বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

ধারাবাহিক উপন্যাস ।। চাবি (পর্ব - ১) ।। সপ্তদ্বীপা অধিকারী

 প্রেম

 চাবি

সপ্তদ্বীপা অধিকারী


প্রথম পরিচ্ছেদ

 

তখন সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা পলির খুব চাপ পড়াশুনায় শেষ করেছে যদিও সিলেবাস তবুও বারবার রিভাইস দেওয়াটা ওর একটা বদ অভ্যাস অথবা ভালো অভ্যাস

সেদিন তখন পলি পড়ছিল ইতিহাস

ওর ঠামি হঠাৎ বলেন--" দিদুন, দেকোদিনি কেডা ডেকতেচে

পলি উঁকি মেরে দেখে সুবল কায়পুত্র ওর সাথেই পড়ে সেই একই "নয়ানজলি মাধ্যমিক  বিদ্যালয়" কিন্তু সকলের থেকে বয়সে সে প্রায় বছর চারেকের বড়ো তার বাবার মিষ্টির দোকানে মোটামুটি আয় হয় সবাই জানে যে, সুবলকে পাশ করতে হবে না ওতো ওই মিষ্টির দোকানেই বসবে কোনো রকমে একটু লিখতে-পড়তে পারাটুকু শিখলেই হবে এর বেশি কিছু কোনোদিন তার বাবা কার্তিক কায়পুত্রও চায়নি সে নিজেও চায়নি বারবার পরীক্ষা দেয় তবু আর ফেল করে কিছুদিন স্কুলে আসা বন্ধ করে আবার কিছুদিন হয়ত আসে ইচ্ছে হলেই আসে নইলে আসে না সেই সুবল হঠাৎ পরীক্ষার আগে কেন যে পলির কাছে এসেছে ভগবান জানেন! পলি ডেকে বসালো ঠামিকে চা দিতে বললে ঠামি বলেন--"চা কেন খাবা বাবা এই দুকুরি? ভাত রান্না হইয়েচ দুটো মুকি দে যাও"

সুবলের তাতেও যথেষ্টই আগ্রহ পলি ভাবছে অন্য কথা ছেলেটা এলো কেন? নিশ্চয়ই ভাত খেতে আসেনি সে পলির আসলেই সময় খুব কম প্রচুর পড়াশুনা করতে হয় এইসময় এক একটা দিন সোনার মতো দামি সে বলল--"সে নাহয় খেয়ি যাবে কিন্তুক আমার কাচে কি ঝন্যিতি  সুবলদা?"

সুবল মুখটা নিচু করে নিয়েছে যেন কোনো গর্হিত কাজ করেছে এমনই তার হাব-ভাব

পলি আবার বলে--"সুবলদা, বলো কী ঝন্যিতি এইয়েচো?"

সুবল বলে--"আসলে আমিও মাধ্যমিক দুবো"

পলি বলে--"সে তো খুব ভালো কতা"

পলির একটু হাসি পেয়ে যায় সুবল কখনোই পড়ুয়া টাইপের ছেলে নয় সে স্কুলে যেতে হয় তাই যায় পড়াশুনা করার জন্য যে স্কুলে যেতে হয় এটা সে মানে না নইলে কেউ পরপর চারবার ফেল করে?

পলি বলল--" দেবা তো দাও ভালোই তো কিন্তুক লাস্ট ডেট ঝেন কবে? খেয়াল রেকো তারপর আর  ফর্ম ফিল আপ হবে নাকো!"

সুবল বলে--"আজই ছেলো লাস্ট ডেট মুই ফরম ফিলাপ কদ্দিচি কিন্তুক মুই ইবারে পাশ কত্তি চাই"

পলি খুব খুশি হয়ে বলে--"সেতো খুব ভালো কতা সুবলদা থালি একেনে এয়ে সমায় নষ্ট কত্তেচো ক্যান্?"

 সুবল বলে--"তোমার সাহায্য চাই মুই ঝানিনেকো কী পড়ব বা কেরাম্ভায় পড়ব তুমি সাহায্য করবে পলি?"

পলি বলে--"মোর একুন বলে নাওয়া-খাওয়ার সমায় নেইকো...!"

সুবল অনুরোধ করে--"দেখো না পলি! মোর মাতাডা পোস্কার! সত্যি বলতিচি মিচে কতা নয়কো!"

পলির ঠামি ডাকে--"সুবল দাদা, ভাত বেড়িচি খেয়ি যাওপলিদিদু তুইও আয়"

পলি দ্রুত উঠে পড়ে দুপুরবেলায় অভুক্ত অতিথিকে নিয়ে বসে থাকা অভদ্রতা তা সেই অতিথি যতোই অসম্ভব ব্যাপারে জড়িয়ে থাকুক না কেন! খেতে গিয়ে বিশেষ কথা হয়না দুজনেই মুখ বুজে খেয়ে নেয় সুষনি শাক ভাজা, পিঁয়াজ ফোঁড়ন দিয়ে পাতলা মুসুড়ির ডাল ব্যাস এই এইটুক পেলেই এক থালা মোটা চালের ভাত  গোগ্রাসে গিলে নেয় সবাই পলি মনে মনে পড়া ঝালিয়ে নিচ্ছিল আর সুবলের তো মনটাই খারাপ ছিল বলে তার কথা বলতেই ভাল্লাগছিল না

খাওয়া হয়ে গেলে সুবল সেই পলির পিছু পিছু পলির পড়ার ঘরেই আসে পলি এটা ভাবতেও পারেনি সে জানত যে সে না করে দিয়েছে তারপর খেয়েছে এবার যে কোনো ভদ্রলোক চলেই যায় কিন্তু সুবল তাও পলির পিছু পিছু এলে পলি বলে--"আচ্ছা, পাশ করার যখন এতোটাই ইচ্ছে থালি বচ্ছরের পেত্থম থে পড়ালেখা করলিই হতো না?"

সুবলের চোখ দুটো কেমন যেন ছলছল করে উঠল সে বলল--"আমি পেত্থমে তো বুজতিই পারিনিকো!"

পলি হেসে ফেলে বলে--"কী? কী বললে? তুমি পেত্থমে বুজতিই পারোনিকো? কী বুজতি পারোনিকো? তুমি পাশ কত্তি চাও, না, ফেল কত্তি চাও, তাই বুজতি পারো নিকো?"

সুবল কিছু বলেনা

কিন্তু তার চোখে যেন কিছু একটা ছিল একটা কিছু যাকে অস্বীকার করা যায়না পলি একটু ভাবে তারপর বলে--"দেকো, মোর এই একুন সমায় হবে না তোমারে পড়া দেক্কে দেবার কিন্তুক আগামীবার মানে আগামী বছর দায়িত্ব নে পাশ করগে দোবো কতা দিচ্চি"

সুবল সাথে সাথে বলল--"আমাকে এই বছরেই পাশ করতে হবে আমি শুরু থেকে না পড়ে ভুল করেছি এখন তুমি আমাকে একটু কষ্ট করে দেখিয়ে দিলেই আমি পারব"

পলি অবাক হয়ে গেল সুবলের কথা শুনে কারণ এই গ্রামের লোকজন যে উপভাষায় কথা বলে তা  সহজে ছাড়তে পারে না একমাত্র তারাই এই মৌখিক উপভাষা ছাড়া শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে যারা স্কুলে যায় এবং দস্তুরমতো পড়াশুনা করে আসলে পড়াশুনা করতে করতে তারা শিখে যায় পলি দুই রকম ভাষাই অবলীলায় ব্যবহার করতে পারে কারণ সে প্রচুর পড়াশুনা করে সুবল তো একদম পড়াশুনা করে না সেক্ষেত্রে এই ভাষা সুবলের জানবার বিন্দুমাত্রও সম্ভাবনা নেই সেই ছেলে যখন বইএর ভাষায় এমন শুদ্ধ করে কথা বলছেতখন সে নিশ্চয়ই বইএর ভাষা শুনেছে  পড়াশুনাও সে করে যথেষ্টই পলির এমনিতেই অতি খারাপ লাগছিল সুবলদাকে ফিরিয়ে দিতে বিশেষ করে যে মানুষটা এইরকম হা-পিত্যেশ করছে পড়াশুনার জন্য, তাকে ফিরিয়ে দেওয়াটা অত্যন্ত কষ্টের ওই মুহূর্তেই পলি বলল--"ঠিক আছে কিন্তু আমি তো এখন তোমাদের বাড়ি যেতে পারব নাগো সুবলদা তুমি এসো মানে তোমাকেই আসতে হবে!"

সুবল কায়পুত্র বলেছিল--" না, না তোমাকে যেতেও হবে না আমিই আসব তোমাকে আলাদা করে পড়াতেও হবে না আমি লিখতে এবং পড়তে পারার জন্যই এসেছিলাম স্কুলে সেটা আমি পারি ভালোভাবেই পারি কিন্তু পাশ করার কথা তো কখনো ভাবিনি জানিও না কেমন প্রশ্ন আসে বা কী কী পড়তে হয় মোটমাট আমি আসব তুমি তোমার পড়া পড়বে আমি শুধু বসে বসে থাকব শুধু শুনব আর কিচ্ছু না"

এবার অবাক হবার পালা পলির

সে বলে--"আমি পড়ব আর তুমি শুনবে তাতেই তোমার পড়া হয়ে যাবে?"

সুবল বলে--"অবশ্যই তুমি পড়েই দেখো না!"

পলি ততক্ষণে সুবলের প্রতি কেমন করে যেন আকৃষ্ট হতে আরম্ভ করেছে! ওকে দূর থেকে যতোখানি অবজ্ঞা করেছে ঠিক ততখানি অবজ্ঞা ওর প্রাপ্য নয়! বরং তো একজন জিনিয়াস! পলি বলল--"আচ্ছা তুমি তো জানো সুবলদা যে বিশাল মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল কিন্তু পতন ঘটা উচিত ছিল না  ঐতিহাসিকগণ মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কতোগুলো কারণ নির্ণয় করেছেন আমি সেই কারণগুলি মুখে মুখে বলছি তুমি লিখতে পারবে তো শোনার পর?"

সুবল বলে--"নিশ্চয়ই পারব পলি তুমি বলো!"

