বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন :

গল্প।। আলোর দিশা ।। তপন তরফদার


 

 আলোর দিশা

তপন তরফদার

 

               ওর নাম ছিল বাসুকি সাঁপুই হাঁ ঠিক ধরেছেন আমার অর্ধাঙ্গিনীর নাম  ওটাই  ছিল এখন নাম হয়েছে বাসুকি ভট্টাচার্য্য কলেজে পড়তে পড়তে যা হয় তাই হয়েছিল আমাদের ভাব ভালোবাসার বিয়ে এই বিয়ে সহজে দুপক্ষই মেনে নিতে পারেনি আমাদের ভট্টাচার্য পরিবার, সমাজের কৌলিন্য পরিবার নীচু জাতের মেয়েকে বিয়ে মেনে নেয় না বাবা আমাদেরকে ঘরে ঢুকতে দেয়না মা চাইলেও কাজের কাজ কিছু  করতে পারে না আমরা ভাড়াবাড়িতে সংসার পাতি কিন্তু ঘটনার মোড় অন্য জায়গায় বাসুকির পরিবার ওই ব্রাম্ভণ পরিবারের ছেলে বলে মেনে নেয়না ওরা মনে করে ওদের জাত ছাড়া অন্য জাতের লোকেরা মেয়েদের পরিবারের ভিতরে যে সন্মান, কর্তৃত্ব পাওয়া উচিত তা অন্য জাতের লোকেরা দেয়না নামেই ওই ব্রাম্ভণ, কায়স্থ কিন্তু  কার্যত বাড়ির রমণীদের ঝিয়ের মত ব্যবহার করে দুই পরিবারের মধ্যেই পরিবর্তন দেখা যায়  আমার ছেলে শৌমিকের জন্মের পর উভয়ের কাছেই শৌমিক যার ডাক নাম বাবাই কদর পায় পরিবারে স্থান পাই

            বাসুকীর পরিবার কেন ব্রাম্ভন বলেও সমাদার করেনা তা ওদের আদি ভিটেতে মনসা পুজো উপলক্ষে এসে জানতে পেরেছিলাম পদবি সাপুঁই এদের পূর্ব পুরুষরা বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের জায়গিরদার থেকে প্রতাপশালী জমিদারি ভোগ করে আসতো এই পরিবার এখন কাজের জন্যই বিভিন্ন স্থানে বসবাস জ্ঞাতি গুষ্ঠি বৃদ্ধি পেয়েছে সবাই কিন্তু  আপ্রাণ চেষ্টা করে এদের ঐতিহ্যবাহী মনসাপুজোর দিনে এই জমিদার বাড়িতে আসতে কয়েক পুরুষ আগে সাপের কামড়ে মরতে বসেছিলেন কর্তা মনসা পুজো করে বেঁচে যায় সেই সময়ে মানত করেছিল ধুমধাম করে বংশ পরম্পরায়  "মনসা পুজো" করবে

