ছবিঋণ- ইন্টারনেট
প্রেম এসেছিলো জীবনে
সমীর কুমার দত্ত
অন্ধকারে উঠানের এক গোপন জায়গায় কাজল ও শশাঙ্কের নৈশপ্রেম রোজই চলতে থাকে। একে অপরের আলিঙ্গনাবদ্ধ হোয়ে সুখদুঃখের কথা শেয়ার করে। ছোট থেকে তারা বড়ো হয়েছে পাশাপাশি বসবাস কোরে। কৈশোর থেকে 'তুই' 'তোকারি' করে বেড়ে উঠেছে। তখন ওদের মনের মধ্যে কোন পাপ ছিলো না। কিন্তু মনের টান ছিল। তবে মনের টান মনেই ছিল। তাই কেউ ভাবতেও পারেনি যে পরবর্তী কালে তারা পরস্পরের প্রেম বন্ধনে আবদ্ধ হবে। কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তীর্ণ হতেই পরষ্পরের প্রতি প্রেমাশক্ত হয়ে পড়ে। রাতের অন্ধকার উঠানে তাদের প্রেম বেড়ে ওঠে অবাধে।
কাজল ও শশাঙ্ক পরষ্পরের প্রতিবেশী। বাড়িওলাসহ পাঁচ ভাড়াটের বাড়িতে বসবাস করে। কাজল শশাঙ্কের থেকে বয়সে বড় হবে তো ছোট নয়। কাজল গ্রাজুয়েট। শশাঙ্ক অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ।আটা কলের ব্যবসায়ী ত্রিলোচন জানা'র তিন পুত্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র। একটা প্রাইভেট ফার্মের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। কাজল , স্বাস্থ্য বিভাগের সরকারি কর্মচারী অনুকূল বর্ধনের একমাত্র কন্যা। কাজল যখন স্কুল ফাইনাল পাশ করে, তখন ওর মা শোভা দেবী দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। বাবার তত্ত্বাবধানে কাজল ঘরকন্না করার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাজুয়েট হয়। মায়ের অকাল প্রস্থান আর সবকাজ সেরে বাবার অফিস চলে যাওয়াতে কাজল নিঃসঙ্গ লাগামছাড়া হয়ে পড়ায় প্রতিবেশী শশাঙ্কের বাড়ির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বশতঃ এই প্রেমের উন্মেষ হয়ে থাকতে পারে।
যৌবনে পদার্পণ করেই দুজনের পরষ্পরের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়।'তুই' থেকে 'তুমি'তে উত্তরণ ঘটে পরষ্পরের গাত্র স্পর্শে পরষ্পরের মনে শিহরণ জাগে। একে অপরকে কাছে পাবার তীব্র আকাঙ্খা মাথাচাড়া দেয়। কিন্তু উভয় বাড়ির কেউই চায় না ওদের মিলন ঘটুক। কাজে কাজেই নৈশ অভিসার ছাড়া উপায় কী।
কাজল শ্যামবর্ণা , খুব সুশ্রী না হলেও , চলে যাওয়ার মতো। পক্ষান্তরে শশাঙ্ক শিক্ষিত না হলেও সুশ্রী বটে। আবার চাকুরে।
কাজলের জন্য পাত্র যে দেখা হয়নি তা নয়। তবে কারোর সুনজরে কাজল পড়েনি। শশাঙ্ক বয়সে কিছুটা ছোট হলেও , বাকিগুলোতে উত্তীর্ণ হয়ে যায়।
কিন্তু উভয়ের বাড়ি বিধি বাম।
বয়সে বড়ো কুশ্রী মেয়েকে শশাঙ্কর বাড়ি কোন ভাবেই মেনে নেবে না। আর কন্যা পক্ষের তরফে অনুকূল বাবু খুব গোঁড়া লোক। তাছাড়া পাত্র বয়সে ছোট এবং অশিক্ষিত। কোন ভাবেই চলবে না। তবুও উগ্র যৌবনের তীব্র আকর্ষণে নৈশ অভিসার জমে ওঠে। একদিন কাজল ধরা পড়ে গেলো বাবার কাছে নিজের অজান্তেই। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যে হয়।
