পুরী
অঙ্কিতা পাল বিশ্বাস
আমি একজন ভ্রমণ পিপাসু মানুষ ছোট বড় যে কোন জায়গায় ঘুরতে আমার খুব ভালো লাগে। গ্রাম শহর থেকে আরম্ভ করে পাহাড় নদী সমুদ্র সবই আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তাই শীতের ছুটি পড়তে না পড়তেই গত ২৫শে ডিসেম্বর বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্র সৈকত পুরীতে।
হলুদ বালুতটে নীল জলের বারংবার আছড়ে পড়া দেখতে কার না ভালো লাগে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ শ্রী জগন্নাথ দেবের মন্দির। আমাদের ট্রেনের সময় ছিল রাত আটটা বেজে ৩৫ মিনিটের গরীব রথ এক্সপ্রেস যেটি শালিমার স্টেশন থেকে ছেড়ে পরের দিন সকাল ছয়টা ত্রিশ মিনিটে পুরীতে পৌঁছয়।
আমরা মধ্যাহ্ন ভোজন শেষ করে ঠিক বিকেল ৪ঃ৩০ মিনিটে স্করপিও সংযোগে সন্ধ্যা সাতটা বেজে পনেরো মিনিটে শালিমার স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। পথে যেতে যেতে অতিক্রান্ত হলো মা ফ্লাইওভার সেখানে আলোক বর্ণমালায় সাজানো বিজ্ঞাননগরীকে চমৎকার দেখতে লাগছিল, তারপর দ্বিতীয় হুগলী সেতু যাহার নীচে আমাদের পবিত্র গঙ্গা নদী প্রবাহিত হয়ে চলেছে। বড়দিনের মহানগরী কে এমন আলোক বর্ণমালায় আলোকিত হতে আগে কখনো দেখিনি।
সেদিনে ট্রেনের নৈশ্য ভোজনে ছিলো চাওমিন ও রুটি তরকারি। কচিকাঁচারা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েছিল, নতুন জায়গা দেখবার আকর্ষণে চোখে ঘুম আসছিল না। রাতের আঁধারে কাঁচ লাগানো জানালায় ভালো করে দেখা যাচ্ছিলো না কিছুই, ট্রেন ছুটছে কেবলই ছুটেই চলেছে অবিরাম ; তবে মনে হলো একের পর এক ছোট বড় অনেক স্টেশন চলে গেলো। এবার ট্রেন এসে এক স্টেশনে দাঁড়ালো খড়গপুর স্টেশনে বেশ কিছুক্ষণ। অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ দেখি তারার মতো অনেকগুলি একসাথে আলো জ্বলছে, দূর থেকে মনে হলো রাতের আকাশে তারক মন্ডলীর মধ্যে ঢুকে আছি। ঘুম আসছিল না তাই বহুক্ষণ বসে আছি জানলার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ রাত দুটো ট্রেন এসে দাঁড়ালো এক স্টেশনে ঘুম চোখে ভালো করে বুঝতে পারিনি তারপর রাত তিনটে বেজে ৩০ মিনিট ট্রেন এসে দাঁড়ালো ভুবনেশ্বরে অবশেষে আমরা সকাল ছয়টা বেজে ২১ মিনিটে পৌঁছে গেলাম পুরীতে।
স্টেশন থেকে প্রায় ৩০ মিনিট দূরত্বে আমাদের হোটেল সেখানে একটা অটো সংযোগে যেতে যেতে উদীয়মান লাল সূর্যি মামার আভা সমুদ্র সৈকতের চকচকে হলুদ বালুতট পাশে থাকা সবুজ ঝাউ গাছের সাথে সাথে আমরা হোটেলে পৌঁছলাম। এতটা যাত্রা করে ক্লান্তির পর স্নান সেরে হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই এ বাড়ির ছাদ থেকে ও বাড়ির ছাদে এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বাঁদর সেনাবাহিনী।
ভাইয়ের সাথে বেরিয়ে পড়লাম সকালে সমুদ্র দেখার আকাঙ্ক্ষায় প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিট হাঁটার পর দুজনে মিলে স্বর্গ দ্বারে পৌঁছে গেলাম ; যেখানে কি সুন্দর শান্ত পরিবেশে যারা গত হয়েছেন তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হচ্ছে তেনাদের আত্মার শান্তি কামনা করি। সেখান থেকে সমুদ্রকে খুব কাছ থেকে দেখা যাচ্ছিলো ওদিকে তাড়া দিচ্ছে দেরি হয়ে যাবে তাই বিলম্ব না করে, প্রাতরাশ এর জন্য লুচি ও ঘুগনি নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।
এবার একটু সাজগোজ করে পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম একটা টোটো সংযোগে সেখানে পৌঁছলাম এতো পরিমাণ জনজোয়ার দেখে চক্ষু চরক গাছ! একজন পূজারির মাধ্যমে পূজা দেওয়া সম্ভব হলো আমরাও চলেছি সাথে জন জোয়ার........................................