পলি বলল--"এক মিনিট" বলে সুবলদাকে একটা খাতা আর কলম দিল সুবল তৈরি হয়ে বসল

পলি একবার বই দেখে রিডিং পড়ল সুবল তখন চোখ বন্ধ করে শুনছে পলি আবার বই বন্ধ করে বিষয়টা মানে কী কী পড়ল সেইগুলো মুখে মুখে বলতে আরম্ভ করল পলি বুঝতে পারছে যে, সুবলও বিড়বিড় করছে

পলি বলল--"সুবলদা, এবার লেখো"

সুবল লিখল খুব কম সময়ের মধ্যেই সুবলদা খাতাটা পলিকে দেখতে দিল

পলি স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ সুবল সব কয়টা কারণই লিখেছে একটাও বাদ পড়ে নি তবে ভাষাটা বড্ড সহজ সরল

 সেই শুরু পলি নিজেই সুবলের প্রেমে পড়ে গেল গ্রামের মানুষ সহজ-সরল সেই সাথে যদি তাদের জীবনে কোনো আদর্শ থাকে তাহলে সত্যিই তা ভালোবাসার মতো হতে সময় নেয় না ভক্তি শ্রদ্ধা জাগায় এইসব চরিত্রের মানুষেরা এই মানুষটিকে কিন্তু পলি সেভাবে ঠিক চিনতই না যে ছেলেটা বছর বছর ডাহা ফেল করে সে যে এতোখানি ব্রিলিয়াণ্ট তা পলি কল্পনাও করেনি পরীক্ষার অনেক আগেই পলি ভালোবেসে ফেলেছিল সুবলদাকে কিন্তু কখনো বলতে পারেনি আর  সংসারের চাপ, ভাইকে মানুষ করা, দাদু-ঠামিকে দেখাশোনা --এইসমস্ত কিছুই  পলিকেপলির চিন্তা চেতনাকে দখল করে রেখেছিল পরীক্ষার পুরো সময়টাই সুবল প্রায় সব সময়েই পলিদের বাড়িতে থাকত পলিকে আলাদা করে পড়াতে সত্যিই হয়নি নিজে রিভিশান দিয়েছে আর সুবলদা সেই পড়া শুনে শুনে শিখে নিয়েছিল পরীক্ষা হয়ে যাবার পর যখন একদম হঠাৎ করে সুবলদার আসা বন্ধ হয়ে গেল পলির যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল এই অনুভূতিকে পলি আগে কখনো চেনেনি কী অদ্ভুত ব্যাপার! বাপরে! সে যেন খেতে পারছে না ঘুমাতে পারছে না সুবলদার শরীরের একটা গন্ধ আছে পলির ঘরেও সেই গন্ধটা যেন রয়ে গেছে পলির মনটাই ভীষণ  খারাপ লাগছিল তার সুবলদার জন্য এত্তোখানি মন খারাপ! কই সুবলদা তো একবারো তার খোঁজ নিচ্ছে না! স্বার্থপর! নিজের কাজটুক গোছাতেই এসেছিল! পলির খুব অভিমান হলো মনে মনে সে ভাবল একদিন না একদিন নিশ্চয়ই সুবলদা আসবে সে কথাই বলবে না সুবলদার সাথে কথাটা ভেবেই পলির কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগছে সেতো ঠিক এইরকম মেয়ে নয়! সেতো ভীষণ শক্ত-সমর্থ মনের একজন মেয়ে! নিজের পায়ে দাঁড়ানো আর গ্রামের মানুষের উন্নতি করা  ছাড়া তার আর কোনো উদ্দেশ্যই নেই এই জীবনের!

একটা একটা করে দিন যাচ্ছে আর পলির অভিমান জমে জমে পাহাড় হচ্ছে অভিমান ভাঙাতে কেউ আর আসছে না

সেদিন ছিল পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন পলিই প্রথম দেখল সে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে তারই হায়েস্ট মার্কস তাদের স্কুলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে আর সুবলদা সেকেণ্ড ডিভিশনে পাশ করেছে খবরটা তার খুব দিতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু সে ফোন করল না সুবলদা এই কয় মাসে ফোনও করেনি একবারো পলিকে পলির ভীষণ কষ্ট হয় আজকাল ঈশ্বর তাকে সবরকম গুণই দিয়েছেন কিন্তু এইটাও সব থেকে বাজে কপাল দিয়েছেন যে তার যার প্রতি প্রেমের অনুভূতি জাগল, তার সাথে বিচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে জীবনে এই প্রথম পলি কারও প্রেমে পড়ল এবং প্রেম মানে যে শুধুই সুখ নয়, তাও সে হাড়ে হাড়ে টের পেল মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো সেদিন সোনা হঠাৎ বলল--"এদি, জানিস তো সুবলদার বিয়ে"

পলি যেন চমকে উঠল বলল--"তাই? তুই কী করে জানলি?"

সোনা বলল--"আমি জানি তো গ্রামের সব্বাই জানে!

মেয়েটা ওদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে দুজনে এদিক-ওদিক ঘুরতেও যায় তো!"

পলি কিচ্ছু জবাব দিল না মুখ বুজে থাকল মুখ বুজে থাকলেও পাঁজরের রক্তক্ষরণ কিছুতেই বন্ধ হয় না

কিছুদিন বাদে একদিন পলির সাথে একদম হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়ে যায় সুবলদার পলি দেখেও না দেখার ভান করে চলে আসছিল সুবলই ডাকল--"কি খবর পলি?"

পলি তাও জবাব দিল না! বেইমান! মনে মনে সে বলল সুবল সাইকেলে ছিল সামনের রডে একটা মিষ্টি মেয়ে বসেছিল পলি বুঝতে পারল এই মেয়েটাই সুবলের হবু বউ পলির অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে! কেন যে দেখা হলো সুবলের বউএর সাথে? কোথাকার কে এক সুবল! তার আবার বউ! আর তাদের জন্য তার হৃদয়ের যন্ত্রণা! দূর! তার মা নেই বাবা নেই! সেই যন্ত্রণাও যে ভুলে থাকতে পারে, সে কখনোই সুবলের প্রেমিকা দেখে মরে যাবে না! পলি তাড়াতাড়ি চলে আসার চেষ্টা করে!

সুবল হঠাৎ সাইকেল নিয়ে পলির পথরোধ করে দাঁড়ায় বলে--"একটা কথা তো শুনে যাও! কত্তোবার ডাকছি!"

পলি, যেন কিছুই হয়নি এমনি মুখ করে বলে--"ওহ! সুবলদা! তুমি? শুনতে পাইনি গো!"

সুবল বলে--"তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম তিনদিন! তোমার দেখা পাইনি!"

পলি অবাক হয়!

বলে--"কবে গেছিলে?"

সুবল বলে--"আরে যেদিন রেজাল্ট আউট হয়েছে সেইদিন আর তারপর আরও দুইদিন তোমাকে পাইনি!"

পলি অবাক হয়ে বলল--" কিন্তু আমাকে তো কেউ বলেনি"

সুবল বলে--"আমি তো কাউকে বলতেও বলিনি না পেয়ে চলে এসেছি ভেবেছি পরে যাব কখনো তো এতোদিনে এই প্রথম তোমার দেখা পেলাম"

পলি বলে--" আমাদের মনেহয় মোবাইল বলে একটি বস্তু ছিল সেখানে দুজনেরই নাম্বারে যোগাযোগও ছিল সেখানে তো...!"

পলির কথা শেষ হবার আগেই সুবল বলল--"আরে আমার মোবাইলটা জলে পড়ে গেছিল তারপর পুরো দেহ রেখেছে অবস্থা অত্যন্ত খারাপ"

পলির মনেহলো ওর মৃত্যু পরোয়ানা এসে গেছিল এসে গেছিলেন যমরাজও এখন বোধহয় যমরাজ ফিরে যাচ্ছেন

ভাবতে ভাবতেই সুবল বলে--"দাঁড়াও তোমার সাথে আলাপ করিয়ে দেই...! হলো...!"

পলির বুকের মধ্যে আবার যেন দুরমুশ হচ্ছে!

সে যেন দেখতেই পাচ্ছে যে তার সামনে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে যমরাজ দাঁড়িয়ে! ওইতো!

নাহ! সহ্য করতে পারবে না! কিছুতেই পারবে না!

সে রিং না হওয়া ফোনটাকে কানে ধরে অকারণে চিৎকার করে বলল--"হ্যাঁ, ভাই বল! এইতো আমি এসে গেছিএইতো! এক মিনিটেই আসছি বাড়িতে!"

বলতে বলতে পলি প্রায় ছুট্টে বাড়িতে এলো কিছুতেই সুবলদার নিজের হবু বউকে সুবলদাই পরিচয় করিয়ে দেবে, তা মানতে পারবে না! পলি নিজের পরিবর্তনে নিজেই অবাক হয়ে যায় মাঝে মাঝে! কোথায় গেল তার সেই পার্সোনালিটি? কোথায় গেল তার সেই মনের জোর? কোথায় গেল তার সেই লোহার মতো শক্ত জেদ? একজন অতি সাধারণ পুরুষ তাকে এইভাবে ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারল?

আসলে এই যে সুবল আর সুবলের সাইকেলের রডে বসা সুন্দরী মেয়েটা, এর পুরোটাই সিনেমার মতো সাজানো ছিল স্ক্রিপ্টও লেখা হয়েছিল সুবল স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী অভিনয়ও করেছে অভিনয় করেনি পলি

কারণ জানতে গেলে সুবলের সাথে পলির ভাই সোনার আলাপচারিতার বিস্তারিত জানতেই হবে

সুবলকে পলি ভালোবেসেছিল সে বুঝেছিল যে, সুবল মানুষটা আদ্যন্ত সহজ-সরল চারবার মাধ্যমিক ফেল করেছিল সে পাশ করার কোনো ইচ্ছেই তার ছিল না কী হবে পাশ করে? চাকরির কোনো গ্যারাণ্টি নেই ধুর! কিন্তু পলিকে দেখার পর তার মধ্যে একটা ইচ্ছে জাগে পরীক্ষায় পাশের ইচ্ছে কিন্তু সেই ইচ্ছের পূরণ করতে সে পলিকেই সাহায্য করতে বলল সে জানে যে, পলি খুব ভালো মেয়ে দয়াময়ী ভালো ট্যিউশানিও পড়ায় অনুরোধ করলে পলি ফেলতে পারবে না সেই যে পলির কাছে পরীক্ষার আগের মাস খানেক একসাথে কাটালো, কী যে হলো সুবলের! সে শয়নে-স্বপনে-নিদ্রায়-জাগরণে পলিকেই দেখতে লাগল যতোদিন একসাথে ছিল, সে বুঝতে পারেনি তার ভালোলাগার গভীরতা পড়া ছাড়তেই সুবল পাগল হয়ে যেতে লাগল জানত যে, পলি এইসব একদম পছন্দ করে না! বললে কোনোদিন ওর সাথে কথাই হয়ত আর বলবে না! না পেরে সোনাকে একদিন বলে ফেলেছিল আর বলতে গিয়ে অসম্ভব ইমোশানালও হয়ে পড়েছিল সোনা বয়সে ওর থেকে অনেক ছোটো অত ছোটো ছেলেকে নিজের প্রেমের কথা বলার সময় গড়গড় করে সব বলে গেছে তখন সে জানত যে, সে এইসমস্ত কাহিনি তার কাছেই উন্মুক্ত করছে যে তার প্রেমিকার ভাই তার অত্যন্ত আপন মানুষ কাছের মানুষ! তার বলা শেষ হলে সোনা যখন জিজ্ঞাসা করল--"সুবলদা  মেয়েটা কে?"

