বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

গল্প ।। এক টুকরো আগুন ।। স্বপন চক্রবর্তী


 

এক টুকরো আগুন 

 স্বপন চক্রবর্তী 

 

চিরন্তন প্রেমের গল্প বাংলা সাহিত্যকে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সময় থেকেই সমৃদ্ধ করে আসছে। তবে আজ যে কাহিনী আপনাদের কাছে তুলে ধরতে চলেছি সেটি  কিন্তু সেই অর্থে প্রেমের কাহিনী নয়। বরং বলা যেতে পারে, যে কাহিনীটি কয়েকটি  মানুষের চলার পথের কঠিন বাস্তবের মর্মরে গাঁথা এক অশ্রুসিক্ত সত্য ঘটনা। জীবনের গল্প। আর সেই সাথে আমার জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতাও বটে। যদিও গল্পের স্বার্থে কুশীলবদের নামগুলির আমি পরিবর্তন করতে বাধ্য হলাম। 

সুধী পাঠকবৃন্দ, আসুন আমার কাহিনীর অন্দরে প্রবেশের আগে একজনের  সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই। ভুবন। ভুবনকে আপনারা চিনবেন না। কিন্তু আমার গল্পের সাথে ভুবনের একটা বিশেষ যোগসূত্র অবশ্যই আছে। 

ভুবন ছিল আমাদের বাড়ীর একজন পরিচারক। ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো। সকালে বাজার করা থেকে দুপুরে মা,দিদিদের সিনেমার টিকিট কেটে আনা , আবার আমাদের 'স্কুল' থেকে 'টিউশনি ক্লাসে' নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা-সব কিছুতেই ভুবন। 

ভুবনদের বাড়ী ছিল কাকদ্বীপে। কাকদ্বীপে আমাদের কিছু ধানজমি ছিল। ভুবনের বাবা মদন কাকা সেই জমিতে চাষ করতেন আর মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ীতে চাল নিয়ে আসতেন। পরে অবশ্য বাবা সেই জমি বিক্রয় করে দেন। যাই হোক, একদিন মদন কাকা ভুবনকে আমাদের বাড়ী নিয়ে আসেন। ভুবনের বয়স তখন বছর বারো হবে। সে নাকি আগে কলকাতার কোনো মিষ্টির দোকানে কাজ করতো। আমার থেকে বয়সে হয়তো সে বছর দুয়েকের ছোট ছিল। তবে আমার সঙ্গে ভুবনের খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল। আমি পরিবারের সব থেকে ছোট সদস্য ছিলাম। আমাকে ভুবন ছোড়দা বলে ডাকত।আমি ভুবনকে কিছু লেখাপড়াও শিখিয়েছিলাম। ভুবন বাংলা, ইংরাজী সব পড়তে পারত। হিসেবও করতে জানতো। 

ভুবনের মা তাকে জন্ম দেবার পরেই মারা যান। আর ভুবনের বাবা মদন কাকা মারা যাবার পর, ভুবনের জেঠার ছেলেরা ভুবনকে মেরে তাড়িয়ে দেয়। তখন থেকেই ভুবন আমাদের বাড়ী পাকাপাকিভাবে থেকে যায়। বাবা ভুবনকে পরে একটা রিক্সা কিনে দিয়েছিলেন। সে সেই রিক্সা করে আমাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত। ভুবনের যখন বছর পঁচিশ বয়স, তখন আমার বাবা,মা ভুবনের সঙ্গে আমাদের বাড়ীর কাছে বাগদী পাড়ায় একজন মা-বাপ হারা অনাথা অসহায়া মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। তার আগে ঐ পাড়াতেই বাবা ভুবনের নামে একটা ছোট জমি কিনে সেখানে বসবাসযোগ্য একটি পাকা বাড়ি তৈরী করে দিয়েছিলেন। ভুবন এখন তার বৌকে নিয়ে সেখানেই থাকে। বয়স হয়ে গেছে। আর সে বিশেষ পরিশ্রম করতে পারে না। আমার বাবা মাও একে একে পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন। আমার দিদিরাও বিয়ে করে অনেকদিন আগেই শ্বশুর বাড়ী চলে গেছে। 


