ছবিঋণ- ইন্টারনেট
গুরুর গল্পের গরু
তপন তরফদার
এখন পথে ঘাটে শিক্ষা ও শিক্ষক গুরুদের নিয়ে আলোচনা চলছে।। আমাদের "নিশির ডাক" এর আড্ডায় আলোচনা হবেনা এ কখনোই হতে পারেনা। প্রথমেই খোলসা করে বলে দিই কেন আমাদের এই বোসদের পুকুর পাড়ের সিমেন্টের বেঞ্চের আড্ডার নাম "নিশির ডাক" দেওয়া হয়েছে। এই আড্ডার সদস্যরা সন্ধ্যা হলেই ছটফট করতে থাকে আড্ডায় যোগদান না করলে রাতে চোখের পাতা এক হয়না। বদহজম হয়ে যায়। আমরা জানি গ্রাম বাংলায় ওই নিশির ডাক নিয়ে অনেক গল্পকথন চালু আছে। কোন অদৃশ্য শক্তির আকর্ষণে সন্মোহিত হয়ে চলে আসে আসরে। অনেক আবার একেই বলে "ভূতে ধরা"।
আমাদের এই আসরের মধ্যমনি লাল্টুদা ও পল্টুদা আমাদের গুরু। ঠিক ধরেছেন ওরা দুই ভাই। দুর সম্পর্কের ভাই। লাল্টুদার পিসির ননদের মেজশালার খুড়তুত দাদার কাকার ছেলে ওই পল্টু। দুজনের কেউ কাউকেই দাদা বা ভাই বলে সম্বোধন করেনা। সুযোগ পেলে কেউ কাউকেই এক ইঞ্চি জমি ছাড়েনা। জিতবেই। আর এই জেতার লড়াইয়ের কথার বিনিময় এতো মনোগ্রাহী ও আনন্দদায়ক হয় তা নিশির ডাকের সদস্যরাই জানে।
আজকের বিষয় উঠে এসেছে বিয়ের মন্ত্র। লাল্টুদার মতে অনেক পুরোহিত পুরোপুরি বিয়ের মন্ত্র না জেনেই বিয়ে দেয়। পল্টুদা বুঝতে পারে আজকের বিষয় ওই বিয়ে। পল্টুদা বললো এই বিয়ে নিয়ে আমার গোবিন্দপুরের মামাদের গ্রামের ঘটনা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। নারায়ণ শর্মা ওখানকার জুনিয়র হাই স্কুলের সংস্কৃত'র শিক্ষক। শর্মা ঢালাও নম্বর দেন ছাত্রদের। অভিবাভকরা মনে করে তাদের ছেলেমেয়েরাই সংস্কৃততে খুবই দড়, তা না হলে এত নম্বর পেতোনা। শর্মা মাস্টার জানে এই স্কুল থেকে পাশ করে সদরে যে দুটো স্কুলে যাবে সেখান সংস্কৃত পড়ানো হয়না। পরীক্ষার আগের সপ্তাহে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর কি হবে বলে দিতেন এবং আরও বলে দিতেন ভালো করে লিখে লিখে প্রাক্টিশ করে আসবি তা না হলে ফেল করবি।
কালের নিয়মে শর্মা শিক্ষককে অবসরপ্রাপ্ত করা হলো। স্কুলের পূজো হলেও ছাত্র ছাত্রীদের চাঁদা ও শিক্ষকদের চাঁদা দিয়ে পূজো, প্রসাদ, খাওয়া দাওয়া খরচ বাদে সবটাই তিনি নিতেন। অবসর নেয়ার পর ভাবলেন পূজো ছাড়া গতি নাই।পৈতা যখন আছে তখন তা দেখিয়েই আয় হবে। বামুন হয়ে ছোটো কাজ করা যায় না। খোঁজ খবর করতে লাগলেন ওই বিবাহ থেকে শ্রাদ্ধ বাড়ির।