এতো ঠেলাঠেলি মানুষের ভিড় দেখে বিরক্তি লেগে গেলো বাচ্চাগুলো ভয়ে কাঁদতে শুরু করলো। যাইহোক ভিড় সামলে ঠেলে ঠুলে পূজা দিয়ে জগন্নাথ দেব কে দর্শন করে মনটা পবিত্র হয়ে গেলো, মন্দিরের আদলটাও ভারী সুন্দর। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বিকেলের শ্রান্ত আলোতে কিছুক্ষণ নিজেদের মতো ছবি তোলার পর মধ্যাহ্নভোজন সেরে হোটেলে ফিরে আসা হলো। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর, কর্তা মশায়ের হাত ধরে রাতের আঁধারে সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে পা ভিজিয়ে একের পর এক রুপোলী ঢেউগুলোকে কাছে এসে আছড়ে পড়তে দেখতে, সাথে স্নিগ্ধ বাতাস, সমুদ্র গর্জন, আকাশের এক ফালি চাঁদ সে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ যাকে এক কথায় প্রকাশ করা যায় না.......
পরের দিন সকালে প্রাতরাশ শেষ করে ভুবনেশ্বরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, স্রোতের মতো বয়ে চলে গেলো রাঙা প্রভাতী সমুদ্র সৈকত।
কিছুক্ষণ পর, গাড়ি এসে দাঁড়ালো আরেক জলরাশির তীরে যেখানে ঢেউয়ের তালে তালে সবুজ ঝাউ বনানী মাথা দুলিয়ে যাচ্ছে অনবরত নাম চন্দ্রভাগা। খুব সুন্দর শান্ত পরিবেশে মাছ ধরে চলেছে ডিঙি মাঝির দল।
এবার গাড়ি এসে দাঁড়ালো স্যান্ড ক্রাফ্ট মিউজিয়াম যেখানে বালি তৈরি অসংখ্য মূর্তি সুসজ্জিত রয়েছে। এতো সুন্দর নির্মাণ কার্য আগে কখনো দেখিনি।সেখানে কিছুক্ষণ থাকার পর............
আবারো চলেছি অজানা অচেনা পথ ধরে, পথের ধারে অসংখ্য ছোট বড় সবুজ বৃক্ষ রাশি ক্রমশ এগিয়ে চলেছে আমাদের সাথে। যেতে যেতে পার হয়ে যায় এক সুন্দরী নদী - টলটলে স্বচ্ছ জল নদীর কূলে লাল মোরামের সরু পথ, নাম মহানদী।
এবার গাড়ি এসে দাঁড়ালো কোনার্কের সূর্য মন্দিরে। এখানকার মন্দিরের আদল কিছুটা পরীর মন্দিরের মতন। আমরা প্রথমে টিকিট কেটে একটি কক্ষে প্রবেশ করেছিলাম যেখানে বিশাল আকৃতির পাথরের তৈরি দুটি বড় বড় চাকা ছিলো, কক্ষে পাথরের তৈরি বিভিন্ন রকমের মূর্তি সোনালী রঙের একটি বড় জাহাজ বা নৌকা আকৃতির জিনিস তৈরি করা ছিলো।
এবারে আমরা একটি পেক্ষা গৃহে প্রবেশ করলাম সেখানে মন্দিরের নির্মাণ সম্পর্কে চলচ্চিত্র এর মাধ্যমে দেখানো হয়েছিল। মন্দিরে ভিড়ের কারণে ঢোকা সম্ভব হলো না। বাইরে থেকে দেখে সূর্য দেবতার মন্দিরকে চক্ষু সার্থক করতে হলো।
তারপর অনেকটা পথ অতিবাহিত করার পর একটি স্থানে মধ্যাহ্নভোজন করা হলো.............................
তার কিছুক্ষণ চলার পর র একটি ছোট্ট পাহাড়ি রাস্তা একে বেঁকে ধবলগিরি বা ধৌলি গিরিতে পৌঁছলো। সেখানে সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাবা মহেশ্বরের মূর্তি দর্শন করলাম ঠিক তার পিছনেই রয়েছে শ্বেত বর্ণের গৌতম বুদ্ধের মন্দির ; যেন তিনি স্বয়ং বিচরণ করে চলেছেন। পাহাড়ের কোল থেকে বয়ে চলা স্বল্প জলে ভরা সরযু নদীকে পল্লী বাংলা ছবির মতো অপরূপ দেখতে লাগছিল।
কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি এসে দাঁড়ালো লিঙ্গরাজ মন্দিরে। এখানকার নিয়ম অনুসারে চামড়ার জিনিস ব্যবহার নিষিদ্ধ, তাই বিলম্ব না করে মন্দিরের আশেপাশ পরিদর্শন করে কিছুক্ষণ বিন্দু সরোবরের টলমল জলে হাত ডুবিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম নন্দনকানন এর উদ্দেশ্যে।
নন্দন কাননে যেতে প্রায় বিকাল চারটে পনেরো বেজে গেলো, প্রবেশ করতে না করতেই একটি ময়ূর পেখম মেলে গাছের উপর বসেছিল, খাঁচার মধ্যে দেখলাম অনেকগুলি বানর একত্রিত হয়ে খেলা করছিলো, একগুচ্ছ সবুজ ঘাসের ওপর একটি লম্বা গলা জিরাফ ঘুরে বেড়াচ্ছিল, একটু উঁকি মেরে দেখি যে জলের মধ্যে ওটা কি দেখা যায়? দুটো জলহস্তি একজন পিঠ ডুপিয়ে আরেকজন মাথা ডুবিয়ে বসে আছে । ওরে বাবা এবার তো বাঘ মামার খাঁচায় চলে এসেছি আমরা
ওই যে সাদা বাঘটা বসে আছেন গাছের উপর , আর আরেকজন বাঘ মামা এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর একজন বাঘ মামা বসে বসে মাংস খাচ্ছেন এতো যে মানুষ তাকে দেখতে এসেছেন তার কোনো ভুরুক্ষেপ নাই। এতো বড় বড় বাঘ মামাদের সাথে আলাপ হয়ে মন ভরে গেলো ।
এভাবেই সন্ধ্যে নেমে এলো নন্দনকাননে।
ক্লান্ত এবার নেমে একটু চা খাওয়া হলো, এবার হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত নটা বেজে গেলো।
পরদিন সকাল ৮:০০ টা চা জল খাবার খেয়ে আমরা চিলকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম..... ...............