ভুবনের একটি ছেলে, একটি মেয়ে। আমাদের কাহিনী ভুবনের বড় ছেলে হারান বা হারুকে কেন্দ্র করেই। ছেলেটি লেখাপড়ার ধার দিয়েও যায়নি। ভুবনের রিক্সাটা সেই চালাত। অসৎ সঙ্গে মিশে সে একটু আধটু নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। ভুবন আমাকে প্রায়ই বলতো - " ছোড়দা, দুঃখের কথা কি আর বলবো ! ছেলেটা নেশার ঘোরে যখন তখন আমাকে আর ওর মাকে যাচ্ছেতাই গালাগালি দেয়। এর থেকে মরণ ভাল ছিল।"


সেই ভুবনের ছেলে হঠাৎ একজন স্থানীয় সরকারী ঠিকাদারের সঙ্গে রাজস্থানে চলে গেল। সেই ঠিকাদারটির রাজস্থানে বেশ কিছু ব্যবসা আছে বলে শুনেছিলাম। সে নাকি রাজস্থানে অনেক বড় বড় বাড়ি তৈরীর কাজের বরাত পেয়েছিল। ছেলেটা চলে যেতে ভুবন যেন কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, যদিও মাঝে মাঝে ছেলেটাকে অনেকদিন দেখেনি বলে আক্ষেপও করতো। 


এইভাবে বছর তিনেক কেটে গেল। হঠাৎ একদিন ভুবন সাতসকালে বেশ হাসিমুখ নিয়ে আমার কাছে এসে হাজির।বললে-"ছোড়দা, গতকাল রাতে হারান বাড়ী ফিরেছে। সে আর রাজস্থান যাবে না।"আমি জিজ্ঞাসা করলাম-" কেন, সেখানে কোন ঝামেলা পাকিয়ে পালিয়ে এসেছে নাকি?"ভুবন বললে- না, না, ওর ওখানে ভাল লাগছিল না।" বললাম -" ভাল কথা, কিন্তু এখানে থাকা মানেই ত' আবার সমস্যা শুরু হবে তোমার বাড়ীতে ! " ভুবন কোন উত্তর করলে না। 


কিন্তু কিছুদিন পরেই আমার সন্দেহ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল। একদিন বিকালে হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে ভুবন হাজির। আমি শুধালাম - " কি হয়েছে ভুবন, তুমি এত হাঁফাচ্ছ কেন ? " উত্তরে ভুবন যা বললে তার সাথে আমার ধারণা একেবারেই মিলে গেল। 


আগের দিন বিকালে ভুবনের ছেলে ওদের বাড়ী থেকে বাইরে যাবার সময় ভুল করে ওর 'মোবাইল ফোন'টা বাড়ীতে ফেলে যায়। হঠাৎ 'ফোনের' আওয়াজে ভুবন দেখে হারানের 'ফোন'টা ঘরের কোণে পড়ে আছে। ভুবন 'ফোন'টা তোলে। ওপার থেকে একটি নারীকণ্ঠের কান্না শুনতে পায়। "শাদি, লেড়কা" - আরো কি সব কথাবার্তা বলছিল মেয়েটি। ভুবন ছোটবেলায় কলকাতার দোকানে কাজের সূত্রে সামান্য হিন্দি কথা বুঝতে পারতো। তার সন্দেহ হয় যে হারান বোধহয় রাজস্থানে কোন কাণ্ড ঘটিয়েছে। সে নিশ্চয় ওখানে কোন মেয়েকে বিয়ে করে, বৌ বাচ্চা সব ফেলেই পালিয়ে এসেছে এখানে। সে ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রেখেই ছুটতে ছুটতে আমার কাছে আসে।


