে ঐ কাপালিকের চিৎকার শুনে এবার সেই তরুণটি রুখে দাঁড়ালো । মনে হল সে এবার বুঝি কাপালিক দুজনকে মেরেই বসবে। কিন্তু হঠাৎই যেন কেউ তরুণটিকে ঠেলে তার আসনে বসিয়ে দিলো। কে সে ! কারোকে ত’ দেখা গেল না এগিয়ে আসতে !  কাপালিক দুজনও ত’ তাদের আসন ছেড়ে ওঠেননি। তবে ! তবে কে তাকে ঠেলে আসনে বসিয়ে দিলে ! তরুণটি এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। এবার সেই মহিলার বুঝি প্রমাদ গোণার সময়। তিনি ভাইকে চুপ করে থাকতে বললেন বটে, কিন্তু তাঁর অন্তরাত্মা ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিলো। এদিকে সেই কাপালিকের হুঁশিয়ারির কিন্তু শেষ নেই। আর ঐ সব গণ্ডগোলের জেরে বাসটাও মাঝপথেই দাঁড়িয়ে গেছিলো। 

হঠাৎই সেই মহিলার মনে হলো কেউ যেন তাঁকে ঠেলে সীট থেকে ফেলে দেবার চেষ্টা করছে। মহিলাটি আর কোন ঝুঁকি না নিয়ে ভাইটিকে সাথে নিয়ে তড়িঘড়ি বাস থেকে নেমে গেলেন ঐ দুর্যোগের রাতে এক অজানা অচেনা জায়গায়। কণ্ডাকটারের একমাত্র হতভম্বের মত তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় রইল না। আর তারা নেমে যাবার পরেই বাসটিও হঠাৎ কেমন করে যেন চালু হয়ে দুরন্ত গতিবেগে ছুটতে শুরু করে দিলো। 

মহিলাটি যেখানে ভাইকে নিয়ে নামলেন , সেই জায়গাটি নিমপীঠ আশ্রমের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে কিছুটা দূর। সৌভাগ্যক্রমে সেখানে ছিল একটা ছোটখাটো পুলিশ ফাঁড়ি। বেশ কিছুদিন ঐ এলাকায় মাঝে মাঝেই চুরি ডাকাতি হচ্ছিল। সেই চুরি ডাকাতি রুখতেই ঐ অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির বন্দোবস্ত করেছিল এলাকার দায়িত্বে থাকা কুলতলী ও জয়নগর থানা। পুলিশ ফাঁড়িটিকে দেখে এবার বুঝি মহিলা আর তরুণটির ধড়ে প্রাণ এল। পড়ি ত’ মড়ি করে ছুটতে ছুটতে তাঁরা সেই ফাঁড়িতে ঢুকে তাঁদের অসহায় অবস্থা আর বাসের মধ‍্যে যা যা ঘটনা ঘটেছিল, সব আনুপূর্বিক বিবরণ দিয়ে গেলেন । কিন্তু ঐ ফাঁড়িতে যে পুলিশ অফিসারটি ছিলেন এবং অন‍্য যে কয়েকজন কনস্টেবল ছিলেন, তাঁরা কেউই তাঁদের কথা বিশ্বাস করলেন না। বরং হেসেই উড়িয়ে দিলেন। অবশ‍্য একজন কনস্টেবল যাঁর বাড়ি ঐ এলাকাতেই ছিল, তিনি দয়াপরাবশ হয়ে তাঁর বাড়িতে ঐ মহিলা এবং তাঁর ভাইকে রাতের মত আশ্রয় ও খাবারের বন্দোবস্ত করে দিলেন। যদিও এ ছাড়া তাঁর কোন উপায়ও ছিল না , কারণ পুলিশ অফিসারটির তাঁর ওপর সেরকমই  নির্দেশ ছিল। আর ঐ আশ্রয়টুকু পেয়ে মহিলাটি ত’ বর্তে গেলেন। যাবার সময় বারবার তিনি অফিসার সহ পুলিশ ফাঁড়ির সকলকে ধন‍্যবাদ দিলেন । 