শ্মশানেও ঢুঁ মারতেন কোথাকার মড়া, শ্রাদ্ধের ঠাকুর মশাই আছে কিনা। দশকর্মা দোকানের মালিককেও বলে রেখেছেন পুরোহিতের কাজ ধরে দিতে পারলে মালিককেও কমিশন দেবেন।
অনেক মানুষ আছে যাদের কপালে ভগবান লিখে দেন, "এরা জন্ম থেকেই ভাগ্যবান। এবার ফাল্গুন মাসে একটাই বিয়ের দিন। যেমন সরস্বতী পুজোর দিন ব্রাম্ভনের আকাল হয় তাই হয়েছে। গঙ্গারামের মেয়ে টেঁপির অনেক কসরত করে পাত্র পাওয়া গেছে। ওই লগ্নেই বিয়ে দিতে হবে। গঙ্গারাম দশহরা দোকানের মালিক দশরথকেই বলে, বিয়ের জন্য আমার এক বামুনের দরকার। এখানে বামুন পাওয়া যাবে? দশরথ বলে পাওয়া যাবে। আমি একজন জ্ঞানীগুনী সংস্কৃত শিক্ষককে পুরোহিত হিসেবে ঠিক করে দিতে পারি। দোকানের কর্মচারী পচাকে বললো, পচা তুই নারায়ণ ঠাকুরকে ডেকে আন। গঙ্গারাম খুবই খুশি। যার নামই নারায়ণ, সেখানে বলার কিছুই নেই।
দশকর্মা দোকানে বসেই বিয়ের কথা শুরু হলো। নারায়ণ শর্মার মোটা পৈতেটা হলুদ ফতুয়ার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে। শর্মা,ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণু মন্ত্র সজোরে বলে বলল, আজকালকার ওই বামুন ঠাকুররা কাজের কাজ কিছু করেনা। বিয়ের দেবতা ব্রহ্মার ও পুজো না করে শুধুমাত্র পয়সা লুটের ধান্দাবাজী করাই পুরোহিতদের ধান্দা। আমি স্কুলের নাম করা সংস্কৃতের শিক্ষক,পণ্ডিত ও পুরোহিত । তোমাদের ভাগ্য ভালো। তোমরা ঠিক জায়গায় এসেছো? আমি হর-পার্বতীর বিয়ে দেবোই। আমায় অগ্রিম বায়না বাবদ পাঁচশো টাকা দিয়ে যাও। বিয়ের জন্য যা কিছু দরকার এই দশকর্মার দোকান থেকে কিনবে। কিপটেমি করবে না।
নারায়ণ শর্মা আনন্দে টগবগ করে ফুটতে ফুটতে গঙ্গারামের বাড়িতে হাজির। গঙ্গারামের বৌ ক্ষেন্তি শাঁখ বাজিয়ে পুরোহিতের পায়ে জল ঢেলে পা ধুইয়ে সুতোর কারুকার্য করা চটের আসন পেতে দিয়ে বলে, বসুন ঠাকুর মশাই। বর ও সকাল সকাল এসে গেছে। নারায়ণ ঠাকুর আসনে জম্পেশ করে বসে মনে মনে ঠিক করেছে দুচারটে সংস্কৃতি শ্লোক এমন ভাবে বলবে যেন ওদের মুন্ডু ঘুরে যায়। সবাই বলবে এটাই খাঁটি বিয়ের মন্ত্র।
