ছোটগল্প ।। বৃষ্টি ভেজা সে রাতে ।। উৎপল সরকার

 ছবিঋণ- ইন্টারনেট 

 

বৃষ্টি ভেজা  রাতে

উৎপল সরকার

 

জয়গাঁয় বর্ষা এলে রাস্তা হারিয়ে যায়। চা-বাগানের গন্ধ মিশে যায় ক্যামেলিয়া ফুলের গন্ধের সাথে। এই সময় আলো কমে। ধোঁয়াটে হয়ে যায় চারদিক। ঝড়ের আগে ঝিঁঝির ডাক শুরু হয়। তারপর হঠাৎ সব চুপ। যেন সমস্ত পৃথিবীটা নিজের শ্বাস জোর করে আটকে রেখেছে। আমি এসেছিলাম এই সব কিছুর মধ্যে লুকোতে।

আমার নাম ঋদ্ধি রায়। কলকাতায় একটা মাঝারি মাপের সংবাদমাধ্যমে কাজ করতাম। একদিন হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিয়েছি, কাউকে কিছু না বলে। বাবা-মা ভেবেছিলেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছি। বন্ধুরা ভেবেছিল প্রেমে ধাক্কা খেয়েছি। দুটোই সত্যি, কিন্তু পুরোটা নয়। আমি শুধু একটু নিজের সঙ্গে একা থাকতে চেয়েছিলাম। ও হ্যাঁ, শুধু নিশা জানে। ওকে ফোন করে কলকাতা থেকে চলে যাওয়ার খবরটা দিয়েছিলাম। ফোনের ও-পাশ থেকে “হুঁ”, “হাঁ”—নিশা আর কিছু বলেনি। হয়তো ওর কিছু যায় আসে না তাই।

জয়গাঁয় এসে উঠেছি “সুনিতা লজে”। মালিক রতন দাস, বয়স সত্তরের কাছাকাছি। ছেলেপুলে হয়নি। নেপালি মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। পাঁচ বছর হল স্ত্রী মারা গেছেন। আগে অন্য নাম ছিল, এখন স্ত্রীর নামেই লজ। তিনি রাত দশটায় লজের দরজা বন্ধ করে দেন, ভোর পাঁচটায় খোলেন। তার মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে লজে। এখানকার লোকজন সবই জানেন। কেউ কিছু বলেন না।

নিচের রিসেপশন থেকে দেয়ালঘড়িটা ঢং ঢং করে বেজে উঠল। রাত এগারোটা বেজেছে জানান দিল।

আমি দোতলার ঘরে বসে একটা পুরনো গান শুনছিলাম ইউটিউবে—ভূপেন হাজারিকার।

“বিস্তীর্ণ দুপারের,

অসংখ্য মানুষের

হাহাকার শুনেও

নিঃশব্দে, নীরবে—

ও গঙ্গা তুমি,

গঙ্গা বইছো কেন?”

বাইরে সো সো বাতাস বইছে, সঙ্গে ঝড়। সারি সারি চায়ের গাছ ও সংলগ্ন ঝোপগুলো যেন কালো সমুদ্র। হঠাৎ দরজায় টোকা। প্রথমে হালকা, তারপর জোরে।

রতন কাকু তো সাধারণত দোতলায় এই সময় ওঠেন না। কোনো কিছু কাউকে দিতেও আসেন না এত রাতে।

আস্তে করে আমি দরজা খুললাম।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিশা।

সাদা সিফন শাড়িটা কয়েক ফোঁটা কাদার ছিটে আর বৃষ্টিতে মাখামাখি। চুল ভিজে কাঁধের কাছে এসে লেপটে আছে। চোখের কাজল হালকা রেখার মতো গাল বেয়ে নেমে এসেছে। হাতে একটা ছোট্ট চামড়ার খয়েরি রঙের ব্যাগ। আমি চিনি। কলকাতায় ওর সঙ্গে বহুবার দেখেছি ব্যাগটা।

নিশা শুধু বলল — আগে দরজা বন্ধ কর।

আমি বন্ধ করলাম। লাইট জ্বালালাম না। শুধু টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে—হলুদ আলো। টেবিল ল্যাম্পের আলোটা অনেকটা ডিমের অর্ধেক হলুদ কুসুমের মতো দেখাচ্ছে।

আমি বললাম — তুই এখানে? হঠাৎ কী কারণে?

হাতের ব্যাগটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে নিশা বলল — পালিয়ে এসেছি।

নিশা ব্যাগ খুলে একটা কালো পেনড্রাইভ বের করল। আমাকে দেখিয়ে বলল — এটা হারালে আমি মরে যাব। আর আমি মরলে তুইও বাঁচবি না।

কপট ন্যাকা-ন্যাকা শোনাল নিশার গলাটা।

টেবিলের সামনে রাখা চেয়ার টেনে নিশাকে বসতে দিলাম। আমি আর একটা চেয়ার টেনে ওর পাশে বসলাম।

— কী আছে ওতে?