সুবলের মনে হল যেন এক ধাক্কায় সুবলকে বাস্তবে ফিরিয়ে দিল সোনা সোনার বলার মধ্যে দূরত্ব ছিল গ্রামসুলভ পরিচিতের বাইরের কিছু ছিল না সুবল এক ধাক্কায় পিছিয়ে এল তার নিজের ভালোবাসার মায়ায় সে নিজে সোনাকে কাছের ভেবেই সব বলেছে কিন্তু সোনার চোখে মুখে আপন জনের কাতরতা নেই সোনা তখনো সুবলের মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে সুবল ধীরে ধীরে বলল--"মেয়েটিকে মা আসলে পছন্দ করে রেখেছিল আমার মামার বাড়ির দেশের মেয়ে"

সুবল নিজেই নিজের চারিদিকে বেড়াজাল বানাচ্ছে তখন কী বলছে কেন বলছে তা যেন নিজেই জানে না

সোনা হঠাৎ মুচকি মুচকি হাসছে সুবল বলে--"হাসছিস  কেন ভাই?"

সোনা বলে--"অভয় দিলে একটা কথা বলি?"

সুবল বলে--"নিশ্চয়ই বল!"

সোনা বলে--"মেয়েটিকে আমি চিনি"

সুবল অবাক হয়ে বলে--"তুই কী করে চিনবি? আমার মামার বাড়ি তুই কখনো গিয়েছিস নাকি?"

সোনা বলে--"নাহ তা যাইনি তবে তোমার শ্বশুর বাড়ি গিয়েছি"

সুবল খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলে--"বুঝতে পারছি না সোনা হেঁয়ালি ছেড়ে সোজা করে বল"

সোনা বলে--"তোমাদের বাড়িতে কে বেড়াতে এসেছে?"

সুবলের খেয়াল হয় তাইতো! ওই মুহূর্তে তাদের বাড়িতে তো তার মামাতো বোন বেড়াতে এসেছে! সর্বনাশ! ভুলভাল ভাবছে না তো!

সুবল গড়গড় গড়গড় করে বলে যায়--"সোনা, আমার বোন আজেবাজে রটাবি না এমা! ছি ছি! আমার বোন হয়! এসব কী বলছিস? কী ভাবছিস?"

সোনা তখনো মিটিমিটি হাসছে

সুবল বলে চলে--"আমি ভুল করে বলে ফেলেছি যে, মামার বাড়ির দেশের মানুষ আমার খেয়ালই ছিল না যে, আমার মামাতো বোন এইসময়েই আমাদের বাড়িতেই রয়েছে

সোনা বলে--"তার নাম কি পূর্ণিমা?"

সুবল থমকে যায়! এই নাম উচ্চারিত হলেই প্রাণে জাগে আনন্দ চোখে স্বপ্ন বেঁচে থাকার ইচ্ছে যুদ্ধ করার শক্তি! পৃথিবীকে মনেহয় শত্রুহীন! জীবন মানেই সুখ আর সুখ! খুশি আর খুশি!

সোনা হঠাৎ বলল--"কী জামাইবাবু! কী ভাবছো?"

সুবল লাজুক হাসে

বলে--"ফাজলামো হচ্ছে?...  কিন্তু ওইদিকের হাবভাব তো কিছুই জানিনা"

সোনা বলে--"আমিও জানিনা কিন্তু তোমাকে দেখেই আন্দাজ করেছিলাম"

সুবল বলে--"কবে কোথায় দেখে আন্দাজ করেছিলি?"

সোনা বলে--" আরে যে মানুষটা বছরের পর বছর ফেল করছে, গায়েও মাখছে না সে হঠাৎ পাশ করার জন্য এমন উন্মাদ হয়ে গেল কেন? আমাকে তো খোঁজ রাখতেই হয়!"

সুবল বলে--" কিন্তু তখন সত্যিই তোর দিদির পড়ার প্রতি যে আগ্রহ, যে নেশা তার প্রতিই আকৃষ্ট হয়েছিলাম"

সোনা বলে--"তারপর কবে বুঝলে যে আমার জামাইবাবু হতেই হবে নইলে বাঁচতেও পারবে না!"

সুবলের মনে পড়ে গেল একটু আগেই সে এই কথাগুলোই বলেছে সোনাকে

এতোক্ষণে সোনার চোখে, মুখে,উচ্চারণে একদম নিজের মানুষ, আপন মানুষ বলে অনুভূতি হচ্ছে

সুবল আবার বলল--"সোনাবাবু আমার, শালাবাবু আমার, একটা ব্যবস্থা তোমাকে  তো করতেই হবে"

এতোক্ষণ সোনা মজা করছিলএবার গম্ভীর হয়ে বলল--"ওরে বাবা? আমি? আমাকে বাড়ি থেকে বার করে দেবে ওকে বুঝতেই পারি না সুবলদা! সত্যি বলছি"

সুবল বলে--"নারে আমার মনেহয়, পলিও আমাকে পছন্দ করে"

সোনা বলল--"কী করে বুঝলে?"

সুবল বলে--" তেমন কিছু না একদিন যেতে দেরি হয়েছিল তো যে পলি নিজের পড়া ছেড়ে এক মুহূর্তও নষ্ট করেনা, সেই মেয়ে সেইদিন আমাকে ফোন করেছিল বলেছিল--'সুবলদা, কিগো দেরি করছো কেন?'

আমি ওর সেইদিনের সেই যে উৎকণ্ঠা ভরা আহ্বান তা কখনো ভুলব না!"

বলে সুবল কিছু ভাবতে লাগল

সোনা বলল--"আমি কিন্তু তোমাকে বুঝেছিলাম দিদিকে একটুও মনেহয় না যে, সে কারও সাথে প্রেম করবে! বিয়েও করবে বলে তো আমার মনেই হয়না!"

সুবল বলে--"না কোথাও যেন আমাকে পলি পছন্দ করে আমি ওর চোখে আমার জন্য মায়া দেখেছি যে কয়দিন পড়তে গেছি, নিজে হাতে রান্না করে খাইয়েছে পড়িয়েছে ওর পড়ানোর জন্যই অতো অল্প সময় পড়েও পাশ করেছি"

সোনা বলে--" তুমি বলে দেখো না তাহলে বলছো না কেন?"

সুবল বলে--"না রে, ভীষণ ভয়ই করে তোর দিদিকে যদি চিৎকার করে অপমান করে? যদি কথা বলার, তোদের বাড়িতে যাওয়ার অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলি? যদি ওর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখতেও না পারি? সোনা তুইই একটা ব্যবস্থা কর নারে!"

সোনা চুপ করে থাকে

সুবল বলে--" কীরে, কী ভাবছিস?"

সোনা বলে--"ভাবতে হবে সুবলদা ভাবতে হবে দিদি তোমাকে পছন্দ করে কীনা সেটা  আগে জানতে হবে"

সুবল বলে--"সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করাই তো যায়!"

সোনা বলে--"ইসসস! নিজের বেলায় আঁটিসাঁটি, পরের বেলায় চিমটি কাটি! না?".

সুবল বলে--"তুইই আমাকে বাঁচাতে পারিস ভাই! তোকে বাড়ি থেকে বার করে দিলেও ক্ষমাও করে দেবে আমার তো সেই পথটাই নেইরে!"

সোনা বলে--"এক কাজ করি দিদিকে বলি যে, তোমার বিয়ে দেখি ওর কোনো রিয়্যাকশান হয় নাকি!"

সুবল বলে--"কিন্তু তাই বলে একেবারে বিয়ের খবর দিলে তো সে আরও দূরে সরে যাবে রে! যদিওবা সম্ভাবনা থাকত, সেই রাস্তাটাই বন্ধ হয়ে যাবে নাতো?"

সোনা বলে--"না তা হবে কেন? যাকে ভালোবাসি সে অন্য কারো হয়ে গেলে  ভালোবাসা আরও  বাড়ে! শুধু যন্ত্রণাই বাড়ে, তা নয়!"

সুবল বলে--"আরেব্বাস! শালাবাবু যে প্রেমে পিএইচডি!"

এবার সোনা লজ্জা লজ্জা মুখ করে হাসে

 

এবার কুসুমতলি গ্রামে ভীষণ গরম পড়েছে মানুষের সহ্যের সীমা অতিক্রম করছে এই গরম ঠা ঠা রোদ্দুর যখন ওঠে মনেহয় সূর্যদেব পুরো পৃথিবীকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার না করে আর থামবেন না হু হু করে পুকুরের জল নেমে যাচ্ছেকয়েকটা পুকুর এমনভাবে শুকিয়েছে যে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এটা পুকুর ছিল পুকুরের নীচের মাটিতে পাঁক থাকে দুর্গন্ধযুক্ত সেই পাঁক অনেক গভীর উপর থেকে দেখে বোঝা যায় না সেই গভীরতা সেই  গভীর পাঁকের  বুকেও চিত্র-বিচিত্র ফাটল

পাড়ায় একটা ক্লাব ঘর আছে বহু পুরানো বটবৃক্ষের তলে ক্লাব ঘরের মূলি বাঁশের বেড়ার গায়ে  চৌকো টিনের উপর সযত্নে লেখা 'অগ্রদূত সংঘ' ক্লাব ঘরের কাঠের দরজা ঠেলে যে কেউ যে কোনো সময় ঢুকে পড়ে ভিতরে একটা ক্যারাম বোর্ড আছে আর আছে সাদা কালো একটা আট ইঞ্চি টিভি গ্রামের ছেলে-ছোকরারা সেখানে আড্ডা দেয়, টিভিতে সিনেমা দেখে মাঝে মাঝে কারণ সুধাও চলে পাশের গ্রামের নিতাই বাগের অনেক তাল গাছ আছে সে নিজেই সেই সব গাছ কেটে রস বার করে সেই রস থেকে সুস্বাদু তাল-পাটালি বানায় তার বউ প্রতিমা খাঁটি তালের রসের পাটালির স্বাদ অতুলনীয় ছাড়া মিছরিও তৈরি হয় নিতাই বাগের বাবা নিমাই বাগের হাতের তৈরি মিছরি নিয়ে যেত অনেক বড়ো বড়ো  কোম্পানি নিতাই বাগ বাবার কাছেই শিখেছে এই বিদ্যা তারও ভালোই পসার ছিল কিন্তু সে মনে মনে অন্য কথা চিন্তা করল কী হবে সুনাম দিয়ে? সুনাম ধুয়ে কি মানুষ জল খাবে? সে তাল গাছে যে মাটির ঠিলেতে করে রস পাড়া হত, তা পরপর তিন-চারদিন পাড়ে না গাছ থেকে এই গরমে তালের রস পচে যায়  সাদা সাদা ফেনা ওঠা দুর্গন্ধযুক্ত সেই