পুরী থেকে চিলকার দূরত্ব প্রায় দেড় ঘন্টার মতো।
কিছুটা পথ যেতে যেতে একটি সরবরে একগুচ্ছ শ্বেত পদ্মের মেলা, কোথাও আবার লাল শালুক কোথাও বা সাদা, কোথাও বা বেগুনি কচুরিপানার দল ভেসে চলেছে। এত সুন্দর গ্রাম বাংলার পল্লী প্রকৃতি আগে কখনো দেখিনি দুদিকে লাল-মোরামের রাস্তা আমরা ক্রমশ এগিয়ে চলেছি। মাঝে মাঝে দুই একটি ঝাউবন চোখে পড়ে, কোথাও আবার চোখে পড়ে বকুলের মেলা কোথাও আবার বাবলা, বট কোথাও বা সবুজ ক্যাকটাসের দল, ইউক্যালিপটাসও কম নয়। ক্রমশ এগোচ্ছি আহা কি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছি যা কখনোই ভোলা যায় না। এবার গাড়ি এসে পৌঁছলো একটি খাবারের স্থানে আহা! মাটির দেয়ালের ওপর চিংড়ি, কাঁকড়া, পাখি, মাছ আঁকা স্থানে বসে গ্রাম বাংলা প্রকৃতির ছত্রছায়ায় চিংড়ি মাছের তরকারি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন করতে কতইনা ভালো লাগছিলো।
এবার চিলকা হ্রদে আমাদের ভ্রমণ জলে ছিলো প্রায় তিন ঘন্টার মতন , আমরা ঠিক দুপুর বারোটা ১৫ নাগাদ নৌকায় উঠেছিলাম। চিলকা হ্রদের সবুজ জলে ভাসতে ভাসতে তরী একটা তীরে পৌঁছলো আশ্চর্যের বিষয় জলের মধ্যে একটি মানুষ ঝিনুক ভেঙ্গে ভেঙ্গে মুক্ত দেখানোর এবং শৈবাল ভেঙে বিভিন্ন রঙের প্রবাল দেখাচ্ছিলেন, এর পাশাপাশি কিছু লাল কাঁকড়াও দেখিয়েছিলেন তিনি। চিলকা হ্রদের বক্ষ মাঝে ভাসমান নৌপথে ক্রমশ এগিয়ে চলেছি আমরা সবাই ; হঠাৎ দেখলাম একটা ট্রলারে কিছু চারচাকা গাড়ি এবং কিছু মানুষ ভাসতে ভাসতে চলেছে । তরী ক্রমশ এগিয়ে চলেছে........................
অনেকগুলি পরিযায়ী পাখি একত্রে উড়ে চলেছে নীল আকাশের মাঝে, চিলকার সবুজ জল এবং আকাশের নীল রং মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গেছে। তরী কখন যে ভাসতে ভাসতে হ্রদের মাঝখানে এসে উপস্থিত হলো বুঝতে পারলাম না ; দেখলাম অসংখ্য ডলফিন তিরিং বিরিং করে লাফিয়ে যাচ্ছে কি মজাদার ব্যাপার!
বাচ্চাকাচ্চারা তো আনন্দ মাখা কন্ঠস্বর বলেই উঠলো - ও হাউ ফানি। তরী ক্রমশ এগিয়ে চলেছে........................