কিন্তু পরদিন সকালে যা ঘটল তার জন্য মনে হয় কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। পরদিন সকালে প্রথমে কুলতলি থানায়, তারপর জয়নগর থানায় খবর গেল যে সেদিন রাতের ৮১ নম্বর রুটের শেষ বাসটা যার নম্বর ছিল ডব্লিউ বি টি ৪৩৭৫ ( WBT 4375 )  , সেটা জামতলা বাস ডিপোতে ঢোকেনি এবং বাসটির ড্রাইভার, কণ্ডাকটারও নিপাত্তা। খবরটি পেয়েই পুলিশ নড়েচড়ে বসল। চারিদিকে খোঁজ খোঁজ রব পড়ে গেলো। তবে কি ড্রাইভার আর কণ্ডাকটার বাসটাকে নিয়ে কোথাও পালিয়ে গেলো !  এবার সেই মহিলা এবং তার তরুণ ভাইটির ডাক পড়লো কুলতলী থানায়। তাঁরা ইতিমধ্যেই পেটকুলচাঁদে তাঁদের আত্মীয়ের বাড়ি পৌঁছে গিয়েছিলেন । আর যাবার সময় সেই পুলিশ কনস্টেবল যে তাঁদের তাঁর বাড়িতে আশ্রয় ও আহার দিয়েছিলেন ওই অভিশপ্ত রাতে, তাঁকে পেটকুলচাঁদে কোথায় থাকবেন, সব জানিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে তাঁদেরকে খুঁজে পেতে পুলিশের কোনোই অসুবিধা হয় নি। কুলতলী থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ ইন্সপেক্টরকেও তাঁরা একই কথা জানালেন, যা আগেরদিন রাতে পুলিশ ফাঁড়িতে জানিয়েছিলেন। পুলিশ বিশ্বাস করবে কি না করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। 

এমতাবস্থায় সেদিন সন্ধ্যায় পুলিশের কাছে এক ভয়ংকর খবর এল যা সকলকে চমকে দিল। নিমপীঠ থেকে জামতলা প্রায় ১৭ কিলোমিটার আর জামতলা হাট থেকে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে কুলতলি ছাড়িয়ে মাতলা আর নিমানিয়া এই দুই নদীর সংযোগস্থলের পাশে সুন্দরবন অধিভুক্ত কৈখালী গ্রাম। যেখানে ইচ্ছে হলে আর হাতে সময় থাকলে লঞ্চ বা নৌকায় চেপে চলে যাওয়া যায় সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে। সেই মাতলা আর নিমানিয়া নদী যেখানে মিশেছে তার থেকে একটু দূরে সরু চিতরী খাঁড়ির মধ‍্যে যেখানে দু পাশে গরান, গোলপাতা, হোগলা আর সুন্দরীর গা ছমছমে ঘন জঙ্গল, ঠিক সেখানেই জলের মধ‍্যে বনের পাশে একটা বাসকে ভাসতে দেখা গেছে। কয়েকজন মৎস্যজীবী মাছ ধরতে গিয়ে খাঁড়ির মধ‍্যে অত বড় বাসটাকে জলে ভাসতে দেখে অবাক হয়ে যায়। তারা নাকি দেখেছে বাসটা যেখানে ভাসছিল সেখানের জলের রঙ কেমন লাল, যেন রক্ত মিশেছে জলে। তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে এসে কুলতলী ‘বিটে’ প্রথমে খবরটা দেয়। 