তালের রস অনেক বেশি টাকায় বিক্রি হয় গ্রামের উঠতি যুবকেরা সেই রস ক্লাব ঘরে বসে খায় এই রস তখন অনেক রসিক হয়ে ওঠে গ্রামে একে বলে তাড়ি মাথার চাঁদি ফাটা গরমে, অস্থির অস্থির গরমে ছেলেগুলো সেই তিতকুটে ঝাঁঝালো পদার্থ গলায় ঢালে বিশ্রী স্বাদের পদার্থটুক সমস্তটাই এক ঢোকে গিলে নেয় কেউ কেউ চানাচুর বা চপ-ফুলুরি যোগাড় করে কখনো তাও পায় না এমনিতে গরমে আয় কমে যায় সকলের এত্তো গরিব মানুষগুলোর আয় বলতে ভ্যান-রিক্সা টানা গ্রামের পাশের পাকা সড়ক সোজা মাইল পাঁচেক গেলে রেলওয়ে স্টেশন এই কুসুমতলি গ্রামেও কয়েকঘর শিক্ষিত পরিবার আছে তাঁরা চাকরি-বাকরি করেন সরকারি অফিসার,পুলিশের কনস্টেবলও আছেন তাঁরাই মাসকাবারি ভ্যান রিক্সা রাখেন সে আর কটা টাকা অবসর সময়ে কারো জমিতে জোন দিয়ে কিছু পয়সা আয় হয় কিন্তু তাতে সংসারের সকলের পেট চলা অসম্ভব! এই পরিস্থিতিতে কেমন করে যে নিতাই বাগের তাড়ি কেনার পয়সা যোগাড় করে  ছেলেগুলো তা চিন্তাও করা যায় না অথচ কালু, সোনা, হরে, শিবেদের নিয়মিত তাড়ি খাওয়া চাইই চাই আজও  ক্লাব ঘরে চারজন টিভিতে বেশ জম্পেশ একটা সিনেমা চালিয়ে ক্যারাম খেলছে আর তাড়ি গিলছে

এই চারজনের মধ্যে তিনজনকে যে কোনো গ্রামে খুঁজে পাওয়া যাবে কিন্তু সোনার একটু আলাদা ইতিহাস আছে সোনারা দুই ভাই বোন পরিবারে মোট চারজন  ঠাকুমা-দাদু এবং সোনার দিদি পলি পলি এই কুসুমতলি গাঁয়ে বড্ড বেমানান কী যে মিষ্টি দেখতে মেয়েটা! মাথা ভর্তি কোঁকড়া কোঁকড়া চুলের ঢল পিঠ ছাপিয়ে কোমর ছুঁয়েছে শান্ত দিঘির মতো দুটো চোখ কথা কম বলে কী ভীষণ জেদ আর অধ্যাবসায় নিয়ে মেয়েটা বিএ পাশ করেছে ফার্স্ট ডিভিশনে আশেপাশে কলেজ নেই একটা স্কুল আছে, তাও মাইল তিনেক দূরে "নয়ানজলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়" সেখান থেকেই পলি বা পূর্ণিমা মাধ্যমিক পাশ করেছে তিনটে বিষয়ে লেটার নিয়ে তারপর অনেক দূরের কলেজ থেকে প্রায় জোর করে পড়াশুনাটা চালিয়েছে সে এই গ্রামের মেয়েদের পড়তে দেওয়া তেমন একটা হয় না ভালো সম্বন্ধ এলে বিয়ে হয়ে যায় তাড়াতাড়িই মেয়ের রূপ থাকলে বিয়ের জন্য খুব ভালো চাকরিজীবী সম্বন্ধ আসে পলিরও এসেছিল সে পত্রপাঠ বিদায় করে দিয়েছে অবশ্য তার ভাই সোনা এই ব্যাপারে দিদির পাশে থাকে সেও দিদির বিয়ে চায় না পলির  বেশ লাগে ভাইএর এই আচরণ! পলির  পার্সোনালিটি আছে সোনা এই পলিরই একমাত্র আদরের ছোটো ভাই হওয়া সত্ত্বেও এলাকার বখাটে ছেলেদের পাল্লায় পড়ে  বখে যাচ্ছে এটা পলি দেখতে পাচ্ছে অনেক চেষ্টা করেও সে ভাইকে সামলাতে পারছে না পলি বেশ কয়েকটা ট্যিউশানি করে সত্যি বলতে অনার্স সহ পাশ করার খরচ সে নিজেই ট্যিউশনি করে যোগাড় করেছে নিজেও পড়াশুনার মতোই ট্যিউশনির বিষয়েও  সমান  একাগ্র যে সমস্ত ছেলে-মেয়েরা সত্যিই পড়তে চায়, পলি তাদের কাছে আইডিয়াল একবার তারা পলির কাছে পড়তে এলে নেশার মতো বারবার আসে পলি ম্যামের পড়া বোঝানোর কায়দাটাই অন্যরকম তার কথার প্রতিটি মোড়কে মোড়কে হিরে, জহরত খালি

চিনে নিতে হয় ভালোবেসে পড়াশুনা যে কতোটা গভীর হতে পারে তা পলি ম্যামের পড়ানো শুনলে বোঝা যায় আর প্রতি শনি রবিবার পলির ব্যাচ থাকে অনেকগুলো এই দুটো দিন সে এতোটাই ব্যস্ত থাকে যে তার আদরের ভাই সোনার দিকেও তেমন একটা নজর দিতে পারে না আর ঊনিশ বছরের সোনাও এই সুযোগের অপেক্ষাতেই থাকে - দুটো দিন সে লাগামছাড়া আচরণ করে আজ শনিবার টিভিতে হিন্দি সিনেমা চালিয়ে তারা তাড়ি খাচ্ছে আর ক্যারাম খেলছে 'অগ্রদূত সংঘ' সামনের রাস্তায় অল্প আলো আছে অনেক দূরে দূরে কারেণ্টের পোস্টগুলো এত্তো কম পাওয়ারের বাল্ব লাগানো যে একটা থেকে আর একটার মাঝে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার তারউপর আবার মাঝের দুটো পোস্টের বাল্ব নেই হয় কেটে গেছে নয়ত চুরিও হতে পারে

সোনার বেশ নেশা হয়েছে চোখ দুটো ঢুলুঢুলু দারুণ মস্তি হচ্ছে তার আর মস্তি হলেই তার শিপ্রার কথা মনে পড়ে শিপ্রাটা কিছুতেই তার প্রস্তাবে রাজি হচ্ছে না সোনা বলল-- "আচ্ছা,মোরে কি দেখতি খারাপ,বল?"

কে তার কথার জবাব দেবে? ততক্ষণে কালু, হরে,গণেশ সব্বাই কম-বেশি মাতাল গণেশ একবার ভাবল যে সে ততটাও মাতাল হয় নি সে সোনার কথার জবাব দেবে কিন্তু জবাব দেবার কথা চিন্তা করতে না করতেই সে সোনার প্রশ্নটাই পুরোপুরি ভুলে গেল সে বলল--"সোনা,আলুর চপ এনিচি নাকি ঝে দোবো?"

সোনাও শিপ্রার কথা না ভুলেও সে কী বলেছে তা ভুলে গেল

বলল সে--" আলবত এনেচিস আলুর চপ! একুন নেই বললি হবে?"

হরের মাথা তখন টলছে বনবন সে স্ট্রাইকারটাও ঠিকঠাক ধরে মারতে পারছে না যখন ঠিক সেই সময় একটা শব্দ যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল 'অগ্রদূত সংঘ' ক্লাবের পিছনের দেওয়ালের দিকে মাতাল হলেও গ্রামে থাকার দৌলতে এই মারাত্মক গরমে যে সাপের উৎপাত হয় খুব বেশি তা তারা খুব ভালোভাবেই জানে বিষাক্ত সাপের কামড়ে প্রতি বছরই এই গরমের দিনে তাদের গ্রামে বেশ কিছু মানুষ মারা যায় হাসপাতাল একটা আছে বটে অনেক দূরে প্রায় কুড়ি মাইল দূরে সেখানে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও নেই বললেই চলে আর সাপের কামড়ের রুগি সেখানে নেবার উপায় পায়ে টানা রিক্সা কয়েক ঘণ্টা লাগে যেতে তাতে করে চিকিৎসকের আর কোনো উপায় থাকে না চিকিৎসার তাই গ্রামের সব্বাই সাপের এই বিষাক্ত নি:শ্বাসকে ভয় পায় খুব যে কোনো সাপুড়ের থেকে গ্রামের এইসব মানুষগুলো ভীষণ ভালো সাপ চেনে 'অগ্রদূত সংঘ' পিছনে আছে মজা ড্রেন তার দুই পাশে ঝোপঝাড় ড্রেনের মজা একটা জায়গা থেকে মানুষজন যাতায়াত করে ভিতরে অনেক আবাদি জমি আছে আবার তারই পাশে অনাবাদি জমির পরিমাণও কম নয়

মিনিট চল্লিশেক দূরত্বে স্থানীয় শ্মশান ফলে  প্রয়োজনে মানুষজনের যাতায়াত থাকলেও অপ্রয়োজনের নির্জনতায় মাটির পিঠে বুক দিয়ে চলা প্রাণীরা রাজত্ব করে

আওয়াজ শুনেও ছেলেরা বুঝতে পারে  না কিছুইমাতালের কান থাকে নাপিছনের অন্ধকার থেকে ক্লাব ঘরের সীমানায় প্রবেশ করেছে সেই বিভীষিকাময় মৃত্যুদূত! ছেলেরা কিছুই টের পায় না আবার আওয়াজ ওঠে হিসসসসস! যেন নিজের অবস্থান জানান দেয় সেই ক্ষমতাবান প্রতিভূ সাপটা যেন বোঝাতে চাইছে মদ আর বিষের অধিকারী সাপ দুজনেই ক্ষমতাবান ওরা ওদের মতো টলে টলে পড়ে যাওয়া সামলে স্ট্রাইকার ধরে, দুলে দুলে মারার চেষ্টা করে আর ঠিক সেই সময় মৃত্যুদূতের তৃতীয়বারের আওয়াজ শোনা যায়

ক্লাবের পিছন দিকের বেড়ার তলা দিয়ে গত বর্ষায় প্রচুর মাটি গলে গড়িয়ে গড়িয়ে বেরিয়ে গেছে ফলে বেড়া আর মাটির মেঝের মাঝখানে বিঘত পরিমাণ ফাঁকা সেই অংশ দিয়ে রাজা নয়, মহারাজার মতো সে প্রবেশ করেছে অন্ধকার জগত থেকে আলোয় প্রবেশ করেই যেন সে শত্রুর উপস্থিতি সম্পর্কে নি:সন্দেহ হয়েছে আর তাই নিজের অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছে যেন যুদ্ধে আহ্বান জানাচ্ছে দুলে দুলে উঠে একটি ত্রিকোনাকৃতি মাথা বেশ মোটাসোটা দেহ গমের মতো গায়ের রঙ গায়ে গোল গোল আঁশ একহাত ফনা তুলে দাঁড়িয়ে ফনার পিছনে গরুর পায়ের ক্ষুরের চিহ্ন!

হঠাৎ গণেশের নজরে পড়ে সে টলতে টলতে উচ্চারণ

 করল--"গোখরো!"

