ভুতের গল্প ।। আধি ভৌতিক রহস্য।। দীপক পাল

 ছবিঋণ- ইন্টারনেট 

 

 আধি ভৌতিক রহস্য

  দীপক পাল 



  

আমি থাকতাম কলকাতা শহরের মধ্যেস্থলে চার রাস্তার মোড়ে নিকটে খুব বড় দেববাবুর বাজার  তার আশেপাশে অগুন্তি দোকানপাট ডাক্তারখানা আরও কত কি  

যে আছে তার কোন ঠিক নেই জন্ম থেকে যৌবনের অনেকটা সময় আমার এখানেই কেটেছে কলকাতায় হয়তো ভুতেরা থাকতো না তারা তখনকলকাতা থেকে পাত্তারি  গুটিয়ে সব গ্রামে চলে গেছে তাই আমি কলকাতায় তাদের উপস্থিতি টের না 

পেলেও গ্রামে গিয়ে সেটা  ঠিক পেয়েছি তাহলে ঘটনাটা বলি

 

          স্বপনদা আর তার দাদা বিজনদারা আমাদের পাশেই থাকত তখন আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল তাদের বাবা রহড়াতে এক বিঘা জমি কিনেছিলেন দুটি আম গাছ  দুটি কলা গাছ সমেত স্টেশন থেকে অনেকটা দূরে সাঁতরাগাছি ঝিল ছাড়িয়ে আগে থেকেই  বাগানে একটা কুঁড়ে ঘর ছিল সেটা অনেকটা বাড়িয়ে  বেশ পোক্ত করে বানিয়ে নিলোতখন ফাইনাল পরীক্ষা হতো নভেম্বরের শেষ থেকে প্রায় ডিসেম্বরের প্রথম পর্য্যন্ত আর পরীক্ষার পর থেকেইআমি আর সেজদা আর পাড়ার কয়েকজন মিলে লাইব্রেরী থেকে গল্পের বই  

 এনে পাল্টাপাল্টি করে জমিয়ে পড়তাম  আমাদের পাশের বাড়ির স্বপনদা  বিজনদারা ফাইনাল পরীক্ষার পরে হঠাৎ করে সবাই মিলে রহড়াতে এক মাসের জন্য ছুটি কাটাতে চলে গেল তাদের বাবা এক  ইংরেজ কোম্পানীতে চাকরীকরতো তাকেও দেখতে কিছুটা ইংরেজদের মতই ছিল তিনি একমাস ছুটি নিয়েছিলেন গ্রামীন পরিবেশে সবাইকে নিয়ে একসাথে থাকার রহড়া থেকে একদিন স্বপনদা কলকাতায় এসে কিছু দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে কিছুক্ষণ মা বাবার সাথে  

কথাবার্তা বলে আমাকে দু তিনদের জন্য রহড়াতে ওদের বাড়ীতে নিয়ে যাবার কথা বলতেই আমি খুব 

 খুশী হলাম মা বাবাও রাজী হয়ে গেল শিয়ালদহতে তখন ইলেক্ট্রিক ট্রেন ছিলনা তখন সব ষ্টীম ইন্জিন কু ঝিক ঝিক ট্রেন ছাড়লো কালো ধোঁয়া ছেড়ে বেশ লেগেছিল সেদিননামলাম খড়দহ ষ্টেশনে দেখি স্টেশন থেকে কিছুটা রাস্তা পীচের তারপর অনেকটা হাঁটাপথ মেঠো রাস্তা দিয়েএকেবারে গ্রাম্য পরিবেশ আমি তখন প্রাইমারী ক্লাসে পড়ি সম্ভবত ক্লাস ফোরে প্রথম গ্রামে থাকতে এসেছি তখন সন্ধ্যে হতে বিশেষ বাকি নেই স্বপনদার সাথেআশপাশটা একটু ঘুরে নিয়ে যখন স্বপনদাদের বাড়ীতে ঢুকলাম তখন আলো কমে গেছে বগানটা এক চক্কর দিতেই সন্ধ্যা নেমে গেল আমাকে দেখে মাসিমামেসোমশাই খুব খুশী হলেন বিজনদা বললো, ' হাত-পা ধুয়ে আমার এখানে এসে বসো'  