এবার পড়ে গেল সাজ সাজ রব। কেবল জেলা পুলিশই নয়, কলকাতা থেকেও পুলিশের বিশেষ উদ্ধারকারী দল এসে হাজির হল। উদ্ধার করা হল বাসটিকে। ওই বাসটির ভিতর থেকে বাসের চালক এবং কন্ডাক্টারের দেহ ছাড়াও আরও দুটি শবদেহ পাওয়া গেল। ঐ দুটি দেহ কি ঐ দুই কাপালিকের ! আগের রাতে ঐ বাসের যাত্রী মহিলাটির সেরকমই মনে হয়েছিল। একদমই শুকনো যেন দেহগুলি। মনে হল কেউ যেন তাদের শরীরের সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে । কিন্তু কে ! কে তাদের এমন নির্মম ভাবে হত‍্যা করলো ! সুন্দরবনের রাজা রয়‍্যাল বেঙ্গল টাইগারই যদি তাদের হত‍্যা করতো, তাহলে তাদেরকে কি বাসের মধ‍্যে রেখে যেত ? তাদের মাংসে বাঘেদের উদরপূর্তি হত। কিন্তু তা ত’ হয়নি ! আর ঐরকম ঠান্ডার মধ্যে দেহগুলি একেবারে পচে গলে না গেলেও তাদের অমন বিকৃত চেহারা কিভাবে হলো, সেটি ভেবে সবাই অবাক হয়ে গেল। হয়তো জলের মধ্যে ছিল বলেই, শবদেহগুলির ঐরকম দশা হয়েছিল-এরকম একটা ব‍্যাখ‍্যাই করার চেষ্টা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। আর ঐ মৎস্যজীবীদের কথা অনুযায়ী বাসটি যেখানে জলের মধ‍্যে ছিল, সেখানে জলের রঙ লাল হয়ে গিয়েছিল। তবে কি তাদের রক্ত কোনভাবে জলে মিশে গিয়েছিল ! সেই রক্তের অনুসন্ধান করতে পুলিশ যা দেখেছিল তা সত‍্যিই ভয়ে শিউরে ওঠার মতো। বাসটির পেট্রোল ট‍্যাংকারের ভিতর পেট্রলের জায়গায় ছিল মানুষের টাটকা রক্ত। কিভাবে ঐ রক্ত পেট্রোল ট্যাংকের ভিতর এল, তার কোন ধারণা করা বোধহয় আজও সকলের বুদ্ধির অগম্য।

এই ঘটনার তদন্তে সেদিন এমন অনেক প্রশ্ন উঠেছিল, যা রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছিল । সারা দিন চলাচলের পর বাসটির পেট্রল ফুরিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তা সত্ত্বেও গন্তব্য থেকে অত দূরে বাসটি কী ভাবে পৌঁছল ! আর যদি পৌঁছলই বা তাহলে অমন অকূল দরিয়ায় পড়ে ভেসে গেল কি ভাবে ! আর ভাসতে ভাসতে সরু খাঁড়ির মধ্যে ঢুকে গেলই বা কি করে ! সেই সাথে কে বা কারা কেন ঐ নিরপরাধ বাস ড্রাইভার ও কণ্ডাকটারকে অমন নৃশংস ভাবে হত্যা করলো ! যদি সত্যিই কোন অশরীরী শক্তি এর পিছনে থেকে থাকে তবে ঐ কাপালিক দুজন কিভাবে তাদের রোষের শিকার হলো যেখানে সংশ্লিষ্ট মহিলা এবং তরুণের বয়ান অনুযায়ী তাঁরাই ছিলেন ঐ অশরীরী আত্মার পিছনে আসল চালিকা শক্তি ! এরকম অনেক রহস্যের কিনারাই সেদিন করা সম্ভব হয় নি এবং এমনকি সেই সব রহস্যের উত্তর আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি । 

ঐ ঘটনার পরেও কিন্তু সরকারি কর্তৃপক্ষের চাপে বাস রুটটি বন্ধ করা হয়নি, যদিও প্রথমদিকে তেমন কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু এক বছরের মধ্যে পরপর দুটি ঘটনা সকলকে হতবাক করে দিয়েছিল যার ফলস্বরূপ ঐ রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায় ।