 সব্বাই  চমকে উঠল উঁকি দিয়ে দেখেই বুঝতে পারল যে গনেশ  ঠিকই বলেছে নেশা কিছুটা ছেড়েছে তাই বুঝল চরম বিষাক্ত এই সাপের ছোবলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে জঙ্গলে মাঠে-ঘাটেই এরা থাকতে পছন্দ করে! আজ কেন যে 'অগ্রদূত সংঘ' এর আগমন ঘটল কে জানে! এই চরম বিষাক্ত সাপ দূর থেকেও বিষ ছুঁড়ে মারতে পারে ছেলেরা এদিক-ওদিক কোনো অস্ত্র খুঁজছে, কেননা এই সাপকে কখনোই জীবন্ত ছেড়ে দেওয়া যায় না কিছুতেই কোথাও কিচ্ছু নেই একটা লাঠি-সোটাও না এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য যখন সব্বাই ভাবছে কী করবে, সেই সময় তাদের সাথে শত্রুতা করেই যেন একদম হঠাৎ কারেণ্ট অফ হয়ে গেল! ভয়ে সবার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল! তক্ষুনি পাড়ার বছর সাতেকের ছেলেটার চিৎকার ভেসে এল--"সোনাদা, তোমার দিদি ডেকতেচ শিজ্ঞিরি বাড়িত এসো তোমার দাদুরি সাপে কেমড়েচ!

 

` মনোমোহনবাবুকে যখন ডাক্তাররা বললেন যে তাঁকে কোনো বিষাক্ত সাপে কামড়ায়নি, তখনই তিনি পায়ের বাঁধন খুলে ফেললেন

আর বল্লেন--"এই বাঁধন দেবার ঝন্যিই পা অবশ হই গিইলো" বাঁধন খুলেই তিনি যেন সুস্থ হয়ে উঠলেন অবশ ভাব গেল কেটে পলি খুব খুশি হয়ে গেল এক মুহূর্তে যে ভ্যানে  করে সবাই গিয়েছিল, সেই ভ্যানওয়ালা অপেক্ষা করছিল সেই ভ্যানে করেই সবাই ফিরে আসছিলেন ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেলমানুষগুলো ফিরে আসতে আসতে প্রায় সবাই বারবার  ঘুমে ঢুলে ঢুলে পড়ছিল একমাত্র ভ্যানওয়ালার চোখে ঘুম ছিল না অথচ তারই সব থেকে বেশি ঘুম পাবার কথা ছিল পরিশ্রম সব থেকে বেশি সে- করছিল পরিশ্রমী মানুষ সহজে ঘুমায় নাগ্রামের রাস্তা মাটির কিন্তু এতোটাই এবড়োখেবড়ো যা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না দাদুর বয়স হলেও বেশ গাট্টাগোট্টা চেহারা সোনার চেহারাও রোগা পাতলা নয় আর ছিল সোনার এক বন্ধু সেও বেশ মোটাসোটা একমাত্র পলির চেহারাই দোহারা ভ্যানওয়ালা নিজেও বেশ শুকনো উঁচু নীচু রাস্তায় এতোগুলো প্যাসেঞ্জার নিয়ে চলা খুবই কষ্টকর সে পেছন উঁচু করে করে ভ্যান চালাচ্ছেনীচু থেকে উঁচুতে ওঠার সময় প্রাণ যেন বেরিয়ে যায়! পেছন উঁচু করলেও ভ্যান কখনো কখনো থেমে যাচ্ছিল তখন ভ্যান থেকে নেমে হাতে টেনে নিতে হয় ভীষণ শক্তি লাগে এই কাজে! সবার হাতেই একটা করে টর্চ লাইট আছে টর্চ ছাড়া গ্রামের কেউই রাস্তায় বেরোতে সাহস পায় না গরম যত বাড়ে, সাপের উপদ্রপ ততই বাড়তে থাকে বিছানাতেও সাপ উঠে কামড় দিয়েছে এবং মারাও গেছে সেই ব্যক্তি, এমন ইতিহাসও আছে এই কুসুমতলি গ্রামে সারারাস্তায় এই একটাই আলোচনার বিষয়

সাপ আর সাপ ছোবল আর ছোবল! মাঝরাস্তায় একটা দোকান খোলা দেখে মনোমোহন ভ্যানওয়ালাকে দাঁড়াতে বলেন

সুবল কায়পুত্রর মিষ্টির দোকানের ঝাপ খোলা রাত প্রায় এগারটা বেজে গেছে এতো রাতে মিষ্টির দোকান খোলা কেন? নিশ্চয়ই কারো বাড়ি কোনো আত্মীয় বেড়াতে এসেছে

মনোমোহন হাঁক পাড়েন--" সুবল ভাই, দোকানের ঝাপ খুলেচ কেন? কেডা এইয়েচ এই রেতের বেলা?"

সুবল টিমটিমে হারিকেনের বাতি উসকে একটু জোর করে এবং মুখ দেখার অভিপ্রায়ে হ্যারিকেনটা তুলে ধরে তাতে সুবলের নিজেরই মুখটা  পরিষ্কার দেখা যায় কষ্টি পাথরে কোঁদা মূর্তি যেন কুচকুচে কালো গায়ের রঙ চোখদুটো খুব সুন্দর মেয়েদের এরকম চোখ হয় সাধারণত

মনোমোহন বলেন--"কারেন একবার গিলি আর সহজে আসতি চায় না! এই হইয়েচ এক জ্বালা! একুন ভোরডা রেতে জেগে কাটাতি হবে"

সুবল  বলে --"তা ঝা বলেচো দাদু! একবার গিলি আর আসবে নাকো!"

মনোমোহন আবার বলেন--"তা এই এতডা রেতে দোকান খুলেচো ক্যান, বললে না তো!"

সুবল বলে--"দিদি-জাঁইবু এইয়েচ মেলা রেতে এই কতখুন মাত্তর হল তা বলি এই রেতে আর কোম্নে মাচ-মাংস পাব এই মিষ্টি দে আতিথ্যি কল্লুম তা তোমরা কেডা? কোম্নে গিয়েলে? ভ্যানে ঝেন আরো সব কেডা কেডা রইয়েচ!"

মনোমোহন বলেন--"আর বলো না কো সন্দে রেতে তিনি দয়া করেলো তা ভ্যানে কোরে ওই মোচার খোল হাসপাতালে গিইলুম ডাক্তার বোলদেচে বিষ নেইকো হেলে সাপে কেমড়েচে...!"

প্রথম বারে না চিনলেও সুবল এবার মনোমোহনবাবুকে গলা শুনেই চিনতে পারে সঙ্গে সঙ্গে তার সুন্দর চোখদুটো চকচক করে উঠল মনে মনে সে ভাবল হয়ত পলিও এসেছে

সে বলে--"তা বলি দাদু,এই রেতে ওদের নাম নিতি নেইকো.... লতা লতা লতা!"

মনোমোহন হাসেন

বলেন--"একুন দিনকাল পেল্টেচে রে সুবল একুন আর সাপ বললি তেনারা শুনতি পায়  নাকো সপ ঘরে ঘরে টিপিতি সাপের ছিনিমা চলতেচ..! একুন সেকেনে ঝতি কেউ সাপ বলে, সাপ কেরামভায় তারে কাটপে? ওসপ মিছে কতা..!  আশে পাশের অনেক গেরামেই কারেন চলে এইয়েচে

সুবল হাসে ওর হাসিটাও খুব মিষ্টি! যুবক হবার সাথে সাথে সুবলের সৌন্দর্যে যেন বান ডেকেছে ঝকঝকে দাঁতের সারি! একেবারে নিঁখুত সুন্দর এই সুবল সে বলে--"তা দাদু এই রেতে আর কোম্নেও যেতি হবে নাকো! মোর বাড়ি দুটো চালে-ডালে ফুটকেচে মাতোমরাও একেনে নয় থেকে যাও...!"

মনোমোহন বলেন--"নারে সুবল বুড়ি চিন্তা করতেচে আগে তো সেকেনে গে বেঁচে আছি তার পেরমান দিতি হবে!"

সবাই হেসে ওঠে হো হো করে

পলি বলে--"সত্যি সত্যি কিন্তু হাসির কথা নয় দাদুরে ঠাম্মা যা ভালোবাসে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না!"

এই রাতটাই কেমন মায়াময় হয়ে ওঠে সুবলের কাছে  পলির কণ্ঠ কানে যেতেই

ভ্যানওয়ালাও বলে --"তা সত্যি কতা বলেচো বোন দাদু আর ঠাকমা তো আসলে হর-পাব্বতী!"

বলতে বলতে সে  হাসে আসলে তার নাম শিবে আর তার বউএর নাম পার্বতী হয়ত সেইটাই মনে পড়ে  গেছে তার!

সুবল আবার বলে--"দাদু, থেকি গিলিই পাত্তে ওই আগান-বাগান দে এই রেতে যাবা কি ঠিক?"

মনোমোহন বাবু বলেন--"আরে কিচ্ছু হবে না কো...! হলি সেই মাটে গিইলুম ত্যাকুন হত তা তেকুন হেলে সাপে কেমড়েচ..! বিষ নেইকো ঝাদের...! তাছাড়া সবার কাচেই টর্চ রইয়েচ...! ভ্যানে করে যেতিচি সপ ভেবো না দিনি...!"

সুবল কায়পুত্র বলে--"মুই কি শুদু ওই লতার কতা বলতিচি... টর্চ দে যাদের কাত কত্তি পারবা নাকো মুই তাদের কতাও বলতিচি...!"

মনোমোহন বাবু হাসলেনবল্লেন--"ঝা নেইকো  তার ঝন্যি এতো ভয় কেন যে তোঙ্গা?"

পলি মনোমোহনকে বলে---"দাদু,কিচু দানাদার আনতি দেই সোনারে? বড্ড খিদে নেগেচ"

মনোমোহন বলেন--"আর তাছাড়া সোনা, সোনার বন্ধু, আর এই শিবেরে এট্টু খাতি দেবা ধম্মের কাজ...!"

সোনা সঙ্গে সঙ্গে বলে--"দাদু মুই দ্যানাদার আর দুটো রসগুল্লা খাবো"

মনোমোহন বলেন--"আচ্ছা বেশ, তা তুই একলা ক্যান খাবি? সবাই খাবে!"

সবাই হাসে সত্যিই খিদে পেয়েছে সবার খালি হাড় জিরজিরে সুবল মাথা থেকে সারা গায়ে গড়িয়ে নামা ঘাম মুছতে মুছতে বলে--"না না, মোর এট্টা দ্যানাদার হলিই হবে!"

পলি তখন একটা সস্তা আর অনেক পুরানো মানি ব্যাগ থেকে টাকা গুনতে গুনতে বলে--"সোনা, যাতো মিষ্টি নে  আয় সবার ঝন্যি দুটো করে দ্যানাদার আর দুটো করে রসগুল্লা আর শিবদার ঝন্যি চারটে...!"