বাইরে হাত পা ধুতে ধুতে দেখি বাঁশ গাছগুলোকে ঘিরে কত জোনাকি পোকা আলো জ্বালিয়ে এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে আর তার সাথে ঝিঁঝি পোকাদের কলতান মিলেমিশে এই শীতের পরিবেশকে বেশ আরও গ্রাম্যতা দিয়েছে পূব দিক থেকে চাঁদ উঠছে ভেতর থেকে মাসিমা ডাকাতে ফিরে গেলাম হ্যারিকেন আলোয় আলো আর আঁধারিতে  চা খেতে খেতে গল্প বেশ জমিয়ে হলো  আলো আঁধারিতে রাতের খাওয়াও হয়ে গেল তাড়াতাড়ি এখানে সবাই তাড়াতাড়িশুয়ে পরে ভোর হতেই সবাই উঠে পরে মেশোমশাইয়ের ইচ্ছায় একটা ছোট্ট ঘরে আমাকে তার পাশে শুতে হলো তিনি ডালহৌসীতে এক বৃটিশ কোম্পানীতেচাকরী করতেন ছুটি  নিয়েছেন কদিন মেসোমশাই নানা গল্প করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে নাক ডাকতে লাগলেন নতুন জায়গায় আমার ঘুম আসছেনা জানালা দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো বিছানার ওপর পড়ে আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে আমি মেসোমশাইয়ের পিঠের ওপর দিয়ে মাথা তুলে বাইরেটা দেখতে গিয়ে আমার একবারে চক্ষুস্থির দেখি অদুরে সাদা কাপড় পড়া দুটি বউ মাথা নেড়ে আমায় যেন ডাকছে মনে হলো বুকটা ধক্ করেউঠলো আমি চট্ করে মেসোমশাইয়ের পিঠের আড়ালে শুয়ে পড়লাম কিছুক্ষণ পরে কৌতুহলে আবার মাথা উঁচু করে তাকালাম সেদিকে দেখি সেই দুজন একইভাবে হেলেদুলে  আমায় ডাকছে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো ওরা যেন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে আমার দিকে আমি ভয় পেয়ে দেয়ালেরদিকে মুখ করে শুয়ে পড়লাম আমার আগে তো আছে মোসোমশাই সেটুকু সান্ত্বনা কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাই নি স্বপনদার ডাকে ঘুম ভাঙলো কিরে পিন্টু ওঠ, সবাই তোর জন্য বসে আছে উঠে পর এই নে দাঁত মাজার পাউডার দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে আয় চটপট চা বিস্কুট খেতে বাঁ হাতের তালুতে পাউডার ঢেলে দাঁতমাজতে মাজতে বেরোলাম বাইরে হাঁটতে হাঁটতে গতকাল রাতে যেখানে বউ দুটোকে দেখে ভয় পেয়েছিলাম, আর সেখানে গিয়ে দেখি দুটো কলাগাছ হাওয়ায় ঠিকসেইভাবে দুলছে চাঁদের আলোয় তাহলে রাতে কলাগাছকে এইরকম দেখায় যথারীতি সেদিনও রাতের বেলায় একই অভিজ্ঞতা হলো কাউকে সেকথা বলিনি আমি 


