গল্প ।। জীবনের মাঠে ।। উৎপল সরকার


                                                                                                                                                    ছবিঋণ- ইন্টারনেট 

 

জীবনের মাঠে

উৎপল সরকার 

পড়ন্ত বিকেল। মায়া টকিজের পাশে বি এম ক্লাবের মাঠের কোনায় লম্বা ঘাসগুলো দুলছে হালকা হাওয়ায়। বহু বছর পর নিজের শহর আলিপুরদুয়ারে ফিরেছে ইশান। কলকাতার বেসরকারি চাকরির ব্যস্ততায়, দূরের জীবনে, এই মাঠটাকে সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। তবু আজকে মন আপনা আপনি তাকে এখানে টেনে এনেছে।
মাঠের এক কোণে ডিউস বলে কয়েকজন কিশোর ক্রিকেট খেলছে। বলটা গড়িয়ে এসে ইশানের পায়ের কাছে থামল। সে বল তুলে ছুড়ে দিতেই ছেলেগুলোর একজন হেসে বলল,
— "দাদা, খেলবে নাকি?"
ইশান একটু থমকে গেল। কতদিন ব্যাট হাতে নেয়নি! তবু অদ্ভুত টানে এগিয়ে গেল।
— "চেষ্টা করতে পারি," হেসে বলল সে।
খেলা শুরু হলো। প্রথম কয়েকটা বলে একটু অস্বস্তি, তারপর ধীরে ধীরে কিছুটা ছন্দ ফিরে এল। ব্যাটে বল লাগতেই টক করে যে শব্দ উঠল, তা যেন তার শৈশব ও কৈশোরের দরজা হাট করে খুলে দিল। এই মাঠেই সে একসময় স্বপ্ন দেখত—বড় খেলোয়াড় হবে, রেলের প্লেয়ার্স কোটায় সরকারি চাকরি করবে।
একটা জোরালো কভার ড্রাইভ মারতেই ছেলেগুলো চিৎকার করে উঠল—
— "ওফ দাদা! একদম ফাটিয়ে দিয়েছো !"
ইশান একটু হেসে বলল,
— "আগে খেলতাম… অনেক আগে।"
খেলার ফাঁকে ছেলেটা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
— "দাদা, তুমি কি এখানে খেলতে?"
— "হ্যাঁ, এই মাঠেই বড় হয়েছি।"
— "তাহলে এখন খেলো না কেন?"
এই প্রশ্নটাই যেন বুকের ভেতর কোথাও চেপে থাকা একটা স্মৃতিকে নেড়ে দিল। ইশান একটু চুপ করে রইল, তারপর বলল,
— "সবাই সব জায়গায় টিকে থাকতে পারে না রে…"
খেলা শেষ হলে ছেলেটি বলল,
— "দাদা, তুমি তো দারুণ খেলো! এতদিন কোথায় ছিলে?"
ইশান মৃদু হেসে বলল,
— "এই মাঠেই ছিলাম… শুধু একটু দূরে সরে গিয়েছিলাম।"
ছেলেগুলো চলে গেলে মাঠটা আবার ফাঁকা হয়ে গেল। ইশান একা দাঁড়িয়ে রইল। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল পুরনো দিনগুলো।
তখন সে নিয়মিত প্র্যাকটিস করত। সকালবেলা কুয়াশা ভেদ করে দৌড়, বিকেলে নেট। কোচ বলতেন,
— "তোর ট্যালেন্ট আছে, ইশান। একটু সুযোগ পেলে অনেক দূর যেতে পারবি।"
সেই কথাতেই ভরসা করে সে স্বপ্ন বুনেছিল। রেলের ট্রায়াল দিতে গিয়েছিল। প্রথম দিন ব্যাট হাতে নামতেই সবাই তাকিয়ে ছিল। ভালো খেলেছিল সে। দ্বিতীয় দিনও রান করেছিল। কিন্তু তারপরই সবকিছু বদলে গেল।
একজন সিনিয়র প্লেয়ার তাকে আলাদা করে ডেকে বলেছিল,
— "দেখ, এখানে শুধু খেলা দিয়ে হয় না… বুঝেছিস তো?"
— "মানে?"
— "কাকে ধরতে হবে, কার কথা শুনতে হবে… এগুলো না জানলে সুযোগ পাওয়া কঠিন।"