একদিন রাতে কাজলের বাবা টের পেয়ে যান যে তার কন্যা বাথরুম করার জন্য নিত্যকার মতো দরজার খিল খুলে বের হয়। কিন্তু বহুক্ষণ পার হয়ে যাবার পরও ঘরে ঢোকেনি। "বাইরে এতোক্ষণ কাজল করছেটা কী?" কথাটা মনে মনে বলেই চুপিসারে বেরিয়ে গেলেন দেখতে। যা দেখলেন তাতে তাঁর চক্ষু চড়কগাছ। তাঁর মেয়ে বয়সে তার চেয়ে ছোট এক যুবকের আলিঙ্গনাবদ্ধ। ইচ্ছে করছিলো এক চড়ে মাথাটা ঘুরিয়ে দিতে। ধীর পদে ঘরে এসে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে কাজল চুপচাপ ঘরে এসে দরজায় খিল দিয়ে শুয়ে পড়ে। সে যে ধরা পড়ে গেছে,তা সে জানতে পারলো না। অনুকূল বাবুর ঘুম মাথায় উঠলো । চিন্তিত হয়ে পড়লেন। মা মরা মেয়ে। তাই এই হাল! আর দেরি করা ঠিক হবে না। এবার থেকে অনিদ্রায় তাঁর দিন কাটতে লাগলো।ঠিক করলেন ,এখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জরুরীভিত্তিক বদলি হওয়ার জন্য আবেদন করবেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। কিছুদিনের মধ্যেই আবেদন মঞ্জুর হলো। কারণ , গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বড়ো একটা কেউ বদলি হতে চায় না। ব্যাপারটা চটজলদি কাজলের অজান্তেই ঘটে গেলো। প্রতিদিনের মতো কাজল সেদিন নির্দিষ্ট সময়ে উসখুস করতে থাকে বাইরে বের হবার জন্য। কিন্তু অনুকূল বাবু হাবেভাবে মেয়েকে বুঝিয়ে দেন যে তিনি জেগে আছেন। গত কয়েক দিন বাবার হাবভাবে সে বুঝতে পারে যে সে তার চোরা প্রেমে বাবার কাছে ধরা পড়ে গেছে। দিনের বেলায় শশাঙ্কের সঙ্গে কোন ভাবেই সে দেখা করতে পারে না এক বাড়ি লোকের সামনে। তাছাড়া শশাঙ্ক চাকরিতে বেরিয়ে যায় আর ফিরতে ফিরতে রাত সাতটা আটটা হয়ে যায়। ততোক্ষণে অনুকূল বাবু ফিরে পড়েন। কাজল ঘর থেকে বেরোতে পারে না।
কিছুদিনের মধ্যেই তোড়জোড় শুরু হয়েগেলো বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার। বাড়িওলাকে সবকথা জানিয়ে অনুকূল বাবু বাসার পাট চুকিয়ে মেয়েকে নিয়ে দেশের বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। তড়িঘড়ি একটা সম্বন্ধ দেখে কাজলের বিয়ে দিয়ে দিলেন। শশাঙ্ক এর কিছুই জানতে পারলো না। কারণ, কাজল শশাঙ্কের মুখোমুখি হলেও কোন কথা হয়নি। এমনকি চোখাচুখিও নয়।বাবার এই হটকারিতার কারণ কাজল বুঝে উঠতে পারেনি এবং বিবাহে বাধাও দিতেও পারেনি।
