তবু মনে রেখো
রাজশ্রী দে
অনেক অনেক বছর আগে তখনও ব্রিটিশরা এদেশ ছেড়ে যায়নি, আজ বলছি ঠিক তখনকার কথা, উত্তর কলকাতা, সেই লাল লাল বাড়ি, আর সবুজ খড়খড়ি দেওয়া জানলা, সেই রকম ই এক বাড়িতে থাকতো এক পরিবার। পাঁচ ছেলে মেয়ে সেই ভদ্রলোকের, দুই ছেলে তিন মেয়ে, সবাই খুব ছোট ছোট, আর তাঁর স্ত্রী একা সামলাতে পারতেন না এই ছোট ছোট বাচ্চাদের তাই তাদের দেখাশোনা করার জন্য রয়েছে এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা, তাছাড়া কাজকর্ম করার লোক তো আছেই। ভদ্রলোক বেশিরভাগ সময়ই কলকাতার বাইরে থাকতেন , কাজের সূত্রে,আর গ্ৰাম থেকে আত্মীয় স্বজন আসা তো ছিলই, কেউ আসতো ডাক্তার দেখাতে, কেউ কলেজে ভর্তি হতে, কেউ বেড়াতে, হিমশিম খেতেন ভদ্রমহিলা। বাচ্চাদের যে দেখাশোনা করতেন সেই গৌরী মাসী রোজ সকাল নটা নাগাদ বাচ্চাদের একটা ক্রেশে নিয়ে যেতো, সেখানে খেলা হতো নানা রকমের, দুধ, চকলেট দেওয়া হতো তারপর মেমসাহেবরা পিয়ানো বাজিয়ে তাদের ঘুম পাড়াতো, বেশ কয়েকঘন্টা পর ছুটি হয়ে যেতো , ভাবা যায় আজ থেকে কতো বছর আগে ও ক্রেশ ছিল।
ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে ছেলে মেয়েরা , তাদের প্রথম তিন জনকে দেওয়া হোলি চাইল্ডে, আর দুজন ছেলে মেয়ে বড্ড ছোট। এগল্পটা এবাড়ির মেজো মেয়ে রোজি কে নিয়ে, সব ভাই বোনদের মধ্যে সে একটু আলাদা, জেদি, একগুঁয়ে, শান্তশিষ্ট ভাইবোনেদের মধ্যে বড়োই বেমানান,বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা প্রকাশ পাচ্ছে বেশী, এখন সে ও তার দিদি মেয়েদের স্কুলে ভর্তি হয়েছে, নাচ, গান, আবৃত্তি সবই তার পচ্ছন্দের একমাত্র পড়াশোনা ছাড়া, স্কুলের সিস্টাররা ভালোবাসে তাকে , এক প্রাণচঞ্চল মেয়ে সে। এক খৃস্টান পরিবারের সঙ্গে চার্চে যায় সে, মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রভু যীশুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে তার খুব ভালো লাগে। স্কুল থেকে ছোট্ট বাইবেল দিয়েছে ,সেটা পড়তে তার বেশ ভালোই লাগে।মায়ের থেকে বাবা অনেক বেশি প্রিয় তার, বাবা বাড়ি থাকলে যতোরকমের নাচগান শিখেছে সব বাবা কে দেখানো চাই, বাবাও যে ধৈর্য্য ধরে দেখেন তার মেজোমেয়ের সব কিছু, উৎসাহ দেন। গরমের ছুটিতে বেড়িয়ে পড়েন সবাই মিলে বেড়াতে, কখনও দার্জিলিং, কখনও বেনারস, পুরী।