সব শুনে আমি বললাম - " ঠিকই ভেবেছ তুমি, ভুবন। এখন তোমার উচিত পুলিশের হাতে হারানকে তুলে দেওয়া। একটি নিরপরাধ মেয়ে এবং তার নিষ্পাপ শিশুর জীবন নষ্ট করে দেওয়ার শাস্তি তার পাওয়া উচিত।" কিন্তু ভুবন আমার কথা শুনবে কেন ! অপত্য স্নেহে কাতর ভুবন আর তার স্ত্রী তাদের অপোগণ্ড ছেলের যথারীতি আবার বিয়ে দিল। সেই বিয়েরও ফসল দুটি শিশু। দুটি মেয়ে। ফলে তাদের অহেতুক সন্তান স্নেহের জন্য কেবল একটি নয়, বলতে গেলে দুটি রমণীর জীবনই হয়তো নষ্ট হতে বসলো। সেই সঙ্গে নির্দোষ কয়েকটি শিশুরও। হারান বিশেষ কিছুই করে না। মাঝে মাঝে বাপের রিক্সাটি চালায়। যা পয়সা রোজগার করে তার বেশীটাই নেশায় উড়িয়ে দেয়। আর রাতের বেলায় বাড়ী ফিরে এসে বৌ বাচ্চাদের পেটায়। ভুবন আর কি করে ! সে যথাসাধ্য চেষ্টা করে বৌমা আর নাতনীদের ভরণপোষণের। এক কথায় সে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছেই বটে।ইতিমধ্যে একটি ভাল ছেলে দেখে সে তার মেয়ের বিয়েও দিয়ে দিয়েছিল। সেই মেয়েও তার বাপকে সাধ্যমত সাহায্য করে। 


আমার কাহিনী যদি এখানেই শেষ হয়ে যেত, তাহলে আমার প্রিয় পাঠককুল, আপনারা বলতেন - " এ কেমন হল, এ ত' মনে কোন দাগই কাটল না। সর্বোপরি এ কেমন প্রেমের গল্প হল !" কিন্তু কাহিনীর পট পরিবর্তন ঘটল এর পরেই। আর যে ঘটনা ঘটল, তা একেবারেই অভাবিত। বুদ্ধি দিয়ে যার ব্যাখ্যা করা সত্যই সাধ্যের অতীত।


আমার ফুলগাছ করার শখ অনেকদিনের। ভাবলাম কিছু সুদৃশ্য টবে গাছগুলি রেখে ফুলবাগানটি সাজালে কেমন হয় ! যেমন ভাবা, তেমনই কাজ। কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের সময় কলকাতায় রাস্তার ধারে এমন টবের পসরা সাজিয়ে অবাঙালী বিক্রেতার দলকে বসে থাকতে দেখেছি। একদিন রবিবার বিকালে সেখানে গেলাম। বেশ কয়েকটি পছন্দও হল। যে ছেলেটি বিক্রয় করছিল, তার পাশে তার স্ত্রী এবং একটি ফুটফুটে ছোট ছেলে ও একটি তেমনই কমনীয়া ছোট্ট মেয়ে বসেছিল। ঠিক যেন দুটি দেবশিশু । দেখে যেন মনে হয় যমজ, এতটাই দুজনার মুখের সাদৃশ্য। আর মহিলাটির মুখটির অর্ধেকটি ওড়না দিয়ে ঢাকা। কিন্তু তার মধ্যে দিয়েও এক অনুপম রূপলাবণ্যের আভাস আমাদের দুজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আমি মেয়েটিকে বললাম - বহিন, খুব সাবধানে আমাদের গাড়ীর পিছনে টবগুলি তুলে দাও। আমি অনেক দূর যাব, সেই বারুইপুর।"  'বারুইপুর' কথাটি শুনে যেন মেয়েটি সামান্য চমকে উঠল বলে আমার মনে হল। 


যাই হোক্, এর পরেও আরো বার দুই তিন ওদের কাছ থেকে টব কিনে নিয়ে আসার সূত্রে, ওদের সঙ্গে বেশ আলাপ হয়ে গেল। ওদের আসল বাড়ী রাজস্থান। পেটের তাগিদে এত দূরে চলে এসেছে। কাছেই 'ফুটপাথের' ধারে একটি ঝুপড়ীতে ওরা থাকে। অনন্য সুন্দর শিশুদুটিকেবেশ ভালবেসে ফেললাম। মুখগুলি যেন মায়ায় মাখানো।