                 দেবী মনসা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতাম না জানতাম শুধু  মনসা মঙ্গল কাব্যের কথা মনসা মঙ্গল কাব্য বাঙালি মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম, যেখানে দেবী মনসার আরাধনা তাঁর সঙ্গে চাঁদ সওদাগরের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সমাজের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জটিলতাগুলি ফুটে উঠেছে মনসা একাধারে দেবী এবং মানবীয় চরিত্রে উপস্থাপিত; তাঁর প্রতিশোধপরায়ণ, ক্ষমতাশালী, কিন্তু অভিমানী সত্তা মধ্যযুগের বাঙালি নারীর ভেতর-বাইরের দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি বহন করে মনসার স্বীকৃতি শ্রদ্ধার জন্য সংগ্রাম এবং তাঁকে উপেক্ষা করার ফলে যে প্রতিক্রিয়া তা বাঙালি গৃহস্থালির নারীর জীবন এবং সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাঙালি অন্দরমহল বা গৃহের অভ্যন্তরীণ জীবন ছিল মূলত নারীদের ক্ষমতার কেন্দ্র যদিও বাইরের পৃথিবীতে পুরুষদের আধিপত্য ছিল, অন্দরমহলে নারীদের ভূমিকা প্রভাব ছিল গভীর এখানে নারীরা পরিবারের ভিতরে প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সামাজিক বন্ধনকে প্রভাবিত করত মনসার চরিত্রের ক্ষমতা, প্রতিশোধস্পৃহা, এবং অভিমান এই অন্দরমহলের নারীর অবস্থান, তাদের আত্মপরিচয় মর্যাদার সংগ্রামের সঙ্গে মিলে যায়  মনসার মতো অন্দরমহলের নারীও কখনো দমনপীড়নের শিকার, কখনো আবার ক্ষমতার অধিকারী সংসারে মনসার মতো দেবীর পূজা নারীর শক্তি, সামর্থ্য প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার প্রতীক হিসেবে ধরা হয় একদিকে মনসার আরাধনা বাঙালি সমাজের নারীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, অন্যদিকে তাঁর ক্রোধ প্রতিশোধবোধ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর বঞ্চনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায় সার্বিকভাবে, মনসা মঙ্গল কাব্যে মনসার চরিত্র এবং বাঙালির অন্দরমহলের নারীর চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাব্যটি একাধারে দেব-দেবীর উপাখ্যান এবং বাঙালি নারীর পারিবারিক, সামাজিক ধর্মীয় জীবনের গভীর প্রতিফলন এই সাপুঁই পরিবারেও অন্দর মহলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এই মেয়েরাই নেয়

         চার দিন হল  বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে আছি গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সপরিবারে এসেছি শনিবার ছিল মনসা পুজো  মানুষের আনাগোনা লেগেই আছে ঠাকুর দালানে পুজো শুরু হল সকাল আটটায় ১০টায় পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে পরে আরও একবার  দেওয়া হল পুজো শেষ হয়েছে ১১টায়  সন্ধ্যায় মনসা পুজোকে সামনে রেখে বিভিন্ন কথকতা গান বাজনার আসর বসে আমন্ত্রিত শিল্পীরা থাকলেও পরিবারের যারা  যে বিষয়ে পারদর্শী তারাও অংশগ্রহণ করে এই অনুষ্ঠান শুনে মনসা সম্পর্কে অনেক কিছু  জানতে পেরেছি

            শ্রাবণ মাসের শেষ দিনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মনসা দেবীর পূজা করে থাকে মনস্ শব্দের সাথে আপ প্রত্যয় যোগ করে মনসা শব্দের উৎপত্তি বুৎপত্তিগত অর্থে মনসা মনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দেবী ভাগবত ব্রহ্মবৈবর্ত পূরাণ মতে সর্পভয় হতে মানুষদেরকে পরিত্রাণের জন্য ব্রহ্মা কাশ্যপ মুনিকে মন্ত্র বা বিদ্যা বিশেষ আবিষ্কারের জন্য আদেশ করেন ব্রহ্মার আদেশে কশ্যপ মুনি যখন মনে মনে বিষয়ে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করছিলেন তখন তার মন থেকে এক দেবীর সৃষ্টি হয় প্রথমত মনসা কশ্যপ মুনির মানসকন্যা কারণ মানব কল্যাণে ঔষধ আবিষ্কারের কথা ভাববার সময় মন থেকে দেবীর সৃষ্টি হয় বলে তার নাম মনসা কথাগুলো  ভাগবত পূরাণ লেখা আছে

       