রোজি স্কুল থেকে ফিরেই দিদি আর ছোট বোনের সঙ্গে চলে যায় পাশের মাঠে মণিমালাতে, তখন মণিমালা আসর হতো , ছোট ছেলে মেয়েদের খেলানো , গান শেখানো এসব কিছু। ভাইয়েরা যেতো হেদুয়ায় সাঁতার শিখতে।হঠাৎ করে মণিমালাতে আসতে শুরু করলো একটা ছেলে নাম জর্জ, আংলো ইণ্ডিয়ান, পাড়ায় নতুন এসেছে, আলাপ হলো সবার সঙ্গে, ক্লাস এইটে পড়ে সে।রোজি তখন ক্লাস সেভেন, সে সবাই কে গল্প করে বেড়াচ্ছে জর্জের সঙ্গে তাদের আলাপ হয়েছে, তার দিদি যারপরনাই বিরক্ত। রোজ তার মণিমালা যাওয়া চাই, ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে তার সঙ্গে জর্জের, বড়দিনে সব বন্ধুদের সঙ্গে ওদের বাড়ি গেছিল রোজি, কি সুন্দর বাড়ি, আর সবথেকে সুন্দর জর্জের মা , বাবা আর ছোট্ট বোন।
রোজির পড়ায় মন নেই, ওদিকে জর্জের একই অবস্থা, এখনকার মতো ভালোবাসার কথা স্পষ্ট করে বলার রেওয়াজ ছিল না।বিকেলে দুজনের ই দেখা হয় কিন্তু কেউই বলতে পারেনা তাদের মনের কথা। তখন পরীক্ষা হয়ে গেছে জর্জ তার গ্ৰাণ্ডমাদারের কাছে গোয়া যাবে , ভীষন মন খারাপ তার, একটা চিঠিতে ভালোবাসার কথা লিখে সে বন্ধুর হাত দিয়ে পাঠালো, বন্ধু ভুল করে দিয়ে এলো দিদি ডেইজির হাতে, শুরু হলো চরম অশান্তি বাড়িতে ,রোজি র বাড়ি থেকে বারণ, মা দিদি কেদে কেদে চোখ ফুলিয়েছে, বাবার চিৎকার , সব দোষ মায়ের, রোজি র্নিবিকার, এদিকে জর্জ কিছু না জেনেই গোয়া রওনা দিয়ে দিয়েছে।
রোজির বেড়োনো বন্ধ, তখনকার দিনে রক্ষণশীল পরিবার তাদের, গরমের ছুটি এখন, গ্ৰাম থেকে দাদু ঠাকুমা এসেছেন ডাক্তার দেখাতে, কিছুই ভালো লাগছে না তার, সেই প্রাণ চঞ্চল মেয়েটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে, দুপুরে সবাই ঘুমিয়ে পরলে জানলার খড়খড়ি ফাঁক করে দেখে সে রাস্তা, মাঝে মাঝে সনপাপড়ি, মিষ্টি বিক্রেতারা হেঁকে হেঁকে যেতো। মাঝে মাঝে উঠোনে ছোট বোনের সঙ্গে খেলতো কিতকিত, কিন্তু বাবা বিদেশ থেকে ডল নিয়ে এসেছেন, বোনের মন শুধু ঐ ডলের দিকে, ডলকে নিয়ে পাউডার মাখাচ্ছে, চুল আঁচড়াচ্ছে ।
তার জন্য ও নিয়ে এসেছে কিন্তু সে সাজিয়ে রেখে দিয়েছে, মন ভালো নেই তার। এভাবে ছুটি শেষ হলো , তারা একদিন গিয়েছিল ভিক্টোরিয়া, সেখান থেকে নিউমার্কেট।আর একদিন দাদু ঠাকুমার সঙ্গে দক্ষিণেশ্বর গিয়েছিল তারা।
স্কুল খুলে গেছে, দিদি বোন সঙ্গে যেতে হচ্ছে তাকে , আগে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে যেতো, তার ওপরে গৌরী মাসী আনা নেওয়া করছে। স্কুল যাতায়াতের পথে দু একবার দেখা হয়েছে জর্জের সঙ্গে, বন্ধুদের মাধ্যমে দু চারটে চিঠির আদান প্রদান ও হয়েছে। তারপর শুনেছে জর্জের বাবার ট্র্যান্সফার হয়ে গেছে দেরাদুন , তারা সপরিবারে চলে যাচ্ছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে একবার দেখা হয়েছিল, পাড়ার বিট্টুর হাত দিয়ে পাঠিয়েছিল একটা চিঠি আর তার মধ্যে ছিল একটা গোলাপ, অনেক বড় বড় করে তাতে লেখা ছিল Forget me not.