          এরপর তিনটে দিন কাটলো বাড়ীর জন্য মন খারাপ করছে সাথে.একটা করে মাত্র এক্সট্রা জামা পায়জামা এনেছি আর একটা গল্পের বই রবার্ট লুইসষ্টীভেন্সনের লেখা ' ডঃ জেকিল এন্ড মিঃ হাইড ' এর বাংলায় অনুবাদ করা বই সেটাও শেষ হয়ে গেছে স্বপনদাকে বললাম বাড়ী যাবার কথা বলে উঠলো, ' আর দুটো দিন থাক তারপর যাবি পরেরদিন বিকালে অর্থাৎ চতুর্থ দিনে এক জায়গায় নিয়ে যাবে বলে স্বপনদা আমাকে নিয়ে বেরলো মেঠোপথ দিয়ে হাঁটছি প্রথমেএকজনের বাড়ীতে নিয়ে গেল সেখানে মুড়ির মোয়া  নাড়ু খেয়ে বিদায় জানালাম আমরা তারপর আমাকে একটা লাইব্রেরীতে নিয়ে গেল স্বপনদা বলে,' এখানে একটা এত ভাল বই পড়ছি তোকে কি বলবো প্রবোধ সান্যালের 'দেবাত্মা হিমালয় ' চল লাইব্রেরীতে যাই তুইও ছোটদের বই পড়বি '

 

ভেতরে ঢুকে দেখি তিনজন লোক বই পড়তে ব্যাস্ত আলমারীতে কত বই থাকে থাকে কাঠের পার্টিসনের ওপারে একজন ছোটখাটো বয়স্ক লোক চেয়ারে বসে ঢুলছে কাছাকাছি যেতেই ডদ্রলোক সোজা হয়ে বসলেন স্বপনদা ওনাকে ' দেবাত্মা হিমালয় ' থাকলে দিতে বললেন আর আমাকে একটা শিব্রাম চক্রবর্তীর বই  

দিতে বললেন কিছুক্ষণ পরে ভদ্রলোক তাই এনে দিলেন আমাদের পাশাপাশি গিয়ে চেয়ারে বসলাম আমরা শিব্রামের ছোট ছোট গল্পগুলো পড়তে পড়তে আমার ভারী হাসি পাচ্ছিল কতক্ষণ পরে স্বপনদা বললো,' তুই পড়তে থাক, আমি বইটা জমা দিয়ে একটু বাজারে যাব কিছু জিনিস

পত্র কিনতে কেমন?' মাথা নাড়লাম দেখি ওই তিনজন পাঠক চলে গেছে কখন স্বপনদাও বই জমা দিয়ে চলে যেতে আমি ছাড়া আর থাকলো শুধু পার্টিসনের ওপারে সেই ভদ্রলোক তিনিআবার ঝিমুচ্ছেন অদ্ভূত ভদ্রলোক আমি আবার গল্পে ফিরলাম  

কিছুপরে একটা ধূসর রঙের বড়ো আলোয়ানে গোটা আগাপাশতলা ঢেকে একজন লোক অতি ধীর  

পদক্ষেপে এসে একটা চেয়ার খুব আস্তে করে টেনেআলমারীর পাশে গিয়ে বসলো চোখ দুটো বোঝা গেলনা মাথার সামনের দিকে কিছু কাঁচাপাকা চুল যার বেশীর ভাগটাই সাদা দেখে বোঝা যায় যে ব্যাক্তিটির বয়স হয়েছে চেয়ারে সে যে বসে ঝিমুচ্ছে তা না কিন্তু সে চুপচাপ বসে আছে তাই দেখে কি আর পড়া যায় খালি বইয়ের লেখাগুলোর ওপর চোখ বুলোচ্ছি বই বন্ধ করে দিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে থাকলাম ওনার কিন্তু কোন নড়নচড়ন নেই একবার চোখ তুলে আমার দিকে তাকালো শিউরে উঠলাম আমি ঠিক কেমন যেন দৃষ্টিটা ছম ছম করে উঠলো কেমন সারা শরীর কি করা যায় যে এখন স্বপনদারতো আসার নামই নেই আমার কথা ভুলে বাড়ী চলে যায়নিত আবারপার্টিসনের আড়ালে লোকটাতো এখনও ঝিমোচ্ছে দেখছি ঠিক এই মূহুর্তে স্বপনদা ঢুকলো লাইব্রেরীতে বললো,' কিরে তোর বই পড়া হয়ে গেল? বাঃ 

সাবাস" আমি চুপ আমার হাত থেকে বইটা নিয়ে সে জমা দিল ঝিমোন লোকটাও উঠে পড়লো এবার লাইব্রেরী বন্ধ করার তোরজোর করছে আমি আঙুল তুলে রহস্যজনক লোকটাকে দেখাতে গিয়ে চমকে উঠলাম স্বপনদা বললো, ' কিরে কি হলো কিছু বলবি?' 