সেদিন হঠাৎ করেই দুপুর নাগাদ ওদের জন্য স্থানীয় হোটেল থেকে বেশ কিছু খাবার তৈরী করে ঐ রাজস্থানী ছেলেটির 'ফুটপাথের' ঝুপড়ীতে গিয়ে হাজির হলাম। কয়েকটি টব কেনাও উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু দেখলাম পসরাগুলি কাপড় দিয়ে ঢাকা।বাচ্চা দুটিকে নিয়ে ওদের মা কাছেই ছিল। আমাদেরকে দেখে সে বললে যে তার স্বামী অভয় মানে ঐ রাজস্থানী ছেলেটি কিছু মালপত্র হাওড়া স্টেশন থেকে আনতে গেছে। তাই তাদের পসরা সব ঢাকা দেওয়া আছে। তবে আমি যদি কিছু কিনতে চাই, তাহলে কোন অসুবিধা হবে না। খাবারের বাক্সগুলি মেয়েটির হাতে দিলাম। ওদের মুখগুলি খুশীতে ঊজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এবার আমরা কয়েকটি টব কিনলাম। কেনাকাটার পরে যখন চলে আসছি হঠাৎ মেয়েটি ভাঙা ভাঙা বাংলায় আমাকে বলল - " বাবু, অম্বা একঠো বাত বলবে ? বুঝলাম মেয়েটির নাম অম্বা। " আমি বললাম - "বলো, বহিন।"  মেয়েটি বললে - দো মিনিট রুক সাকতা, বাবুজী ?" আমার ত' অপেক্ষা করতে কোন বাধা ছিল না। সে এবার জিজ্ঞাসা করলো - বাবু, আপকা কোঠী কাঁহা বোলা থা, উস দিন? বারাইপুর ! ও জায়গা কি বহোৎ দূর আছে ? " আমি বললাম - তা থোড়া দূর ত' হ্যায়ই, বহিনজী। লেকিন কিঁউ !" সে উত্তর দিল না। দেখলাম সে দ্রুত পদক্ষেপে তার ঝুপড়ীর মধ্যে ঢুকে পড়লো। একটু পরেই একটা খাম হাতে নিয়ে সে প্রায় দৌড়েই আমাদের কাছে চলে এল। এসে খামটা খুলে একটা  'ফটো' আমার হাতে দিয়ে বললে - "বাবুজী, ইস্ তস্বীর কো আচ্ছে সে দেখিয়ে না।" আমি দেখলাম একটা বিয়ের ছবি। আমি অবাক হয়ে শুধালাম - এ তো মালুম হ্যায় বহিন,তুমহারী শাদীকি তসবীর ! " ইতিমধ্যেই মেয়েটির লাবণ্যময়ী মুখটির সাথে আমাদের পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। সে বললে - " হাঁ, লেকিন  মেরী যো মরদ কো আপ জানতা হ্যায়, ইস তস্বীর মে ও নেহী হ্যায় জী। এ মেরী পহেলী শাদীকি ফোটো।" আমি ত' আশ্চর্য হয়ে গেলাম। গল্প বেশ জমাটী হয়ে উঠছে ধারণা হল। মেয়েটি বললে - হাঁ বাবুজী, পহেলী শাদী। আর যো আদমী মুঝে শাদী কিয়া, উসকা কোঠী ইস বংগালমে বারাইপুরকা আশপাশই হ্যায়।"