ভাসতে ভাসতে চোখে পড়লো এক সবুজ বনানী।।
এবার মনে হলো বনানী যেন ক্রমশ এগিয়ে আসছে আমাদের কাছে, অস্পষ্ট ঝোপ-ঝাড় আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠলো দেখা গেলো এক বিরাট বড় ঝাউবন। এবার সূর্যি মামা ক্রমশ পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যাচ্ছেন তার রশ্মিতে লেকের সবুজ জল এবার যেন সোনার রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে। আবার পরিযায়ী পাখিরা উঁড়ে চলেছে শত শত, কেউ আবার জলের ওপরে ভাসছে হাঁসের মতন। এবার তরী এসে দাঁড়ালো এক হলুদ বালুকাময় সবুজ ঝাউবনে ঘেরা অসংখ্য ক্যাকটাসে ভরা দ্বীপে যেখানে ছোট ছোট তাবু খাটানো ছিলো কারণ সেখানে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে । কিছু লোক আবার হ্রদের পাশে বসে বসে বনভোজন করে চলেছে নিজেদের ছন্দে। এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর জলযাত্রা প্রায় অন্তিম লগ্নে যেতে যেতে দেখতে পেলাম কেউ কেউ নৌকার মধ্যে বসেও বনভোজন করছে নিজেদের মতো করে। আবার ও একটা ভেসেলে পার হয়ে যাচ্ছে বাস বাইক এবং অসংখ্য মানুষ।। আমরা অবাক হয়ে মাঝি কে জিজ্ঞেস করলাম - ভেসেল বাস কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে ? সে তেমন কোনো উত্তর দিতে পারলো না বা হয়তো সে আমাদের ভাষাই বুঝতে পারেনি। এভাবে আনন্দে ছন্দে আমাদের আজকের যাত্রা শেষ হলো। আবার গাড়ি করে হোটেলে ফিরে আসলাম, রাত্রের দিকে একটু সমুদ্র সৈকতে বেরিয়ে দেখি তখনো সেখানে উৎসব সজ্জায় মুখরিত। সাগর কিনারে এক বিরাট নাগর দোলা বসেছিলো, সৈকতের পাশে প্রতিটি হোটেল সুন্দর সুন্দর আলোকসজ্জায় সাজানো ছিলো কারণ সেই সময় সেখানে মেলা হচ্ছিলো। তাড়াতাড়ি নৈশ্য ভোজন সেরে শুয়ে পড়লাম।
সকাল সকাল উঠে সমুদ্রে স্নান করার মজাটাই আলাদা...........
ঢেউয়ের পর ঢেউ আমাদের যেন ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে।
অবশেষে পুরীর সমুদ্র সৈকতে আশ
পাশ ঘুরে ঘুরে দেখার পালা।
তাই তাড়াতাড়ি মধ্যাহ্নভোজন শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম, প্রথমে যেটা দেখলাম সেটা হলো খুব সুন্দর গৌতম বুদ্ধের মন্দির যেখানে গেলে মনটা পবিত্র হয়ে যায়। এই মন্দিরে চারিদিকে অসংখ্য ফুল গাছ দিয়ে সাজানো এই মন্দিরের নাম সুদর্শন মন্দির। আর ১০-১৫ মিনিট পরেই জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি। তারপর একটা আশ্রমে যাওয়া হয়েছিলো সেখানেও অসংখ্য ফুল এবং ফল গাছ দ্বারা সুসজ্জিত ছিলো। এবার গুপ্ত বৃন্দাবন যেটা দেখলে মনে হয় যে যেন শ্রী চৈতন্য দেব যেন আমাদের কাছে ডাকছেন। এখানে চৈতন্যদেবের বিভিন্ন সময়কালের মূর্তি রয়েছে। যেতে যেতে গাড়ি দাঁড়ালো একটা মন্দিরের সামনে যেখানে এই মন্দিরের একটি কক্ষে ১০৮ টা মহাদেবের মূর্তি রক্ষিত রয়েছে। সেই মন্দিরের এক প্রান্তে দোলনায় বসে দুলছেন শ্রী রাধিকা এবং তার সখা শ্রীকৃষ্ণ।
অবশেষে একটি মন্দিরে প্রবেশ করা হলো যেটি কিনা চন্দন হ্রদের মধ্যস্থলে সেখানেও জগন্নাথ, রাধা কৃষ্ণ ও শ্রীচৈতন্যদেব কে দেখতে পেলাম। এইভাবে চারিপাশ ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যে নেমে আসে। এবার তো বাড়ি ফিরতে হবে তাই হোটেলে গিয়ে বিলম্ব না করে রাত আটটার মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়লাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। রাত দশটা বেজে ১৫ মিনিটে আমাদের ট্রেন ছিলো সেদিনের নৈশ্য ভোজনে ছিল তরকা এবং রুটি।