ইশান কিছুই বুঝতে পারেনি, বা বুঝেও মানতে পারেনি। সে ভেবেছিল মাঠে পারফরম্যান্সই সব। কিন্তু শেষ তালিকায় তার নাম ছিল না।
বাড়ি ফিরে সে হতাশ হয়ে বসে ছিল। বাবা তখন বলেছিলেন,
— "খেলাধুলো ভালো, কিন্তু পেটের দায় বড়। অন্য কিছু ভাব।"
সেই থেকেই ধীরে ধীরে ক্রিকেটটা হাতছাড়া হয়ে যায়। পড়াশোনা শেষ করে কাজের খোঁজে কলকাতা যায় সে।
কলকাতার জীবন ছিল একেবারে অন্যরকম। ছোট্ট ভাড়া বাড়ি, চারজন মিলে এক ঘরে থাকা, মাসের শেষে টাকার টান—সব মিলিয়ে একটা নিরন্তর লড়াই। অফিসে বসের ধমক,
— "ইশান, এই রিপোর্টটা আবার ভুল! কবে শিখবে?"
সহকর্মী রাহুল একদিন বলেছিল,
— "দেখ, এখানে টিকে থাকতে হলে সব সহ্য করতে হবে। স্বপ্ন দিয়ে পেট ভরে না।"
রাতে বিছানায় শুয়ে ইশান অনেকবার ভেবেছে—যদি আরেকটু লড়ত? যদি ওই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াত? কিন্তু তখন পরিস্থিতি তাকে অন্যদিকে ঠেলে দিয়েছিল।
মাঝে মাঝে ছুটির দিনে সে গড়ের মাঠে গিয়ে বসত। দূরে কেউ ক্রিকেট খেললে চুপচাপ তাকিয়ে থাকত। একদিন এক অচেনা ছেলে বলেছিল,
— "দাদা, খেলবে?"
ইশান মাথা নেড়ে বলেছিল,
— "না, এখন আর খেলি না।"
কিন্তু মনে মনে জানত, খেলাটা সে ছাড়েনি—খেলাই যেন তাকে ছেড়ে দিয়েছে।
আজ এতদিন পর এই পুরনো মাঠে ফিরে এসে মনে হচ্ছে, সবকিছু আবার নতুন করে শুরু হতে পারে কি?
সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। আকাশে লালচে আলো। ইশান অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবছিল। হঠাৎ পাশের চায়ের দোকান থেকে হরেন কাকু ডাকলেন,
— "এই ইশান! কবে এলি রে?"
সে চমকে তাকাল।
— "আজই কাকু।"
— "দেখলাম খেলছিলি। একদম আগের মতোই আছে তোর হাত!"
ইশান হেসে বলল,
— "সময় বদলায় কাকু… মানুষও।"
হরেন কাকু চা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
— "সব বদলায় না রে। যেটা ভেতরে থাকে, সেটা ঠিকই রয়ে যায়।"
চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছিল। ইশান ধীরে ধীরে চুমুক দিল। মনে হচ্ছিল, এই শহর, এই মাঠ—সবকিছু তাকে এখনো চেনে, এখনো আপন করে নেয়।
বাড়ি ফেরার পথে তার মনে হলো, সব স্বপ্ন পূরণ নাও হতে পারে, কিছু স্বপ্ন মাঝপথে থেমে যায়, কিছু স্বপ্নকে থামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু জায়গা থাকে, যেখানে ফিরে এলে মনে হয়—সব হারিয়ে যায়নি।
হয়তো সে বড় খেলোয়াড় হতে পারেনি, হয়তো সরকারি চাকরিটাও জোটেনি । কিন্তু জীবনের এই মাঠে সে এখনও খেলছে—নিজের মতো করে, নিজের লড়াই নিয়ে।
আর সেদিন তার মনে হলো, কখনও কখনও ফিরে আসতে পারাটাই সবচেয়ে বড় জয়।
--------------------------------------------
 
 
লেখায়--- উৎপল সরকার
নিউটাউন, জেলা - আলিপুরদুয়ার

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.