                 এই বিষয়টি  সবাই জানে মর্ত্যে মানুষের পূজা না পেলে সে দেবী হতে পারেনা তাই এক সময় মনসা মানুষের পুজো পাওয়ার জন্য মর্ত্যে নেমে আসেন প্রথম দিকে মানুষ উপহাস করলেও মনসার রোষানলে পড়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে তার পূজা করেন  লক্ষ্মী সরস্বতী মতো দেবী হতে চাঁদ সওদাগরের পূজা গ্রহণ প্রয়োজন ছিল কিন্তু চাঁদ তার পূজা করবেন না বলে সংকল্প করেছিলেন মনসা একে এক চাঁদের ছয় পুত্রকে হত্যা করেন সর্প দংশনের মাধ্যমে এক সময় মনসা ইন্দ্রের রাজসভার দুই নর্তক, নর্তকী  ঊষা এবং অনিরুদ্ধর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন

              প্রচলিত গল্পটি বহূল প্রচারিতএই অনিরুদ্ধ চাঁদ সনকার সপ্তম পুত্র রুপে জন্মগ্রহণ করল তার নাম লখিন্দর আর ঊষা বেহুলা নামে জন্মগ্রহণ করেন উজানী নগরে সায়বেনের কন্যা রুপে এক সময় বেহুলা লক্ষিন্দরের বিয়ে হয় মনসা লোহার বাসরঘরে সাপ দিয়ে লক্ষিন্দরকে মেরে ফেলে লোহার তৈরি বাসরঘরে মনসা বিশ্বকর্মাকে ভয় দেখিয়ে একটি ছিদ্র রেখে দেয় সেই ছিদ্র দিয়ে কালনাগিনী ঢুকে লক্ষিন্দরকে ছোবল মারলে লক্ষিন্দর মারা যায় বেহুলা স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে ভেলায় ভেসে ইন্দ্রপুরীতে যায় সেখানে নৃত্য করে দেবতাদের খুশি করলে তারা লক্ষিন্দরের জীবন ফিরিয়ে দিতে রাজি হয় তবে শর্ত থাকে মনসার পূজা করতে হবে চাঁদ সওদাগর কে বেহুলা  স্বামী লক্ষিন্দর চাঁদের ছয় পুত্রের জীবন ফিরিয়ে আনে মনসার পূজা দেবার বিনিময়ে ওই বিষয়টি আমরা সবাই জানি, চাঁদ সওদাগর মনসার দিকে না তাকিয়ে বা হাতে ফুল দিয়ে পূজা করেন পুজোতো পেলেন এতেই খুশি হয়ে চাঁদ সওদাগরের পুত্রদের জীবন ফিরিয়ে দিয়ে মানুষের দেবতা হলেন কালের নিয়মে সাপের থেকে বাঁচতে, পুত্র সন্তানের  আশায়  মনসার পূজা চালু হলো এবং অচিরেই জনপ্রিয়তা লাভ করলো

        

              এই বেলিয়াতোড়ের সাপুঁই পরিবারের মনসা পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভোজন ঠাকুর বিসর্জনের পরের দিন ভোজনের আয়জোন করা হতো কম বেশি  হাজার  লোকের খাওয়ার পাত পড়তো জম্পেশ খাওয়া দাওয়া বিশেষতঃ শেষ পাতে বিশেষ পাকে তৈরি প্রমাণ সাইজের কালো পান্তুয়া জমিদার বাড়ির সামনের ফাঁকা  জমিতেই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হতো জায়গাটি রঙিন কাপড়ে মুড়ে উৎসব বাড়ির পরিবেশ তৈরি করা হতো

             এখন আর পাতপেড়ে খাওয়ানোর ব্যবস্থা নেই মাটির ভাঁড়ে করে প্রসাদ বিতরণ করা হয় প্রসাদের সঙ্গে থাকে মায়ের প্রসাদী ফুল   চরনামৃত্ এই পরিবারের বর্ষীয়ান সদস্য ভবতারন সাপুঁই বীরভূমের গোয়ালতোড়ে থাকেন বাড়িতে মনসা মন্দির করে পুজো করেন তান্ত্রিকদের মতো কিছু  টোটকা বিতরণ করেন সাপে কাটার মোক্ষম ওষুধ  এই মনসা পুজোর পাদোদক লোক মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এই সুখবর লাইন লাগিয়ে অনেকেই আসেন এই ফুল আর পাদোদক সংগ্রহ করতে