ভ্যানওয়ালা শিবের চোখদুটো চকচক করে ওঠে খিদে পেটে নিয়ে ভ্যান চালাচ্ছে সেও  বাড়িতে সেদিন তাদের গুগলির ঝোল রান্না হয়েছিল শুকনো লংকা আর পিঁয়াজ দিয়ে তার বউ পার্বতী যা রান্না করে না! আর ওই বড়ো পুকুরের একদম পাঁকের তলা থেকে তোলা হয়েছে সেই গুগলিগুলো অনেক পুরুষ্ট গুগলিগুলো বেশ গায়ে-গতরে! মুখের কাছটার চর্বিগুলো খেতে যা লাগে না! একটা গুগলি ঠিকমতো রান্না হলে এক থালা ভাত সাবাড় হয়ে যায়! ভ্যান যখন সে বের করছিল, তার বউ তখন গুগলি কষিয়ে সবে জল দিয়েছে কাঠের উনুনে মুহূর্তেই টগবগ করে ফুটে উঠেছে আর বাতাসে গুগলি-কষার যে গন্ধ ছড়িয়েছে তাতেই গাল ভর্তি হয়ে গেছে লালায় সেই সময় শিবেকে ভ্যান নিয়ে বেরতে হয়েছে পেটে খিদেয় চোঁচোঁ করছে কিন্তু সাপে কাটার খবর পেলে যে তাকে ভ্যান নিয়ে বেরতেই হবে ভাগ্যিস বেরনোর সময় তার বউ পার্বতী বাটিতে করে এক গাল ভাত গুগলির ঝোল দিয়ে মেখে ওর গালে তুলে দিয়েছিল নইলে এতোখানি পথ হয়ত ভ্যান চালিয়ে যাতায়াত করতেই পারত না এতোক্ষণ তার খিদের কথা মনেও ছিল না এখন সে ভীষণ খিদে অনুভব করল আর তখনি গুগলির ঝোলের কথা তার মনে পড়ল

সোনা বলল--"শিবেদা, চলো না দোকানে গে খাইগে সব্বাই"

শিবে ভ্যান থেকে নামে পলি বলে--"মুই যাব নাকো তুই মোর ঝন্যি নে আয়"

সুবলের মনের মধ্যে এক ঝলক আঁধার নেমে এল যেন! এই রাতে পলির মুখটা তার খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল

সবাই নেমে যায় সুবলের দোকানের রসগোল্লা আর দানাদার খেতে ভ্যানে একা পলি বসে থাকে

খেয়ে দেয়ে প্ল্যাসটিকের প্যাকেটে চারটে রসগোল্লা আর আলাদা প্লেটে দুটো দানাদার এনে পলির সামনে রাখেন মনোমোহন বাবুবলেন--"নে,খা!"

পলি হেসে বলে--"বাপরে! এতোগুলো রসগুল্লা খাব? আবার দুটো দ্যানাদারও?"মনোমোহন বাবুবলেন--"হ্যাঁ,খেয়ি নে দিনি মেলা ফচর ফচর না করে?"

পলি খেয়ে নেয়! খিদেয় পেটে তারও ছুঁচোয় ডন মারছিল শিবে আবার ভ্যান চালাতে আরম্ভ করে সবাই ঘুমে ঢুলছিল প্রায় ঢুলু ঢুলু চোখ ছিল সোনারও কিন্তু তাদের ভ্যান যখন এক বিশাল আম বাগান পার হচ্ছিল সেই সময়, ঠিক সেই সময় সোনার চোখ যেন কোন্ মন্ত্রের শক্তিতে জেগে উঠল একটা নির্দিষ্ট বাড়ির দিকে তার চোখ বাড়িটায় অনেক গাছ পালা আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা ইত্যাদি গাছের মধ্যে একটা ছোট্ট মাটির বাড়ি ছোট্ট একটা উঠোনের এক পাশে ছোট্ট একটা ডোবা সেই ডোবায় নামার ঘাট করা আছে খেজুর গাছের কাণ্ড দিয়ে সেই বাড়ির পাশ দিয়ে আসবার সময় সোনার চোখ ঘুরে গেল সেইদিকে সোনার বন্ধু সোনাকে খোঁচা মারল সোনা বলল ফিশফিশ করে যে সেও দেখেছে রাতের চোখ সওয়া আবছা আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ওই খেজুর গাছের কাঠের উপর দুজন মানুষ বসে আছে এই মাঝরাতে ওখানে কারা? শিবেও দেখেছে সব্বাই দেখেছে শিবে বলে--"রাম,রাম,রাম,রাম...!"

মনোমোহন বাবু বলেন--"ধেত্তেরি ভূতের নিকুচি করেচ! ওকেনে দুজন মানুষ রইয়েচ! মানুষ! জলজ্যান্ত দুজন মানুষ!"

কেউ  আর কিছু বলার আগে সোনা ঝট করে চলতি ভ্যান থেকে নেমে পড়ল এবং হনহন করে ওইদিকে ঘাটের কাছে এগিয়ে গেল তারপর যে ঠিক কী হল আর কী হল না ঠিক বোঝা গেল না একটা মেয়ের ভয়ার্ত চিৎকার তারপর দুটো ছেলে-মেয়ের  মধ্যে তর্কাতর্কি বচসা চিৎকার তারপর মারামারি মধ্য রাতের গ্রামের নিস্তব্ধতায় জেগে উঠল কুসুমতলি গ্রামের পাশের গ্রাম নয়ানজুলি গ্রামের মানুষেরা

 

মনোমোহন বাবু বাড়িতে ফিরে দেখেন তাঁর স্ত্রী সরমাদেবী তখনো  খান নি

তিনি বলেন--" না খেয়ি বসে রইয়েচো ক্যান?"

সরমাদেবীর মুখ গম্ভীর থমথমে

তিনি কোনো জবাব না দিয়ে সোজা রান্না ঘরে গিয়ে প্রবেশ করেন

খেজুর পাতার তৈরি চ্যাটাই পেতে দেন গ্লাসে জল দেনথালা ধুয়ে ভাত বাড়েন ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত মুসুড়ির  ডাল আলুর ভর্তা বেশ পিঁয়াজ,লংকা দিয়ে মাখা ঘুঁটের আগুন নিভে গেলেও মাটির উনুনে কড়াই বসিয়ে রাখলেই অনেকক্ষণ পর্যন্ত তা গরম থাকে ভাতের হাঁড়িও এমন ভিজভিজে আগুনের উপর বসিয়ে রাখলে অনেকক্ষণ গরম থাকেভিজভিজে আঁচে ডাল ফুটেছেও এতোক্ষণ গরম ডালে আলু ভাতে ঠাণ্ডা হলেও দারুণ উপাদেয় লাগে খেতে পলি, সোনা খেতে বসে পড়ে মনোমোহন বাবু  খেতে না বসে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েন

সরমাদেবীকে সোনা বলে--

 "দাদু আবার শুয়ি পড়ল ক্যান ঠামি?"

সরমাদেবী জবাব দেন না

সোনা ডাকে---" দাদু,কতোডা রেত হইয়েচ দেকো দিনি একোন না খেয়ি শুলি আর উটতি পারবা নাকো!"

বলে সে আবার সরমাদেবীর দিকে তাকিয়ে বলে-- "তুম ডেকতেচো না ক্যান ঠামি?"

সরমাদেবী কিছু বলবেন ভেবে মুখ খুলতে যান পলি থামিয়ে দেয়

ভাইকে বলে-- "তোর আর বুদ্দি-শুদ্দি কবে হবে বলদিনি ভাই?"

সোনার এমনিতে মন মেজাজ ভালো নয় তার নিজেরও যে বিশেষ বুদ্ধি নেই, তা আজই ফেরার সময় প্রমাণ হয়েই গেছে দিদি কি সেই কথারই ইঙ্গিত করল?

সোনার ভাতের গ্রাস আর স্বাদু লাগছে না সে মুখ নীচু করে নিল

পলি বলল-- " খেয়ি শুয়ি পড়গে যা!"

সোনা তাড়াতাড়ি কয়েক গ্রাস ভাত মুখে তুলে আরও তাড়াতাড়ি চিবিয়ে গিলল

বলল--" যাচ্চি দিদি!"

বলে সে উঠে যেতেই পলি বলল--"ন্যাও,স্বামী-স্ত্রী একোন মান ভেঙে পিরিত করো"

বলে পলি হাসল

সরমাদেবী বলেন-- "তা পরিবারের গুষ্টিশুদ্দু  সবাই মিলি কোম্নে গিয়েলে মোরে এট্টু জানালি কী এমন ক্ষতি হতো শুনি!"

পলি বলে-- "ঠামি এট্টা অঘটন ঘটি গিয়েচ! "

সরমাদেবী বলেন--"কী হয়েচ?"

পলি কীভাবে বলবে কথাটা ভেবে পায় না

সরমাদেবী আর মনোমোহনবাবু তার দাদু আর ঠামি দুজনেরই বয়স বাহাত্তর তখনকার দিনে দুজনে প্রেম করেছিলেন ক্লাসমেট ছিলেন

সরমাদেবী ছিলেন নাম করা জমিদার সব্যসাচী রায়ের একমাত্র সুন্দরী মেয়ে আর মনোমোহনবাবু দরিদ্র এক কৃষকের ছেলে সামান্য জমিজমা যেটুক আছে তাতে বারো মাসের পেটের ভাতটুকুও জোগাড় হয় না

ফলে যা হবার তাই হলসরমাদেবীকে তাঁর বাবা বিখ্যাত উকিল অর্জুন চক্রবর্তীর সাথে বিয়ের পাকা বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন অনেক আগে থেকেই মনোমোহনবাবুরা এমনিতে  হা ভাতে ঘর তার উপর নীচু জাত সেই সময় অসবর্ণ বিবাহ ছিল না বললেই চলে কোনো মতেই সরমাদেবী তাঁর বাবাকে বোঝাতে সক্ষম হন নি বিবাহ হয়ে গেল তাঁর সেই  সুদর্শন উকিল অর্জুন চক্রবর্তীর সাথে

মনোমোহনবাবু বুকে পাথর চেপে চুপ থাকলেন তিনিও মা-বাবার একমাত্র সন্তান মায়ের মুখের দিকে চেয়ে তিনিও চুপ ছিলেন সরমাদেবী শ্বশুরবাড়ি চলে গেলেন পরদিন গভীররাতে মনোমোহনবাবুর বেড়ার ঘরের টিনের দরজায় শব্দ কে ডাকে এত রাতে?

দরজা খুলে দিলেন মনোমোহনবাবুর মা  বিধবা নিভাদেবী সামনে ঘোমটায় মুখ ঢাকা সরমাদেবী

মনোমোহনবাবু বাইরে বের হলেন একদিন আগে বিয়ে করা স্বামীর সাথেই এসেছেন সরমাদেবী অগ্নি সাক্ষী করে বিয়ে করা স্বামীকে তিনি মনের কোনে বিন্দু পরিমাণও জায়গা দেননি সামনে মনোমোহনবাবুর মাও দাঁড়িয়ে! সরমাদেবী বুঝতে পারছেন না যে তিনি কী করবেন! কেমন করে নিজেকে বোঝাবেন? সরমাদেবী কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই কেঁদে ফেললেন মনোমোহনবাবুর মা অবাক হয়ে চেয়ে রয়েছেন এরকম একটা পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিলেন না কেউই তাই বিষয়টা কেমন করে এবং কে সামলাবেন প্রত্যেকেই যখন এমনই ভাবছেনঠিক তখনই সরমাদেবী  আরও জোরে জোরে কেঁদে ফেললেন মনোমোহনবাবুর মা এতোক্ষণে মুখ খুললেন--  "এসবের মানে কী?"