নারায়ণ বিয়ের মন্ডপেই বিয়ের বই খুলেই মন্ত্র পাঠ করতে লাগল। দুটো লাইন পড়েই নারায়ণ মাথা চুলকাতে থাকে। প্রচণ্ড ভুল হয়ে গেছে বিয়ের বই না এনে শ্রাদ্ধের বই এনেছে। কিভাবে সামলাবে তাই ভাবতে থাকে। গঙ্গারামের জ্যাঠা বলল, ঠাকুর মশাই মন্ত্রগুলো কেমন ঠেকছে। এটাতো শ্রাদ্ধের মন্ত্র। নারায়ণ বলে আপনি ঠিক ধরেছেন। কোনো শুভ কাজ করতে গেলে পিতৃপুরুষদের শ্রদ্ধা করে শ্রাদ্ধের মন্ত্র বলতে হয়। এমন শুভ দিনে পূর্ব পুরুষদের আশীর্বাদ নিয়ে কাজ শুরু করলে সাফল্য আসবেই। এই সাতপাকে বাঁধন শুধু এক জনমের নয় সাত জনমের। এখনকার পুরোহিতরা শুধুমাত্র সর্টকাটে বিয়ে দিয়ে টাকা নিয়ে কেটে পড়ে। আমি সেই দলের লোক নই। মনে মনে বিয়ের মন্ত্র মনে করতে থাকে। ওই "যদি দং হৃদয়ং তব"ছাড়া কিছু মনে আসছেনা। ঠিক করলো একই মন্ত্র কায়দা করে বলে ম্যানেজ করতে হবে।প্রথমেই বলেছি ভগবান কিছু লোকের কপালে লিখে দেয় "ভাগ্যবান"। এক্ষেত্রে ও তাই হলো। পঞ্চায়েত প্রধানের ছেলে কচি আকন্ঠ মদ খেয়ে বিয়ে বাড়িতে হাজির। পুরোহিতকে ধমক দিয়ে বলে, তাড়াতাড়ি বিয়ে শেষ করুন। আমি টেঁপির জন্য উপহার এনেছি, এটাই শেষ উপহার ওকে দেবো। পঞ্চায়েতের ছেলের উপরে কেউ কথা বলবে তা স্বপনেও কেউ ভাবতে পারেনা। নারায়ণ ওই একটা মন্ত্র আউড়েই সাতপাক ঘুরিয়ে মাথায় সিঁদুর দিয়ে, খই পুড়িয়ে বিয়ে শেষ করা মাত্রই কচি বলে আমি খেঁদীর জন্য পাঁচশো টাকার লটারির টিকিট কেটে এনেছি। নারায়ণ পুরোহিত বলে আমি টিকিটটা শোধন করে দিচ্ছি। গঙ্গারাম মনে মনে বলে টেঁপিকে কচির হাত থেকে বাঁচাতেই এই তড়িঘড়ি বিয়ে। দর্শকরা ধন্য ধন্য বলল। বিয়েও শেষ হলো।
লাল্টুদা আর না থাকতে পেরে বলে উঠলো, পল্টু অনেক বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। গল্পের গরু গাছে ওঠে। এই গুরু তো গরুকে ছাপিয়ে গেল। আমাদের কি শিক্ষা দিতে চাইছিস। পল্টু বলে একটুতেই তোমার অধৈর্য হয়ে পড়ো। শেষটা শোনো। ভালোয় ভালোয় বিয়ে শেষ। গঙ্গারাম নারায়ণকে বিয়েতে পাওনা যজমানীর মালপত্র সহ একটা ভ্যানও ভাড়া করে বাড়ি পাঠিয়ে দিল।
আসল ঘটনাটা ঘটলো পরের দিন ওই বারোটা বাজার আগে। রাত্রের সেই ভ্যানোতে ঠাসাঠাসি করে দশ-বারোজন লোক হাজির। ওরা সবাই ওদের ছেলের বা মেয়ের বিয়ে এই পুরোহিত নারায়ণ শর্মাকে দিয়ে করাবে। লাল্টুদা একটা মিচকে হাসি হেসে বলে। পাগল। পল্টুদা বলে উঠলো, সব শুনলে তুমি ও পাগল হয়ে যাবে। ওর পিছনে দৌড়াবে। সেই শুদ্ধি করা লটারির টিকিটটা প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল।
========================