তারপর সে ভাঙা ভাঙা হিন্দী বাংলা মিশিয়ে যা বলল তার প্রতিটি বর্ণ এখনো আমার হৃদয়ের অন্তস্থলে একেবারে গেঁথে আছে। সে বললে - " বাবুজী, হামি রাজস্থানের আলোয়ার জিলার মাজরা গ্রামের আওরত আছি।মেরী পহেলী মরদ বাংগালসে হামারা মাজরা গাঁও মে আয়া, কুছ 'বিল্ডিং'কা কাম করনে কা ইরাদা লে কে। ম্যায় ভী একই বিল্ডিং'কা কাম মে লাগি হুয়ি থী। ধীরে ধীরে হাম দোনো কি বিচ পেয়ার হো গ্যায়ী। হামারি পিতাজি বহুত দিন পহেলে গুজর গ্যায়ী থে। ঘর মে কেবল বুড়ী মাতাজী জিন্দা থী। লেকিন বহোৎ বিমার থা উনকী। গ্রাম কি মুখিয়া, হামারী সাথ ওই বংগালী লেড়কা কো শাদী দিলা দি। মেরা যো ঐ লেড়কা হ্যায় না , ও মেরী পহেলী শাদীকি বাচ্চা। আর মেরী মুন্নী, ও অভয় কি লেড়কী।  শাদীকি দো বরষ বাদ, মেরী পহেলী মরদ বাংগাল আয়া। লেকিন ও আর মাজরা গাঁও ফিরত যায় নি, কভি লট নেহী গিয়া। মেরা লেড়কা তব বহোৎ ছোটা থা। মেরী মাতাজী কি ভি দেহান্ত হো গায়ী। ম্যায় যাদাই তকলিফ মে থী। তব অভয় আয়া থা। ও মেরী গাঁওকা হী লেড়কা। লেকিন পাঁচ সাল ও গাঁও মে নেহী থা। তব শুনি থি যে অভয় কলকাত্তামে বেওসা করে। উনকো ভি মাতা পিতা সে লেকে কোঈ রিস্তেদার নেহী হ্যায়। অভয় বচপনসেই মুঝে প্যার করতা থা। লেকিন মেরী শরম কি বাত যো মুঝে কভি উনকো সাথ নেহী দিয়া। তো উসবার অভয় যব পাঁচ সাল বাদ মাজরা গ্রাম লট আয়া,মেরী তকলীফ উনকো সহন নেহী পড়া। ও সাচমুচ মেরে পেয়ার করতা থা, আভি ভি করতা হ্যায়। অভয় মুঝে শাদী কি বাত বোলা। ম্যায় চৌক গয়ী থি। অভয় গ্রামকা সরপঞ্চ ঔর বুজুর্গ আদমী কা সাথ ভি বাত কিয়া। সব উনকো বাধাই দিয়া। অভয় মুঝে শাদী করকে কলকাত্তা লে আয়া।অভয়কো সব মালুম হয়। অভয় বহোৎ আচ্ছা আদমী হ্যায়। হামাকে খুব ভালবাসে। ও মুঝে বোলা যে তুমি হারুনকে ভুলে যাও। হাঁ, মেরী পহেলী মরদ, যো এই বংগালকাই বুরা আদমী হ্যায়, উসকা নাম হারুন হি থা। লেকিন ম্যায় ক্যায়সে ভুল যায়েগী বাবুজী ! হামার মালুম আছে যে হারুনকো নেহী ভুলনে সে হামি অভয়কো সাথ বুরা সুলুক কোরছি। তব ভি, হারুন তো মেরী পহেলী পেয়ার থা, হ্যায় না ! বাবু, মেহেরবানী করকে একবার ধেয়ান সে মুঝে শাদী করনেবালা ওই আদমীকা তস্বীর দেখিয়ে জী। উস আদমী আপলোগোঁকা জান পয়চান হ্যায় কি নেহী ?"