ট্রেনের দোলা চলে কখন যে ঘুম এসে গেল বুঝতে পারিনি যখন ঘুম ভাঙলো ভোর পাঁচটা বেজে বাইশ মিনিট ট্রেন এসে দাঁড়ালো খড়গপুর স্টেশনে। আবারও ট্রেন ছুটছে তার সাথে ছুটে চলেছে পদ্ম ফুলের খাড়ি, সবুজ ধান জমি, চুলে ছুটে চলেছে গাঁদা ফুলের মেলা, হলুদ সরষে ক্ষেত। এবার ট্রেন এসে দাঁড়ালো কোলাঘাটে ওই যে তাপবিদ্যুতের চুল্লি ক্ষনিকের মধ্যে পার হয়ে গেলো রূপনারায়ণ। সকাল আটটা ট্রেন এসে দাঁড়ালো শালিমার স্টেশনে, এবার স্করপিও তে চেপে দ্বিতীয় হুগলী সেতুর উপর দিয়ে মা ফ্লাইওভার ধরে বিজ্ঞান নগরী কে সাক্ষী রেখে বাড়ি ফিরে এলাম পিছে পড়ে রইল এক গুচ্ছ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। একটি ভ্রমণের মধ্যে ভালো-মন্দ উভয় রয়েছে তাই আমি বলবো আমার কাছে পুরী ভ্রমণ মন্দ হয়নি এই ভ্রমণ আমার কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
==================
নাম - অঙ্কিতা পাল বিশ্বাস
ভাঙ্গড় দক্ষিণ ২৪ পরগনা
দূরভাষ - ৯৭৪৯৬১৭২২০
হলুদ বালুতটে নীল জলের বারংবার আছড়ে পড়া দেখতে কার না ভালো লাগে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ শ্রী জগন্নাথ দেবের মন্দির। আমাদের ট্রেনের সময় ছিল রাত আটটা বেজে ৩৫ মিনিটের গরীব রথ এক্সপ্রেস যেটি শালিমার স্টেশন থেকে ছেড়ে পরের দিন সকাল ছয়টা ত্রিশ মিনিটে পুরীতে পৌঁছয়।
আমরা মধ্যাহ্ন ভোজন শেষ করে ঠিক বিকেল ৪ঃ৩০ মিনিটে স্করপিও সংযোগে সন্ধ্যা সাতটা বেজে পনেরো মিনিটে শালিমার স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। পথে যেতে যেতে অতিক্রান্ত হলো মা ফ্লাইওভার সেখানে আলোক বর্ণমালায় সাজানো বিজ্ঞাননগরীকে চমৎকার দেখতে লাগছিল, তারপর দ্বিতীয় হুগলী সেতু যাহার নীচে আমাদের পবিত্র গঙ্গা নদী প্রবাহিত হয়ে চলেছে। বড়দিনের মহানগরী কে এমন আলোক বর্ণমালায় আলোকিত হতে আগে কখনো দেখিনি।
সেদিনে ট্রেনের নৈশ্য ভোজনে ছিলো চাওমিন ও রুটি তরকারি। কচিকাঁচারা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েছিল, নতুন জায়গা দেখবার আকর্ষণে চোখে ঘুম আসছিল না। রাতের আঁধারে কাঁচ লাগানো জানালায় ভালো করে দেখা যাচ্ছিলো না কিছুই, ট্রেন ছুটছে কেবলই ছুটেই চলেছে অবিরাম ; তবে মনে হলো একের পর এক ছোট বড় অনেক স্টেশন চলে গেলো। এবার ট্রেন এসে এক স্টেশনে দাঁড়ালো খড়গপুর স্টেশনে বেশ কিছুক্ষণ। অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ দেখি তারার মতো অনেকগুলি একসাথে আলো জ্বলছে, দূর থেকে মনে হলো রাতের আকাশে তারক মন্ডলীর মধ্যে ঢুকে আছি। ঘুম আসছিল না তাই বহুক্ষণ বসে আছি জানলার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ রাত দুটো ট্রেন এসে দাঁড়ালো এক স্টেশনে ঘুম চোখে ভালো করে বুঝতে পারিনি তারপর রাত তিনটে বেজে ৩০ মিনিট ট্রেন এসে দাঁড়ালো ভুবনেশ্বরে অবশেষে আমরা সকাল ছয়টা বেজে ২১ মিনিটে পৌঁছে গেলাম পুরীতে।
স্টেশন থেকে প্রায় ৩০ মিনিট দূরত্বে আমাদের হোটেল সেখানে একটা অটো সংযোগে যেতে যেতে উদীয়মান লাল সূর্যি মামার আভা সমুদ্র সৈকতের চকচকে হলুদ বালুতট পাশে থাকা সবুজ ঝাউ গাছের সাথে সাথে আমরা হোটেলে পৌঁছলাম। এতটা যাত্রা করে ক্লান্তির পর স্নান সেরে হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই এ বাড়ির ছাদ থেকে ও বাড়ির ছাদে এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে বাঁদর সেনাবাহিনী।
ভাইয়ের সাথে বেরিয়ে পড়লাম সকালে সমুদ্র দেখার আকাঙ্ক্ষায় প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিট হাঁটার পর দুজনে মিলে স্বর্গ দ্বারে পৌঁছে গেলাম ; যেখানে কি সুন্দর শান্ত পরিবেশে যারা গত হয়েছেন তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হচ্ছে তেনাদের আত্মার শান্তি কামনা করি। সেখান থেকে সমুদ্রকে খুব কাছ থেকে দেখা যাচ্ছিলো ওদিকে তাড়া দিচ্ছে দেরি হয়ে যাবে তাই বিলম্ব না করে, প্রাতরাশ এর জন্য লুচি ও ঘুগনি নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।
এবার একটু সাজগোজ করে পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম একটা টোটো সংযোগে সেখানে পৌঁছলাম এতো পরিমাণ জনজোয়ার দেখে চক্ষু চরক গাছ! একজন পূজারির মাধ্যমে পূজা দেওয়া সম্ভব হলো আমরাও চলেছি সাথে জন জোয়ার........................................