কেউ কোনো জবাব দেয় না

মনোমোহনবাবুর মা বলেন-- "দেখো তোমার বে হই গিচে সেকেনেই তোমারে থাকতি হবে আর ঝতি না থাকতি চাও থালি নিজির বাবার বাড়ি যাও একেনে কোনো জায়গা হবে নাকো!"

তিনি কী ভেবে কথা বললেন তা কেউই বুঝল না তবে এমন একটা সম্ভাবনা মনোমোহনবাবুর  চিন্তাতেও এল সরমাদেবী যাঁকে বিয়ে করেছেন  তিনিই মনোমোহনবাবুর বাড়িতে স্বয়ং এসেছেন সুতরাং আন্দাজ করাই যায় যেতিনি সমস্ত জেনে গেছেন

মনোমোহনবাবু তখন মনে মনে তৈরি হচ্ছেন তিনি কী বলবেন তিনি ভাবছিলেন যখন যে তিনি বলবেন এমন কিছু সম্পর্ক তাঁর সাথে ছিল না এমনই ভাবছিলেন যে মুহূর্তে ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন এক বিরাট ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন সরমাদেবী  নিভাদেবীর পায়ের উপর

"মা,মাগো...!" অসহায় নারী আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেন না হতচকিত নিভাদেবী  অপরিচিত নতুন বরের সামনে অপ্রস্তুতে পড়ে যান সরাতে যান সরমাদেবীকে কিন্তু কী শক্তি যে তখন ভর করেছিল সরমাদেবীর শরীরে! দুই হাতে নিভাদেবীর পা চেপে ধরে রাখলেন তিনি সদ্য বিয়ে করা নতুন বরের সামনে অন্য পুরুষের মায়ের পায়ে স্থান চাইছে সে সত্যিকারের ভালোবাসা সবসময়  নৈবেদ্য হতে চায় নতুন বউ হু হু হু হু কেঁদে যাচ্ছে সরমাদেবীর না বলা সমস্ত কথাই বলা হয়ে গেল অশ্রু এক মুহূর্তে এত কথা বলার ক্ষমতা রাখে যার সাথে শত শত বছর ধরে বলা কথারও তুলনা হয় নামনোমোহনবাবু অপরাধীর দৃষ্টি নিয়ে নতুন বরের দিকে তাকালেন

বললেন-- " বিশ্বেস যাও, ওর সাথে কোনো সম্পক্ক নেই কো মোর!"

নতুন বর কিছু বলেন না

মনোমোহনবাবু সরমাদেবীর বুকফাটা কান্না আর সহ্য করতে পারছেন না এদিকে নতুন বর ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে রয়েছেন তাঁরই বিবাহিতা স্ত্রী মনোমোহনবাবু আর পারলেন না তিনি এবার বললেন-- "এমন করতিসেন ক্যান আপনি? আপনার সোয়ামী কী ভাবতিসেন বলেন তো?"

এক ধমক দিয়ে উঠলেন সরমাদেবীর বিবাহিত স্বামীবললেন-- "চুপ একদম চুপ! ন্যাকামি হচ্ছে?"

মনোমোহনবাবু এবং তাঁর মা নিভাদেবীও চমকে ওঠেন গম্ভীর গলা দামি পোষাক এবং এইরকম গলার স্বরেই একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে এইসময় কান্নার বেগ কমে আসে সরমাদেবীর তিনি প্রায় ফিশফিশ করে বলেন-- " আমি ওনাকে সব বলে দিয়েছি"

চমকে ওঠেন মনোমোহনবাবুর মা নিভা দেবীও

সরমাদেবীর স্বামী অর্জুন চক্রবর্তী

 মনোমোহনবাবুকে বললেন--  "এই রকম ভালোবাসা ফেলে তো মানুষ স্বর্গেও যেতে চায় না আর আপনি চুপচাপ বসে বসে দেখলেন যে আপনার ভালোবাসা চোখের জলে বুক ভাসাতে ভাসাতে অন্য একজনের সংসার করতে যাচ্ছে? কাপুরুষ কোথাকার!"

বলে তিনি পকেট থেকে মোবাইল বার করে সময় দেখলেন

তারপর বললেন--" আমি চললাম তাহলে সরমা,আপনি ভালো থাকবেন আশা করি"

ভদ্রলোক পা বাড়াতেই মনোমোহনবাবু পথ আগলে দাঁড়ালেন

বললেন--"আপনি কোতায় যাতিসেন? মুই কী করবওরে বাবা, সরমার বাবা সব্যসাচী রায় মোরে মেরে ফ্যালাবে ওরেও কেটে মেলা টুকরো করে কুত্তারে দিয়ে খাওয়াবে"

ভদ্রলোক বললেন--

"না, উনি কিছুই করবেন না ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া আইনত অপরাধ!"

বলে তিনি একটু থামলেন

তারপর বল্লেন--"আমি আইন মোতাবেক আপনাদের রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করব চিন্তা করবেন না জমিদার সব্যসাচী রায়কে আমিই সামলাব ভাববেন না আপনারা!"

বলে সরমাদেবীর সদ্য বিবাহিত স্বামী চলে যেতে যেতে একবার মুখ ফিরিয়ে তাকালেন

বললেন--" সুখে থাকুন দুজনে!"

তাঁর চোখের কোনে স্পষ্ট জল দেখলেন মনোমোহন বাবু কিন্তু সরমাদেবীর তা চোখেই পড়ল না!

আজ এতগুলো বছরেও সরমাদেবী এবং মনোমোহনবাবুর  পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ বিন্দুমাত্রও কমেনি!

দুজনেই দুজনকে চোখে হারান! পলি তাই ভেবে পাচ্ছে না যে তার দাদুকে যে সাপে কামড়িয়েছে তা কেমন করে তার ঠামিকে বলবে?

সোনা আবার রান্না ঘরে এসেছে তখন

সে তার দিদির দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে পলি ইশারা করছে কেমন করে তাদের দাদুকে যে সাপে কামড়িয়েছিল সেই কথাটা বলবে?

সোনা তখন হঠাৎ সেদিনের ক্লাব ঘরের সেই বিশাল গোফরোর আমদানির কথা তুলল কী বিশাল তার সাইজ আর কত্তো জোরে জোরে ফোঁসফোঁস করছিল আর ফুলে ফুলে উঠছিল তাই বলছিল বলতে বলতেই সোনার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল এত্তো বড়ো গোখরো সে তার জীবনে কখনো দেখেনি ঠামি বলেন--"তারপর? তারপর কী হলো তাই এজ্ঞে বলোদিনি!"

সোনা বলে--" তারপর আর কী? সেই যমদূত তো আঙ্গা দিকি এজ্ঞে এসতেচে ত্যাকোন! মোরা চাদ্দিকি অস্তর খুঁজতিচি... না মারলি এই বিষ ঝেকেনে ছোবল মারবে, সেকেনেই মড়া মানুষ!"

সোনা বলেই চলে--"মোরা তো কিচ্চুটি পেতিচি নেকো, ঠিক ত্যাকোন লোডশেডিং!"

ঠামি বলেন--" কী সব্বোনেশে কতা! মাগো! তাপ্পর কী হলো? তোরা আর কেডা কেডা ছিলিস? সব্বাই ঠিক আচিস তো বাপধন?"

সোনা বর্তমান ভুলে যায়! সেই বীভৎস ভয় তাকে গ্রাস করে নেয় আর সে বলে ওঠে--"ত্যাকোনই তো গোপে চিচকার করে মোরে ডেকেলো বলে--"সোনাদা, তোমার দিদি ডেকতেচ শিজ্ঞিরি বাড়িত এসো তোমার দাদুরি সাপে কেমড়েচ!"

সোনা একটু থেমে আবার যোগ করল-- " সেই ঝন্যিতি  ঠামি দাদার নে হাসপাতালে গিইলুম মোরা সাপে কেমড়েচে দাদুরি!"

সোনা চলে গিয়েছিল নিজের ঘরে তারপর ঘটনাটা কোনদিকে কেমন মোড় নেয় দেখার জন্য আবার এসেছে সে না এলে কী হতো বলা বড়ো মুস্কিল কী হলে কী হতো তার কোনো গ্যারাণ্টি নেই কিন্তু বর্তমানে কী হয়েছে তার ছবি চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে বর্তমানের ঘটনারই যানে চড়ে ভবিষ্যত আসে

পলি আর সোনা আর মনোমোহনবাবু সেই একই পথ ধরে মোচার খোল সরকারি হাসপাতালে .গিয়ে যখন পৌঁছাল, তখন মধ্যরাত পার হয়ে গেছে ভ্যান থেকে ধরে ধরে নামানো হলো সরমাদেবীকে প্লাস্টার খসা টিমটিম করে জ্বলতে থাকা ফ্যাটফ্যাটে সেই একই হাসপাতালে যখন সরমাদেবীকে প্রবেশ করানো হয়, তখনো তিনি অজ্ঞান কোনো ডাক্তার তখন হাসপাতালে নেই সিস্টাররাও নেই যিনি ছিলেন তাঁর সেদিন ছুটি অন্যজন যিনি তাঁর বদলে আসবেন তিনি তখনো পৌঁছাননি এইরকম আধা সত্য বা আধা মিথ্যা সংবাদ শুনতে ওইসব এলাকার মানুষ অভ্যস্ত ডাক্তার রুগি দেখেন দয়া করে সেরকম মন রুগি এবং ডাক্তার উভয়েরই মনোমোহনবাবু নিজেই সরমাদেবীকে ধরে ধরে শুইয়ে দিলেন তারপর অপেক্ষা করতে লাগলেন একজন এলেন তিনি হাতুড়ে নাড়ি দেখে কিছু না বলে ভিতরে গেলেন সন্দেহটা সেই মুহূর্তেই এলো মনোমোহনবাবুর তিনি সেই হাতুড়ে ডাক্তারের হাতে-পায়ে ধরতে লাগলেন

" ডাক্তারবাবু, কী হইয়েচ মোর সরমার? বেঁচে আচ কিনা সেইটাই এট্টূশ বলে দেন" হাতুড়ে ডাক্তাররাই অধিকাংশ সময় থাকেন হাসপাতালে কিন্তু মৃত্যু হলে তাঁরা কথা বলেন না মৃত্যু না হলে তাঁরা তাঁদের জ্ঞান অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তাতে ভুল চিকিৎসায় মারা গেলেও তাঁদের কোনো শাস্তি-টাস্তি হয়না কিন্তু মৃত্যুর খবর কিছুতেই তাঁরা উচ্চারণ করেন না মনোমোহনবাবুর কেমন যে লাগছে তা তিনি ভাষা দিয়ে বোঝাতে পারবেন না সরমা শুয়ে আছেন চোখের পাতা বন্ধ তিনি নি:শ্বাস নিচ্ছেন না এটুকু বোঝাই যাচ্ছে! তবে কী তাঁকে একা করে দিয়ে চলে গেলেন তিনি? এই দুনিয়ায় সরমা না থাকলে তাঁর বাঁচার ইচ্ছেটাই মরে যায় | মনোমোহনবাবু ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে চেয়ে রয়েছেন পলি আর সোনা এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছে একজনও কি ডাক্তার নেই? সিস্টার নেই? সত্যিই নেই?

