শ্রীনিকার জগন্নাথ
কাবেরী মিত্র
রথযাত্রা কী, কেমন হয়—শ্রীনিকা কিছুই জানে না। আগের দিন বাবার সঙ্গে টিভিতে খবর দেখার সময় সে বারবার দেখছিল, একটি বিশাল রথের ওপর তিনটি হাতকাটা কাঠের মূর্তি বসানো। অসংখ্য মানুষ মোটা দড়ি ধরে সেই রথ টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
—বাবা, ওরা কারা?
বাবা হেসে বললেন,
—ওটা রথ। আর রথের ওপর যাঁদের দেখছ, তাঁরা তিন ভাইবোন—বলরাম, শুভদ্রা আর জগন্নাথ। বলরাম আর জগন্নাথের খুব আদরের বোন শুভদ্রা। ওরা এখন তিন ভাইবোন মিলে মাসির বাড়ি যাচ্ছে। সেখানে সাত দিন থাকবে, মাসির আদর খাবে, ভালো ভালো খাবার খাবে। তারপর সাত দিন পর আবার নিজের বাড়ি ফিরে আসবে। সেই ফেরাকেই বলে উল্টো রথ।
শ্রীনিকার মনে আবার প্রশ্ন জাগল।
—তাহলে সবাই ওই মোটা দড়িটা টানছে কেন?
বাবা তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন,
—সবাই ভালোবেসে তাঁদের মাসির বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে।
এই কথা বলতে বলতেই অঞ্জনের মন ফিরে গেল নিজের ছোটবেলায়। সেই ছোটবেলা—দুষ্টুমি, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলো, মায়ের স্নেহ, রথের মেলা, ঝুলন, রাস—কত আনন্দে ভরা ছিল!
সে বলতে শুরু করল—
—মায়ের হাত ধরে রথের মেলায় যেতাম। পাঁপড় ভাজা, জিলিপি খেতাম। সবাই মিলে রথের দড়ি টানতাম। ফেরার পথে একটা ছোট কাঠের রথ কিনে সারাটা রাস্তা টেনে টেনে বাড়ি আনতাম। তারপর পাড়ার সব বন্ধু মিলে কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। ঘণ্টার শব্দ শুনে কাকিমারা বাইরে বেরিয়ে আসতেন। আমার ছোট্ট রথে জগন্নাথ, বলরাম আর শুভদ্রা মালা পরে বসে থাকতেন। মা পুজো করে একটি ছোট থালায় নকুলদানা দিয়ে বলতেন, "যে দেখতে আসবে, তাকে প্রসাদ দিস।" আমিও খুব আনন্দ করে সবাইকে প্রসাদ দিতাম। উল্টো রথের দিন আবার রথ নিয়ে বেরোতাম। ঝুলন পূর্ণিমায় মা নিজের হাতে সুন্দর একটি দোলনা বানিয়ে দিতেন। তাতে রাধাকৃষ্ণকে বসিয়ে দোল দিতাম।
শ্রীনিকা মুগ্ধ হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সব শুনছিল। কিন্তু কেউ খেয়ালই করেনি, শ্রীনিকার মা কখন এসে তাঁদের পাশে বসেছেন।
অঞ্জনের কথা শেষ হতেই তিনি মৃদু হেসে বললেন,
—ইস! তোমার ছোটবেলাটা কত সুন্দর ছিল! আর আমার শৈশব কেটেছে শুধু "এটা করবে না, ওটা করবে না"—এইসব নিয়মের বেড়াজালে। তোমার মুখে এসব শুনলে আমার খুব হিংসে হয়।
অঞ্জন হেসে বলল,
—আজও সেই আনন্দ পাওয়া যায়, যদি তোমরা চাও।
—কীভাবে?
—আজ বাজারে দেখলাম রথ রাখা হয়েছে। বিকেলে টানা হবে। রথ উপলক্ষে বড় মেলাও বসেছে। চলো, আজ আমরা সবাই যাই।
শ্রীনিকার মা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
—আমি যাব! কোনোদিন রথ টানিনি।
শুনে শ্রীনিকা হাততালি দিয়ে উঠল,
—ইস! কী মজা! আজ আমরা রথের মেলায় যাব!
বিকেলে তিনজনে মেলায় গেল। সবাই মিলে রথের দড়ি টানল, নাগরদোলায় চড়ল, পাঁপড় ভাজা খেল। সেদিন শুধু শ্রীনিকাই নয়, তার মাও যেন আবার ছোট্ট মেয়ে হয়ে গেলেন। কারণ, এই আনন্দ তাঁর কাছেও ছিল একেবারে নতুন।
ফেরার সময় অঞ্জন শ্রীনিকার জন্য একটি ছোট কাঠের রথ কিনে দিল। তাতে বসে আছে জগন্নাথ, বলরাম আর শুভদ্রা।
বাড়ি ফিরে শ্রীনিকা ফ্রিজ থেকে মিষ্টি বের করে তিন ভাইবোনকে খেতে দিল। তারপর থেকে ওরা যেন সত্যিই তার নিজের ভাইবোন হয়ে গেল। যত গল্প, যত অভিমান—সবই সে এসে জগন্নাথকে বলে।
শুধু শ্রীনিকাই নয়, তার মাও খুব খুশি। তিনি অঞ্জনের কাছে এসে বললেন,
—সত্যি গো, আজ আমারও খুব ভালো লেগেছে।
অঞ্জন হেসে বলল,
—তা তো দেখতেই পাচ্ছিলাম। আমার অতি আধুনিক বউটা আজ একেবারে বাচ্চা হয়ে গেছে। আজ তো মেলায় আমাকে দুটো বাচ্চাকেই সামলাতে হয়েছে।
কথা শেষ হতেই দুজনেই হেসে উঠল।
এখন কেউ বাড়িতে এলেই শ্রীনিকা সবার আগে তার তিন ভাইবোনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
কেউ যদি তাকে একটু বকেও, সে গম্ভীর মুখে বলে,
—আমাকে কেউ কিছু বলবে না। তা হলে আমি বলরাম দাদাকে বলে দেব। বাবা বলেছে, বলরাম দাদার গায়ে খুব জোর, একেবারে কুস্তিগিরের মতো। তিনি এসে তোমার নাক ফাটিয়ে দেবেন। আর জগন্নাথ দাদা যেমন শুভদ্রাকে আদর করে, আমাকেও রাতে ঘুমের সময় আদর করে যাবে।
শিশুমনের এই অকৃত্রিম বিশ্বাসে যেন স্বয়ং জগন্নাথও মুগ্ধ হয়ে থাকেন। হয়তো অলক্ষ্যে তিনি তাঁর এই ছোট্ট সখীকে আগলে রাখেন। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর
==============================
কাবেরী মিত্র
রাজারহাট, কলকাতা

