দেবী যখন বাড়ির অতিথি
তপন মাইতি
শিউলিপুর নামে ছোট্ট একটি গ্রাম ছিল। গ্রামটির এক পাশে নদী, অন্য পাশে সবুজ ধানক্ষেত।
শরৎ এলেই আকাশে তুলোর মতো মেঘ ভাসত, আর ভোরবেলা ঘাসের ডগায় শিশির ঝিকমিক করত।
সেই গ্রামে থাকত দুই বন্ধু—রিমি আর রাহুল। তারা সারা বছর অপেক্ষা করত শারদীয়া পুজোর জন্য।
একদিন ভোরে রিমি ছুটে এসে বলল,
—রাহুল! জানিস, মা দুর্গা নাকি আজ আমাদের গ্রামে আসছেন!
রাহুল অবাক হয়ে বলল,
—সত্যি? আমাদের বাড়িতে?
—শুধু আমাদের বাড়িতে নয়, সবার বাড়িতে!
সেদিন থেকেই গ্রামে শুরু হল উৎসবের প্রস্তুতি
কেউ মণ্ডপ সাজাল, কেউ আলপনা দিল, কেউ ঢাক বাজানোর অনুশীলন করল।
কিন্তু রিমির চোখে পড়ল, গ্রামের এক প্রান্তে বুড়ো কাকুদের ছোট্ট ঘরটিতে কোনও আলো নেই।
রিমি মাকে জিজ্ঞেস করল,
—মা, ওদের বাড়িতে পুজোর আলো নেই কেন?
মা মৃদু হেসে বললেন,
—হয়তো তাদের কাছে প্রদীপ কেনার টাকা নেই।
রিমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিজের পুজোর জন্য জমিয়ে রাখা কয়েনের বাক্সটি নিয়ে এল।
—এই টাকা দিয়ে প্রদীপ কিনব।
রাহুলও বলল,
—আর আমি আমার নতুন রঙ পেনসিলের কিছু টাকা দেব।
দুজন মিলে আরও কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বুড়ো কাকুদের ঘর পরিষ্কার করল।
কেউ প্রদীপ আনল, কেউ ফুল, কেউ ফল। গ্রামের সবাই অবাক হয়ে দেখল—
ছোট্ট শিশুরা যেন বড়দের একটি বড় শিক্ষা দিয়ে ফেলেছে।
পুজোর দিন মণ্ডপে ভিড় জমল
রিমি দেখল, গ্রামের হরিদাস কাকু, যিনি অন্য পাড়ায় থাকেন, তিনি সেলিম চাচার সঙ্গে পাশাপাশি বসে খিচুড়ি
খাচ্ছেন।
রাহুল বলল,
—দেখ, আজ সবাই একসঙ্গে!
রিমি বলল,
—মা তো একাই আসেননি। সঙ্গে সবাইকে নিয়ে এসেছেন।
হঠাৎ মণ্ডপের আলোয় রিমির মনে হল, প্রতিমার চোখ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
সেই রাতে রিমি স্বপ্ন দেখল—মা দুর্গা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছেন।
রিমি জিজ্ঞেস করল,
—মা, তুমি কোথায় থাকো?
দেবী মৃদু হেসে বললেন,
—যেখানে কেউ ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়, যেখানে কেউ একা মানুষকে পাশে বসায়, যেখানে কেউ অন্যের দুঃখকে
নিজের দুঃখ বলে মনে করে—আমি সেখানেই থাকি।
রিমি আবার জিজ্ঞেস করল,
—তুমি কি শুধু পুজোর সময় আসো?
দেবী বললেন,
—না। তোমরা যখন ভালোবাসো, তখনই আমি আসি।
বিজয়ার দিন দেবী নদীর পথে বিদায় নিলেন। সবাই কাঁদল। রিমিও কাঁদল।
কিন্তু বাড়ি ফিরে সে দেখল—বুড়ো কাকুদের ঘরের প্রদীপটি এখনও জ্বলছে।
রিমি হাসল।
সে বুঝল, দেবী চলে গেলেও তাঁর আলো থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে।
আর সেই দিন থেকে শিউলিপুর গ্রামের শিশুরা ঠিক করল—
প্রতি বছর পুজোর আগে তারা শুধু মণ্ডপ সাজাবে না, গ্রামের এমন সব বাড়িতেও আলো জ্বালাবে যেখানে
আলো পৌঁছয়নি।
কারণ তারা জানত—
দেশ শুধু মানচিত্রের নাম নয়,
দেশ মানে—একসঙ্গে থাকা মানুষের ভালোবাসা।
--------------------------------
নাম:তপন মাইতি
ঠিকানাঃ গ্রামঃ পশ্চিম দেবীপুর; পোঃ দেবীপুর; থানাঃ মৈপীঠ কোস্টাল; জেলাঃ দঃ২৪পরগণা;
পিন-৭৪৩৩৮৩; পশ্চিমবঙ্গ। ভারত।