আমি ত' হতবাক। মানুষের হাসির পিছনে কত কান্নাই যে লুকিয়ে থাকে, তা ভাবলে মনটা ভারী হয়ে আসে। এদিকে হারুন নামটা শুনেই মনটা কেমন তোলপাড় করে উঠল। তবে কি ও ভুবনের ছেলে হারান, যাকে মেয়েটি হারুন নামে অভিহিত করছে ! ভালো করে ছবিটি দেখলাম। সাদা কালো ছবি। অনেকদিন হলেও যত্ন করে রাখা আছে যদিও সামান্য বিবর্ণ হয়ে গেছে। ভাল করে দেখে ত' আমার মাথা ঘুরে যাবার জোগাড়। এ যে সত্যিই হারান, ভুবনের ছেলে ! আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সেই দেহাতী কিন্তু বুদ্ধিমতী রাজস্থানী রমণীটি বোধহয় উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে ওর পহেলা মরদকে আমি চিনি। সে আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করলো - " বাবু, ঐ আদমীকো আপ জানতা হ্যায় না !"একটু চুপ করে থেকে বললাম - "হ্যাঁ, আমি চিনি। খুব ভাল করেই চিনি। সে ত' মহা বদমাশ, নেশাখোর, কামচোর। এখানে আবার একটা বিয়েও করেছে। দুটো মেয়েও হয়েছে। বৌ, বাচ্চাদের ধরে ধরে পেটায়। আমি শুনেছিলাম সে নাকি রাজস্থানে একটি শাদী করে পালিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই হতভাগিনী যে তুমি, আর তোমার সাথে এইভাবে আমাদের এত ভালভাবে আলাপ হয়ে যাবে, তা স্বপ্নেও কখনো কল্পনা করি নি। ঈশ্বরের কি অদ্ভুত লীলা !" 


অম্বা আমার কথা সব বুঝতে পারলো কিনা জানিনা, কিন্তু তার অনিন্দ্যসুন্দর  চোখদুটিতে দেখলাম জল টলমল করছে। কথা বলতে বলতে কখন উত্তেজনার বসে তার মাথা আর মুখের আবরণটি সরে গিয়েছিল, সে হয়তো খেয়ালই করেনি। এমন একটি অপূর্ব লাবণ্যময়ী নিরপরাধ রমণী কিভাবে এক স্বার্থান্বেষী পুরুষের বঞ্চনার স্বীকার, সেটা ভেবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিলাম না। 


আমি রাগতস্বরে অম্বাকে বললাম - "বহিন, তুমি যদি বলো, তাহলে আমি আজই ওর শাস্তির বন্দোবস্ত করবো। এরকমভাবে দু দুটো নিরপরাধ মেয়ে  আর কটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নিয়ে ওর ছিনিমিনি খেলা আমি জন্মের মত খতম করে দেবো। আমি পুলিশে নালিশ করবো তোমার হারুনের নামে। ওকে সারা জীবন জেল খাটিয়ে ছাড়বো, তবেই আমার শান্তি। তুমি এই তস্বীরটা কিন্তু সাবধানে রেখো , বহিন। বাদ মে জরুরত হো সাকতা ।"


মেয়েটির চোখ দুটি যেন একবার জ্বলে উঠেই আবার নিভে গেল। কিছুক্ষণ মুখ নীচু করে সে কি ভাবল, জানি না। তবে বুঝলাম যে, সে সম্ভবত হারানের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করতে দ্বিধাগ্রস্ত। আর আমার ধারণা যে অমূলক নয় তার প্রমাণও পেলাম যখন সে হিন্দী বাংলা মিশিয়ে বললে - " ছোড় দিজিয়ে, বাবুজী। কেয়া হোগা ! অভয় খুব ভাল আদমী আছে। মুঝে বহোৎ পেয়ার করে। মেরা লেড়কা ভি বহোৎ মজে মে হ্যায়। আভি ঝুটমুট ঝামেলা হোবে,  ঔর মেরা সুখ ভি বিগড় যায়েগী। ও হারুন খুব পাপী আছে, বদমাশ আছে। লেকিন তব ভি মেরী পতি ভি থা। মেরী পহেলী প্যার।উসকা খেলাপ সিকায়ত করুঙ্গী ত' , ঐ সিকায়ত মুঝে ভি যাদা দুখ দেঙ্গে। ও ভি আভি শাদীশুদা হ্যায়। হামারে লিয়ে, সাথসাথ মেরা পুরা পরিবার কে লিয়ে দোয়া কিজিয়ে, বাবুজী। আর হারুন কি লিয়ে ভি দোয়া কিজিয়ে। ও যেন শাহী রাস্তামে চলতে শেখে। উপর মে ভগবান হ্যায়।কুছ সাজা দেনে কি জরুরৎ হ্যায়, ত' ভগবানই দিবেন। হারুনকা কসুর ত' জরুর হ্যায়, লেকিন ম্যায় উসকো মাপ কর দিয়া।"