— পোর্টালের চাকরি ছাড়ার পর বাজারিয়া ফিনান্সে ঢুকি। হরিয়ানা থেকে আমাদের কোম্পানির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে প্রচুর টাকা আসে। তার পঁচিশ শতাংশ চলে আসে উত্তরবঙ্গে। দুটো চোরাচালানকারী দলের তিনজন মাথার কাছে, হাওয়ালার মাধ্যমে। এরপর তাদের নামে যাওয়া টাকা অন্য আর এক হাত ঘুরে চলে যায় নকশালবাড়িতে। তারপর নেপালের ব্যাংকে। আমি সবগুলো প্রুফ কপি করেছি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম — কীভাবে পেলি?

নিশা চোখ নামাল — লাস্ট তিন মাস ধরে সৌনাভ, আমাদের কোম্পানির অ্যাকাউন্টসের হেড, ওর সাথেই ছিলাম। তুই জানিস না, আমি ঠিক কতটা নিচে নেমেছি।

বলতে বলতে নিশার গলা ভেঙে গেল।

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। বুকের বাঁ দিকটা একটু বোধহয় মুচড়ে উঠল। তারপর আস্তে উঠে গিয়ে জানালা খুললাম। এক দলা দমকা ঝোড়ো হাওয়া ঘরে ঢুকে ঘরটাকে ঠান্ডা করে দিল। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশটা। পেঁজা তুলোর মতো মেঘ ছুটে বেড়াচ্ছে সেখানে।

আমি তেরচা ভাবে নিশার দিকে চেয়ে বললাম — তোকে দেখে আমার একটুও অবাক লাগছে না। তুই চিরকাল, সবসময় এমনই ছিলি। যা চাস, তাই করে ফেলিস। পরে কাঁদিস।

বলতে বলতে চোখটা মনে হয় অজান্তেই ভিজে উঠল।

আমার দিকে তাকিয়ে নিশা তেতো একটা হাসি হাসল। বলল — এখন কাঁদার সময় নয়। কিছু একটা করতেই হবে। নয়তো মরার পালা।

বাইরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল দূর থেকে। চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে তীব্র শব্দে ধেয়ে আসছে। হেডলাইট নিভিয়ে।

আমি জানালা বন্ধ করলাম।

— তুই ছাড়া কতজন জানে আমি এখানে আছি? নিশার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম।

নিশা অসহায় মুখে বলল — শুধু দুজন। আমার ফ্ল্যাটমেট আর হয়তো বস। ফ্ল্যাটমেটকে বলেছিলাম তুই জয়গাঁয় আছিস। ওকে ভরসা করি। কিন্তু বস... এতক্ষণে উনি জেনে গেছেন আমি পেনড্রাইভ নিয়ে পালিয়েছি।

আমি টেবিল ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিলাম। ইউটিউবে তখনও মৃদু ভলিউমে গানগুলো চলছিল। হাত বাড়িয়ে গানটা বন্ধ করে দিলাম।

— তুই কেন এসেছিস আমার কাছে?

নিশা চেয়ার থেকে শরীরটা টেনে নিয়ে আমার গা ঘেঁষে বসল। অন্ধকারে তার শরীরের গন্ধটা পেলাম—বোধহয় বকুল ফুলের গন্ধ হবে সেটা। বহুদিন আগের সেই চেনা গন্ধ।

— কারণ তুই একমাত্র মানুষ, যে আমাকে কখনো ব্যবহার করিসনি। আমি এত লোককে ব্যবহার করেছি। কিন্তু আমি তোকে ব্যবহার করতে চাইওনি রে কখনো। তুই আমার শেষ ভরসা। আখরি রাস্তা।

কথাগুলো বলে চিরাচরিত সিগনেচার স্টাইলে গজদাঁত বের করে একটা অদ্ভুত হাসি হাসল নিশা।

বাইরে গাড়ির শব্দ কাছে এসে ধীরে ধীরে থেমে গেল। দুটো দরজা খোলার শব্দ হল।

আমি নিশার হাতটা ধরলাম।

— আয়।

দোতলা থেকে নেমে খুব ধীরে লজের পেছনের দরজা দিয়ে বেরোলাম। পিছনে একটা পুরনো গুদাম আছে—চায়ের পাতার গুদাম। এখন ব্যবহার কম হয়। এখানে আসলে চাবি আমার কাছে থাকে। রতন কাকুর থেকে নিয়ে রাখি। মাঝে মাঝে এখানে একা একা বসে মদ খাই।

ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। পুরনো চায়ের পাতার গন্ধ আর রাশি রাশি ধুলো।

— এখানে কেউ আসবে না। ডুপ্লিকেট চাবিটা রতনকাকু ছাড়া আর কেউ রাখে না।

নিশা কাঁপছিল। ঋদ্ধির হাতটা শক্ত করে ধরে বলল — আমার খুব ভয় লাগছে।

আমি নিজের হাতটা নিশার হাতের ওপর আলতো করে রেখে বললাম — ভয় পেলে বেঁচে থাকা যায় না।

আমি পকেট থেকে একটা ছোট্ট ছুরি বের করলাম। ফল কাটার ছুরি। কলকাতা থেকে সঙ্গে এনেছিলাম।

সময় মনে নেই, তবে অনেকক্ষণ দুজনে চুপ করে বসে রইলাম। আমার পাশে বসে ক্লান্ত হয়ে নিশা ওর মাথাটা আমার কাঁধে রাখল। বকুল ফুলের গন্ধটা আবারও নাকে এসে ধাক্কা দিল। সব মেয়েদের গা থেকেই কি এমন বকুল ফুলের গন্ধ পাওয়া যায়? কী জানি!

লজের সামনে দিয়ে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কেউ লজের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। তারপর গালি—বাংলা, হিন্দি মিশিয়ে।

নিশা আমার হাতটা আবারও শক্ত করে ধরল — তুই যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাস...

বলতে বলতে অনেক দিন পরে নিশার চোখ বেয়ে কান্না নেমে এল। হেরে যাওয়া মানুষের কান্না যেভাবে ঠিকরে বের হয়, সেভাবে।

বাঁ হাতটা পিঠের পেছন দিক দিয়ে নিয়ে নিশাকে জড়িয়ে নিলাম। বললাম — আমি কোথাও যাব না।

রাত দুটো।

গাড়ি চলে গেল। কিন্তু আমরা আর তখনই লজের ঘরে ফিরলাম না। গুদামে বসে রইলাম। চায়ের পাতার ওপর। মাথার ওপর টিনের ছাদে বৃষ্টি পড়ছে—টিপ-টিপ-টিপ। হয়তো শব্দগুলো সময় পার হওয়ার বার্তা দিচ্ছিল।

ভোর চারটে নাগাদ বৃষ্টি থেমে গেল।

আমি বললাম — আমরা আজই চলে যাব। জয়গাঁ থেকে সাড়ে পাঁচটার প্রথম বাস ধরে নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশন। সকাল সাতটা একান্ন মিনিটে বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। সেখান থেকে ওই ট্রেনে করে গুয়াহাটি। তারপর দেখা যাবে।

নিশা মাথা নাড়ল। বিড়বিড় করতে করতে বলল — তুই যেখানে নিয়ে যাবি, যাব।

ভোরের আলো ফুটেছে। চা-বাগানের ওপর কুয়াশার হালকা চাদর পড়েছে। হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে—বৃষ্টির পরে যেমন হয়।

রতন দাসের আজ একটু দেরি হয়েছে ঘুম ভাঙতে। ঘড়িতে এখন ছটা বেজে দশ মিনিট। হাঁটাহাঁটি করতে করতে ঋদ্ধির ঘরের সামনে গিয়ে রতন দাস চমকে উঠলেন।

ঋদ্ধির ঘরের দরজাটা ভেজানো নয়, হাঁ করে খোলা। এমন তো কোনোদিন হয় না। রতন দাস উঁকি মেরে দেখেন—ঘর ফাঁকা।

টেবিলে একটা চিঠি। সঙ্গে তিন হাজার টাকা আর গুদামের চাবিটা রাখা।

চিঠিতে লেখা —“কাকু, আমি চলে যাচ্ছি। টাকা টেবিলে রেখে গেলাম। আর কখনো ফিরব না। ধন্যবাদ।”

এর ঠিক আগে, তখন সকাল পাঁচটা বাজে।

দুজনে হাত ধরে বেরিয়ে পড়েছে—ঋদ্ধি আর নিশা। বাসস্ট্যান্ডের দিকে।

পিছনে ফেলে আসা বিস্তীর্ণ চা-বাগান বৃষ্টি ধোয়া জলে উজ্জ্বল সবুজাভ রূপ নিয়েছে। দূর থেকে হালকা সুরে সাদরি ভাষার গান শোনা যাচ্ছে। একটা সাইকেল চেপে কেউ একজন আসছে। সামনে অজানা রাস্তা। কিন্তু এবার দুজন—ঋদ্ধি ও নিশা। আর এই দুজনই যথেষ্ট।

------------------------------------ 

উৎপল সরকার
নিউটাউন, আলিপুরদুয়ার 
ফোন নং -৭০০১২৯৭৪৫৯

E


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.