জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া পয়লা বৈশাখ
প্রবীর কুমার চৌধুরী
বাঙালির জীবন থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে নববর্ষের উৎসব। সময়ের নির্দয় স্রোতে ভেসে গেছে একসময়ের প্রাণবন্ত ঐতিহ্য। আজ আর বাড়িতে লোকসমাগম হয় না, উঠোনে ভিড় জমে না, আর কোলাহলে ভরে ওঠে না বৈঠকখানা। কোথায় গেল মায়ের হাতের পাঁঠার মাংসের সেই অতুলনীয় স্বাদ? কোথায় হারিয়ে গেল আমাদের একান্নবর্তী সংসার, কাকা, জ্যাঠা, দাদুর স্নেহমাখা আশ্রয়ে গড়ে ওঠা আনন্দময় দিনগুলি?
একসময় পয়লা বৈশাখ মানেই ছিল মিলনের উৎসব। সকালবেলা ঘুম ভাঙত ঠাকুমার শঙ্খধ্বনি আর ঠাকুর ঘরের ধূপের সুগন্ধে। নতুন জামার গন্ধে মন ভরে উঠত অজানা আনন্দে। বাড়ির লাল মেঝের ঝকঝকে দালানে আসন পেতে সারি সারি করে বসতেন আত্মীয়-স্বজন। আমরা ছোটরা প্রণাম করতাম , বড়রা আশীর্বাদ করতেন - “সুখে থেকো, ভালো থেকো।” সেই আশীর্বাদের স্পর্শে নববর্ষের দিনটি হয়ে উঠত পবিত্র ও মঙ্গলময়।
সেদিন মায়ের রান্নাঘর ছিল উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। কাঁসার থালায় সাজানো থাকত লুচি, ছোলার ডাল, পোলাও, পায়েস, চাটনি, আর সেই বহুল প্রতীক্ষিত পাঁঠার মাংস। দুপুর গড়াতেই ঘর ভরে উঠত হাসি, গল্প আর আনন্দের কলতানে। মিষ্টির প্লেটে মা, কাকিমার হাতে, হাতে ঘুরে বেড়াত - রসগোল্লা, সন্দেশ, লাড্ডু। সেদিন নববর্ষ তো শুধু উৎসব ছিলো না , ছিল সম্পর্কের পুনর্মিলনের এক পবিত্র উপলক্ষ।
আজ সেই মানুষগুলো আর নেই। ঠাকুরমা, দিদিমা, দাদু, জ্যাঠা,বড়মামা -
এক এক করে তাঁরা চলে গেছেন অনন্তের পথে। তাঁদের স্নেহ, গল্প আর আশীর্বাদ আজ শুধুই স্মৃতি। হৃদয়ের কোণে জমে থাকা সেই স্মৃতিগুলোই এখন একমাত্র সম্বল।
একাকিত্বর শূন্য মনে স্মৃতিকণায় ভেসে ওঠে আজও আমার জন্মস্থান বরাহনগর । মনে পড়ে বাঁশগোলার মাঠ, জয়নিতাইয়ের দোকান, তাঁতিপাড়া, দর্জিপাড়া, ডোমবাগান। সন্ধ্যাবেলায় মায়ের হাত ধরে পাঠবাড়ির গন্তব্য , রাসপূর্ণিমায় ঝুলনতোলা, কালি পুজোয় রঘুডাকাতের কালিবাড়ি। আজও শূন্য মনে ভেসে ওঠে কুঠিঘাটের -এর গঙ্গার ছবি। গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে কত বিকেল যে পালতোলা নৌকা দেখতে দেখতে কেটেছে, তার হিসেব নেই। ওপারে পশ্চিম প্রান্তে শান্তির প্রতীক হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে বেলুড়মঠ । পাশেই রয়েছে লাল বাবার আশ্রম -- ধ্যান ও আধ্যাত্মিকতার এক নিবিড় ঠিকানা। দক্ষিণে গঙ্গার তীরে অবস্থিত দক্ষিনেশ্বর ভবতারিণী মায়ের মন্দির, এখানেই ঠাকুর রামকৃষ্ণের লীলা ক্ষেত্র। ভবতারিণী মায়ের চিরন্তন আশ্রয়। আর উত্তরের নদীপথ ধরে পৌঁছানো যায় বাগবাজারের (সারদা ) মায়ের স্নানের ঘাটে।