শহুরে পাত্র অনেক দেখেছেন , তবে সরকারি চাকুরে দেখতে গিয়েই পাত্র আর জোটেনি। সরকারি পাত্রদের বাজারে দাম আছে। সুতরাং বরপণ যেমন আছে, তেমনি পাত্রীকে রূপবতী না হলেও খেলো হলে চলবে না। সুন্দরী, রূপবতীদের ক্ষেত্রে একটা সুবিধে আছে। অল্প বরপণ হলেও চলে যাবে। অবস্থাপন্ন সরকারি পাত্রদের রূপের প্রতি যতটা টান , অর্থের প্রতি ততটা নয়। মধ্যবিত্ত সরকারি চাকুরেদের অল্পবিস্তর অর্থ ও রূপ দুটোর প্রতি মোহ থাকে। তবে এক্ষেত্রে তারা দুটোকে সামঞ্জস্য করে নেয়। কিন্তু কাজলের ক্ষেত্রে দুটোই কম। রূপের কথা নয় ছেড়েই দেওয়া গেলো। অর্থও যে খুব একটা বেশি ব্যয় করতে পারবে তেমনও নয়। কারণ অনুকূল বাবু বাংলাদেশ থেকে উৎপাটিত হয়ে নিঃস্ব অবস্থায় এদেশের ভিন গাঁয়ে দখলি জমির পাট্টা পেয়ে বসবাস করছেন। চাকরির খাতিরে গ্রামের বাড়ি চাবি দিয়ে স্ত্রী,কন্যা নিয়ে শহরে একখানা ঘর ভাড়া করে চাকরি পর্যন্ত শহরে থাকার ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন। স্ত্রী দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। স্ত্রীর মৃত্যুতে কিছুটা ভেঙে পড়লেও শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেন।মেয়েকে শিক্ষিত করে তোলেন। মন্দের ভালো অবস্থায় জীবন ধারণ করেন, কারণ, রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের মাইনে ততোটা ভালো নয়। তবে সরকারি চাকরির একটা নিরাপত্তা আছে। যদিও জীবনের কোন কিছুরই নিরাপত্তা নেই।
যাই হোক, কাজলের বিয়ে ঠিক হলো একজন দোজবরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে। যার স্ত্রী এক সন্তানের জন্ম দিয়ে মারা যায়। সদ্যজাত সন্তানকে মানুষ করার জন্যই এই বিবাহ। নামেই বিবাহ, শুধু কর্তব্যের খাতিরে এই বিবাহ। বয়স্ক দোজ বরের মনে রোমান্সের কোন জায়গা আছে কি? নেই। কাজল এর কোন প্রতিবাদ করতে পারেনি। মুখ বুজে সব মেনে নিয়েছে। ওদের মতো মানুষের জীবন সংগ্রামে দিনগত পাপক্ষয় ছাড়া দয়া, মায়া, ভালোবাসার কোন জায়গা নেই।তাই শহরের কোলাহল থেকে চলে এসে দূরে প্রত্যন্ত গ্রামে থেকে কর্তব্যের মাঝে মাঝে বাইরে বেরিয়ে এসে উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকে শশাঙ্ক যদি ছুটে এসে তার হাতটা ধরে। তার জীবনের প্রথম প্রেম।সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে শশাঙ্কের হাত ধরে পালিয়ে যেতে পারলে ভালো হতো। আসার সময় শশাঙ্ককে কিছুই বলে আসা হয়নি। সে হয়তো খুব দুঃখ পেয়েছে। তারই জন্যে হয়তো প্রত্যেক রাতে উঠানে বেরিয়ে এসে অপেক্ষা করতে থাকে। শশাঙ্কর বাড়ির সকলের মুখ এক এক করে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।ভাবতে ভাবতে কাজলের দুচোখ জলে ভরে যায়। কিছুক্ষণ পরে মনে হয় সে এসব কী ভাবছে, যা আর হবার নয়। আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ কোরে আবার গতানুগতিক গৃহকর্মে মনোনিবেশ করে।
------------------------
Samir Kumar Dutta
Pune, Maharashtra
Mobile no. 9051095623(WhatsApp)