একজন সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ সারাদিন রান্না করেছেন,খেয়েছে্ন রাতে খান না বিশেষ তিনি

সেদিন তো না খেয়েই ছিলেন মনোমোহনবাবুকে সাপে কামড়িয়েছে শুনেই তিনি ধ্মাস করে মাটিতে পড়ে গেলেন আর উঠলেন না

পলি অবশেষে পাকড়াও করল একজন সিস্টারকে

বলল--"আমি চাই এখুনি এই মুহূর্তে আমার ঠামিকে দেখা হোক আমরা কোথায় যাবো বলুন! একটাই মাত্র হাসপাতাল এই এলাকায়! সেখানে নেই কোনো ডাক্তার! রাত-বেরাতে আমরা কোথায় যাব? বলুন!"

কথায় কাজ হলো মনেহয় পলির উচ্চারণে শিক্ষার ছোঁয়া আছে সিস্টার ফোন করলেন কোথাও মিনিট পনেরোর মধ্যে একজন ডাক্তার এলেন স্টেথো ঝুলিয়ে সরমাদেবীকে ভালো করে পরীক্ষা করতে হলো না স্টেথো দিয়ে বুক দেখলেন হাত ধরে নাড়ি দেখলেন বোজা চোখের পাতা টেনে খুললেন অবশেষে বললেন--"উনি আর নেই এক ঘণ্টা আগেই উনি সকলকে ছেড়ে চলে গেছেন" সোনা "ঠামি" বলে তার সেই বৃদ্ধ শরীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল পলি ঠামির পায়ের উপর মুখ ছোঁয়ালো! দুটো চোখের জলে ঠামির পা ভিজে যেতে লাগল সত্যিকারের মায়ের মতোই ভালোবেসেছেন তিনি  পলিকে আর সোনাকে একমাত্র ছেলের মৃত্যুও তাঁকে টলাতে পারেনি এই ছোটো ছোটো দুটো বাচ্চার মুখের দিকে চেয়ে তিনি সব ভুলে গেছিলেন নিজে না খেয়ে থেকেছেন দিনের পর দিন অথচ কী বড়োলোকের মেয়ে! এতো ভালো কী করে বেসেছেন তিনি মনোমোহনবাবুর মতো একজন দরিদ্র মানুষকে! শুধু ভালোবেসেই একটা ছোট্ট জীবন কাটিয়ে দিলেন

কোনোদিন কোনো অভিযোগ করেন নি কোনোদিন বলেন নি যে "আমি ভুল করেছি তোমাকে বিয়ে করে!"

মনোমোহনবাবু মাঝে মাঝে বলতেন--"তোমার যেবন নষ্ট কদ্দিচি মুই কোনো শখ-সাধ মেটাতি পাল্লুম নাকো"

তিনি বলতেন সরমার মুখ ফুলে যেত এই কথা শুনে তিনি বলতেন--" থালি মোদের ভালোবাসার কুনো মূল্য নেই বলতি চাচ্চো তুমি?"

বলে একটু থেমে আবার শুরু করেন--"তুম মোরে পেইয়ে থালি সুকি না বুজলুম"

মনোমোহনবাবু চুপ থাকতে পারেন না তিনি জানেন যে, সরমাকে না পেলে তাঁর বেঁচে থাকাই ছিল অসম্ভব!

তিনি বলে ওঠেন--"ভাগ্যিস তুমি ওরাম্ভায় চলি এয়েলে নাতো কেরাম্ভায় কী হতো বলোদিন!"

মনোমোহনবাবু হাসেন এতো যুগ বাদে এইসব মনে পড়লেও তাঁর হাসি পায় সুখের হাসি এদিকে পলি নিজেকে সংযত করার কথা ভাবছে কেননা, সে জানে যে, তার দাদুকে তাকেই সামলাতে

হবে তাছাড়া ডাক্তারবাবু লিখে দিচ্ছেন ডেথ সার্টিফিকেট সে ব্যাপারেও জিজ্ঞাসাবাদ করছেন ডাক্তার শিবেও হাপুশনয়নে কাঁদছে সরমাদেবীর প্রাণহীন শরীরটা শিবের ভ্যানে তোলার সময়েও তাকেই হাতও লাগাতে হলো মানুষ মারা গেলেই বোধহয়, মানুষের শরীর ভারী হয়ে যায়! পলিকেও অনেকটাই শক্তি লাগিয়ে তার প্রিয় ঠামির শরীরটা সবার সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে তুলতে হলো শিবেদাকেই একটা দড়ির ব্যবস্থা করতে দেখা গেল সরমার শরীরটাকে বেঁধে দেওয়া হলো সেই দড়ি দিয়ে শিবেই চোখের জল মুছতে মুছতে বাঁধলো কোনাকুনি করে নইলে ভ্যানে আরও তিনজন বসতে পারবে না সরমার শরীরটাকে যত্নে বাঁচিয়ে তিনজন বসল যেন সরমার ব্যথা না লাগে এমন করে বসা হলো ভ্যান ছেড়ে দিল শিবে সেই একইরকম এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে ভ্যান চলছে ঘট ঘটাং করে উঁচু নিচু পথে ভ্যান চলছে সরমার মাথাটা অল্প অল্প দুলছে বোঝার কোনো উপায় নেই যে, সরমা আর বেঁচে নেই পলির হঠাৎ খেয়াল হল! আরে, তার দাদু কী করছেন! পলি দাদুর দিকে তাকালো দেখলো দাদু তাঁর চোখদুটো দিয়ে ঠামির মুখের দিকে চেয়ে রয়েছেন অন্ধকারে  কী দেখছেন দাদু? পলি দাদুর কোলে তার হাতটা তুলে দিল এই মুহূর্তে তার দাদুকে সে কী বলে সান্ত্বনা দেবে ভেবে পেল না ঠামি ছাড়া তারাই বা কাটাবে কেমন করে দিন? সোনাও কাঁদছে ফোঁচ ফোঁচ করে প্রাথমিক কান্নার সেই বেগ ক্রমে কমে আসছে পলিরও কিন্তু বুকের মধ্যে শূন্য! শূন্যতা এতোটা জ্বালায় মানুষকে! শিবের ফোনে বারবার ফোন আসছে গ্রামে শিবেই ফোন করে খবরটা দিয়েছে সব্বাইকে একটু আগেই যে রাস্তা দিয়ে তারা ফিরেছে, এখনো সেই রাস্তা দিয়েই ফিরছে সেই শিপ্রাদের বাড়ির পাশ দিয়ে আসার সময় সোনা একবারও ফিরেও চাইল না সে দেখলো না সে- পুকুরঘাটে এখনো কেউ বসে আছে কীনা! এমনকি সে শিপ্রাদের বাড়ির দিকেও একবারও তাকিয়ে দেখলোও না অথচ একটু আগেই সে শিপ্রার পাশে কোনো ছেলেকে দেখেই উন্মত্ত হয়ে ঘুষি মেরে বসেছিল আসলে সেটা ছিল শিপ্রারই বন্ধু অমিতা অমিতার শরীরটা বেশ বড়োসড়ো রাতের অন্ধকারে ওড়নাবিহীন লম্বা ঝুলের জামাকে পাঞ্জাবী পরিহিত পুরুষ ভেবে সোনার প্রাণ যেতে বসেছিল এই হয় মানুষের জীবন সবসময় বর্তমান নিয়েই চালিত হয় বর্তমান যদিও অতীতের উপর দাঁড়িয়ে থাকে এবং বর্তমানই ভবিষ্যতের পথ বাতলে দেয় তবুও মানুষ বাঁচে বর্তমান নিয়েআর সেই বর্তমানের আয়ু কী ভীষণ কম

তখনো রাত অথচ মোলায়েম একটা ভোরের আস্তরণ সেই রাতের শরীরে পড়ে রয়েছে ঠিক এমন সময়ে ভ্যান এসে দাঁড়ালো কুসুমতলি  গ্রামের  পলিদের বাড়ির সামনে পলি টের পেল ওই ভোরেও প্রায় সমস্ত গ্রামবাসী এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাদের বাড়িতে ভ্যান পৌঁছাতেই ভোরের বাতাস ভারি হয়ে উঠল সমবেত কান্নায় পলি সব্বাইকে সান্ত্বনা দিচ্ছে কিন্তু নিজেও হাপুশনয়নে কাঁদছে! সোনার বন্ধুরাও এসেছে কীযে যন্ত্রণা নিকটজনের বিদায়বেলায়! পলি-সোনার ঠামি নয়, যেন তাদের দ্বিতীয় বার মাতৃবিয়োগ হলো ঘর দুয়ার খাঁ খাঁ করছে ঠামিকে শোয়ানো হলো উঠোনের তুলসিতলায় ধূপ জ্বেলে দিল শিয়রে গ্রামেরই কেউ কপালে সিঁদূর লেপে দেওয়া হলো গ্রামের এঁয়োতিরা ঠামির সিঁদূর নিয়ে নিজেদের সিঁথি রাঙিয়ে নিল এঁয়োতির সিঁদূর! আহা! যেন স্বর্গের অক্ষয়বাসের একমাত্র অবলম্বন! পুরো কাজ করে গেল পলি মুখ বুজে গ্রামের লোকজন তখনো

বাড়ি ভর্তি কে যেন বাঁশ কেটেছে কে যেন সেই বাঁশের উপর ঠামির ব্যবহার করা  কাঁথা-বালিশ পেতেছে, কে যেন ঠামিকে বিয়ের সময়ের মতো চন্দনের ফোঁটা দিয়েছে, কে দিয়েছে দুই চোখের উপর তুলসিপাতা যেন তৈরি হয়েই ছিল এমন কিছু কাকে কোন অংশ অভিনয় করতে হবে তাও যেন শিখিয়ে রেখেছিলেন কেউ এমন নিঁখুত ভাবে সমস্ত ঘটে চলল তারপর এল সেই সময়টা যখন ঠামির মৃতদেহটাকে কাঁধে তুলতে হবে তুলেও নিয়েছেন চারজন কারো হাতে খই আর খুচরো পয়সা পাড়ারই কোনো এঁয়ো একটা বালতিতে গোবর-জল গুলে নিয়ে রেডি সরমার শরীরটা বাঁশের দোলায় তোলার সাথে সাথে কয়েকজন চিৎকার করলেন--"বলো হরি!" একদল সুর চড়িয়ে প্রায় সাথে সাথে বললেন--"হরিবোল!"

একজন পিছন পিছন গোবর ছড়া দিচ্ছেন

ঠিক সেই সময় ঠিক সেই সময় নাটকের অন্তিম পর্বের মতো কেউ গিয়ে মনোমোহনবাবুকে ডাকলেন--" দাদু গো! কিছু তো বলো!"

দাদু বসে ছিলেন মাটির দাওয়ায় সেই ব্যক্তির ছোঁয়া লাগতেই মাটির পুতুলের মতো আলগোছে গড়িয়ে পড়লেন বারান্দা থেকে উঠোন

ক্রমশ-------------  

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.