           অনেক গুলি পাখা যথেষ্ট আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বছর অসহনীয় গরম সঙ্গী দোসর ছিল ভয়াবহ দহন জ্বালা মানুষ ব্যতিব্যস্ত, কষ্টের শেষ ছিল না তবুও মানুষের  আসার খামতি নেই  এত  মানুষ যে গরম উপেক্ষা করে হাজির হলেন, সে কিসের টানে? মা মনসার অমোঘ আকর্ষণ তো  আছেই তার সঙ্গে  বাড়ির মানুষজনের দরাজ, অনাবিল আতিথেয়তা, হাসিমুখে সাদরে আপ্যায়ন   
     
         
 হই হুল্লোড় করে সারাটা দিন কোথা দিয়ে কেটে গেল, টের পাওয়া যায়নি সবাই ক্লান্ত রাত নটা নাাগাদ রাতের খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি শুরু হলো সার্বজনীন পিসিমনি ঘোষণা করলেন, আমার নাতি পূর্ণেন্দু সাঁপুই  আমেরিকার  এক কোম্পানিতে বিরাট এক চাকরি পেয়েছে বিদেশ চলে যাবে আর কবে দেখা হবে কে জানে আগামীকাল তোমাদের কে খাওয়াতে চাই সবাই থেকে যাও কালতো রবিবার, ছুটির দিন

         এলাহি ব্যবস্থা জলখাবার পর্বে সকলকে দেওয়া হল গরম গরম কুমড়ী, বেশ লম্বা সাইজের বেগুনী আর মুড়ি সঙ্গে  একটি পেল্লাই সাইজের কড়া পাকে ভাজা জিলিপি জলখাবার যে এত উপাদেয় হয় তা প্রথম অনুভব করলাম সকালের জলখাবারে স্লাইস পাউরুটির ওপর মাখন বুলিয়ে, ডিমের পোচ ছাড়া অন্য কিছু  ভাবার সময়ই থাকেনা অত সময় কোথায় এখন ধরতক্তা মার পেরেক

       আমরা বাঙালিরা জানি সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে  "আর খাবার জমে ক্ষীর হয়ে যায়  খাওয়ার  সঙ্গে আড্ডায়" তেলে ভাজায় কামড় দিতে দিতে   জলখাবারের সাথে নির্ভেজাল আড্ডা "লেগপুলিং"  যা যে কোনো স্বর্গীয় সুখের থেকে বেশি  সবাইকে অবাক করে দিয়ে  মাথায় গামছার পাগড়ি বেঁধে এক কিশোরী হাতে চায়ের কেটলি সঙ্গে আমার শ্রীমান শ্রীমানের হাতে মাটির ভাঁড় কিশোরী বলছে আমি চা ওলা, সবাইকে চা দেবো বাবাই'এর মুখে হাসির ফোয়ারা বুঝতে পারছি আমাদের বাচ্চারা সঙ্গী পেলে কত আনন্দ পায়

  
      
