আমরা অনেক ভালোই আছি
মিঠুন মুখার্জী
সেদিন ছিল রবিবার। মাঘ মাস। হাড় হিম করা ঠান্ডা। অশেষ কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। একটুর জন্য শেষ ট্রেনটা তিনি মিস করেন। পুরো রাতটা প্রায় শিয়ালদহ স্টেশনেই কেটেছিল তার। ঠান্ডায় তেমন একটা লোক ছিল না। অশেষের গায়ে ছিল উলের সোয়েটার ও একটি মোটা চাদর। যেখানে সেখানে তার ঘুম হয় না। তাই সমস্ত স্টেশনটা পাইচারি করেন তিনি । কয়েকজন গরিব মানুষকে প্লাটফর্মে শুয়ে থাকতে দেখেন তিনি। শীতে একেবারে কুঁকড়ে যাচ্ছে তারা। থর থর করে কাঁপছে। খুব খারাপ লেগেছিল তার। এক মুহূর্তে অন্য এক জগতে চলে যান তিনি। তিনি ভাবেন-- 'আমরা কত সুখে আছি, যেটুকু পাই তা নিয়ে খুশি নই। চাহিদা দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে। অথচ এরা এত কষ্ট করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।' অশেষের দুই চোখের কোনে জল দেখা যায়। নিজের গা থেকে মোটা চাদরটি খুলে একজন আগন্তুক মানুষের ঘুমন্ত শরীরের উপর ঢেকে দেয়। ঠান্ডার হাত থেকে তিনি কিছুটা রক্ষা পায়।
চাদরের স্পর্শে লোকটির ঘুম ভেঙে যায়। সে উঠে বসে। গায়ে চাদর দেখে বুঝতে পারে তার সামনে থাকা বাবুটিই সেটা দিয়েছেন। সে অশেষের হাতদুটো ধরে বলে -- " বাবু আমাদের কথা কেউ ভাবে না। বছরের পর বছর এখানেই পড়ে থাকি। ভিক্ষা করে কোনো দিন খাওয়া জোটে কোনো দিন জোটে না। গ্ৰীষ্ম - বর্ষা - শীত স্টেশনই আমাদের ভরসা। আমাদের আপন বলতে কেউ নেই। আপনি এই ঠান্ডায় আমার যে উপকার করলেন তা আগে কেউ করে নি। ভগবান আপনার মঙ্গল করুক।" অশেষ লক্ষ করে বৃদ্ধ লোকটির দুচোখে জল। অশেষের চোখেও জল দেখা দিল। তিনি বললেন --- " আমি নিমিত্ত মাত্র। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছেতেই সব হয়।" সেই মুহূর্তে আরও কিছু চাদর ও কম্বলের অভাব তিনি অনুভব করেন।
পরদিন অফিস বন্ধ করে কুড়িটি চাদর ও কুড়িটি কম্বল নিয়ে শিয়ালদহ স্টেশনে যান তিনি। সঙ্গে তার একমাত্র মেয়ে আরাধ্যা। মেয়ের হাত দিয়ে অসহায় সর্বহারা মানুষদের হাতে চাদর ও কম্বল তুলে দেন তিনি। সকলে দুহাত তুলে আশীর্বাদ করে তাদের। শ্রেষ্ঠ উপহার পেয়ে অশেষ খুব খুশি হন।
===============
মিঠুন মুখার্জী
C/O-- গোবিন্দ মুখার্জী
গ্ৰাম : নবজীবন পল্লী
পোস্ট+থানা -- গোবরডাঙা
জেলা -- উত্তর ২৪ পরগণা
পিন-- 743252

