গল্প ।। প্রেম যাত্রা ।। বাপন মান্না


 

প্রেম যাত্রা

বাপন মান্না 


চারিদিকে মেঘ ঘিরে এসেছে। আমি জোরে সাইকেল চালিয়ে স্টেশনের দিকে যাচ্ছি। কারণ আজ শিয়ালদহের অবনীন্দ্র সভাঘরে আমার বই প্রকাশিত হবে। অনেক কষ্টে স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। দেখলাম ট্রেন আসতে এখনও কিছুটা সময় বাকি আছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ট্রেন আসল। ধামুয়া স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠলাম। পরবর্তী স্টেশন হোটর আসতে না আসতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টির মধ্যেই দুজন কলেজে পড়া মেয়ে ট্রেনে উঠল। আরও অল্প কিছুজন ট্রেনে উঠল। সেই মেয়ে দুটি আমার ঠিক সামনে এসে বসল। দুজনেই খুব সুন্দরী। দুজনে একে অপরের সাথে আস্তে আস্তে কিছু কথা বলছে। সেইসঙ্গে মিষ্টি করে হাসছে দুজনে। আমি মাঝেমাঝে তাদের দিকে সাধারণভাবেই তাকাচ্ছিলাম। তাদের মধ্যে একজন ফোনে কি সব করছে। আর একজন এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে আমার সাথে একবার চোখাচোখি হয়ে যায়। চোখাচোখি হতেই সেই মেয়েটি লাজুকভাবে আমার দিকে অপূর্ব এক মুচকি হাসি হাসল। সত্যি বলতে কি — ওই হাসি সারাজীবনে খুবই কম দেখতে পাওয়া যায়। তখনই তার নাম ধরে তার বান্ধবী ডেকে বলল, "এই সুহাসিনী, তুই এই ড্রেসটা পছন্দ করেছিলিস না?" বুঝতে পারলাম — ফোন ঘাঁটতে থাকা মেয়েটি অনলাইনে কোনো ড্রেস দেখছে। সেইসঙ্গে মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিলাম, আমার সুহাসিনীর নামটা মুখে আনার জন্য। ওহ্, ভুল বলে ফেলেছি। আমার সুহাসিনী নয়, শুধুই সুহাসিনী। কারণ সুহাসিনীকে আমার মনের কখন জানি না ভালোলাগতে শুরু করেছে। এতে আমার কি দোষ? আমি সবসময় মনকে বোঝাই — কোন সুন্দরী মেয়েকে দেখে সহজেই আইসক্রিমের মতো গলে না যেতে। কিন্তু মন কি আর করে! সুন্দরী কোন মেয়ে দেখলেই মনটা কেমন কেমন করে ওঠে। যাই হোক, মাঝেমাঝে একটু হাসির ঝিলিক আর বান্ধবীর সঙ্গে সুহাসিনীর অল্পকিছু কথা আমাকে খুবই আনন্দ দিচ্ছিল। এইভাবে সময় অতিবাহিত হচ্ছিল। আরও তিন-চারটি স্টেশন চলে যাওয়ার পর আমার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন উঁকি দিল। সুহাসিনী কোন্ স্টেশনে নামবে? শিয়ালদহ পর্যন্ত যাবে নাকি সোনারপুর, নরেন্দ্রপুর পর্যন্ত যাবে? কারণ যদি নিউ গড়িয়া পর্যন্ত যায়, তবে ভালোই হবে। আমি যেহেতু নিউ গড়িয়াতে নামব, সেহেতু সমস্ত ট্রেন যাত্রাটা আমি তার অতুলনীয়, অবর্ণনীয় হাসি দেখার সাক্ষী হতে পারব। একবার মনে হল, সাহস করে জিজ্ঞাসা করি। আবার মনে হল, কামরা ভর্তি লোক, কোথায় উল্টোপাল্টা