সেদিনের মত এরকমই এক ঝড় বৃষ্টির রাতে শেষ বাসটি  যখন কিছুটা দেরীতে চলছিল, তখন জামতলার কিছুটা আগে হঠাৎ সেই বাসটিকে পাশের দিক থেকে ধাক্কা মেরে আরেকটি বাস ঝড়ের গতিতে এগিয়ে যায়।   আর শোনা যায় বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার।  কোনক্রমে সেই বাসের চালক দুর্ঘটনার কবল থেকে নিজের বাসটিকে সামাল দিয়ে যাত্রীদের প্রাণ রক্ষা করেন। কিন্তু সবার চোখের সামনেই ঐ ঝড়ের গতিতে চলা বাসটি যেন হঠাৎই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। 

পরের ঘটনাটি আরও ভয়াবহ এবং অদ্ভুতও বটে। নিমপীঠের পরে সেদিন শেষ বাসটিতেও ফের  দুজন কাপালিক ওঠে। আর তাদের উঠতে দেখেই বাসে যে দু চার জন যাত্রী ছিল তারা সকলেই নেমে যায়, এমনকি বাসের চালক এবং কন্ডাক্টরও । কিন্তু তাদের চোখের সামনেই বাসটি বেশ গতি নিয়ে চলতে শুরু করে। সকলেই তখন হতভম্ব।  এক নিঃসীম ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে সবারই তখন প্রাণান্তকর অবস্থা। পরে বাসটিকে কুলতলীর কাছে একটি খালে পরিত্যক্ত অবস্থায় ভাসতে দেখা যায়। তবে বাসটিতে এবার আর কারো মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি ।

পরপর এমন দুটি ভয়াবহ ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই আর কেউ রাতের দিকে জামতলায় বাস নিয়ে যেতে রাজি হন না। এমনকি ওই ‘রুটে’ বাস চালকে সকল অস্বীকার করেন। ফলতঃ ঐ বাসরুটটি উঠে যায়। এমনকি বেশী রাতের দিকে অন্য কোন গাড়িরও  ঐ পথে চলাচল মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে প্রায় বছর পনের বাদে আরো একটি বেসরকারি বাস কর্তৃপক্ষ ঐ রুটে বাস চালানো শুরু করে। কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে কয়েক মাস যেতে না যেতেই সেই বাসরুটটিকেও বন্ধ করে দেওয়া হয় । 


কাল বহমান। পুরাতনকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে নতুন নতুন সৃষ্টির উন্মেষ। কর্ম থেকে অবসর নেবার পর কৈখালী গিয়েছিলাম। অতীতের জয়নগর, নিমপীঠ , জামতলা, কুলতলীর সাথে বর্তমানের জায়গাগুলির  কোন মিল খুঁজে পাওয়া ভার।এখন চারিদিকে  লোকসংখ্যা অনেক বেড়েছে, বিজলী বাতির আলোয় কিছুটা জায়গায় অন্তত অন্ধকার দূর হয়ে গেছে। তবু যখন সেদিন অন্ধকার রাস্তায় কৈখালী থেকে ফিরছিলাম, তখন গাড়িতে বসে ভাবছিলাম এখন যদি সেই বাসটা আমাদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে কি হবে ? হঠাৎ যেন একটা অট্টহাসিতে কেমন চমকে উঠলাম। হিমশীতল হাওয়ার একটা স্রোত শরীরের মধ‍্যে দিয়ে বয়ে গেল। কেমন যেন কেঁপে উঠলাম। তবে কি !!!!

 ———————————————————————

বিদেশে ঘটে যাওয়া একটি সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে লেখা 

স্বপন চক্রবর্তী

মাতৃ কুটীর, শিবাণী পীঠ লেন, শিবাণী পীঠ মন্দিরের সন্নিকটে, ভট্টাচার্য্য পাড়া, ওয়ার্ড নং - ৫ , বারুইপুর, ২৪ পরগণা (দক্ষিণ), কলকাতা-৭০০১৪৪

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.