এতো ঠেলাঠেলি মানুষের ভিড় দেখে বিরক্তি লেগে গেলো বাচ্চাগুলো ভয়ে কাঁদতে শুরু করলো। যাইহোক ভিড় সামলে ঠেলে ঠুলে পূজা দিয়ে জগন্নাথ দেব কে দর্শন করে মনটা পবিত্র হয়ে গেলো, মন্দিরের আদলটাও ভারী সুন্দর। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বিকেলের শ্রান্ত আলোতে কিছুক্ষণ নিজেদের মতো ছবি তোলার পর মধ্যাহ্নভোজন সেরে হোটেলে ফিরে আসা হলো। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর, কর্তা মশায়ের হাত ধরে রাতের আঁধারে সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে পা ভিজিয়ে একের পর এক রুপোলী ঢেউগুলোকে কাছে এসে আছড়ে পড়তে দেখতে, সাথে স্নিগ্ধ বাতাস, সমুদ্র গর্জন, আকাশের এক ফালি চাঁদ সে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ যাকে এক কথায় প্রকাশ করা যায় না.......
পরের দিন সকালে প্রাতরাশ শেষ করে ভুবনেশ্বরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, স্রোতের মতো বয়ে চলে গেলো রাঙা প্রভাতী সমুদ্র সৈকত।
কিছুক্ষণ পর, গাড়ি এসে দাঁড়ালো আরেক জলরাশির তীরে যেখানে ঢেউয়ের তালে তালে সবুজ ঝাউ বনানী মাথা দুলিয়ে যাচ্ছে অনবরত নাম চন্দ্রভাগা। খুব সুন্দর শান্ত পরিবেশে মাছ ধরে চলেছে ডিঙি মাঝির দল।
এবার গাড়ি এসে দাঁড়ালো স্যান্ড ক্রাফ্ট মিউজিয়াম যেখানে বালি তৈরি অসংখ্য মূর্তি সুসজ্জিত রয়েছে। এতো সুন্দর নির্মাণ কার্য আগে কখনো দেখিনি।সেখানে কিছুক্ষণ থাকার পর............
আবারো চলেছি অজানা অচেনা পথ ধরে, পথের ধারে অসংখ্য ছোট বড় সবুজ বৃক্ষ রাশি ক্রমশ এগিয়ে চলেছে আমাদের সাথে। যেতে যেতে পার হয়ে যায় এক সুন্দরী নদী - টলটলে স্বচ্ছ জল নদীর কূলে লাল মোরামের সরু পথ, নাম মহানদী।
এবার গাড়ি এসে দাঁড়ালো কোনার্কের সূর্য মন্দিরে। এখানকার মন্দিরের আদল কিছুটা পরীর মন্দিরের মতন। আমরা প্রথমে টিকিট কেটে একটি কক্ষে প্রবেশ করেছিলাম যেখানে বিশাল আকৃতির পাথরের তৈরি দুটি বড় বড় চাকা ছিলো, কক্ষে পাথরের তৈরি বিভিন্ন রকমের মূর্তি সোনালী রঙের একটি বড় জাহাজ বা নৌকা আকৃতির জিনিস তৈরি করা ছিলো।
এবারে আমরা একটি পেক্ষা গৃহে প্রবেশ করলাম সেখানে মন্দিরের নির্মাণ সম্পর্কে চলচ্চিত্র এর মাধ্যমে দেখানো হয়েছিল। মন্দিরে ভিড়ের কারণে ঢোকা সম্ভব হলো না। বাইরে থেকে দেখে সূর্য দেবতার মন্দিরকে চক্ষু সার্থক করতে হলো।
তারপর অনেকটা পথ অতিবাহিত করার পর একটি স্থানে মধ্যাহ্নভোজন করা হলো.............................
তার কিছুক্ষণ চলার পর র একটি ছোট্ট পাহাড়ি রাস্তা একে বেঁকে ধবলগিরি বা ধৌলি গিরিতে পৌঁছলো। সেখানে সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাবা মহেশ্বরের মূর্তি দর্শন করলাম ঠিক তার পিছনেই রয়েছে শ্বেত বর্ণের গৌতম বুদ্ধের মন্দির ; যেন তিনি স্বয়ং বিচরণ করে চলেছেন। পাহাড়ের কোল থেকে বয়ে চলা স্বল্প জলে ভরা সরযু নদীকে পল্লী বাংলা ছবির মতো অপরূপ দেখতে লাগছিল।
কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি এসে দাঁড়ালো লিঙ্গরাজ মন্দিরে। এখানকার নিয়ম অনুসারে চামড়ার জিনিস ব্যবহার নিষিদ্ধ, তাই বিলম্ব না করে মন্দিরের আশেপাশ পরিদর্শন করে কিছুক্ষণ বিন্দু সরোবরের টলমল জলে হাত ডুবিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম নন্দনকানন এর উদ্দেশ্যে।
নন্দন কাননে যেতে প্রায় বিকাল চারটে পনেরো বেজে গেলো, প্রবেশ করতে না করতেই একটি ময়ূর পেখম মেলে গাছের উপর বসেছিল, খাঁচার মধ্যে দেখলাম অনেকগুলি বানর একত্রিত হয়ে খেলা করছিলো, একগুচ্ছ সবুজ ঘাসের ওপর একটি লম্বা গলা জিরাফ ঘুরে বেড়াচ্ছিল, একটু উঁকি মেরে দেখি যে জলের মধ্যে ওটা কি দেখা যায়? দুটো জলহস্তি একজন পিঠ ডুপিয়ে আরেকজন মাথা ডুবিয়ে বসে আছে । ওরে বাবা এবার তো বাঘ মামার খাঁচায় চলে এসেছি আমরা
ওই যে সাদা বাঘটা বসে আছেন গাছের উপর , আর আরেকজন বাঘ মামা এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর একজন বাঘ মামা বসে বসে মাংস খাচ্ছেন এতো যে মানুষ তাকে দেখতে এসেছেন তার কোনো ভুরুক্ষেপ নাই। এতো বড় বড় বাঘ মামাদের সাথে আলাপ হয়ে মন ভরে গেলো ।
এভাবেই সন্ধ্যে নেমে এলো নন্দনকাননে।
ক্লান্ত এবার নেমে একটু চা খাওয়া হলো, এবার হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত নটা বেজে গেলো।
পরদিন সকাল ৮:০০ টা চা জল খাবার খেয়ে আমরা চিলকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম..... ...............