এই সব পবিত্র স্থান যেন স্মৃতির মানচিত্রে অমলিন হয়ে আছে। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু গঙ্গার স্রোত এখনও সেই অতীতের গল্প শুনিয়ে যায়।
একদিন আমাদের যে সংসার ছিল একান্নবর্তী, আজ তা ভেঙে ভেঙে পরমাণুর মতো ক্ষুদ্র। কোথায় কাকার বাড়ি, কোথায় জ্যাঠার সংসার? কত দূরে সরে গেছে মামার বাড়ি! সম্পর্কগুলো এখন অদৃশ্য তারে এখন ফোনের পর্দায় সীমাবদ্ধ - একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা, “শুভ নববর্ষ।” উষ্ণতার বদলে সেখানে বিরাজ করে নিঃসঙ্গতা।
আজ আর পয়লা বৈশাখে নতুন জামার আনন্দ নেই। নেই মাঠভরা ফুটবল খেলার হৈচৈ,উল্লাস। হারিয়ে গেছে সেদিনের বৈঠকখানার জমজমাট জলসা, গান, আবৃত্তি আর প্রাণখোলা হাসি। আজ দীর্ণ, জীর্ণ, চোখলে ওঠা রকে বসে না কোন আড্ডা। সেখানে কেবল পাড়ার প্রভূত্বহীন, কালু, ভুলু,কুন্তী, ভোলারা সংসার পাতে। দোকানে দোকানে হালখাতা খোলার রেওয়াজও এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। সময়ের চাপে ঐতিহ্য যেন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। একদিন পয়লা বৈশাখে দোকানে দোকানে নতুন বছরের ক্যালেন্ডার ও মিষ্টির প্যাকেট সংগ্রহ করা আমাদের কিশোরদের উৎসবের অঙ্গ ছিলো।
নগরায়ণ, ব্যস্ততা ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ আজ একা হয়ে পড়েছে। এখন ছোট ছোট দেশলাই বাক্সের ফ্ল্যাটে বন্দি জীবন, বাতাস, আলো, প্রাণখোলা হাসিহীন নীরব জীবন। যেখানে সম্পর্কের জন্য জায়গা কম, আর আবেগের জন্য সময় আরও কম। যৌথ পরিবারের বদলে এসেছে নিউক্লিয়ার পরিবার। নিয়ম কানুন, খরচের বহর কমেছে। সুবিধা বেড়েছে, কিন্তু কমেছে আত্মীয়তার উষ্ণতা।
তবুও স্মৃতি কখনও মুছে যায় না।
আজও পয়লা বৈশাখের সকালে মন কেমন করে ওঠে। মনে পড়ে যায় ফেলে আসা সেই সোনালি দিনগুলোর কথা। এখন ফ্লাটবাড়ির খোপের এক চিলতে বারান্দায় বসে বসে সেসব দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেই যেটুকু সুখ খুঁজে নিই - সেইটুকুই আজ আমার উৎসব, সেইটুকুই আমার নববর্ষ।
গঙ্গার বাতাসে ভেসে আসে অতীতের গান। মনে হয়, যেন দূর থেকে ভেসে আসছে হাসির শব্দ, শঙ্খধ্বনি আর আশীর্বাদের সুর। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই - ভিড়ে ভরা উঠোন, আলোয় ভরা ঘর, আর সবার মুখে আনন্দের হাসি।
হারিয়ে যায়নি পয়লা বৈশাখ! সে বেঁচে আছে আমাদের স্মৃতিতে, সংস্কৃতিতে, আর হৃদয়ের গভীরে। যতদিন বাঙালি তার শিকড়কে স্মরণ করবে, ততদিন নববর্ষের ঐতিহ্য কখনও বিলীন হবে না।
হয়তো আবার কোনো একদিন- বাড়ির দরজা খুলে যাবে, আত্মীয়-স্বজন ফিরে আসবে,উঠোন ভরে উঠবে হাসি-আনন্দে, আর মায়ের হাতের রান্নার গন্ধে ভরে উঠবে ঘর। হয়তো কন্যা, পুত্রবধূর হাত ঘুরে...। সেই প্রত্যাশা নিয়েই আজও অপেক্ষায়, আমরা বলি - “শুভ নববর্ষ।”
====================
মহামায়াপুর স্কুল রোড
গড়িয়া,কলকাতা -৮৪