 

- 'না একটা লোক ওইখানে বসেছিলো, কিন্তু কেমন যেন এখন দেখছি নেই'  

 

- ' কৈ কাউকে দেখিনিতো তুই দেখলাম বই বন্ধ করে সামনের দিকে তাকিয়ে আছিস'  

 

লাইব্রেরীর ভদ্রলোকও চাবি হাতে নিয়ে বেরোতে বেরোতে বললো, 'হ্যাঁ আমিও দেখেছি আপনার জন্য এই ছেলেটি বই বন্ধ করে চুপচাপ অপেক্ষা করছিল সামনের দিকে তাকিয়ে'

 

আমরা লাইব্রেরীথেকে বেরিয়ে বাড়ীর দিকে হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফিরে তাকালাম দেখি লাইব্রেরী ভদ্রলোক দরজায় তালা দিয়ে উল্টোদিকে হাঁটছেন তারপরেই দেখি সেই রহস্যজনক লোকটা লাইব্রেরীর সিঁড়িতে বসে আছে আর আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসছে চোখদুটো রেডিয়ামের মতো জ্বলছে স্বপনদা এক কদমএগিয়োছিল আমি জোরে তাকে বলি, 'পেছন ফিরে তাকাও একবার স্বপনদা লাইব্রেরীর সিঁড়িতে' স্বপনদা পেছন ফিরে তাকিয়ে বললো,


- '
 কৈ কিছুতো নেই তোর কি হয়েছে বলতো পিন্টু? তুই দেখতে পাচ্ছিস অথচ আমি দেখতে পাচ্ছি না এরকম আবার হয় নাকি, বল?'  

 

আমি চুপচাপ হাঁটতে থাকলাম কিন্তু মনে মনে আমি খুব ভয় পেলাম মেঠো পথ ধরে স্বপনদার   

গা ঘেঁষে এগিয়ে চললাম বাঁশ গাছের ঝোপের জোনাকি আলোরছোটাছুটি দেখতে পেলাম স্বপনদার কোন কথা আমার কানে ঢুকছে না


  সেদিন রাতে খেয়েদেয়ে মেসোমশায়ের পাশে দেয়ালে মুখ করে শুলাম এর আগে সবাই কিছু জানতে চাইলেও আমি ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারিনি সবাই কেমন অবাক মেশোমশাই বলেছিলেন ওকে ওর মতো থাকতে দাও সারারাত দু'তিনবার চমকে চমকে উঠেছিলাম অবিশ্রান্ত ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কিছু শুনতে পাইনি 


   পরেরদিন সকাল দশটায় সেজদা আমায় বাড়ী নিয়ে যেতে এলো আমি সবাইকে বিদায় জানিয়ে সেজদার সাথে ফিরে চললাম আমার বাড়ী আবার সেই ষ্টিম ইন্জিনে চেপে কু ঝিক্ ঝিক্ করতে করতে নিজেদের কলকাতার ভাড়া বাড়ীতে ফেরাকি মজা একটু পরে একটা লম্বা ভোঁ আওয়াজ করে  কয়লার ধোঁয়াউদ্গিরন করতে করতে খড়দহ স্টেশন  

ছাড়লো রেলগাড়ীটা  গায়ে কয়লার গুঁড়ো জানলা দিয়ে এসে গায়ে পড়তে লাগলো



                                  ___________________________

Address: -  Dipak Kumar Paul,
                    DTC Southern Heights
                    Block-8, Flat - 1B,
                    D.H.Rd. Kol - 700104
                   Cont: 9007139853
                   --------------------------------

 

 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.