পুরী থেকে চিলকার দূরত্ব প্রায় দেড় ঘন্টার মতো।
কিছুটা পথ যেতে যেতে একটি সরবরে একগুচ্ছ শ্বেত পদ্মের মেলা, কোথাও আবার লাল শালুক কোথাও বা সাদা, কোথাও বা বেগুনি কচুরিপানার দল ভেসে চলেছে। এত সুন্দর গ্রাম বাংলার পল্লী প্রকৃতি আগে কখনো দেখিনি দুদিকে লাল-মোরামের রাস্তা আমরা ক্রমশ এগিয়ে চলেছি। মাঝে মাঝে দুই একটি ঝাউবন চোখে পড়ে, কোথাও আবার চোখে পড়ে বকুলের মেলা কোথাও আবার বাবলা, বট কোথাও বা সবুজ ক্যাকটাসের দল, ইউক্যালিপটাসও কম নয়। ক্রমশ এগোচ্ছি আহা কি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছি যা কখনোই ভোলা যায় না। এবার গাড়ি এসে পৌঁছলো একটি খাবারের স্থানে আহা! মাটির দেয়ালের ওপর চিংড়ি, কাঁকড়া, পাখি, মাছ আঁকা স্থানে বসে গ্রাম বাংলা প্রকৃতির ছত্রছায়ায় চিংড়ি মাছের তরকারি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন করতে কতইনা ভালো লাগছিলো।
এবার চিলকা হ্রদে আমাদের ভ্রমণ জলে ছিলো প্রায় তিন ঘন্টার মতন , আমরা ঠিক দুপুর বারোটা ১৫ নাগাদ নৌকায় উঠেছিলাম। চিলকা হ্রদের সবুজ জলে ভাসতে ভাসতে তরী একটা তীরে পৌঁছলো আশ্চর্যের বিষয় জলের মধ্যে একটি মানুষ ঝিনুক ভেঙ্গে ভেঙ্গে মুক্ত দেখানোর এবং শৈবাল ভেঙে বিভিন্ন রঙের প্রবাল দেখাচ্ছিলেন, এর পাশাপাশি কিছু লাল কাঁকড়াও দেখিয়েছিলেন তিনি। চিলকা হ্রদের বক্ষ মাঝে ভাসমান নৌপথে ক্রমশ এগিয়ে চলেছি আমরা সবাই ; হঠাৎ দেখলাম একটা ট্রলারে কিছু চারচাকা গাড়ি এবং কিছু মানুষ ভাসতে ভাসতে চলেছে । তরী ক্রমশ এগিয়ে চলেছে........................
অনেকগুলি পরিযায়ী পাখি একত্রে উড়ে চলেছে নীল আকাশের মাঝে, চিলকার সবুজ জল এবং আকাশের নীল রং মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গেছে। তরী কখন যে ভাসতে ভাসতে হ্রদের মাঝখানে এসে উপস্থিত হলো বুঝতে পারলাম না ; দেখলাম অসংখ্য ডলফিন তিরিং বিরিং করে লাফিয়ে যাচ্ছে কি মজাদার ব্যাপার!
বাচ্চাকাচ্চারা তো আনন্দ মাখা কন্ঠস্বর বলেই উঠলো - ও হাউ ফানি। তরী ক্রমশ এগিয়ে চলেছে........................