কি বলে দেবে ঠিক নেই, লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাবে। অনেকক্ষণ ধরে মনের মধ্যে ওই একই প্রশ্ন ঘোরাঘুরি করছে — সুহাসিনীকে জিজ্ঞাসা করা উচিৎ নাকি উচিৎ নয়? ততক্ষণে সুহাসিনীর কালো মখমলের মত চুল থেকে এক অপূর্ব সুগন্ধ বাতাসে ম-ম করতে শুরু করেছে। আর রেশমের মতো কোমল সোনালী লোম সুহাসিনীর দুই বাহুর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। মনের মধ্যে একশ ব্যর্থ প্রেমিকের মানসিক দৃঢ়তা একত্রিত করে বলেই ফেললাম, "আপনি কোথায় নামবেন?" উত্তরে সুহাসিনী আবারও স্বাভাবিকভাবেই মিষ্টি হেসে উত্তর দিল, "ঢাকুরিয়া।" আমি প্রথম চেষ্টায় সফল হয়ে দ্বিতীয় বার জিজ্ঞাসা করলাম, "আপনারা হোটর থেকে উঠলেন তো?" যথারীতি সুহাসিনী ঘাড় নেড়ে বলল, ''হ্যাঁ, হ্যাঁ।" আমি উত্তর পেয়ে মনে মনে খুব আহ্লাদিত বোধ করলাম। তারপর নিউ গড়িয়া স্টেশন আসল। আমি এই স্টেশনে নেমে মেট্রো করে রবীন্দ্র সদন মেট্রো স্টেশনে যেতে পারতাম। কারণ রবীন্দ্র সদনের কাছেই অবনীন্দ্র সভাঘর, যেটা আমার গন্তব্যস্থল। কিন্তু আমি নিউ গড়িয়া স্টেশনে নামলাম না। শুধুমাত্র আরও কিছুটা পথ সুহাসিনীর সাথে একসঙ্গে যাব বলে, আরও কিছুক্ষণ সুহাসিনীর অবর্ণনীয় হাসি দেখব বলে, আরও কিছুক্ষণ সুহাসিনীর মিষ্টি নরম কন্ঠস্বর শুনব বলে নিউ গড়িয়াতে নামলাম না। তারপর সুহাসিনীকে বললাম, "একটু জল হবে আপনার কাছে? গলাটা শুকিয়ে গিয়েছে।" সুহাসিনী বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, আছে। দিচ্ছি।" তারপর সুহাসিনী জলের বোতলটা আমার হাতে দিল। বোতলটা আমার হাতে দেওয়ার সময় সুহাসিনীর হাতের কোমল ঠান্ডা স্পর্শ লাগল আমার হাতে। আমার হাতটা যেন আজ ধন্য হয়ে গেল। এত কোমল হতে পারে কারও হাত! এত কোমল! অতঃপর ঢাকুরিয়া স্টেশন আসতেই ওরা দুজনে ট্রেন থেকে নেমে গেল। রেখে গেল চুলের মিস্টি সুগন্ধ আর কিছু স্মৃতি। তারপর আমি শিয়ালদহ পর্যন্ত সুহাসিনীর মুখ ও মুখের হাসি কল্পনায় স্পষ্ট দেখতে দেখতে চললাম। শিয়ালদহ আসতে আমি ট্রেন থেকে নেমে মেট্রোতে করে রবীন্দ্র সদন হয়ে বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলাম। 
           অনুষ্ঠান শেষে ফিরে আসার সময় এমন কোন ঘটনাই আর ঘটেনি। কিন্তু মন চাইছিল যেন সুহাসিনীরা এই ট্রেনেই এই কামরায় আবার ওঠে। কিন্তু চাইলেই তো আর মিরাক্কেল হবে না! যাই হোক, বাদলা দিনে এমন একজন প্রেয়সীর সান্নিধ্য পেয়ে দিনটা ভালই কাটল।
================================
 
নাম: বাপন মান্না 
ঠিকানা: ধামুয়া, মগরাহাট, দক্ষিণ ২৪ পরগণা


Uploaded Image

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.