     শুরুতে ভাতের সঙ্গে একচামচ বিশুদ্ধ গাওয়া ঘি, বিশেষ মশলা দিয়ে মাখা চন্দ্রকোণা আলুর আলুভাতে পরিবেশন করা হল নটে শাক দিয়ে উচ্ছে চচ্চড়ি অসাধারণ এক পদ শুকতো পটলের দোর্মা এঁচোড় চিংড়ির ডালনা বড় বড় পিসের রুই মাছের ঝোল দু'রকম মাংস, অনেকেই বলে পাঁঠার মাংস স্বাস্থ্যের কারনে খায়না কোনটা ছেড়ে কার কথা বলব হাত চেটেপুটে সবাই খেলো কাঁচা আমের অপূর্ব এক চাটনি  আইসক্রিম ছিল শেষ পাতে উঠে পড়ার সময় প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে মিষ্টি পান   হালুইকর বামুনের রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই   পরিতৃপ্তির খাওয়া দাওয়া শেষ হল সাড়ে ৩টে   নাগাদ   তারপর চলল ছোট ছোট গোষ্ঠীতে দেদার আড্ডা, খোশ গল্প  আবার কবে দেখা হবে কে জানে! এই সময়টুকু নষ্ট করতে কেউ চায়  না যতটা সম্ভব কাছের মানুষগুলির সান্নিধ্যে থেকে মনটাকে যতটা পারা যায় অক্সিজেন নিয়ে  চাঙ্গা করে নেওয়া যায়

          সূর্যের পাটে বসবে আর কিছক্ষণ পরে বিশু ঘোষ পাড়ার পুরানো লোক এখন ডেকরেটরের কাজ শুরু  করেছে বাড়িতে এসে হাজির সঙ্গে ওর বিশ্বস্ত কর্মচারি কাম ট্রলি চালক ইয়াকুব বিশু লজ্জা লজ্জা গলায় শুরু  করলো আগামীকাল সনাতন মোদোকের নাতির অন্নপ্রাশন সকালেই লোকজন আসবে ইচ্ছে না থাকলেও মালপত্র গুলো নিয়ে যেতে হবে বলেই, কোনো উত্তর না শুনেই স্কুটার চালিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল

            বাচ্চাদের বলতে হয়না কখন ওরা বড়দের অজান্তেই নিজেদের মধ্যে বন্ধন গড়ে তোলে কে প্রস্তাব দিল, কে শুরু   করলো কে জানে সবাই মিলে "কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাকে পাবি তাকে ছোঁ" খেলতে শুরু  করেছে সোনামনি আমার বাবাইকে  ছুঁয়ে দিয়েছে ওকে কানামাছি হতে হবে ওর চোখ বেঁধে দিয়ে সবাই আশ্বস্ত করছে, তুই সহজেই অন্যকে ছুঁয়ে দিতে পারবি আমি বাবা হয়েও এরকম ভরসা ওকে দিয়েছি কিনা মনে পরছেনা বাবাইএর মুখ দেখে আমি যা বুঝলাম ভয় পায়নি খেলাটা উপভোগ করছে যথারীতি কাপড় দিয়ে ওর চোখ বেঁধে দেবার পর চোখের সামনে  আঙুল নাড়িয়ে প্রশ্ন করা হলো, কটা আঙুলএই খেলায় এই রীতি কে প্রচলন করেছে কেউ জানেনা অথচ কেউই ভাবেনা, সত্যি যদি দেখতে পায়, সত্যি সত্যি সে কি বলবে সঠিক আঙ্গুলের সংখ্যা

             দুহাত ছড়িয়ে অপরের গলার স্বর আন্দাজ করে ছোঁয়ার জন্য এগোচ্ছে উঠোনের কোনার দিকে ডেকরেটারের রাখা বড় জলের জ্যারিকেনের গায়ে হাত রাখে জ্যরিকেনটা কেঁপে ওঠে বাবাই মাগো বলেই তীব্র চিৎকার করে বসে পড়ে একটা সাপ সড়সড় করে চোখের নিমেষে  মিলিয়ে গেল