ভাসতে ভাসতে চোখে পড়লো এক সবুজ বনানী।।
এবার মনে হলো বনানী যেন ক্রমশ এগিয়ে আসছে আমাদের কাছে, অস্পষ্ট ঝোপ-ঝাড় আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠলো দেখা গেলো এক বিরাট বড় ঝাউবন। এবার সূর্যি মামা ক্রমশ পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যাচ্ছেন তার রশ্মিতে লেকের সবুজ জল এবার যেন সোনার রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে। আবার পরিযায়ী পাখিরা উঁড়ে চলেছে শত শত, কেউ আবার জলের ওপরে ভাসছে হাঁসের মতন। এবার তরী এসে দাঁড়ালো এক হলুদ বালুকাময় সবুজ ঝাউবনে ঘেরা অসংখ্য ক্যাকটাসে ভরা দ্বীপে যেখানে ছোট ছোট তাবু খাটানো ছিলো কারণ সেখানে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে । কিছু লোক আবার হ্রদের পাশে বসে বসে বনভোজন করে চলেছে নিজেদের ছন্দে। এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর জলযাত্রা প্রায় অন্তিম লগ্নে যেতে যেতে দেখতে পেলাম কেউ কেউ নৌকার মধ্যে বসেও বনভোজন করছে নিজেদের মতো করে। আবার ও একটা ভেসেলে পার হয়ে যাচ্ছে বাস বাইক এবং অসংখ্য মানুষ।। আমরা অবাক হয়ে মাঝি কে জিজ্ঞেস করলাম - ভেসেল বাস কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে ? সে তেমন কোনো উত্তর দিতে পারলো না বা হয়তো সে আমাদের ভাষাই বুঝতে পারেনি। এভাবে আনন্দে ছন্দে আমাদের আজকের যাত্রা শেষ হলো। আবার গাড়ি করে হোটেলে ফিরে আসলাম, রাত্রের দিকে একটু সমুদ্র সৈকতে বেরিয়ে দেখি তখনো সেখানে উৎসব সজ্জায় মুখরিত। সাগর কিনারে এক বিরাট নাগর দোলা বসেছিলো, সৈকতের পাশে প্রতিটি হোটেল সুন্দর সুন্দর আলোকসজ্জায় সাজানো ছিলো কারণ সেই সময় সেখানে মেলা হচ্ছিলো। তাড়াতাড়ি নৈশ্য ভোজন সেরে শুয়ে পড়লাম।
সকাল সকাল উঠে সমুদ্রে স্নান করার মজাটাই আলাদা...........
ঢেউয়ের পর ঢেউ আমাদের যেন ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে।
অবশেষে পুরীর সমুদ্র সৈকতে আশ
পাশ ঘুরে ঘুরে দেখার পালা।
তাই তাড়াতাড়ি মধ্যাহ্নভোজন শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম, প্রথমে যেটা দেখলাম সেটা হলো খুব সুন্দর গৌতম বুদ্ধের মন্দির যেখানে গেলে মনটা পবিত্র হয়ে যায়। এই মন্দিরে চারিদিকে অসংখ্য ফুল গাছ দিয়ে সাজানো এই মন্দিরের নাম সুদর্শন মন্দির। আর ১০-১৫ মিনিট পরেই জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি। তারপর একটা আশ্রমে যাওয়া হয়েছিলো সেখানেও অসংখ্য ফুল এবং ফল গাছ দ্বারা সুসজ্জিত ছিলো। এবার গুপ্ত বৃন্দাবন যেটা দেখলে মনে হয় যে যেন শ্রী চৈতন্য দেব যেন আমাদের কাছে ডাকছেন। এখানে চৈতন্যদেবের বিভিন্ন সময়কালের মূর্তি রয়েছে। যেতে যেতে গাড়ি দাঁড়ালো একটা মন্দিরের সামনে যেখানে এই মন্দিরের একটি কক্ষে ১০৮ টা মহাদেবের মূর্তি রক্ষিত রয়েছে। সেই মন্দিরের এক প্রান্তে দোলনায় বসে দুলছেন শ্রী রাধিকা এবং তার সখা শ্রীকৃষ্ণ।
অবশেষে একটি মন্দিরে প্রবেশ করা হলো যেটি কিনা চন্দন হ্রদের মধ্যস্থলে সেখানেও জগন্নাথ, রাধা কৃষ্ণ ও শ্রীচৈতন্যদেব কে দেখতে পেলাম। এইভাবে চারিপাশ ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যে নেমে আসে। এবার তো বাড়ি ফিরতে হবে তাই হোটেলে গিয়ে বিলম্ব না করে রাত আটটার মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়লাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। রাত দশটা বেজে ১৫ মিনিটে আমাদের ট্রেন ছিলো সেদিনের নৈশ্য ভোজনে ছিল তরকা এবং রুটি।
ট্রেনের দোলা চলে কখন যে ঘুম এসে গেল বুঝতে পারিনি যখন ঘুম ভাঙলো ভোর পাঁচটা বেজে বাইশ মিনিট ট্রেন এসে দাঁড়ালো খড়গপুর স্টেশনে। আবারও ট্রেন ছুটছে তার সাথে ছুটে চলেছে পদ্ম ফুলের খাড়ি, সবুজ ধান জমি, চুলে ছুটে চলেছে গাঁদা ফুলের মেলা, হলুদ সরষে ক্ষেত। এবার ট্রেন এসে দাঁড়ালো কোলাঘাটে ওই যে তাপবিদ্যুতের চুল্লি ক্ষনিকের মধ্যে পার হয়ে গেলো রূপনারায়ণ। সকাল আটটা ট্রেন এসে দাঁড়ালো শালিমার স্টেশনে, এবার স্করপিও তে চেপে দ্বিতীয় হুগলী সেতুর উপর দিয়ে মা ফ্লাইওভার ধরে বিজ্ঞান নগরী কে সাক্ষী রেখে বাড়ি ফিরে এলাম পিছে পড়ে রইল এক গুচ্ছ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। একটি ভ্রমণের মধ্যে ভালো-মন্দ উভয় রয়েছে তাই আমি বলবো আমার কাছে পুরী ভ্রমণ মন্দ হয়নি এই ভ্রমণ আমার কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
==================
নাম - অঙ্কিতা পাল বিশ্বাস
ভাঙ্গড় দক্ষিণ ২৪ পরগনা
দূরভাষ - ৯৭৪৯৬১৭২২০