এরপর বহু বছর কেটে গেছে, রোজি পৌঁচ্ছেছে গতকাল দার্জিলিংয়ে, তার বয়স এখন বাষট্টি তেষ্টট্টি, সে যে ওল্ড এজ হোমে থাকে সেখান থেকেই সদলবলে বেড়াতে আসা।ব্যারাকপুরে গঙ্গার ধারে এক বিশাল বাগান বাড়িতে থাকে তারা , ভাই বোনেরা বিয়ে থা করে সবাই নিজের নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তার আর সংসার করতে মন চায় নি। দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা করার পর অবসর নিয়ে স্বেচ্ছায় চলে এসেছে সে এই হোমে। আজ আর ম্যালে যাওয়ার ইচ্ছে নেই , বড্ডো টায়ার্ড লাগছে, অনেকেই গেল বেড়াতে।দুদিন এদিক ওদিক ঘোরার পর ঠিক হলো টাইগার হিল যাওয়া , যাদের অসুবিধে তারা গেলেন না। ভোর রাতে গাড়ি আসবে, তাই আজ ম্যাল থেকে ফিরে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পরতে হলো।
পরের দিন অন্ধকার থাকতেই তারা রওনা হয়ে গেল, দেখতে পাবে কিনা সেই দৃশ্য , আকাশ পরিস্কার থাকবে কিনা এরকম হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে তারা এঁকেবেঁকে চলতে লাগল, বাইরে অন্ধকার।অবশেষে অনেক উচুঁ তে গন্তব্য স্থলে পৌঁচ্ছোলো, তখনও টুরিস্টদের ভীড় সেভাবে হয়নি। সামনে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কিছু বিদেশি, মীরা দি সবার আগে যাচ্ছেন, সেই দলটার কাছে গিয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছেন,হাত নেড়ে ডাকতে শুরু করেছেন তাদের, অগত্যা সবাই পা চালালো সেদিকে। মাঝখানে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে সবাইকে বোঝাচ্ছেন পাহাড়ের কথা, রোজির দেখেই মনে হলো কোথায় যেন দেখেছে সে, অনেক অনেক দিন আগে সেই ছোট্ট ছেলেটার মুখের আদলের সঙ্গে মিল পেলো সে, এও কি সম্ভব?তারপর অন্যান্যদের কাছ থেকে নাম জানলো জর্জ, একসময় কিছুদিন উত্তর কলকাতায় থাকতো, এখন থাকে লণ্ডণে, বন্ধুদের সঙ্গে ইণ্ডিয়া ভ্রমণে এসেছে। তৎক্ষনাৎ রোজি র মনে হলো পৃথিবীটা কি ছোট, নাহলে এতো বছর পর এখানে দেখা হয়।অনেক বছর ধরে সে কলকাতার ঐ বাড়িতে অপেক্ষা করেছে একা একা । আচমকা সবাই চিৎকার করে উঠলো, সূর্যোদয় হচ্ছে , অসাধারণ সেই দৃশ্য তারা দেখলো পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, বরফে ঢাকা পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো যেন গলে গলে পরছে, জীবন সার্থক, সে এক অপরূপ দৃশ্য, আজ আর হাতের ওপর হাত রাখা যায় না, অনেক সময় পেরিয়ে এসেছে তারা, পরিচয়টা বরং
তোলা থাক। রোজি আজ ও মনে রেখে দিয়েছে তার পরম প্রিয় মানুষকে, ভালোবাসা হারিয়ে যায় না।
==============
রাজশ্রী দে