          বিনা মেঘে বজ্রপাত অ্যকসিডেন্ট কখন হবে কেউ জানেনা অ্যকসিডেন্ট হলে  কি করতে হবে তাও অনেকেই ঠিক মতো জানিনা  এই বাড়িতে সাপের দেবীর পুজো হয় এখানেই সাপে কেটেছে সাপে কাটলে কি করতে হয় আমি জানি  সব সাপই বিপজ্জনক নয় তবে, এমন কিছু  সাপ আছে যা বিপজ্জনক এবং তাদের কামড়ের ফলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, চরম ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে কামড়ের ঘন্টার মধ্যে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হলে সবচেয়ে কার্যকর তবে, ২৪ ঘন্টার মধ্যে দেওয়া হলেও এটি কার্যকর বরফ ঘষা চলবে না কামড়ানো স্থানটি ধুয়ে ফেলা ঠিক হবেনা তবে কামড় পরিষ্কার করার জন্য সাবান এবং জল ব্যবহার করা উচিত কামড়ের স্থানে একটি শুকনো ড্রেসিং করা যেতে পাররে সাপে কামড়ছে বলেই ভয়ে অনেকেরই হার্ট অ্যটাক হয়ে যায়দৌড়ে গিয়ে বাবাইকে কোলে তুলে নিলাম

                  মূহুর্ত্তের মধ্যেই পরিবেশ অন্য রকম হয়ে গেল বাড়ির বয়জ্যেষ্ঠা জেঠিমা বলেন ভয়ের কিছু  নেই ওটা আমাদের বাস্তু সাপ আমাদের চার পাশেই থাকে ওর গায়ে হয়তো পা লেগেছে বলেই ফোঁস করেছে বাবাই চিৎকার করে কাঁদছে চারদিক থেকে আমাদের ঘিরে ধরেছে আমি জানি বাবাইকে এখন সাহস যোগাতে হবে ওর মনে ভয় যেন ভর না করে

               আমি  ইয়াকুবকে বলি ট্রলিটা খালি করো এই ট্রলি করেই স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাব ইয়াকুব বলে, না না কর্তা তা হয়না আমি ভাবি ট্রলিটা দিতে চাইছেনা আমি বলি যা ভাড়া চাইবে তাই দোবো জিভটা বার করে বলে, ভাড়াটা বড় কথা না বড় কথা মনসাবাড়ির লোক সাপে কেটেছে বলে হাসপাতালে যাবে আপনাদের বাড়ির পুজোর চরণামৃত খেয়ে সাপে কাটার বিষ  ছাড়ায় আর সেই বাড়ির লোক হয়ে আপনি হাসপাতালে যাবেন আমরা ভিন্ন জাতির লোক হয়েও এই দেবীর উপরে  আস্থা রাখি

          কানাঘুসোয় আমি শুনেছি আমাদের এই সাঁপুই বাড়ির মনসা পুজোর চরণামৃত খাইয়ে অনেকেই সুস্থ হয়েছে মাতুয়া সম্প্রদায়কে  সবাই জেনে গেছে আমাদের এই সাঁপুই সম্প্রদায়কে চিনতে শুরু   করেছে যাবেন খ্যাত হতে চলেছে ওই মা মনসার বলে বলিয়ান বলে এইক্ষণেই আমি যদি হাসপাতালের শরনাপন্ন হয়ি, সব কিছু  ধুলোয় মিশে যাবে একটা বিষয় বেশ বুঝতে পারছি, বয়স্করা চাইছে, প্রসাদী চরণামৃত খাওয়াইআমি চাইছিনা কিন্তু  আমি বাড়ির জামাই ভিন দেশ আমি কতটা করতে পারব এই সময়েই  বাসুকি ছুটে এসে  বাবাইকে কোলে তুলে নিয়ে ইয়াকুবের ট্রলিতে বসিয়ে বলে, আমি  এই বাড়ির মেয়ে, বাবাই আমার ছেলে, ছেলের জন্যে আমি যা বলবো তাই হবে ইয়কুব কাকু আমার ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে চলো আমি এক আলোর দিশা দেখতে পেলাম

======================  

তপন তরফদার প্রেমবাজার (আই আই টি) খড়্গপুর 721306

 প্রেমবাজার (আই আই টি) খড়্গপুর 721306



 

ফটো।  তপন  তরফদার 

 

 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.