অম্বার কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আমার চোখের সামনে আরো একবার সেই চিরন্তন ভারতীয় নারীটি যেন  তার শ্বাশ্বত করুণাময়ী স্ত্রীর রূপে মূর্ত হয়ে উঠলো। যুগে যুগে ভারতবর্ষে এমন নারীরাই জন্মগ্রহণ করেছেন যাঁরা অসাধু, অসৎ পুরুষের দেওয়া গরল পান করে নীলকণ্ঠ হয়ে সমাজকে ধারণ করে রেখেছেন। "হে বিজাতীয়া নারী, তুমি আজ আমাদের কাছে আরো ঔজ্জ্বল্যময়ী, লাবণ্যময়ী, করুণার আধার রূপে ধরা দিয়েছ। তুমি সত্যই এক টুকরো আগুনের শিখা, যে আগুনের পরশে শীতল মানুষ ঊষ্ণতায় অবগাহন করে। আবার যে আগুন নিমেষে মানুষকে দহন করে তার জীবন ছারখার করে দিতে পারে। তুমি কিন্তু সেই পবিত্র আগুনের শিখা যে কেবল আপন পরিবারকেই নয়, তোমার পুণ্য পরশে ভুবনের সমগ্র পরিবারকেও সমূহ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছ। তুমি আমার থেকে অনেক বয়োকনিষ্ঠা হওয়া সত্বেও তাই তোমাকে প্রণাম করি।তোমার প্রতি এক অপরিসীম শ্রদ্ধায় আজ আমার মস্তক অবনত হয়ে যাচ্ছে।"


এই ঘটনার পর থেকে অম্বাদের কাছে অনেকদিন আর যাওয়া হয়ে ওঠে নি। মায়ের দীর্ঘদিনব্যাপী অসুস্থতা, অবশেষে তাঁর অমৃতলোকে গমন, নিজের শারীরিক অসুস্থতা, এইসব বিভিন্ন কারণে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। অবশেষে যখন ওদের কাছে যাবার সুযোগ এল, তখন গিয়ে দেখলাম যে ওদের সেই ঝুপড়ীও নেই, আর সেই পসরাগুলিও নেই।আশেপাশের দু একটি দোকানে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে মাস ছয়েক আগে অভয় তার পুরা পরিবারের সাথে রাজস্থান চলে গেছে। কিন্তু কবে তারা ফিরবে, কেউ বলতে পারলো না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এরপরই আমার মায়ের অসুস্থতা, তাঁর চিরবিদায় এবং তারপর কোরোনা সংক্রমণ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার ফলে একেবারেই গৃহবন্দী হয়ে পড়েছিলাম। পরবর্তীকালে কোরোনা সংক্রমণ সংক্রান্ত কারণে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে জীবন কেটেছে। ফলে আর ওদের খবর নেওয়া সম্ভবপর হয় নি। জানিনা অম্বা, অভয় আর তাদের ঐ দুটি দেবশিশু কেমন আছে !  তবে বাড়িতে বসে থাকলেও আমার মনটা যেন রাজস্থানের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে রাজস্থানী বীরাঙ্গনা নারীদের মাঝে আমার অম্বা বহীনকে খুঁজে বেড়ায়। ধন্য ভারতীয় নারী, ধন্য তোমাদের সহনশীলতা, ধন্য তোমাদের পবিত্র প্রেম। তোমরাই সত্যকারের দেবী॥

——————————————————————

                 স্বপন চক্রবর্তী।


মাতৃ কুটীর, শিবাণী পীঠ লেন, শিবাণী পীঠ মন্দিরের সন্নিকটে, ভট্টাচার্য্য পাড়া, ওয়ার্ড নং - ৫ , বারুইপুর, ২৪ পরগণা (দক্ষিণ), কলকাতা-৭০০১৪৪.




Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.